অনুসরণকারী

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০২২

বোগেনভিলিয়া


 

সারা রাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটানোর পর একসময় বিরক্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসল মীরা। মাথাটা বড্ড ধরেছে। স্যারিডনের স্ট্রিপটা সাইড টেবিলেই রাখা ছিল। পাশ ফিরে একটু হাতড়ে নিয়ে সাইড টেবিলের আলোটা জ্বালাল সে। তারপর স্ট্রিপ থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে মুখের ভেতর চালান করে হাতের কাছে রাখা জলের বোতল থেকে দুই ঢোক জল খেয়ে বিছানার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসল। বালিশের পাশ থেকে স্মার্টফোনটা বের করে দেখল ভোর পৌনে চারটে বাজে। আরেকটু পরেই সকাল হয়ে যাবে। গোটা ঘরের জানলাগুলো মোটা পর্দায় ঢাকা বলে বাইরের আলো বোঝা যাচ্ছে না। তারমানে প্রতিবারের মতো এইবারও বেড়াতে এসে প্রথমদিন প্রায় গোটা রাত জেগে কাটিয়ে দিল সে! উফ! আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল! প্রতিবার কোথাও বেড়াতে গেলে মেয়েবেলার এই এক বদঅভ্যেস গোটা ট্রিপের বারোটা বাজিয়ে দেয়।

 

ছোটোবেলা থেকেই কোথাও বেড়াতে গেলে বাকিরা পথের জার্নিতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমে ঢলে পড়লেও মীরার কিছুতেই ঘুম আসে না। বাকিদের মতো পথশ্রমে সেও ক্লান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু বিছানায় শোয়া মাত্র ঘুম উবে যায় তার। তারপর সারারাত ধরে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে থাকে সে। ঘুমের ওষুধ, আরো অন্যান্য পদ্ধতি ট্রাই করে দেখেছে, কিন্তু কিছুতেই কোনো লাভ হয়নি। হাজার চেষ্টা করেও বাইরে বেড়াতে এসে মীরা কিছুতেই ঘুমোতে পারে না। অথচ এই সারারাত জেগে থাকার জ্বালা পরদিন সে হাড়ে হাড়ে টের পায়। অসম্ভব মাথা ধরা, সারা দিন ঢুলতে থাকা, ক্লান্তিভাব সব একে একে জাঁকিয়ে বসে তার শরীরে। ফলে ট্রিপে এসে এঞ্জয় করার বদলে ওকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। একবার তো অদ্রীশের সাথে গোয়া বেড়াতে গিয়ে গোটা ট্রিপটাই পণ্ড হতে বসেছিল!

 

এইসব কারণে আজকাল বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে মীরা। বন্ধুবান্ধবদের কেউ বেড়াতে যাবার প্ল্যান করে ওকে ডাকলে শরীর খারাপ বা কাজের চাপের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যায় সে। অথচ তার মানে এটা নয় যে সে বেড়াতে ভালোবাসে না। সকলের মতো সেও চায় সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গিয়ে হইহই করে স্নান করতে, বিকেলে সমুদ্রের‌ তীরে বসে ঢেউ গুনতে, ভেজা বালির উপর প্রিয় মানুষের সাথে পায়ে পায়ে হাটতে, কিংবা পাহাড়ের কোনো বেনামী হোমস্টে-তে কাছের মানুষটার‌ সাথে এক কম্বলের ভেতর গায়ে গা ঠেকিয়ে পরস্পরের শরীরের ওম মেখে বসে থাকতে, কোনো হিল স্টেশনের কুয়াশামাখা রাস্তায় পরস্পরের হাত ধরে হাটতে। সেও চায় বেড়াতে গিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করতে। কিন্তু বেড়াতে এসে যদি অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকার জন্য ট্রিপটাই মাটি হয়ে যায় তাহলে বেড়াতে আসার মানেটাই বা কী?

