অনুসরণকারী

মঙ্গলবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০২০

রাগ ফিউশন



পর্ব-

পঞ্চম

সকাল থেকে মেজাজটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে আমার হবে নাই বা কেন? কলেজের সিনিয়ার হয়ে ফেস্টের যাবতীয় চাপ সামলাও, জুনিয়ার ভাইবোন গুলো পারফর্ম করবে ওদের কোনো অসুবিধা যাতে না হয় সেটা দেখো ফেস্টে যারা নাম দিয়েছে তারা পৌছলো কিনা সেটা দেখো, আবার নিজের ব্যান্ড মেম্বার গুলো কেও সামলাও আপনারাই বলুন এত কিছুর পর মাথা ঠিক থাকে? আমি একাই খেটে মরবো আর বাবুরা বসে বসে হাওয়া খাবেন কেউ সকাল থেকে মাল-গাঁজা টেনে আউট হয়ে থাকবেন, আরেকজন সালা জিএফ ডিচ করেছে বলে বিরহী দেবদাস হয়ে বসে থাকবেন! একমাত্র মল্লারটাই যা সেন্সিবল বাকিগুলো সব কটা ওয়ার্থলেস! গুড ফর নাথিং! এদের দেখে মনে হয় কি ছিড়তে যে ব্যান্ড খুলেছিলামসকাল থেকে বলে যাচ্ছি হারামীগুলো কে বিকেলে পারফর্ম আছে সব কটা রেডি থাকিস কিন্তু না ওরা আমাকে জীবনেও কোনো দিন সিরিয়াসলি নেয় নি এখন এসে দেখছি সব কটা বসে আছে না ভুল বললাম সব কটা নয়

  যে দেখছেন? ঘরের কোণের বিছানায় এই ভর সন্ধ্যেবেলায় ভোঁস ভোঁস করে মাল টেনে ঘুমোচ্ছে হলো কেদার কেদারেশ্বর চক্রবর্তী আমাদের ব্যান্ডের ড্রামার সারাদিন হয় গাঁজা নয় ওল্ড মঙ্ক গিলে রুমে পড়ে থাকে কিন্তু পরীক্ষার দিন আর পারফর্মের দিন আকন্ঠ গিলেও স্টেডি থাকেআমি বুঝি না এত নেশা করেও কি করে এতটা স্টেবল থাকেতাও আজকের দিনের জন্য ওকে বলেছিলাম আজকের দিনটা নেশা না করতে এখন এসে দেখছি উনি একগলা মাল গিলে উল্টে পড়ে আছেনআপদ একটা!

ডানদিকের বিছানায় হাতে ফোন নিয়ে যে ছেলেটাকে বিরহী মুখ করে বসে থাকতে দেখছেন ওর নাম সৌরভ মিত্র আমাদের ব্যান্ডের লিড সিঙ্গারমালটাকে আমরা দেবদাস বলে ডাকি কারন অপোগন্ডটা সারা বছরে যতটা পড়ার বই পড়ে তার চেয়ে বেশি প্রেমে পড়ে আর যতটা পান, বিড়ি,সিগারেট,বা বিরিয়ানী খায় তার চেয়ে ষোলগুণ বেশি ক্রাশ আর বত্রিশগুণ বেশি ছ্যাঁকা খায়এই তিন বছরে এই নিয়ে চার জন ওকে ছ্যাকা দিলো শেষে জন মানে বৈশালীর সাথে যখন ওর প্রেম মাখো মাখো তখনি ওকে সাবধান করেছিলামবলেছিলামশোন, সাবধান থাক বৈশালীর মতো মেয়েরা হচ্ছে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো কাব্যে, গল্পে, গানেই ওদের ভালো লাগে বাস্তবে সামনে এলে সব তছনছ করে দিয়ে যায় কিন্তু গান ইয়ে মানে হতভাগাটা আমার কথা শুনলে তো? শুনেছিলাম ন্যাড়ানাকি একবারই বেলতলা যায় ইনি রোজ বেলতলা যান এত বার ছ্যাঁকা খেয়েও শিক্ষে হলো না হারামজাদার! যতসব! রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে আমার!

 

  এর চেয়ে আমি এই পঞ্চম দাশগুপ্ত বেশ ভালো আছি বুঝলেন?আজন্ম সিঙ্গেল সেই স্কুলে ক্লাস নাইনে একবার ঠেকে শিখেছিলাম তারপর প্রেমরূপী বসন্তের মুখে কুইনাইন আর বুন্দেলখন্ডের মাটির কাদা মিক্স করে মেরেছি আর প্রেম করে লাভ কি বলুন তো? ছুটির দিন কোথায়হোস্টেলে পড়ে পড়ে ঘুমোবো তা না ওনাকে নিয়ে সারা শহর ঘোরো গ্যাঁটের কড়ি খসিয়ে ফুচকা, আইসক্রিম, মোমো, বিরিয়ানির ভাগ দাওময়দানে, পার্কে বসে বাকি প্রেমিদের কম্পটিশন দিয়ে প্রেম করো সারারাত জেগে হোয়াটসঅ্যাপেআমাল বাউতা থেয়েছে? তুমি না থেলে আমিও থাব না? ওই তি তরছো?” করো ধুস! অতো ন্যাকামো আমার আসে না! তার চেয়ে হোস্টেলেবিকেলবেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে, বিকেলে বেরিয়ে হোস্টেল গেটের পাশে শিবুদার চায়ের দোকানে একভাঁড় চা আর ডিমটোস্ট সাটিয়ে, সেমের অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতে বা ব্যান্ডের গান লিখে নোটেশন দিতে দিতে নাহলে রেকর্ড করা ক্লিপটা এডিট মেরে ইউটিউবে পোষ্ট করতে করতে দু-তিন প্যাকেট সিগারেট মেরে দাও তারপর রাতেরবেলায় ব্যান্ড মেম্বারদের সাথে রিহার্সাল করে নয়তো স্টুডিওতে সবাই মিলে রেকর্ড করার পরে রাতে বিরিয়ানীর সাথে দুবোতল রাম মেরে শুয়ে পড়ো আর তেমন নেশা না হলে পর্নহাইয়ে মানে ভিপিএন জিন্দাবাদ তো আছেই রাত জেগে পুচুসোনা করার চেয়ে নিজের ছোটোভাইকে আদর করে ঘুমোনো ঢের ভালো আমার কাছে

এই অপোগন্ডদের মধ্যে একমাত্র মল্লারই ভালো ছেলে যাকে বলে একেবারে পারফেক্ট আমার মতোই কারো সাতেপাঁচে থাকে নাচুপচাপ বসে নোটেশন শোনে, গিটারে সুর বসায়, আর অল্প মালখেয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে কোনো ঝামেলা নেইব্যান্ডে আমার ভরসার স্থল হলো এই গিটারিস্ট মল্লার ঘোষ ওই একমাত্র তালে ঠিক থাকে বাকিগুলো মানে কি বলবো আপনাদের? জাস্ট অকর্মার ঢেকি সব! মল্লার রেডি হয়ে গিটারের নোটেশনগুলো চেক করছিলো আমাকে দেখে গিটারটা কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় রাখলোতারপর ব্যাপারটা বুঝে বললোচাপ নিস না আমি দেখছি তুই তো জানিসই কেদারকে গাঁজা থেকে দূরে রাখা আর তোকে শিবুদার চায়ের দোকান থেকে আলাদা রাখা সেম ওকে হাজারবার নিষেধ করলেও মাল টানবেইআর আমাদের রাসভ সরি সৌরভের ছ্যাঁকা খাওয়া তো কম্পালসারি ব্যাপার ছ্যাঁকা না খেলে কি ওর ভেতর থেকে গান বেরোয়? আজ পর্যন্ত যতবার আমরা রেকর্ড করেছি ততবারই ছ্যাঁকা খাওয়া সৌরভের সুরে হিট হয়েছে আমাদের ভিডিও আমি শিওর, আজ তাই হবেপুরো স্টেজ কেঁপে যাবে

আমি তাও গোঁজ হয়ে বসে বললাম,”বাল হবে! সালা দেখছিস না দুটো কেমন কেতড়ে পড়ে রয়েছে! সালা আমি সব চাপ, কাজের ঠাপ সামলে খাটবো আর হারামীগুলো গান্ডেপিন্ডে গিলে পেছন উলটে পড়ে থাকবে? সালা ব্যান্ডটা কি আমার একার? সালা এটাকে দেখ! তখন বার বারবলেছিলাম! ওরে ওর পেছনে যাস না তোকে কুত্তার মতো দৌড় করাচ্ছে কিন্তু আমার কথা শুনলে তো? কেমন? লেঙ্গি দিয়ে পোঙ্গা মেরে গেলো তো? এখন আর দেবদাস সেজে কি হবে? সালা বোকাচো

 খিস্তিটা দিতে যাবো এমন সময় কলেজমাঠের দিক থেকে অ্যানাউন্সমেন্ট এলোপঞ্চম দাশগুপ্ত তুমি যেখানেই থাকো না কেন এখনি পার্টি অফিসে এসে যোগাযোগ করোগাইয়ে মানে সর্বনাশ করেছে! পার্ট অফিসে ডাক মানে তো কৃষ্ণময়দার তলব? আবার কি হলো? ওখানে বাবলু আবার কোনো কেলো করে বসলো না তো? আমি এখন কোথায় যাবো? ব্যান্ডের দিকে দেখবো না ওদিকটা অবস্থা বেগতিক দেখে মল্লার আমাকে বললো,”তোকে যে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে সেটা সামলা বাকিটা আমি দেখছিযা কেষ্টদা ডেকেছে নির্ঘাত সিরিয়াস কিছু হবে চাপ নিস না দুটোকে চাঙ্গা করে সময়ের মধ্যে স্টেজে তুলে দেবোআরেকবার কলেজের মাঠ থেকে ভেসে এলো,”পঞ্চম দাশগুপ্ত

মল্লার আমাকে ঠ্যালা মেরে বললো,” কি হলো যা!” আমি মাথা চুলকে বেরিয়ে এলাম আমি জানি মল্লার যখন একবার বলেছে যে করেই হোক দুটোকে নিয়ে আসবে মল্লার কে আমি চিনি যা বলে তাই করে কলেজ মাঠে ছেলেপুলেদের ভিড় হতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে এটা বাড়তে থাকবে ঘরিতে তাকিয়ে দেখলাম সাড়ে ছটা বাজে প্রোগ্রাম শুরু হবে ঠিক সাড়ে সাতটায় মানে এখনো একঘন্টা বাকিআজকের দিনটা সত্যিই আমাদের কাছে স্পেশাল এতদিন পর এই প্রথমবার আমরা লাইভ শো করতে চলেছি এতদিন শুধুমাত্র 1080 মেগাপিক্সেলে আবদ্ধ ছিলো আমাদের শো আজ প্রথমবার আমরা লাইভ অডিয়েন্স ফেস করবো আপনারাই বলুন চিন্তা হবে না?