 

সত্যি কথা বলতে গেলে এবারের ট্রিপেও ওই সারারাত জেগে থাকার ভয়ে মীরার সায় ছিল না। অদ্রীশই ওকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে এসেছে। প্রথম প্রথম অদ্রীশের উপর রাগ‌ হলেও এখানে পৌঁছে আশেপাশের দৃশ্য দেখার পর মীরার মত‌ পাল্টে গেছে। এখানে না এলে সত্যিই শরৎকালের পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটা মিস‌ করে যেত ওরা।

 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মীরা পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পাশে অদ্রীশ উপুড় হয়ে শুয়ে ওর দিকে মুখ করে শুয়ে আছে। মুখ আলতো হা করে খোলা। সারা মুখে সিঁদুর মেখে যাওয়ার ফলে দাঁড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখটা দেখতে একটু অদ্ভুত লাগলেও মীরা খেয়াল করে মুখটায় একটা প্রশান্তির ছাপ নেমে এসেছে। হাল্কা শ্যামবর্ণ মসৃন পিঠে, বাহুতে কাল রাতের আদরের প্রতিদান রূপে নখের আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ অদ্রীশের ঘুমন্ত‌ মুখটার দিকে অপলকে তাকিয়ে আনমনে হেসে ফেলে মীরা। তারপর কম্বল দিয়ে ঢেকে দেয় অদ্রীশের নিরাবরণ দেহটাকে। তারপর একটা আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নেমে নগ্ন অবস্থাতেই আলতো পায়ে এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে।

 

বাথরুমের আলো জ্বালিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে একই সাথে লজ্জা আর আনন্দের অনুভূতি হল মীরার। কাল রাতের আদরে সে যেমন আহত বাঘিনীর‌ মতো অদ্রীশকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, অদ্রীশও তাকে অক্ষত ছাড়েনি। আদরের সময় ওর শরীরে সাথে সাথে মনের ভেতরেও গভীর প্রেমের আঁচড়ের দাগ রেখে গেছে। প্রেমের এক মিঠেকড়া মরণসুখে ভরে দিয়েছে মীরার সমগ্র মনটাকে। বন্য সোহাগে মাতিয়ে তোলার সাথে সাথে বুঝে নিয়েছে নিজের জমিটুকু। কণ্ঠা, বুক আর পেট জুড়ে ভরিয়ে দিয়েছে অজস্র আদরের চিহ্নে অথচ একবারের জন্যেও জান্তব হয়নি। বরং একজন বন্য প্যাশনেট প্রেমিকের মতো আদরে ভরে দিয়েছে। এমনকি চরম মুহূর্তে সংযম হারাতে গিয়েও ওর কথা ভেবে পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে অদ্রীশ। পরম আশ্লেষে মীরা নামের নদীতে অবগাহন করতে করতে নিজের‌ সাথে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে মীরাকেও। প্রায় সারারাত ধরে একে অপরকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছে ওরা। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে দুজনে। কালরাতে যে সুখ মীরা পেয়েছে সে সুখ বিয়ের এতগুলো বছরেও পায়নি। কালরাতের কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে থাকে মীরা। ওর মনে পড়ে যায়‌ অদ্রীশের সাথে দেখা হওয়ার প্রথম‌ দিনটার কথা।

 

*****

ফার্স্ট ইয়ার?

 

হ্যাঁ!

 

কোন ডিপার্টমেন্ট?

 

হিস্ট্রি।

 

অ তাহলে আমাদের ডিপার্টমেন্ট দেখছি। তা নাম কী?

 

মীরা, মীরা মজুমদার।

 

বাঃ! নামটা তো সেরা! মীরা! তা মীরা, তোমার কোনো কানাই বা শ্যাম আছে? নাকি কাঠসিঙ্গেল?

 

ওসব কিছু নেই। আপনারা এভাবে আমাদের ইন্টারোগেশন করছেন কেন?

 

উহু! একটু ভুল হল বোনটি! এটা ইন্টারোগেশন নয়, ইন্ট্রোডাকশন। পাতি বাংলায় বলতে গেলে কলেজের সিনিয়ারদের সাথে জুনিয়ারদের আলাপচারিতা আর একটু মজা করা। তা কী করানো যায় তোমাকে নিয়ে বলো তো? এই অদ্রীশ? কী করানো যায় বল তো একে দিয়ে?