আমরা চার বন্ধু, মল্লার, কেদার, সৌরভ, আর আমি পঞ্চম সেই কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে দেখা হয়েছিল আমাদের তারপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ পাঁচটা বছরআমরা শুধুব্যাচমেট নই রুমমেটও বটেহইহুল্লোর করে একটা বছর কেটে যাবার পর আমরা আবিস্কার করি যে শুধু পড়াশোনাতেই নয় আমরা গানবাজনার দিকেও সেম মেন্টালিটি রাখি ম্যাথসের কেদার কলেজে আসার আগে তবলা শিখতো এবং শুধু তবলাই নয়, যে কোনো রকমের ড্রাম ইন্সট্রুমেন্ট বাঁজাতে পারে সৌরভটা রীতিমতো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে পড়ছে এবং কলেজে আসার আগে কোন এক গুরুজির কাছে তালিম নিতোহিস্ট্রির মল্লার হাতখরচের জন্য গিটার শেখায় কয়েকজন কেআর আমি ইংলিশ লিটরেচারের পঞ্চম দাশগুপ্ত মাধ্যমিকবেলায় কবিতা লিখতাম এখন চর্চা আছে ঠিকই কিন্তু কাউকে দেখাই নাব্যান্ড তৈরির প্রস্তাবটা আমিই দিয়েছিলাম কিন্তু একটা ভয় ছিলো আমাদের মতো আনকোরা কয়েকটা কলেজ স্টুডেন্টের এই আনকোরা ব্যান্ডের গান অডিয়েন্স শুনবে তো? অডিয়েন্সবেস তৈরি করা এত সহজ নয়তার উপরগেঁয়ো যোগী ভিখ পায় নাপ্রবাদ তো আছেই তাই আমরা ঠিক করলাম ইউটিউবকে প্ল্যাটফর্ম করে আমরা গাইবো তাতে অডিয়েন্স পাওয়া কঠিন কিন্তু কিছু সংখ্যক তো তৈরি হবে ঠিক করলাম আমরা যতদিন কলেজে আছি ততদিন এই ব্যান্ডের ব্যাপারটা থাকবে ততদিনে কিছু হলে হবে নাহলে ব্যান্ডটা ভেঙে দেবো বুঝতেই পারছেন নেহাত হুজুগেই তৈরি হয়েছিল সব কিছু

 প্রথম প্রথম আমরা পুরোনো কিছু গানকে রিক্রিয়েট করে আপলোড করতাম ধীরে ধীরে ক্লাসিক্যাল ফিউশন ট্রাই করলাম তারপর নিজেদের লেখা গান কম্পোজ  করে আপলোড করতে লাগলাম প্রথম প্রথম ভিউ কম পরলেও ক্রমশ তা বাড়তে লাগলো তারপর  সৌরভের প্রথম ব্রেকাপের সময় একটা গান আমরা আপলোড করার পর আর আমাদের ফিরে তাকাতে হয়নি দেখতে দেখতে চারটা বছর কিভাবে কেটে গেল টেরই পেলাম না আমরা কমেন্টবক্সে লিসনারদের আমাদের লাইভ পারফর্মেন্সের আবদার অনেক দিন ধরেই ছিলো অবশেষে মল্লার একদিন প্রস্তাবটা দিলো কেমন হয় যদি আমরা আমাদের কলেজফেস্টেই প্রথম লাইভ শো টা করিপ্রস্তাবটা নেহাত মন্দ লাগলো না আমার তবে এর জন্য আমাদের কলেজের কালচারার ডিপার্টমেন্টের অনুমতি প্রয়োজনঅনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে অন্তত আমার তাই মনে হয়েছিলো কিন্তু কালচারার ডিপার্টমেন্টের অনিমেষদার কাছে সেটা বলতেই শুধু এক কথায় রাজিই হলো নাবরং ফেস্টের প্রথম দিনই আমাদের শো করতে হবে আবদার করে বসলো অগত্যা রাজি হতে হলো আমাকে এবার আপনারাই বলুন এরকম একটা দিনে যদি সবকটা এরকম গা ছাড়া মনোভাব করে বসে থাকে তাহলে আমার রাগ হবে না?

 মাঠটা পেরিয়ে বাঁদিকে আমাদের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের পার্টি অফিসদরজাটা ভেজানো দরজার সামনে এসে দাঁড়ালামবুকটা কেমন যেন ঢিবঢিব করছে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে দরজায় নক করে অবশেষে গলা খাঁকড়ে বল্লাম,”আসবো?” হুট করে দরজাটা খুলে গেলো দেখলাম আমাদের আর্টস ডিপার্টমেন্টের রণিত দরজা খুললো সেরেছে! অনুষ্ঠানের আগে এই অপয়া কাঠিবাজটার মুখ দেখতে হলো? রণিত আমাকে দেখে মুচকি হাসলোআমিও জবাবে হাসলেও মনে মনে খিস্তি করার সুযোগছাড়লাম না

 রণিতকে গোটা কলেজ কাঠিবাজ হিসেবে চেনে কিন্তু ওর মাথার উপর কেষ্টদার হাত থাকায় কেউ ওকে ঘাটাতে সাহস করে না রণিতের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো কারো ভালো দেখতে পারে না কারো কিছু ভালো হলে সেখানে কাঠি করাই ওর স্বভাব কলেজে কেউ প্রেম করছে? কাঠি করে সম্পর্কটা কেঁচিয়ে দেবে কেউ গান করে স্যারেদের কাছে প্রশংসা পাচ্ছে, এমন কাজ করবে যাতে সে গান গাওয়াই ছেড়ে দেয় কানাঘুষোয় শুনলেও আমি একেবারে একশো শতাংশ সিওর আমাদের সৌরভেরএতগুলো ছ্যাঁকা খাবার পেছনে এই হারামজাদাটার হাত আছে আমি শুধু প্রমাণ আর সুযোগের অপেক্ষায় আছি যেদিন একে আমি বাগে পাবো বুঝিয়ে দেবো পঞ্চম দাশগুপ্ত কি জিনিস

রণিত আমাকে দেখে হেসে বললো,” আয় ভেতরে আয় কেষ্টদা তোর জন্য অপেক্ষা করছেআমি যতটা সম্ভব হাসিমুখ করে ভেতরে ঢুকলাম আর ভেতরে ঢুকেই আবার আমার মাথায় খুন চেপে গেলো ঘরে একপাশে একটা চেয়ারে বসে আছে কেষ্টদাহাতে একটা সিগারেট ধরানো ইউনিয়নের সব কটাই আজকে উপস্থিত সবকটা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে আর কেষ্টদার পাশের চেয়ারে বসে আছে আজকের আমাদের ব্যান্ডের প্রোগ্রাম নষ্টের মুল কারন, বৈশালী দত্তগুপ্ত

 

সৌরভ

আজকের দিনটা আমার কাছে এক অভিশপ্ত দিন আজকে কেন জানি না সব কিছু পানসে লাগছে কলেজ ফেস্টের হইহুল্লোর, আমাদের প্রথম লাইভ শোর আনন্দে গোটা হোস্টেল, ব্যান্ডের বাকিরাআনন্দ করলেও আমার কাছে আজকে সবকিছুর মজা মাটি হয়ে গেছেমনে হচ্ছে, সব কিছু যেন ফ্যাঁকাসে হয়ে গেছে কোনোকিছুরই কোনো মানে নেই আমার কাছে এই মুহুর্তে সব কিছু অর্থহীন হয়ে গেছে আমার কাছে অথচ আজ সকালেও এরকম ছিল নাসকালবেলাতেও বেশ চনমনে ছিলাম আমি পঞ্চমটা ফেস্টের কাজে আটকে গেছে বলে আজ আর রিহার্সালে আসবে না একেবারে শোয়ের সময় ঢুকবে বলে ওকে বাদ দিয়ে আজকের রিহার্সালটাহয়েছেমল্লারের সাথে ঠিক করে নিয়েছি আজ কোন কোন গানগুলো গাওয়া হবে সেই মতো প্র্যাক্টিস সেরে নিয়ে কলেজে গেলাম আজ আমাদের ডিপার্টমেন্টেরও প্রজেক্ট শো আছেঅনির্বাণ, প্রত্যুষা, সঙ্কর্ষণরা মারাত্মক খেটেছে বিশেষ করে সঙ্কর্ষণ প্রজেক্টটার পরিকল্পনা ওরই ছিলো আমিও প্রজেক্টে নামতে চেয়েছিলাম কিন্তু এটা ওদেরকে বলায়  ওরা প্রায় রে রে করে তেড়ে এসে বলেছিলো একদম না, পঞ্চম নাকি ওদেরকে বলেছে আমি যাতে ফেস্টে ব্যান্ডের শো ছাড়া আর কিছু না ভাবিতাই আমাকে আসতে হবে নাওরা সব সামলে নিতে পারবেপ্রথমে কিন্তু কিন্তু করলেও অগত্যা শেষে রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিলো না

কলেজে আমাদের ডিপার্টমেন্টের স্টলটাতে যেতেই সবকটা হই হই করে ঘিরে ধরলো আমাকে সব কটা আজকের প্রোগ্রামের জন্য আমাকে উইশ করলোসবার সাথে হাসি ঠাট্টায় বেশ কিছুক্ষন কেটে গেলোদুপুরের দিকে হোস্টেলে ফিরবো বলে স্টল থেকে বেরিয়ে এলাম হোস্টেলের দিকে এগোতে যাবো এমন সময় পেছন থেকে কে যেন ডাকলো পেছন ফিরে দেখলাম বৈশালী ওদের ডিপার্টমেন্টের স্টল থেকে বেরিয়ে একটা বোঁকে হাতে করে নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে আমি দাঁড়িয়ে পড়লাম বৈশালী এগিয়ে এলো তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললো,”কখন এলে?”

এই তো ঘন্টাচারেক হলো

একবারও তো আমাদের স্টলে এলে নাবলে আমার দিকে প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকালো আমি মনে মনে হাসলাম অভিমান হয়েছে বেচারীর হেসে বললাম, “তা তুমিও যে আসছো বলোনি তো? বললে একসাথে আসতাম

জেনে কি করতে? রিহার্সাল ছেড়ে আমার সাথে চলে আসতে? “রাগত গলায় বলে ঠোঁটটা একটু ওল্টালো বৈশালী

আহ! কি হচ্ছেটা কি বৈশু? নিয়ে তো আমরা আগেও কথা বলেছিবলে ভ্রু কুঁচকে তাকালাম ওর দিকেএই ব্যান্ডের জন্য ওকে সময় দিতে পারি না বলে আমার উপর যথেষ্ট রাগ আছে বৈশালীর এই নিয়ে বেশ কয়েকবার ঝগড়াও করেছি আমরাআজকের দিনেও এই নিয়ে ঝগড়া করতে ভালো লাগলো না আমার

ওকে লিভ ইট!” বলে বৈশালী কিছুক্ষন চুপ করে রইলো তারপর বোঁকেটা আমার হাতে ধরিয়ে বললো,”আজকের শো টার জন্য অল দ্য বেস্টবলে নিজের ডিপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে চলে গেলো আমি হতভম্বের মতো কিছুক্ষন সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে এলাম আমাদের হোস্টেলে রুমে ঢুকে দেখলাম কেদারটা যথারীতি মাল টেনে উল্টে পড়ে আছে মল্লারটা নেই বোধহয় ক্যান্টিনে খেতে গেছে নিজের বিছানায় বসে বোঁকেটা নাকের কাছে এনে প্রাণ ভরে গন্ধটা নিলাম তারপর বোঁকেটা বিছানার পাশে রাখতে গিয়ে নজরে পড়লো চিরকুট্টাসেটা হাতে তুলে দেখলাম লেখা,” Check Inbox.” কথাটার মানে বুঝতে পারলাম না এমন সময় ফোনে টুংটুং করে নোটিফিকেশন এলো পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলাম বৈশালী একটা ভয়েস নোট পাঠিয়েছেমনে মনে একটু অবাক হলাম এই সময় আবার ভয়েস নোট পাঠাবার কি দরকার ছিলো ওখানেই তো বলতে পারতো বালিশের পাশেই হেডফোনটা ছিলো সেটা ফোনে কানেক্ট কর ভয়েস নোটটা অন করতেই মনে হলো পায়ের তলা থেকেমাটি সরে গেলো

কথাটা আমি ক্যাম্পাসেই বলতে পারতাম কিন্তু বলিনি কারন তুমি সেই সময় শুনলে সাঙ্ঘাতিকভাবে রিয়্যাক্ট করতে তাই এই ভাবে বলতে বাধ্য হচ্ছি সরি আমার মনে হয় আমাদের রিলেশন নিয়ে আমাদের আর না এগোনোই ভালো এতে আমাদের দুজনেরই ভালোকারন আমি দেখেছি গানের প্রতি, ব্যান্ডের প্রতি তোমার যে প্যাশন সেখানে আমাদের রিলেশনটা অনেকটা অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমি খেয়াল করেছি আমরা যখন একসাথে থাকি তখন তোমার শরীরটা আমার সাথে থাকলেও মনটা পড়ে থাকে ব্যান্ডের রিহার্সালে একটা দুটো কথার পর বার বার ব্যান্ডের কথা, গানের কথা, ভিডিওটে কটা ভিউজ এলোকত লাইক পড়লো, ব্যান্ড মেম্বাররা কি করেছে এসব কথায় চলে যাও মানছি ব্যান্ড আর গান নিয়ে তোমার জগত কিন্তু এই জগতে আমি কোথায় বলতে পারো? আমি চাই তুমি অনেক বড়ো একজন গায়ক হও তোমার ব্যান্ডের অনেক নাম হোক কিন্তু আমরা একসাথে থাকলে তা কোনোভাবে সম্ভব নয় আমি জানি আজকের দিনটা তোমার কাছে খুব স্পেশাল আমি চাইনি আজকের দিনে এসব বলে তোমার মন ভেঙে দিতেকিন্তু এটা একদিন না একদিন আমাকে বলতেই হতো আমি এটা বলতে চাইছি না যে আমার আর ব্যান্ডের মধ্যে যেকোনো একজন কে বেঁছে নিতেকিন্তু তোমার স্বপ্নপূরনের ক্ষেত্রে আমি বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই নাতাইভালো থেকো, আজকের শো টা দারুণ হোক তোমার আমি কলেজের স্রোতাদের ভীড়ে দাঁড়িয়ে শুনবো আজকে তোমার গান লাভ ইউ বাবুভয়েসটা শোনার পর প্লিজ কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করো না তোমার নাম্বার আমি ব্লক করছি ভালো থেকো” 

ভয়েসটা শোনার সাথে সাথে বেশ কয়েকবার কল করেছিলাম আমি কিন্তু বার বার যন্ত্রমানবী একই কথা বলে চলেছে,” The number you’ve dialed is currently switched off. Please try again later.” তখনই ক্যাম্পাসে ছুটে গেছি তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি গোটা ক্যাম্পাসে ওদের ডিপার্টমেন্টের প্রজেক্টের স্টলেও গিয়েছিলাম ওরা বলেছে বৈশালী নাকি হোস্টেলে চলে গেছে অনেকক্ষণতখনই ওদের হোস্টেলে ছুটে গিয়েছিলামহোস্টেলের সামনে বৈশালীর রুমমেট অবন্তিকাকে পেয়ে জিজ্ঞেস করায় বললো বৈশালী নাকি সকালবেলাতেই বেরিয়ে গেছে গোটা কলেজে ওকে খুঁজে না পেয়ে পাগল পাগল লাগছিলো আমার গোটা দুপুর-বিকেল ধরে গোটা ক্যাম্পাসে ওকে খুঁজে না পেয়ে ক্লান্তপায়ে ফিরে এলাম হোস্টেলে ঘরে বসে শেষবারের মতো কল করলাম ওর নাম্বারে এবারও যন্ত্রমানবী একই কথা বললো,”The number you’ve dialed is currently switched off. Please try again later.”

রাগে ফোনটা বিছানায় ফেলে দিয়ে শুয়ে পরলাম আমি রাগে, দুঃখে, কষ্টে চোখ ফেটে জল আসছে আমারকেন? কেন? আমিই কেন? প্রতিবার আমার সাথেই কেন হয়ে এটা? এবার তো আমার কোনো দোষ ছিলো না তাহলে আবার কেন? আজকের দিনটা কত স্পেশাল ছিলো আমার কাছে ভেবেছিলাম আজকের আমাদের আনন্দে ওকেও শরিক করবো কিন্তু কেন করলো এটা আমার সাথে? করতে পারলো ?ওই যখন নেই তখন এই প্রোগ্রাম, এই আনন্দের কি মানে? আজকে আমি চাইলেও গাইতে পারবো নাআমার গলা দিয়ে যে আজ গান বেরোবেই না

ভাবতে ভাবতে দেখলাম পঞ্চম ঘরে ঢুকে বলছে,”তাহলে সব রেডি তো? আজ কিন্তু প্রোগ্রামের মুল আকর্ষণ আমাদের শো কি কি গান গাইবি সব রেডি তো?” বলে কেদারের দিকে তাকিয়ে বললো,” এই মালটা আজকেও গিলেছে? সর্বনাশ!” বলে এগিয়ে গেলো ওর দিকে তারপর বেশ কয়েকবার ধাক্কা দিলেও কেদার উঠলো না দেখে মুখ খিস্তি করতে লাগলো তাতেও কোনো কিছু না হওয়ায় নিজের বিছানায় মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলোতারপর আমাকে বললো, “তোরা তো সারাদিন ছিলি ওকে থামাতে পারলি না? আজকের দিনে যদি এইভাবে উল্টে পড়ে থাকে তাহলে হবে কি করে? অবশ্য কাকে বলছি? সারাদিন ফোনে জানুপানু করতে থাকলে অন্যদের দিকে তাকানোর সময় কোথায় পাবে?”

সারা গায়ে আগুন জ্বলে উঠলো আমার মনে হলো কথাটা আমাকে শুনিয়ে বলেছে পঞ্চম ফোঁস করে বলে উঠলাম,” একদম বালের মতো বলবি না কোনদিন ফোনে জানুপানু করেছি বল তো? সারা দিন পাগলের মতো ব্যান্ডের গান নিয়ে পড়ে থেকেছিযেখানেই যাই না কেন? ফোনে ব্যান্ডের সবার সাথে যোগাযোগ করেছি এমনকি আজকে সকালবেলাতেও সব কিছু ভুলে রিহার্সাল করেছি আমরা তুই কি করেছিস বলতো? শুধু গান লিখে আর ইউটিউবে আপলোড করেই দায়িত্ব সেরেছিস ভিডিওর পাবলিসিটি, প্রোমোশনের সব কাজ আমরা সামলেছিআর তুই? গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেরিয়েছিসএমন কি আজকের দিনেও কলেজ ফেস্টের কাজ আছে বলে কেটে পড়েছিস তুই আর কোন কাজে লাগিস বলতো আমাদের?”

আচমকা এই আক্রমণে পঞ্চম অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো বোঝাই যাচ্ছে এরকম পাল্টা ছোবল আশা করে নিনিজের বেড থেকে উঠে এসে আমার বেডে বসলো তারপর আমার পিঠে হাত দিয়ে বললো,” কি কেস রে? আজকে মুড অফ কেন? বৈশালীর সাথে কিছু হয়েছে নাকি?” আমি আর পারলাম না কাঁদতে কাঁদতে সবটা বললাম ওকে পঞ্চম সবটা চুপ করে শুনলো তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”জানতাম এই কারনে তোকে আমি সাবধান করেছিলামযাকগে মন খারাপ করিস না চিয়ার আপযা হয়েছে ভালোর জন্য হয়েছে ভবিষ্যতে খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করে রক্তাক্ত হবার আগেই তোকে মুক্তি দিয়েছেএবার সময় এসেছে ডানা মেলে ওড়ার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠ দেখি আজকের শোতে আগুন লাগিয়ে দে

আমি অস্ফুটে বললাম,”আমি পারবো নাকথা বলতে বলতে আচমকা থেমে গেলো পঞ্চম যেন আমার কথাটা ওর বোধগম্য হলো না আমার দিকে ফিরে বললো,” কি? কি বললি?” আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,”শুনতেই তো পেলি আজকে আমি পারবো নাআজকের প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করে দে

পঞ্চম আমার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলোযেন আমার কথাটা হজম করতে পারে নি তারপর ঠান্ডাগলায় বললো,”একসপ্তাহ ধরে এত প্রচারের পর, কালচারার ডিপার্টমেন্টের হাজার প্রোগ্রামের নিয়ম মেনে, কলেজে অডিয়েন্স ডেকে এনে এখন নাটক মারা হচ্ছে? কেন? না আমাদের গায়কমশাইয়ের প্রেমিকা আজ তাকে লেঙ্গি মেরেছে বাহ বোকাচোদা বাহ! তা গায়কমশাই আজ অডিয়েন্স যদি জানতে পারে যে সামান্য লেঙ্গি খাওয়ার কারনে আপনি আজকের প্রোগ্রাম ক্যান্সেল করেছেন কি হবে ভেবে দেখেছিস? এত বছরে একটু একটু করে যে ফ্যানবেসটা তৈরি হয়েছে সেটা একলহমায় কোথায় দাঁড়াবে জানিস? ডিজিটাল মিডিয়ার অডিয়েন্স যত তাড়াতাড়ি মাথায় তোলে তত তাড়াতাড়ি ছুঁড়ে ফেলতেও এক সেকেন্ডও ভাবে না