 

অনুষার কথা শুনে বই থেকে মাথা তুলে মেয়েটার‌ দিকে তাকায় অদ্রীশ। ছিপছিপে গড়নের, পাকা গমের মতো গায়ের রং, চোখে চশমা, এক ঢাল কোঁকড়া চুল খোপা করা। পরনে ফ্লোরাল চুড়িদার। হাতে একটা ডায়েরী আর কাঁধে একটা ব্যাগ নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে একটা গম্ভীর অথচ‌ বিরক্তভাব থাকলেও চোখে একটা বুদ্ধিমত্তার ছাপ প্রকট। মেয়েটার দিকে একঝলক তাকিয়ে আবার বইতে মুখ গুঁজে অদ্রীশ বলল, “নাম যখন মীরা, তখন একটা‌ মীরার ভজন গাইতে বল। আমরাও কেষ্ট নামে ধন্য হই। সারাদিন যা পাপ করি গঙ্গায় পুলপার্টি করলেও ধোয়া যাবে না। তার থেকে এই ভালো। কেষ্ট নামে আজকের দিনের মতো পাপ থেকে মুক্তি পাবো।

 

কথাগুলো শোনামাত্র‌ ছেলেমেয়েগুলো হইহই করে উঠলেও পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠল মীরার। আবার! আবার সেই এক‌কথা! মেয়েবেলা থেকে এই নামটা ওর জীবন নরক করে দিল। কি কুক্ষণেই যে ওর ঠাকুমা এ নামটা দিয়েছিলেন কে জানে? আর মাও পারে! ছোটোবেলায় গানের স্কুলে ভর্তি করে মাস্টারদের কাছে অনুরোধ‌ করেছিলেন অন্যান্য গানের সাথে মীরার ভজনটাও ভালো করে শেখাতে। বাড়িতে আত্মীয় এলে মীরার ভজন গেয়ে শোনাও, পাড়ার ফাংশনে মীরার ভজন গাও, উফ! সারাজীবন ওর মীরার ভজন গাইতে গাইতে কেটে গেল! কেন ভাই! পৃথিবীতে কি আর কোনো গান নেই? মীরার ভজনই শুনতে হবে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে মীরা কটমট করে তাকাল ভজনের কথা তোলা ছেলেটার দিকে।

 

একরাশ বাবরি চুল আর ঘন দাঁড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখ। পরনে চেক শার্ট আর ফেডেড জিনস,হাতে একটা মোটা বই খোলা। ছেলেটা মাথা নামিয়ে একমনে বইটা পড়ছে আর আপনমনে হাসছে। যেন বাইরের জগতের সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই। একটু আগে মেয়েটির ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করে যেন ফিরে গেছে নিজের জগতে। দেহের গড়ন মাঝারি, মানে খর্বাকায়ও নয় আবার জিমে ডাম্বেল ভাজা দৈত্যাকারও নয়। রংটা হাল্কা শ্যামবর্ণর দিকে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও ছেলেটার আচরণ, শারীরিক ভাষায় বোঝা যায় ছেলেটা সাধারণ নয়। অন্তত এই ragging করা দলটার থেকে সে যে আলাদা এবং কিছুটা বিশেষত্ব যে ওর মধ্যে আছে সেটা প্রথম দেখাতেই চোখে পড়ে। অবশ্য প্রথম দর্শনে মীরার এত কিছু নজরে পড়ল না। সে দেখল একরাশ চুল-দাঁড়ির জঙ্গলে ঢাকা মুখওয়ালা কবি গোছের ছেলেটা ফস করে কথাটা বলে আবার বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে নিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা সেটা দেখে বলে ওঠে, “ওদিকে তাকিয়ে আর কোনো লাভ নেই মামনি! অর্ডার দিয়ে উনি ওনার জগতে চলে গেছেন। এবেলা আর ইহজগতে ফেরার চান্স নেই। গাইতে তোমাকে হবেই! চলো শুরু করো ওয়ান টু থ্রি...!

 

এভাবে আপনারা আমাকে জোর করতে পারেন না! জানেন না ragging বেআইনি আর নিষিদ্ধ!

 

জানি! আর জানি বলেই ইন্ট্রোডাকশনেই ইতি করছি। নাহলে অন্য কিছু দেখতে।

 

আমি আপনাদের নামে HoD -এর কাছে কমপ্লেন করবো!

 

বটে? তা কী বলবে? সিনিয়ার দাদারা নাম জানতে চেয়েছে, একটু গান শুনতে চেয়েছে বলে তোমার খারাপ লাগছে? সিরিয়াসলি? কোথাকার কোন বড়ো শিল্পী হে তুমি? এত অ্যাটিটিউড দেখাচ্ছো? নাও নাও শুরু করো!

 

শুধু নাম জানতে চাইলে কিছু হতো না। আপনারা তো নাম শুনে ক্যারেক্টার জাজ করে ragging করছেন।

 

এই থামো তো! বড্ড বেশি ফ্যাচ ফ্যাচ‌ করো তুমি! এত কথার কচকচানি ভালো লাগে না আমাদের। চটপট শুরু করো নাহলে শাস্তি পেতে হবে!