সে তখন দেখা যাবে কিন্তু আজ আমি কোনো মতেই গাইবো নাবলে গোঁ ধরে বসে রইলাম পঞ্চমের মুখ লাল হয়ে উঠলো কোনোমতে বলে উঠলো,” তুই যাবি না?” আমি জবাব দিলাম না ফোনটা হাতে নিয়ে ঘাটতে লাগলাম মল্লার পাশের বেডে বসে গিটারের নোটেশন চেক করছিলোঅবস্থা বেগতিক দেখে গিটার কোল থেকে বিছানায় নামিয়ে বললো,” “চাপ নিস না আমি দেখছি তুই তো জানিসই কেদারকে গাঁজা থেকে দূরে রাখা আর তোকে শিবুদার চায়ের দোকান থেকে আলাদা রাখা সেম ওকে হাজারবার নিষেধ করলেও মাল টানবেইআর আমাদের রাসভ সরি সৌরভের ছ্যাঁকা খাওয়া তো কম্পালসারি ব্যাপার ছ্যাঁকা না খেলে কি ওর ভেতর থেকে গান বেরোয়? আজ পর্যন্ত যতবার আমরা রেকর্ড করেছি ততবারই ছ্যাঁকা খাওয়া সৌরভের সুরে হিট হয়েছে আমাদের ভিডিও আমি শিওর, আজ তাই হবেপুরো স্টেজ কেঁপে যাবে

পঞ্চম গর্জে উঠে বললো,”বাল হবে! সালা দেখছিস না দুটো কেমন কেতড়ে পড়ে রয়েছে! সালা আমি সব চাপ, কাজের ঠাপ সামলে খাটবো আর হারামীগুলো গান্ডেপিন্ডে গিলে পেছন উলটে পড়ে থাকবে? সালা ব্যান্ডটা কি আমার একার? সালা এটাকে দেখ! তখন বার বার বলেছিলাম! ওরে ওর পেছনে যাস না তোকে কুত্তার মতো দৌড় করাচ্ছে কিন্তু আমার কথা শুনলে তো? কেমন? লেঙ্গি দিয়ে পোঙ্গা মেরে গেলো তো? এখন আর দেবদাস সেজে কি হবে? সালা বোকাচো

এমন সময় কলেজমাঠের দিক থেকে অ্যানাউন্সমেন্ট এলোপঞ্চম দাশগুপ্ত তুমি যেখানেই থাকো না কেন এখনি পার্টি অফিসে এসে যোগাযোগ করোঅ্যানাউন্সমেন্টটা শোনা মাত্র দেখলাম পঞ্চমের মুখটা কেমন যেন ফ্যাঁকাসে মেরে গেলো যেন ওর নামে শমন এসেছেওকে ভেব্লে যেতে দেখে মল্লার বললো,” তোকে যে দায়িত্বটা দেওয়া হয়েছে সেটা সামলা বাকিটা আমি দেখছিযা কেষ্টদা ডেকেছে নির্ঘাত সিরিয়াস কিছু হবে চাপ নিস না দুটোকে চাঙ্গা করে সময়ের মধ্যে স্টেজে তুলে দেবোআরেকবার কলেজের মাঠ থেকে ভেসে এলো,”পঞ্চম দাশগুপ্ত

মল্লার পঞ্চমকে ঠ্যালা মেরে বললো,” কি হলো যা!” পঞ্চম কিছুক্ষন আমাদের দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকোতে চুলকোতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল

পঞ্চমটা চলে যাবার পর মল্লার আমার দিকে তাকাতেই ঝাঁঝিয়ে উঠলাম,”দেখ যা বুঝিস না সেটা নিয়ে তর্ক করতে আসবি না! সালা আমি মরছি নিজের জ্বালায় আর এরা ব্যান্ডের শো মারাচ্ছে অবশ্য কাদের কি বলছি তোরা তো কোনোদিন প্রেমেই পড়িস নি পড়লে বুঝতি কত চাপ? এদিকে ব্যান্ডের জন্য দিনরাত পড়ে থাকো শরীর খারাপ হলেও রিহার্সাল দাও প্রেমিকার কাছে ব্যান্ডের জন্য অশান্তি সহ্য করো আবার ব্যান্ডের মেম্বারের কাছে কথাও শোনো আজ এমনিতেই আমার মন মেজাজ ভালো নেই তার উপর হারামজাদা ফোঁড়ন কেটে কথা শোনাচ্ছে বেশ ব্যান্ড যখন ওর একার, আমার যখন কোনো কৃতিত্বই নেই তাহলে এই ব্যান্ডে থেকে কি লাভ? না আমার দ্বারা আর হবে না আই কুইট!আমি আজকে গাইতে পারবো না সরি ভুল বললাম আমি আর কোনোদিন এই ব্যান্ডের হয়ে আর গাইবোই নামল্লার কিছু বললো না আমার কথা চুপচাপ শুনতে শুনতে বিছানা থেকে উঠে একটা গ্লাসে বোতল থেকে জল ঢেলে নিল তারপর পকেট থেকে একটা লেবুর টুকরো বের করে সেটা গ্লাসের উপর পুরোটা নিংড়ে নিলো তারপর ব্যাগ থেকে একটা পলি প্যাক বের করে আনলো সেখান থেকে কয়েকটা তেঁতুল নিয়ে গ্লাসের জলে ফেলে জলটাকে আবার বোতলে ভরে একটু ঝাঁকিয়ে নিয়ে কেদারের বিছানার দিকে এগিয়ে গেল

কেদার

ধুর বাঁ! পঞ্চমটার চ্যাঁচানিতে আমার নেশাটাই কেটে গেলোকোথায় ভাবলাম বিকেলে শো আছে এবেলা একটু বাবার প্রসাদ টেনে ঘুমোবো বিকেলে শরীর একেবারে ঝড়ঝড়ে হয়ে যাবে কিন্তু হারামজাদাটা ঘুমোতে দিলে তো কারো সুখ সহ্য হয় না হতভাগাটার! সেই সকাল থেকে ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছেমাল খাবি না , মাল খাবি নাআরে বাবা নার্ভ স্টেডি রাখতে হবে তো নাকি? আজকে এতবড়ো একটা শো সকাল বেলা বাবাজি তো বলেই খালাশ এদিকে আমাদের যে হাত পা পেটের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝবে না কিছুক্ষন মাথার উপর বালিশচাপা দিয়ে শুয়েছিলাম তারপর দেখলাম আমরা স্টেজে দাঁড়িয়ে আছিসামনে অগুন্তি মানুষ দুটো হাত উপরে করে আমাদের নাম চিৎকার করে ডাকছে কেউ কেউ আমাদের সাথে সাথে গানের তাল মিলিয়ে গাইছে আমরা গুন গুন করছি নতুন গানটা ,

ভেবেছিলাম, ফিরে আর তাকাবো না/

ভেবেছিলাম, আমাদের আর দেখা হবে না/

ভেবেছিলাম, তুমি আমায় আর ডাকবে না/

ভেবেছিলাম, সময় বয়ে যাবে, থেমে থাকবে না/

যা কিছু, ভেবেছিলাম তা হলো আর কই?/

তোমার জন্য নিশুত রাতে আজো জেগে বসে রই/

জানি আমি এইসব নিছকই পাগলামি/

তোমার সাথে কাটনো সময়গুলো ভীষণ দামি/”

শেষ লাইনের পর আমি ড্রামে স্টিক মারতে যাবো এমন সময় আচমকা মল্লারটা আমাকে হ্যাচকা টান মেরে বিছানা থেকে টেনে তুললো তারপর জলের মতো কি একটা আমার মুখে দিলো পুরোটা খেতে হলো না দু ঢোক খেতেই আমার পেট গুলিয়ে উঠলোসঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে বাথরুমে গিয়ে হড়হড় করে বমি করে ফেললাম সকালে যা পেটে পড়েছিল সবটা বেড়িয়ে গেলো এমন কি দুপুরের মাল পর্যন্ত বেরিয়ে গেল বাথরুমটা টোকো গন্ধে ভরে গেছে বেশ কয়েকমিনিট পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম মল্লার দাঁড়িয়ে আছে হাতে একটা বোতল বোতলের ভেতরের জিনিসটার রং দেখে বুঝলাম বোতলে রাম আছে যেটা এই মুহুর্তে আমার দরকারএত বমি হবার পর শরীরটা দুর্বল লাগছে হাত কাঁপছে আমার আমি ওর দিকে হাত বাড়াতেই বোতলটা এগিয়ে দিলো

বোতলে মুখ দেওয়া মাত্র আবার গা গুলিয়ে উঠলো আমারআবার বাথরুমে ঢুকলাম আমি কিছুক্ষন পর বমির বেগ কমতেই কোনো মতে বললাম, “ওয়াক!এটা কি ছিলো?”

মল্লার ঠান্ডা গলায় বললো,”লেবু আর তেঁতুলগোলা জলের সরবত গাঁজার নেশা না হলেও মদের নেশা কাটায়

মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো আমারএকটু মাল খেয়ে ঘুমোচ্ছি তর সইলো না দাঁতে দাঁত চেপে বল্লাম,”আমাকে এখন খাওয়ালি কেন? শোয়ের এখনো অনেক দেরঈ দুপুরে একটু ঘুমোতে দিবি না নাকি জীবনে একটুও শান্তি নেই বাল!” বলে বেরিয়ে এলাম আমিমল্লার ঠান্ডা গলায় বললো,”শোয়ের আর দেরি নেই চাঁদ দুপুর গড়িয়ে, বিকেল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যে হতে চললো তাকিয়ে দেখ এখন সাতটা বাজেএবার চমকে ধরফর করে উঠে বাইরে তাকালাম আমি সত্যিই তো! সূর্য যে পাটে যেতে বসেছে তারমানে আমি এতক্ষন ঘুমিয়েছি? উফ হে ভগবান! চিৎকার করে বললাম,”অ্যাঁ! সাতটা বেজে গেছে? কি সর্বনাশ! উফ! তোরা আমায় আগে ডাকবি তো! আমারো বলিহারি কেন যে দুপুরে রণিতের সাথে মাল খেতে গেলাম?”