 

কী শাস্তি?

 

সে দেখতেই পাবে! আগে শুরু‌ করো! ওয়ান... টু... থ্রি...

 

সেবার লেকচারার ক্লাসে চলে আসায় আর গান গাইতে হয়নি মীরাকে। তবে সেই দলটা সহজে ছাড়েনি মীরাকে। প্রায় একবছর পর ইউনিভার্সিটি ফেস্টে মীরাকে দিয়ে ওর সম্মতিতেই গান গাইয়ে তারপর থেমেছিল। ততদিনে অবশ্য দুটো দলের সম্পর্ক সিনিয়ার-জুনিয়ার থেকে দাদা-দিদি আর ভাই-বোনের সম্পর্কে পরিণত হয়ে গেছে। সেই কটা বছর যেভাবে কেটেছে তা কোনোদিন ভোলার নয়। আজ এতবছর পরেও সেদিনের কথা ভাবলে একটা মুচকি হাসি খেলে যায় মীরার ঠোঁটে। ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়াররা ওদেরকে গার্জেনের মতো আগলে রেখেছিল। বিশেষ করে অদ্রীশ তো ওদের ব্যাচে সকলের ফেভারিট ছিল। লাইব্রেরীতে সিলেবাসের জন্য রেফারেন্স দেওয়া দুস্প্রাপ্য বই হোক, বা ক্যাম্পাসে বসে ইতিহাসের কোনো টপিকের উপর তর্ক, এক্সকারশনে ঐতিহাসিক এলাকার ইতিহাস জানা হোক বা যাদুঘরে লম্বা‌ ট্যুর। অদ্রীশের সব জায়গাতেই নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে উপস্থিতি থাকত। এমনকি কোনো টপিক নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ জাগলে সেটা নিয়ে অদ্রীশের কাছে গেলেই জলের মতো বুঝিয়ে দিত সে। ইতিহাসের বিভাগে অদ্রীশ ছিল সমস্ত প্রফেসরদের চোখের মণি। এতটাই যে পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের পর অদ্রীশকে আর কাছ ছাড়া করতে চাননি ইতিহাস বিভাগের প্রধান। রিসার্চ ফেলো হিসেবে প্রস্তাব দিয়ে ডিপার্টমেন্টে জয়েন করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই থেকে অদ্রীশ রয়ে গেছে ইউনিভার্সিটিতেই।


পি.এইচ.ডি শেষ করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ইউনিভার্সিটিতেই প্রফেসর হয়ে জয়েন করেছে। তখনও অবশ্য অদ্রীশের সাথে মীরার প্রেমালাপ জমে ওঠেনি। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাকিদের মতো ওর কাছেঅদ্রীশ শুধু অদ্রীশদা-ই ছিল। প্রেমটা শুরু হয় মীরার ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসার বছরপাঁচেক পরে।

 

একদিন কী একটা কাজে সে বইপাড়ায় গিয়েছিল সে। কাজ সেরে ফেরার পথে কী মনে হতেই ঢুঁ মারল একটা বইয়ের দোকানে। অবশ্য সেটাকে দোকান না বলে শোরুম বলাই ভালো। যে দিকে তাকাও থরে থরে সাজানো বই। এদিকে প্রেমের উপন্যাস, তো অপরদিকে ভৌতিক উপন্যাসের সম্ভার। কিছুক্ষণ সেই শোরুমে ঘোরাঘুরি করে নিজের পছন্দ মতো দুটো ভৌতিক আর একটা থ্রিলার উপন্যাস বেছে নিল সে। তারপর বইগুলো নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে বিল মিটিয়ে শোরুম থেকে বেরিয়ে এসে ট্যাক্সি ধরতে যাবে এমন সময় শুনতে পেল একটা ভীষণ পরিচিত কন্ঠস্বর। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল কোমরে হাত দিয়ে অদ্রীশ তাকিয়ে আছে একটা ছোটো বইয়ের দোকানের সামনে। মুখে একটা বিরক্তিকর ভাব স্পষ্ট।‌ পাঁচবছরে একটু মোটা হয়েছে। দাঁড়ি-গোঁফের বহরটা একটু কমেছে। মাথার বাবরি চুল পেছন দিকে পনিটেল করে বাঁধা। বাকি সব একই আছে। এই পাঁচবছরে বিন্দুমাত্র বদলায়নি সে। মীরা অদ্রীশকে দেখা মাত্র পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ডাক দিতেই অদ্রীশ একবার এদিক ওদিক তাকানোর পর পেছন ফিরে মীরাকে দেখতে পায়। তারপর একগাল হেসে বলে, “আরে মীরাবাই যে! কী খবর?”

 

এই চলে যাচ্ছে। তোমার খবর বলো। কী বই কিনলে?

 

আর বই! যে বই আমি খুঁজছি তা এদের কাছে নেই।

 

কী বই?

 

সে আছে এক‌ দুস্প্রাপ্য বই। অনেকদিন হল আউট অফ প্রিন্ট। এক দোকানে খোঁজ করতে গিয়ে বলল এখানে পাওয়া যাবে। এসে শুনছি একটা লাস্ট কপি ছিল। কে যেন গতকাল কিনে নিয়েছে। আর একটাও কপি নেই।

 

এ বাবা! তাহলে কী হবে?

 

কী আর হবে? ঐ অনলাইনে পিডিএফ খুঁজে পড়াতে‌ হবে। যাকগে ও কথা ছাড়, তোর কী খবর? কেমন আছিস? কী করছিস? কী বই নিলি?


সব কথা এখানেই বলবে? তার চেয়ে বরং চলো কোথাও গিয়ে বসা‌ যাক। মেঘ করে এসেছে। বৃষ্টি নামল বলে।

 

সে যেতে পারি তবে খরচ আমি দেবো।

 

না না! সে কী করে হয়?

 

হয়! বেশি বকিস না তো! অনুষা ঠিকই বলতো, বড্ড ফ্যাচ ফ্যাচ করি‌স তুই। এবার কথা না বাড়িয়ে চল দেখি। বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে।

 

কথাটা বলে দুজনে মিলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে দোকানের সামনে থেকে। তারপর হাটতে হাটতে এগিয়ে যায় সদর রাস্তার দিকে।

 

সেদিনের পর থেকেই অদ্রীশের সাথে প্রায়শই ফোনের মাধ্যমে কথা হত মীরার। কখনো কখনো সেই কথোপকথন রাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত স্থায়ী হতো। মাঝে মধ্যে ইউনিভার্সিটির চাপ থেকে মুক্তি পেলে মীরার সাথে দেখা করতে যেত অদ্রীশ। তখন দু'জনকে আর ফোনে পাওয়া যেত না। বাইরের জগতের সাথে সব যোগাযোগ ছিন্ন করে দু'জনে নিজের মতো ঘুরে বেড়াতো গোটা শহরজুড়ে। কখনো কোনো কফিশপে ধোঁয়া ওঠা কফির আমেজে মত্ত হয়ে হাতে হাত রেখে গল্প। কখনো যাদুঘর, বইপাড়ায় হাতে হাত রেখে ঘোরা। কখনো বান্ধবীদের সাথে কাছেপিঠের আউটিং-এ আচমকা অদ্রীশের আবির্ভাব।‌ এভাবেই চলছিল ওদের প্রেমপর্বের দিনগুলো। তারপর একদিন অদ্রীশ শহর ছেড়ে শান্তিনিকেতনে চলে আসায় সেই অভিসারেও‌‌‌ ভাটা পড়ে। তবুও মাঝে মাঝে বন্ধুবান্ধবদের সাথে বেড়াতে এলে অদ্রীশের সাথে ওর কোয়ার্টারে এসে দেখা করে যেত‌ মীরা। কখনো বা বন্ধুদের সাথে, কখনো বা একা। এরকমই একদিন বসন্তোৎসব উপলক্ষ্যে শান্তিনিকেতন বেড়াতে এসে জ্বর বাঁধিয়ে‌ বসেছিল সে। মীরার আজও মনে আছে সেই সন্ধ্যেটার‌ কথা।

 