কি? কি বললি?” বলে চমকে গেল মল্লার তাকিয়ে দেখলাম আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে

 

পঞ্চম

দরজা দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি প্রচন্ড রাগে মাথায় আগুন জ্বলছে আমার কত বড়ো সাহস! বলে কিনা শো হতে দেবে না? এই পঞ্চম দাশগুপ্ত কে চ্যালেঞ্জ?আমিও দেখবো কি করে তোরা আটকাস? এখন  আমার কাছে সব পরিস্কার হয়ে গেছে রণিত তো আই ওয়াশ আসল কালপ্রিট তো কেষ্টাটা একটু আগেও জানতে পারলে মালটাকে আমি সোজা হাটতে হাটতে হোস্টেলের দিকে এগিয়ে গেলাম মল্লারকে সবটা জানাতে হবে। নাহলে এরা! হোস্টেলের গেটের কাছে এসে পৌছে গেছি এমন সময় পেছন থেকে কে যেন আমাকে ডাকলো পেছন ফিরতেই একটা বাঁশ আমার কপাল লক্ষ্য করে ধেয়ে এলো

ছেলেবেলা থেকে খেলাধুলো করি, আর ক্যারাটে চর্চাটা রেখেছি বলে রিফ্লেক্সটা সব সময় দারুন কাজ করে  আমার। অন্তত বিপদের সময় তো বটেই। এইবারও করলো মাথা নিচু করে বাঁশের আঘাতটাকে এড়িয়ে হামলাকারীর পা লক্ষ্য করে সোজা পা চালিয়ে দিলাম সামনের পাব্লিক আঘাত সহ্য করতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়লো সেই সুযোগে মালটার মাথা লক্ষ্য করে লাথি চালিয়ে দিলাম সাথে সাথে মনে পড়ে গেলো ইউনিয়ন অফিসের কেষ্টার তর্জন করা কথা গুলো ছেলেটা পড়ে যেতেই বাঁশটা হাতে তুলে নিলাম। দেখলাম আরো কয়েকজন ঘিরে দাঁড়িয়েছে আমায়। ওরা জানে না পঞ্চম দাশগুপ্ত কি জিনিস!

 

সবকটাকে ঠান্ডা করতে মিনিট পাঁচেক লাগলো।ছেলেগুলো বোধহয়  ভাবতে পারেনি মারতে এসে এভাবে পাল্টা মার খেতে হবে। নাহলে সামনের ছেলেটা এক লাথি খেয়ে ওরম কেলিয়ে যেত না। আর বাকিগুলো ওভাবে পালাতো না। নাকি লাথিটা বেশ জোরে পড়েছে? এই দেখেছেন এই একটা সমস্যা! একবার মাথা গরম হলেই হয় বাল বকতে থাকি নাহলে না বুঝেই মাপজোখ না করে বেকায়দা মেরে দিই। ছেলেটা মরে টরে গেল নাকি? ঐ যে মল্লাররা ছুটে আসছে ওরাই বলবে মালটা আছে না গেছে। তার আগে আপনাদের বলে দিই পার্টি অফিসে কি হয়েছিল।

অফিসে ঢোকার পরেই বুঝলাম হাওয়া গরম। তার উপর বৈশালীকে দেখে আমার মাথা আরো গরম হয়ে গেল। কৃষ্ণদা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,আরে পঞ্চমকুমার যে! আয়! আয়! বোস!বোস! ওই ওকে একটা চেয়ার দে।”

বলার সাথে সাথে পাশেই বসা একটা ছেলে ওর বসার চেয়ারটা দিতে যাচ্ছিলো। আমি ইশারায় বারন করে শান্ত গলায় বললাম,“দরকার নেই। কি কারনে ডেকেছিলে বলো। বুঝতেই পারছো আজকে ফেস্ট কত রকম কাজের চাপ আজকে। আজকে একটু ব্যস্ত আমি।

হুম! তা তো হবেই! তুই যে ব্যস্ত মানুষ! আজকের ইভেন্ট সামলাচ্ছিস, শো গুলো সামলাচ্ছিস আবার আজ তোর ব্যান্ডের শো টাও আজকেই হবে। ব্যস্ত তো থাকবিই!”

কথাটার মধ্যে একটা সুক্ষ্ম ঠেস ছিলো টের পেলাম। অন্য কেউ এই কথাটা যদি বলতো তাহলে এতক্ষনে তার রক্ত দর্শন হয়ে যেত। কিন্তু এখন মাথা গরম করার মতো সময় নয়। মল্লার বলে সব জায়গায় মাথা গরম করতে নেই। স্থান বিশেষে শান্ত থাকতে হয়। হুট করে মাথা গরম হয়ে কিছু করলে আখেড়ে তোমারই ক্ষতি। আমি মল্লারের কথা ফলো করে দেখেছি। সত্যি সত্যি এটা হয়।

অগত্যা মাখা গরমকে সাইডে রেখে হাসলাম। কারন সিচুয়েশন যতই বাজে হোক। আর কৃষ্ণদা যতই হারামী আর গাঁজাড়ু হোক না কেন আমাদের কলেজের জিএস ও। আর আমি ওর দলের একজন সাধারণ সদস্য। কাজেই এখানে সিন ক্রিয়েট করে কোনো বিচ্ছিরি কেসে জড়িয়ে লাভ নেই।

সতর্কভাবে বললাম,“কি যে বলো তুমি? পার্টির চেয়ে জরুরী কাজ আছে নাকি? কিন্তু আজকে কলেজের ফেস্ট কিনা তাই চাপে আছি। তুমি রাগ করলে নাকি? ”

বলটা অফসাইড লোপ্পা গেল বুঝলাম কারন কৃষ্ণদা তখনই হেসে বললো,“আরে না না রাগ করবো কেন? তুই কলেজের ডেলী ক্লাস করা পাব্লিক কলেজের ব্যাপার স্যাপার তুই ভালো বুঝবি। আমাদের আর কি? বছরের একবার ফর্ম জমার সময় কলেজে ভীড় করি। বাকি সারা বছর গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াই। কলেজে কি হচ্ছে না হচ্ছে তেমন খোঁজ রাখি না। তা আজকের অ্যারেঞ্জমেন্ট সব কেমন?”

সতর্কভাবে হেসে আরেকটা লোপ্পা দিলাম,“একদম বিন্দাস! এসে দেখতেই পারছো পুরো ঝিনচ্যাক করে সাজিয়েছি স্টেজটা।তা কেন ডাকলে জানতে পারলাম না তো? কোথাও গন্ডগোল হলো নাকি কৃষ্ণদা?”

আমার প্রশ্নটা যেন শুনতেই পেল না কৃষ্ণদা। পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ফোন বের করে ঘাটতে লাগলো। কিছুক্ষন সবাই চুপ করে থাকলাম। আড় চোখে তাকিয়ে দেখলাম সবকটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাইরে থেকে কলেজের ছেলেপুলেদের চিৎকার ভেসে আসছে। কিন্তু অফিসের দরজা বন্ধ থাকায় শব্দটা বেশ ক্ষীণ লাগছে। ঘরের ভেতর যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা ।

অফিসের দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় সাতটা বাজে। কিন্তু কৃষ্ণদার কোনো বিকার নেই। ও একমনে ফোনে ফেসবুক খুলে স্ক্রল করে চলেছে। ক্রমশ অধৈর্য লাগছে আমার। আরে বাল কিছু বলার নেই তো কি ছিড়তে ডাকলি? পাশে বৈশালী মাথা নীচু করে বসে। ওর দিকে আমি ইচ্ছে করেই তাকাচ্ছি না। কারন ওকে দেখলেই আমার মাথা গরম হয়ে যাবে। আজকের শো টা ওর জন্যই পন্ড হয়েছে! আরে ব্রেকাপ যখন করারই ছিলো। তো দুদিন আগে বা পরেই করতি! আজকেই কেন? যখন জানিসই আজকের দিনটা ছেলেটার কাছে কত বড়ো দিন। তখন আজকেই বলা কেন?

ভাবতে ভাবতে শুনতে পেলাম কৃষ্ণদাবিড়বিড় করে বললো,“তোদের ব্যান্ডে মল্লার ঘোষ আর সৌরভ মিত্র পারফর্ম করে না?

সতর্কভাবে বললাম,“হ্যাঁ দাদা করে। এরা দুজনেই তো ব্যান্ডের ব্যাকবোন। মল্লারের অ্যাকোস্টিক গিটারের সুরের সাথে সৌরভের রেওয়াজ করা গলার রাগ যখন মেলে দারুন ফিউশন তৈরী হয়। আমাদের লেটেস্ট ভিডিও রাগ ফিউশনতো এ কারনেই হিট। আজকের শোতেও ওরা দারুন পারফর্ম করবে । দেখে নিও।”

এটাই প্রবলেম।”

মানে?”

মানে আজকের শো তে ওরা পারফর্ম করবে না

কিন্তু ওরা না থাকলে যে শো টাই হবে না!”

না হোক। তেমন হলে ওর জায়গায় রণিতের স্ট্যান্ডআপ কমেডি রাখা হবে। ফেসবুকে ওরও কম ফলোয়ার নেই। পাব্লিক আশাহত হবে না।”

কিন্তু কেন?

আমি চাইছি না বলে!” বলে বিরক্তভরা চোখে আমার‌ দিকে তাকালো কৃষ্ণদা। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“জানি আজকের দিনটার জন্য তুই অনেক স্বপ্ন দেখেছিস কিন্তু আমিও যে নিরুপায় ভাই। এটা না করলে যে চলবে না। বুঝতেই পারছিস এই মেয়েটা জোর করে ধরেছে। আর তুই তো জানিসই কোনো লেডিস আমার কাছে কিছু চাইলে আমি না বলতে পারি না। তাই! তবে ওকে আমি বুঝিয়ে শো টা আমি করাতে পারি।কিন্তু কিছু শর্ত আছে আমার।”

খেলাটা এতক্ষনে হাল্কা পরিস্কার হলো আমার কাছে। কানাঘুষোয় শুনেছিলাম বৈশালী কৃষ্ণদার মাসতুতো বোন হয়। বৈশালী সৌরভের গানের প্রেমে পড়েই ওর সাথে  প্রেম করতে শুরু করেছিলো। যদিও ইদানিং আমাদের ব্যান্ডের সাথে টাইম স্পেন্ড করা নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝামেলা চলছিল। ব্রেকাপ করে এখানে এসে দাদাকে নালিশ করা হয়েছে যাতে পারফর্ম না করেকিন্তু মল্লার! আচমকা মনে পড়ে গেল আমার। সামনেই কলেজ ইলেকশন! এবছর কৃষ্ণদার বিপক্ষে খানিকটা কাকতালীয়ভাবেই মল্লার‌ দাঁড়িয়েছে। সেই কারনেই কি?

আমি আর থাকতে না পেরে বললাম,“ কি কি শর্ত শুনি?”