সেদিন প্রচুর দোল খেলে, নাচে‌, গানে সারাদিন কাটানোর পর ক্লান্ত হয়ে‌ সিদ্ধির নেশায় চুর হয়ে ওর বন্ধুরা সকলে যখন লজে যে যার রুমে‌ প্রবল ঘুমে আছন্ন, সে সময় মীরা চুপিসারে লজ থেকে বেরিয়ে হাজির হয়েছিল অদ্রীশের কোয়ার্টারে। বেরোবার সময় অদ্রীশের সাথে দেখা‌ করার উত্তেজনায় খেয়াল করেনি ফাল্গুনমাসের সেই দুপুরে‌ হঠাৎ আকাশ জুড়ে জড়ো হয়েছে একরাশ কালো মেঘ। সেদিন অবশ্য মেঘ‌ জমেছিল মীরার মনেও। ইদানিং একটি মেয়ের সাথে অদ্রীশের ঘনিষ্ঠতার খবর মীরার কানে এসে পৌঁছেছিল। ব্যাপারটা সত্যি কিনা যাচাই করতেই বসন্তোৎসবে শান্তিনিকেতন এসেছিল মীরা। মেয়েটাকে চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি। তেমন আহামরি দেখতে না হলেও একটা চটক আছেই মানতে হবে। তবে বড্ড বেশী গায়ে পড়া। আড়াল থেকে মীরা দেখছিল মেয়েটা ইচ্ছে করে অদ্রীশের গায়ে ঢলে পড়ছে। আর অদ্রীশ এতে বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে মেয়েটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই জিনিসটাই ভাবিয়ে‌ তুলেছিল মীরাকে। তাই অদ্রীশকে সরাসরি প্রশ্ন করার জন্য সে অদ্রীশের কোয়ার্টারের দিকে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু অদ্রীশের কোয়ার্টার পৌঁছবার আগেই গোটা শান্তিনিকেতন জুড়ে নেমে এসেছিল অকাল বৃষ্টি। ধুয়ে দিচ্ছিল শাল-শিমূলে ঢাকা, আবিরে রাঙানো সমগ্র শান্তিনিকেতনকে।

 

কলিংবেলের শব্দ শুনে দরজা খোলার পর বৃষ্টিস্নাত মীরাকে দেখে প্রথমে‌ রাগ করলেও পরে পাগলামো দেখে না হেসে‌ থাকতে পারেনি অদ্রীশ।

 

- আরে তাই বলে এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আসতে হবে?

 

আরে বৃষ্টি তো এতক্ষণ ছিল না! এই মাত্র শুরু হল!

 

বটে! আর‌ তুই সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে‌ এলি! উফ! তোকে‌ নিয়ে আর পারা যায় না। একে সর্দির ধাত তার উপর মাইগ্রেনের প্রবলেম, এর‌মধ্যে ঠাণ্ডা লাগালে কী হবে বুঝতে পারছিস? যাকগে এসেই যখন পড়েছিস ভেতরে আয়। আর বৃষ্টিতে ভিজিস না।

 

বলে বারান্দায় মেলে রাখা একটা গামছা দিয়ে মীরাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ঘরে নিয়ে এসেছিল অদ্রীশ। ঘরের ভেতর ঢুকে মীরাকে ড্রয়িংরুমে দাঁড় করিয়ে রেখে ছুটে গিয়েছিল নিজের ঘরে। কিছুক্ষণ পর একসেট পাজামা-পাঞ্জাবী নিয়ে ফিরে বলেছিল, “আপাতত বেডরুমে গিয়ে ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে এটা পরে নে।”

 

ভেজা পোশাক ছেড়ে অদ্রীশের পাজামা-পাঞ্জাবী পরে অদ্রীশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই কড়া কফির গন্ধ ভেসে এল মীরার নাকে। ভেজা পোশাক বারান্দায় মেলে গামছাটাকে পাগড়ির মতো করে মাথায় বেঁধে নিল সে। তারপর ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখল সেন্টার টেবিলে একরাশ খাবার সাজিয়ে অদ্রীশ সোফায় কফিমাগ হাতে বসে আছে। সেদিকে তাকিয়ে মীরা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল,

 

আরে করেছটা কী? এত‌ খাবার কে খাবে?

 

কেন তুই খাবি!

 

ক্ষেপেছ? একটু আগে দোল খেলা শেষ করে পেট ভরে মাংস ভাত খেয়েছি। এরপর এত কিছু খেলে মরে যাবো।‌

 

কিছু হবে না। অন্তত একটা দুটো মালপোয়ার পিস খেয়ে বদহজম হয়েছে এমন পাবলিকের‌ কথা আমি শুনিনি।

 

– এটা এক দুই পিস?