কৃষ্ণদা হেসে বললো,“চাপ নেই তোকে কিডনি বেঁচতে বলবো না। খুবই সোজা শর্ত তোরা পারবি। শো চলাকালীন তোদের কিছু ঘোষণা করতে হবে।

প্রথমত; এই শো তে মল্লারকে স্বীকার করতে হবে যে আমার এগেন্সটে ও ভুল করে দাঁড়িয়েছে । তাই ও নমিনেশন তুলে নিয়ে আমাকে ভোট দেবে। তোরাও তাই করবি।

দ্বিতীয়ত; শোয়ের পর ইলেকশনে আমার হয়ে তোরা প্রচার করবি। যেমন ইউটিউবে বিভিন্ন ব্র্যান্ড প্রোমোট করিস তোরা, তেমন করেই। যেহেতু তোদের ব্যান্ডের গীতিকার তুই। তাই ভোটের জন্য জম্পেশ একটা গান লিখবি। তারপর সেটা রেকর্ড করে আমাদের অফিসে ক্লিপটা জমা দিবি। আমাদের ওয়েবসাইটে সেটা আপলোড করবো আমি।

 

তৃতীয়ত; ইলেকশনের রেজাল্টের পর আরেকটা শো হবে তোদের। যেখানে সৌরভ অফিশিয়ালি তোদের ব্যান্ড ছাড়বে। তবে চাপ নেই, ওদের ব্যাচের সুনীতা আছে ওকে তোদের ব্যান্ডে নিয়ে নিবি। কারন সৌরভের ক্লাসের সাথে ইদানিং তোদের ব্যান্ডের রিহার্সালের টাইম মিলছে না। তাছাড়া ওরও তো নিজস্ব জীবন আছে নাকি? সারাদিন ব্যান্ড ব্যান্ড করলে চলবে? আর সুনীতা এলে তোদেরই লাভ।”

দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস‌ করলাম, “আর এই শর্তগুলো যদি না মানি তখন কি হবে?”

মুহূর্তের মধ্যে স্থির হয়ে গেল কৃষ্ণদা। তারপর হেসে বললো,“না মানার কি আছে এতো মানতেই হবে! নাহলেবলেই গম্ভীর হয়ে গেল। ইঙ্গিতটা যে কি সেটা বোঝার জন্য ছায়া প্রকাশনী বা রায় এন্ড মার্টিনের‌ প্রশ্ন বিচিত্রা পড়তে হয় না। কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর বললাম,“একটু ভাবতে দাও।”

অবশ্যই! এটা সম্পুর্ণ তোদের সিদ্ধান্ত কিন্তু। তবে এটুকুই বলবো প্রস্তাবটা মানলে তোদেরই লাভ।” বলে ইশারা করতেই ছেলেটা আবার নিজের বসার চেয়ার দিয়ে এক কোণে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি ওর দেওয়া খালি চেয়ারে বসলাম।

কিছুক্ষন চোখ বুঁজে শর্তগুলো মানার পর কি হবে কল্পনা করতে লাগলাম আমি। কখনো মনে হলো সত্যিই তো। সৌরভের সাথে রোজ রোজ বাওয়াল ভালো লাগে না। ওকে মুক্তি দেওয়া ভালো। তাছাড়া ব্যান্ডের ওনার তো আমিই! আমি না লিখলে তো ঐ আএ করেই কাটতো না হলে ঐ পুরোনো গান গেয়ে চালাতে হতো।

পরক্ষনেই দেখলাম মল্লারের মাথা নত‌ হওয়া বিধ্বস্ত মুখ। আর তখনই বুকটা হুহু করে উঠলো আমার। ছিঃ! এসব কি ভাবছি আমি? ব্যান্ডটা আমার একার নয়। আমাদের সবার। নিজের কথা ভেবে আর একটা স্বার্থপর লোকের কথা শুনে নিজের আখেড় গুঁছোতে চাইছি? মানছি সুনীতা ভালো গায়‌ কিন্তু সৌরভের সাবস্টিটিউট ও? ইমপসিবল! স্বরলিপিমানে আমরা চারজন। সৌরভের স’, কেদারের র’, মল্লারের ল’ আর আমার মানে পঞ্চমের ‘প’ নিয়ে স্বরলিপি আমাদের অংশ, আমাদের সন্তান স্বরলিপি’! স্বরলিপিমানে আমার যন্ত্রণাময় স্বরলিপিগুলোর সুরেলা রূপে বহির্প্রকাশ।স্বরলিপি’ মানে কেদারের মন কেমন করা ড্রামের বোল, মল্লার আর সৌরভের রাগ ফিউশন হলো স্বরলিপিএকটা পলিটিক্যাল ভ্যাগাবন্ড আমাকে বলবে আর আমি ওর দলের মেম্বার বলে কুকুরে মতো ওর আদেশ পালন করে এতদিনে তিলে তিলে গড়ে তোলা ব্যান্ডটাকে, আমাদের স্বপ্নটাকে শেষ করে দেবো?

মুহূর্তের মধ্যে মধ্যে মনটাকে স্থির করে নিলাম আমি। শেষবারের মতো নিজেকে প্রশ্ন করলাম। কি চাই আমার? জবাব পেতে বেশি দেরী লাগলো না।

পকেট থেকে সিগারেট বার করে ধরালাম। ধোঁয়া টানতেই মাথাটা আরো ক্লিয়ার হয়ে গেল আমার। আরেকটা লম্বা‌ টান দিয়ে বললাম,“একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। কদিন ধরেই একটা জিনিস ঘুরপাক খাচ্ছিলো। বুঝতে পারছিলাম না আমি ঠিক করছি না ভুল। আজ কনসেপ্টটা ক্লিয়ার হয়ে গেল।

মানে? তুই রাজি? ওফ আমি জানতাম! ওহ বাঁচালি ভাই! আমার যে কি আনন্দ হচ্ছে!” কৃষ্ণদা খুশি মুখে আমার দিকে তাকালো।

আমি আরেকবার টান দিয়ে সিগারেটটা মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষতে পিষতে বললাম,“ভাগ্যিস অর্গাজম হয়ে যায়নি নাহলে পাজামাটা হে হে। আগে কথাটা শোনো! আমি বুঝতে পেরেছি ব্যান্ড, সৌরভ এসব বাহানা। তোমার আসল টার্গেট মল্লার।কারন ও তোমার এতদিনের জয়যাত্রাকে থমকে দিয়েছে। তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেউ এতদিন জেতে নি। কিন্তু এবার মল্লারের জেতার চান্স বেশী। তাই তুমি চাইছো বন্ধু হয়ে ওকে জনতার সামনে আমি পিঠে ছুরি মেরে বিশ্বাসঘাতক, ভীরু প্রমাণিত করে দিই। সেই জনতা যারা ওকে এত ভালোবাসা দিয়েছে তাদের সামনে ওকে নিচে নামিয়ে দিই তাই তো? সরি বস পারলাম না! মল্লার শুধু আমার বন্ধু বা ব্যান্ড মেম্বার নয়। ও আমার ভাই। আমার ভরসাস্থল। এরকম বন্ধু সহজে মেলে না। আমি ওকে সবার সামনে নত হতে দিতে পারি না। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আজকে ,এই মুহূর্তে এই পার্টি ছেড়ে মল্লারের সাপোর্টে আমি দাঁড়াবো।”

বোধহয় ঘরে মিনিবাজ পড়লো। সব কটা আমার দিকে চমকে তাকিয়েছে। কৃষ্ণদা প্রথমে বোমকে গেলেও পর মুহূর্তে সামলে নিয়ে বললো,“বুঝেছি। তোর মাথা গরম আছে। তাইকোনো ব্যাপার না। তুই তোর সময় মতো ভেবে আমায় জবাব দিস কিন্তু স্টেজে ওঠার আগে আমি আমার জবাব চাই। শোন শর্তগুলো মাথা ঠান্ডা করে ভেবে দেখে। আবেগে অবুঝ‌ হোস না।

তুমি তোমার শর্তগুলো সবেগে তোমার পেছনে গুঁজে বসে থাকো। আমি আর তোমার কোনো ম্যাটারে থাকছি না। চললাম বস!” বলে উঠে গিয়ে দরজাটা খুললাম। সঙ্গে সঙ্গে বাইরের শব্দ ঘরের ভেতর ঝাপিয়ে পড়লো। মানে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে! শুনতে পেলাম উদ্বোধনী সঙ্গীতে ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েরা কোরাসে গাইছে,

“যদি কেউ কথা না কয়/

যদি সবাই রয়‌ মুখ ফিরায়ে সবাই করে ভয়/

তবে পরান খুলে/

 ওরে তুই মুখ ফুটে তোর মনের কথা একলা বলো রে/”

গানটা যেন ঝড়ের মতো কাঁপিয়ে দিচ্ছে কৃষ্ণদা সমেত সবাইকে। ওদের দিকে তাকিয়ে হেসে বেরোতে যাবো এমন সময় শুনতে পেলাম কৃষ্ণদার গর্জন।

তোর সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কৃষ্ণময় পট্টনায়েক। রাগে ওর কালো মুখটা আরো কালো হয়ে গেছে। বাকিগুলোও উঠে দাঁড়িয়েছে। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন আমায় চিবিয়ে খাবে। রণিত নিজের বা'হাতের আঙুলগুলো মটকে নিয়ে ডানহাতের আঙুলগুলো মটকাতে শুরু করলো। বৈশালী ততক্ষনে আর ঘরে নেই। আমার জবাব শোনার আগেই বেরিয়ে গেছে।

একটু ভেবে দেখলাম চাইলেই এদের সবকটাকে টাইট করতে পারি। কিন্তু সব জিনিসের একটা সময় থাকে। এই মুহুর্তটায় তাই মাথায় আগুন জ্বললেও দাঁতে দাঁত চেপে হেসে বললাম, শুধু সাহস দেখেই পড়ে গেলো? ইয়ে মানে দম? ওটা দেখলে কি হবে ?     ইয়ে মানে আমার দুঃসাহস?