 

তো কী? শোন আগেকার দিনে এই দোলে বিকেলবেলা মালপোয়া নাহলে গরম গরম লুচির সাথে আলুর দম বা সাদা আলুর তরকারি ম্যান্ডেটরি মেনু ছিল। তোদের ঐ এখনকার মতো মাটন দিয়ে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার চল ছিল না আগে।‌ ও জিনিস শুধু রবিবারের জন্য তোলা থাকতো। ছেলেবেলায় দোল খেলে বিকেলে কতবার যে বন্ধুদের বাড়িতে মালপোয়া আর‌ গোবিন্দভোগ চালের পায়েস খেয়ে কাটিয়েছি ভাবলেই এখনও জিভে জল আসে। বিকেলের দিকে স্টুডেন্টরা এখানে গানের আসর বসাবে বলেছে, খানিকটা সান্ধ্য আড্ডা বলতে পারিস। ওদের জন্যই বানাব বলে মিক্সচারটা গুলে রাখছিলাম। ভাগ্যিস তুই চলে এলি। নে অনেক‌ কথা হয়েছে এবার খেয়ে বলতো দেখি‌ কেমন হয়েছে? রন্ধন পরীক্ষায় পাশ করেছি?

 

কথাগুলো শোনামাত্র‌ ভ্রু কুঁচকে‌ গেল মীরার। পরক্ষণে নিজেকে‌ সামলে সোফায় বসে সেন্টার টেবিল থেকে একটা মালপোয়া তুলে কামড় বসিয়েই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেল মীরা। তারপর চোখ বুঁজে পরম তৃপ্তিতে গোটা মালপোয়াটা শেষ করে হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল এক করে প্রশংসাসূচক মুদ্রা করে বলল, “পারফেক্ট! এত‌ ভালো মালপোয়া আগে কোনোদিন খাইনি। মিক্সচারে কী ছিল গো?”

 

যা থাকে! তার সাথে অবশ্য হাল্কা কাঁচা মৌরি দিয়েছি।

 

– উফ! বিকেলে এই মেনুটাই যদি‌ তোমার‌ স্টুডেন্টদের দাও, আমি হলফ করে বলছি জলসা পুরো জমে যাবে!

 

বলছিস?

 

একদম!

 

বেশ‌ নে কফিটা খা! ঠাণ্ডা হয়ে গেল তো!

 

সেন্টার টেবিল থেকে নিজের কফিমাগটা তুলে মীরা জিজ্ঞেস করল, “তোমার‌ স্টুডেন্টরা ক'টার দিকে আসবে?” ঘড়ির দিকে‌ একঝলক তাকিয়ে কফিমাগে চুমুক দিয়ে অদ্রীশ বলল, “তা ধরে নে সন্ধ্যে সাতটা। আসলে সেই সকাল থেকে হাজার ঝক্কি গেছে ওদের উপর দিয়ে তাই দেরী করে আসতে বলেছি।”

 

পলকে একাধিক অভিব্যক্তি খেলে যায় মীরার মুখে। তারপর নিজেকে‌ কোনোমতে সামলে।

 

তা এই জলসা কি আজকের জন্যই নাকি আগেও বসেছে?

 

– আগেও মাঝে মধ্যে দু–একবার বসেছে বটে তবে আমি অতো অ্যালাউ করি না। ঐ মাঝে ‌মাঝে যখন ওরা আবদার করে তখন আসতে দিই। জলসা তো নয় ঐ তোদের ভাষায় ‘জ্যামিং সেশন’ বলে।

 

– বুঝলাম। আচ্ছা তখন থেকে তুমি বাবা কাকাদের মতো তোদের ভাষা, তোদের‌ মতো কেন বলছো বলো তো?

 

বা‌হ রে! বলবো না? সবসময় ফিটফাট থাকি বলে তো আর বয়সটা এক জায়গায় থাকছে না। বুড়ো হচ্ছি তো নাকি? একত্রিশ বছর হতে চলল আমার। টেকনিক্যাল দিক থেকে প্রৌঢ় হতে আর নয় বছর বাকি! তাছাড়া তোরা তো আমাদের পরের জেনারেশন নাকি? একটা এজ গ্যাপ তো থাকছেই!

 

বাজে কথা বলো না তো! মোটেও তুমি বুড়ো হওনি। তুমি তো আমাদেরই জেনারেশনের। একত্রিশ বছর বয়স হয়েছে বলেই কি তুমি বুড়ো হয়ে গেছ নাকি?