আগুনে ঘি পড়লো যেন। পঞ্চম! তুই আমাদের চিনিস না। আমরা দেখবো তোরা কি করে স্টেজে উঠিস?দাঁতে দাঁত চেপে আমার দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলো কালাকেষ্টা।

ওর পোড়া বেগুনের মতো মুখটা দেখে চরম রাগের মধ্যেও হাসি পেয়ে গেল আমার। বাবাজি জানেনা কার সামনে খাপ খুলছে। হাল্কা হেসে বললাম, তাই নাকি? বেশ আমি দেখে নেবো কোন মাইকা লাল আমাদের আটকায়!” বলে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি।

 

মল্লার

কেদারের কথা শুনে আর কিছু বুঝতে বাকি রইলো না আমার। সৌরভের সাথে বৈশালীর আজকেই ব্রেকাপ হওয়া, কেদারের মাল খেয়ে উল্টে থাকা সব! রণিত, বৈশালী এরা জাস্ট উপলক্ষ্য মাত্রআসল মেঘনাদ অন্য কেউ। এর পেছনে কে আছে জানতে বাকি নেই আমার। ঠিক হ্যাই তুম ভি মিলিটারি হাম ভি মিলিটারি। কিন্তুআচমকা মাথায় বিদ্যুত খেলে গেল আমার। পঞ্চমটা তো ওদের! পকেট থেকে ফোন বের করে ওকে ফোন করতে যাবো। এমন সময় নিচে হোস্টেল গেট থেকে হইচই শুনতে পেলাম। তবে কি? একছুটে নিচে নেমে গেটের দিকে গিয়ে দেখি পঞ্চম একটা বাঁশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারমানে ওর উপরও...! কাছে গিয়ে দেখলাম ওর লাগেনি।

কাঁধে হাত দিতেই পেছন ফিরে তাকালো ও। দেখলাম ওর চোখদুটো রাগে লাল হয়ে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম,“কেষ্টা?” ও জবাবে মাথা নাড়লো শুধু। মাসতিনেক আগে কলেজ ইলেকশনে ওর অপোজিটে আমার দাঁড়ানোটা যে কেষ্টা ভালো চোখে নেয় নি সেটা ওর হাবেভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম। তার সাথে এটাও বুঝতে পেরেছিলাম যে ও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। চরম আঘাত করবে। যাতে আমি পিছু হটতে বাধ্য হই। কিন্তু সে দিনটা যে আজকেই হবে  জানতাম না। পঞ্চমকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথাও লাগেনি তো তোর?” পঞ্চম জবাবে মাথা নেড়ে বললো, “রুমে চল কথা আছে। খুব দরকারি।” বলে হাতের বাঁশটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো।

রুমে ঢুকে পঞ্চম সবটা বলে আমার দিকে তাকাতেই আমি মাথা নেড়ে বললাম, “জানি। কেদারের কথায় সবটা পরিস্কার হয়ে গেছে। ওরা আজকের দিনটায় যেমন করেই হোক আমাদের আটকাতে চাইছে। কারন আজকের শো টা হিট হলে আর আমার দৃঢ় বিশ্বাস হবেই, আর আমাদের ফিরে তাকাতে হবে না। কলেজ থেকে প্রফেশনালি যেমন আমাদের ব্যান্ডটা প্রতিষ্ঠিত হবে ঠিক তেমনি সামনের ইলেকশনে আমার জেতাটা পাকা হয়ে যাবে।” বলে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সেখান থেকে একটা পঞ্চমকে দিলাম।

সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে পঞ্চম বললো, “তাহলে কি করবি? ওরা আজকে পারলে জান লড়িয়ে দেবে যাতে শো না হয়। আসার সময় কেষ্টাকে যে ভাবে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে এসেছি ও মালের ইগো ভীষণ ভাবে খোঁচা খেয়ে গেছে।” আঙুলের ফাঁকে রাখা জলন্ত সিগারেটটার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বললাম, “একটা প্ল্যান মাথায় আছে তবে সেটা কতটা কাজ করবে জানি না।”

“আগে প্ল্যানটা শুনি তারপর বোঝা যাবে সেটা হবে কি হবে না।” বলে উঠে বসলো সৌরভ। ওর মুখের দিকে তাকালাম আমি। দেখে বোঝা যাচ্ছে কিছুক্ষন আগেও কেঁদেছে মালটা। জামার হাতা দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে আমাদের সামনে বসলো সৌরভ। একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় ওর চোখ দুটো জ্বলছে বুঝতে পারলাম। শান্ত গলায় সৌরভ বললো, “ সরি ভাই, একটু ট্র্যাকের বাইরে চলে গিয়েছিলাম। এখন সামলে নিয়েছি। বেকার বেকার একটা থার্ডক্লাস মেয়ের জন্য আমি আমাদের স্বপ্নটাকে এভাবে গাধার গাঁ* -এ পাঠাতে পারবো না। আর...” বলে আপনমনে হেসে বললো, “ছ্যাঁকা খাওয়াটা আমার কাছে স্পেশাল পেপারের মতো হয়ে গেছে। না চাইলেও চলে আসে পরীক্ষাতে। যাক গে আমার কথা বাদ দে। প্ল্যানটা বললি না তো?”

আমরা হেসে ফেললাম। এই তো আমাদের দেবদাস ফিরেছে ! মালটার বিরহ ফিলিংটা একদম পঞ্চমের রাগের মতো ঝপ করে পড়ে যায়। হাসতে হাসতে আমি আমাদের ঘরের দরজাটা দিয়ে দিলাম। দেয়ালেরও কান আছে কিনা?

 

পর্ব-২

পঞ্চমটা চলে যাবার পর রাগে টেবিলের উপর ঘুসিটা মেরে বসলো কৃষ্ণময় এত সাহস! সেদিনের পুঁচকে ছোঁড়াটার ওরই অফিসে এসে, ওরই দলের সামনে, ওরই বোনের সামনে এত কথা বলে চলে গেলো আর একটা গান্ডুর মতো শুনে গেলো কিছু বলতে পারলো না দুদিন আগেও যে মালটা কুত্তার মতো লেজ নেড়ে আসেপাশে দাদা দাদা করে ঘুরে বেড়াতো সে মাল আজকে ওর মুখের উপর ঘেউ ঘেউ করে মুতে চলে গেলো ভুল করলো! জানে না ইমেজের কথা এলে কৃষ্ণময় পট্টনায়েক কতটা নির্মম হতে পারেসাপের লেজে পা দিয়েছে পঞ্চমছোবল তো খেতেই হবে

রণিত পাশেই দাঁড়িয়েছিল এগিয়ে এসে বললো, “ কেষ্টদা! পঞ্চম নির্ঘাত মল্লারকে রিপোর্ট করতে গেছে মালটা টের পেলে এতদিনের সব প্ল্যান কেচে যাবে তুমি বলো তো মালটার মুখ আজকের মতো বন্ধ করে দিয়ে আসি?” কৃষ্ণময় ভেবে দেখলো তাতে কোনো ক্ষতি হবে না বরং এতে মল্লারের ভয় বাড়বে এমনিতেও শো এর দুটো স্তম্ভ ভেঙে দিয়েছে সে বৈশালীকে দিয়ে সৌরভকে ভগ্নহৃদয় প্রেমিক বানিয়ে, আর রণিতকে দিয়ে কেদারকে মাল গিলিয়ে আউট করে দিয়ে এবার পঞ্চমকে মেরে বসিয়ে দিলে একা মল্লারের পক্ষে আজকের শো করা চাপের হয়ে যাবেপঞ্চমটারও একটা শাস্তি হওয়া দরকার বহুত বাড় বেড়েছে মালটাকৃষ্ণময় মাথা নাড়তেই রণিত কয়েকটা ছেলেকে নিয়ে বেড়িয়ে গেলো কৃষ্ণময় অফিসে বসে রইলো একা

আধঘন্টা পর ফোনটা বেজে ওঠায় কৃষ্ণময়ের ঘোরটা ভেঙে গেলো আসলে আজকে সকাল থেকে পেটে মাল পড়েছে অনেক তার উপর আজকে ফেস্ট হওয়ায় মোচ্ছব লেগেই আছেকটা বোতল মদ যে ওর পেটে গেছে হিসেব নেই তাই একটু ঝিম লেগে আসছিলো এমন সময় ফোনটা বেজে ওঠায় একটু বিরক্ত হয় সে নির্ঘাত রণিত হবে আরে বাল কাজ সাল্টে দিয়েছিস যখন চলে আয় আবার ফোন করা কিসের? ফোনটা পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে না দেখেই রিসিভ করে কানে নিলো কৃষ্ণময়

টার্গেট যখন আমি তখন আমার বন্ধুদের খামোখা বিরক্ত করা কেন? সোজা আমাকে বললেই পারতে তোমার এগেন্সটে দাঁড়ানোর বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট আমার ছিলো না খানিকটা পরিস্থিতির চাপে পরে নমিনেশনটা দিতে বাধ্য হয়েছিলাম আমি

ঘোরটা কেটে গেল কৃষ্ণময়েরবুঝতে পারলো কে ফোন করেছেতার মানে ওষুধ ঠিক জায়গায় লেগেছে হিসহিসে গলায় সে বলে উঠলো,”তা তো বললে চলবে না বাওয়া! এই কথাটা নমিনেশন জমা করার দিন ভাবতে হতো

পঞ্চমের গায়ে হাত দিয়ে তুমি ঠিক করো নি তো তোমার দলেরই লোক তোমার কি ক্ষতি করেছে? আর কেদার, সৌরভও তোমার শ্ত্রু নয় তোমার শত্রুতা তো আমার সাথে আমাকে কিছু না বলে ওদেরকে খামোখা কষ্ট দিচ্ছো কেন?”

ওদের একটাই অপরাধ ওরা তোর বন্ধুসেই কারনেই কোল্যাটেরাল ড্যামেজ হিসেবে ওদেরকেও ভুগতে হয়েছে আর এইটুকুতে চাপ খেয়ে গেলে চলবে? আরো তো দিন পড়ে আছে! আরো কতকিছু যে তোকে সহ্য করতে হবে তুই জানিস না সবে তো তোদের শো পন্ড করেছি যতক্ষন পর্যন্ত তোকে আর তোর বন্ধুদের ধুলোতে না মিশিয়ে দিচ্ছি ততক্ষন পর্যন্ত আমি শান্ত হয়ে বসবো নাবলে একটা পৈশাচিক হাসি হাসে কৃষ্ণময়

ওপ্রান্ত কিছুক্ষন চুপ থাকার পর বলে,” পঞ্চমের কাছে তোমার শর্তগুলো শুনলাম কিন্তু একটা জিনিস ক্লিয়ার হলো না আমি নমিনেশন তুলে নেওয়ার পরেও আমাদের ব্যান্ডটাকে ভাঙতে হবে কেন? নমিনেশন তুলে নিলে তো তোমার জয় নিশ্চিত তারপর তুমি তোমার রাস্তায় আমি আমার রাস্তায়এতে ব্যান্ড ভাঙার কথা আসছে কোথা থেকে?”

আলবাত্আসছে! আমার ইলেকশন জেতার রাস্তায় এখন কাঁটা  হয়ে দাঁড়িয়েছে তোদের ব্যান্ড তুই কি ভাবিস তুই নমিনেশন থেকে নাম তুলে নিবি আর তোদের ফ্যান পাব্লিক ছেড়ে দেবে? স্পেশালই আমাদের কলেজের ছেলেগুলো? ওরা ঠিক আঁচ করে নেবে যে ডাল মে জরুর কুছ কালা হ্যা আর যদি ঘুণাক্ষরেও টের পায় যে এর পেছনে আমি আছি ওরা আমাকে ছেড়ে দেবে? তাই আমি এই পথ বেঁছে নিয়েছি যাতে সাপও মরে আর লাঠিও না ভাঙে

আর যদি আমরাই অডিয়েন্সের কাছে বলে দিই যে এটা সম্পূর্ণ আমাদের সিদ্ধান্ত নয়?”

খিকখিক করে হাসে কৃষ্ণময় তারপর বলে,”ওরে পাগলা পাব্লিক কি অতোই চোদু রে? কারন কি বলবিআমার কিসের অতো গরজ? আর আমিই যে তোকে প্রেশারাইজড করেছি তার কি প্রমাণ আছে? কেদারটা পাড় মাতাল কাম গাঁজাড়ু, কাজেই ওকে কেউ ফোর্স করলো আর খেয়ে নিলো এটা ঢোপে টিকবে না সৌরভকে ওর গার্লফ্রেন্ড ডিচ করেছে, এতে আমার ভূমিকা কোথায়? আর বাকি রইলো পঞ্চম যতদিন যাচ্ছে আমাদের দলের শত্রু বাড়ছে আর গোটা কলেজ জানে আমার প্রায় ডানহাত  কাজেই আমার ছেলেরা ওকে মেরেছে এটাও প্রমাণ হয় না কারন হোস্টেলের গেটের লাইটটা বেশ কয়েকবছর ধরেই খারাপ আর আধো অন্ধকারে কে কোন দলের কে বলতে পারবে? যাকগে, বেকার ফ্যাচ ফ্যাচ না করে কি বলতে ফোন করেছিস বল?” বলার সাথে সাথে দরজায় টোকা পড়ায় সোজা হয়ে বসে কৃষ্ণময়

বোধহয় রণিতরা এলো ব্যাটারা আর আসার সময় পেলি না? বেশ উপভোগ করছিলো মল্লারের কাঁপা কাঁপা গলাটা ওর ভয়টা যাকগে ভালোই হলো সব কটাও শুনুক কৃষ্ণময় পট্টনায়েকের সাথে লাগতে গেলে কি হতে পারে ফোনটা কানে নিয়ে বলে কৃষ্ণময়,” কিছু বলার থাকলে বল নাহলে ফোনটা রাখ বেকার বেকার আমার সময় নষ্ট করিস না আমার অনেক কাজ আছেবলতে বলতে দরজা খোলে কৃষ্ণময় আর দরজা খোলার সাথে সাথে মাথায় একটা ভারী কিছু একটা আছড়ে পড়ায় মাথাটা টলে যায় তার অজ্ঞান হবার আগে সে টের পায় একজোড়া শক্ত সবল হাত ওকে জাপ্টে ধরেছেতারপর আর কিছু মনে নেই তার

******

কতক্ষন এভাবে পড়েছিল জানে না কৃষ্ণময়একে সকাল থেকে অনেকটা মদ পেটে পড়েছে তার উপর আচমকা এহেন আঘাত কাজেই জ্ঞান ফেরার পর ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগে তারমাথাটা টনটন করছে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ লাগছে পাশ ফিরতে গিয়ে দেখে সে একটা ঘরে খাটের উপর চিৎ হয়ে শুয়ে আছেহাত-পা খাটের দুপাশের বাজুর সাথে শক্ত করে বাঁধা পড়নে একটা সুতো পর্যন্ত নেই চিৎকার করতে গিয়ে দেখে মুখে একটা কাপড় গোঁজা রয়েছে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে পাশে একজন বসে আছে রুমে নাইটল্যাম্প জ্বলছে বলে পাশে বসা ব্যক্তির চেহারা দেখা যাচ্ছে নাকিছুক্ষন বসে থাকার পর পাশে বসা ব্যক্তি পকেট থেকে একটা সিগারেট ধরায় 

সিগারেটের আলোয় ব্যক্তিকে দেখে প্রচন্ড রাগে গোঁ গোঁ করে ওঠে কৃষ্ণময়আরাম করে সিগারেটটা ধরিয়ে আয়েশে ধোঁয়া ছেড়ে পঞ্চম বলে,” এটাকে বলে শঠে শাঠ্যম শেষে তুমি আমাকে মারতে ছেলে পাঠালে? এটা জানার পরও যে আমি ক্যারাটেতে ব্ল্যাকবেল্ট তাও রণিত কে?” বলে ঘরের এককোণে আঙুল দেখায় পঞ্চম সেদিকে তাকিয়ে দেখে চমকে যায় কৃষ্ণময় ঘরের আরেককোণে আরেকটা খাটে ওর মতো করে উলঙ্গ অবস্থায়  অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে রণিত সিগারেটে আরেকটা টান দিয়ে বললো পঞ্চম,” তবে তোমার মতো ওকে মারতে হয় নি চোয়ালে এক লাথি খেয়েই বিছানা নিয়েছে কিন্তু একটা জিনিস দেখে অবাক হয়েছিএতো বড়ো শরীর দুজনের এতো হিরোগিরি মারো কিন্তু আসল কাজের জিনিসটাতেই ঘাপলা তোমাদের! না মানে দুজনেরই মগজ আকারে ছোটো জানতাম কিন্তু তোমাদের তো ওটাও ছোটো অ্যাঁ! রণিতেরটা তাও আছে তোমারটা তো আন্ডারওয়্যার খোলার সাথে সাথে খুজে না পেয়ে চমকে গিয়েছিলাম মনে হয়েছিলো সালা তিন নং পার্টি নাকি? পরে আমাজনের মাঝে খুঁজে পেয়ে হাফ ছেড়ে বেঁচেছিআচ্ছা গেস করো তো তোমাদের কাছে তো রুমাল ছিলো না তাহলে তোমাদের মুখ কি দিয়ে বেঁধেছি? “

ব্যাপারটা টের পাবার সাথে সাথে মুখে একটা নোনতা স্বাদ পায় কৃষ্ণময় ঘৃনায় গা গুলিয়ে আসে তার হারামজাদাটা ওর আন্ডারওয়্যার ওরই মুখে গুঁজে দিয়েছে! ওকে ছটফট করতে দেখে ফিচেল হেসে পঞ্চম বলে,”উহু! যা ভাবছো তা নয় আমি তোমারটাই তোমার মুখে গুঁজে দিই নি ওটা রণিতের মালটা এতো ফিটফাট থাকে কে বুঝবে যে নিজের আন্ডারওয়্যার ধোয় না? অল ক্রেডিটস গোস তু মল্লার না মানতে হবে এতো দিনে তোমার যোগ্য প্রতিপক্ষ এসেছে মনে আছে? কলেজের প্রথম দিন কেদারের সাথে সেম জিনশ তুমি করেছিলেআজ তার প্রতিশোধ নিলো মল্লার তবে মানতে হবে যেভাবে তোমাকে কথায় আটকে রেখেছিলো সেটা না করলে রণিত তোমার কাছে আমার খবর দিয়ে দিতো আর তুমি সাবধান হয়ে কেটে পড়তেতুমি ওর সাথে কথা বলায় এতোটাই ব্যস্ত ছিলে যে পার্টি অফিসের সামনে রণিতের চিৎকার শুনতে পারো নি“ 

 প্রচন্ড রাগে গোঁ গোঁ করে ওঠে কৃষ্ণময় সবটা যে আসলে একটা ফাঁদ ছিলো টেরই পায় নি কিন্তু মুখে কাপড় গোঁজা থাকায় গোঁ গোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ করতে পারে নাপঞ্চমের সিগারেট নিভে গিয়েছিলো সেটা ফেলে আরাম করে আরেকটা সিগারেট জ্বালালো পঞ্চমতারপর কৃষ্ণময়ের মুখে ধোঁয়া ছেড়ে বলে,”বলেছিলাম না আজকে আমিও দেখবো আমাদের শো হওয়া থেকে কে আটকায়? এখন সাড়ে সাতটা বাজে এতক্ষনে মল্লাররা স্টেজে উঠে গেছে পঞ্চম দাশগুপ্ত যা বলে করে দেখায় আজকে শো হচ্ছে তবে চাপ নেই বেশিক্ষন তোমাকে আমি আটকে রাখবো না আমাদের শো শেষ হলেই পার্টির ছেলেদের খবর দেবো ওরা তোমাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাবে অবশ্য এটা শুনলে তোমার গুষ্টি উদ্ধার করেও নিয়ে যেতে পারেবলে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা অডিও ফাইল চালায় পঞ্চম

অডিও ফাইলটা শুনে শিউরে ওঠে কৃষ্ণময় যে ওরই কন্ঠস্বর! মল্লারের সাথে ওর একটু আগের কথোপকথন পুরোটাই রেকর্ড করেছে মল্লার! অডিও ফাইলটা কিছুটা চালিয়ে অফ করে বলে পঞ্চম,”এটার আরো তিনটে কপি আছে আমাদের ব্যান্ডের কাছে কাজেই বেশি লাফালাফি করো নাবেশি চালাকি দেখলে এই ফাইল লাইভ বাজিয়ে দেবো চুপচাপ দুজনে শুয়ে থাকো আর এঞ্জয় করো আজকের শো শো শেষ হলে আমি নিজেই আসবো কেমন? এলামবলে উঠে দাঁড়ায় পঞ্চম তারপর ঘরের বাইরে বেরিয়ে দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে দেয় বাইরে বেরোনোর সাথে সাথে কলেজ মাঠের শব্দে ঢাকা পড়ে যায় কৃষ্ণময়ের গোঙানির শব্দসিগারেটটা এককোণে ছুঁড়ে ফেলে পঞ্চম এগিয়ে যায় কলেজ মাঠের দিকে

ওদিকে ততক্ষনে মল্লাররা উঠে পড়েছে স্টেজে কলেজ মাঠ তখন ভীড়ে ঠাসা দর্শকদের চিৎকারে কানপাতা দায় কেদারের ড্রামের দ্রিমি দ্রিমি বোলের সাথে মল্লারের গিটারের মন কেমন করা সুর ছড়িয়ে পড়ছে ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচেধীর পায়ে মাইকের সামনে এসে দাঁড়ায় সৌরভ সামনের অগনিত ভীড়ের মাঝে সে দেখতে পায় পঞ্চমকে চিউইং গাম চিবোতে চিবোতে থাম্বস আপ করে সে বোঝায় সিচুয়েশন কন্ট্রোলে আছে কিছু দূরে বৈশালী দাঁড়িয়ে, হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ বোঁজে সৌরভ তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাইকের সামনে ঠোঁট এনে মৃদু অথচ ভরাট গলায় গেয়ে ওঠে,” ইয়াদ পিয়া কি আয়ে/ ইয়ে দুখ সহা না যায়”       


 

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...