 

– আরে ধুস পাগলি! তিরিশের কোঠা পার করলেই মানুষের‌ মধ্যে বিজ্ঞভাব চলে আসে, জীবনদর্শনে দার্শনিক ভাব আসে। জ্ঞানবৃদ্ধ বলা চলে আমাদের।

 

– এসব ঢপের কথা তোমার স্টুডেন্টরা বিশ্বাস করলেও আমি করি না। মানুষের জীবন একটা অনন্ত জিজ্ঞাসা আর অ্যাডভেঞ্চারে ভর্তি। কত কিছু জানার, কত কিছু শেখার‌ বাকি। শেখার শেষ নেই জীবনে। এমনকি মরার সময়ও মরতে‌ পারাটা শিখে নিতে হয় নিজের থেকে।

 

– কত বয়স হল তোর?

 

কেন বলবো? জানো না মেয়েদের বয়স আর ছেলেদের মাইনে জানতে নেই!

 

সে জানি আমি শুধু বলতে চাইছিলাম যে তোর বয়সটা এখন কম। জীবনের অনেকটা পড়ে আছে তোর সামনে। ম্যাচিওরিটি আসেনি।এক‌সময় যখন বয়স হবে, ম্যাচিওরিটি আসবে তখন বুঝবি জীবনের মানে আলাদা। জীবন মানে…

 

– থাক! আমি কোনো এক্সপ্লেনেশন চাইনি।

 

– এই দেখো মেয়েটা রেগে যাচ্ছে! আরে‌ আমি‌ তো‌ এমনিই…আচ্ছা বেশ এই টপিক নিয়ে অন্যদিন হবে তা‌ আজকে থাকছিস তো শান্তিনিকেতনে? নাকি বিকেলে ফিরছিস?

 

মীরা জবাব না দিয়ে দুহাতে কফিমাগটা আকড়ে ধরে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তারপর আলগোছে জিজ্ঞেস করে, “শ্রীতমাও আসবে নাকি আজকের অনুষ্ঠানে?”

 

আচমকা প্রশ্নটা শুনে প্রথমে চমকে গেলেও অদ্রীশ বোঝে আচমকা এই বিনা নোটিশে আগমন, আচমকা এই অযাচিত তর্কের কারণটা কী? নির্ঘাত‌ শ্রীতমার‌ কথাটা কোনোভাবে‌ মীরার কানে গেছে। সে বোঝে এখন যদি সত্যিটা বলে দেয় তাহলে এই বাঘিনীর হাত‌ থেকে ওকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। একটু বুঝে হ্যান্ডেল করতে হবে পরিস্থিতিটা। চোখে মুখে অবাক হবার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, “তা আমার‌ স্টুডেন্ট যখন তাকে তো আসতেই হবে। এক‌মিনিট! এর মধ্যে শ্রীতমা আবার এল কোথা থেকে? তুই কী করে জানলি‌ যে ও আসবে? তুই কি ওকে চিনিস নাকি?”

 

এভাবে পাল্টা প্রশ্নের জন্য তৈরী ছিল না মীরা। সে ভেবেছিল হয়তো অদ্রীশ চমকে উঠবে, না বলবে, কিংবা ধরা পড়ে যাবার পর অভিনয় করবে। আর সে অদ্রীশকে বাছা বাছা বাক্যবাণে বিদ্ধ করবে। কিন্তু অদ্রীশ এইভাবে আকাশ থেকে পড়ে পাল্টা প্রশ্ন করায় সবটা গুলিয়ে গেল মীরার। সে আমতা‌ আমতা করে বলে, “ হ্যা মানে…চিনি। ও আমার…ইয়ে মানে দুর সম্পর্কের বোন হয়।”

 

বোন হয়? কই শ্রীতমা‌ তো আমাকে‌ বলেনি!

 

বলেনি মানে? ও‌ কি জানে নাকি আমাদের ব্যাপারে?

 

না, তেমন জানে না। তবে তোর সাথে আমার‌ যে বেশ খাতির তা আমার স্টুডেন্টরা যেমন প্রায় সকলেই জানে তেমনই শ্রীতমাও জানে।

 

– ও! তা ও কি আসবে আজ?

 

বললাম তো আসবে। তা তোরা থাকবি না আজই চলে যাবি। না মানে বলতে চাইছি যে থেকে গেলে ভালো হত। তাহলে তোরাও জয়েন করতে পারতিস।

 

– না বিকেলেই বেরিয়ে যাবো।

 

বলে কফিটা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় মীরা। তারপর বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টিটা অনেক ধরে এসেছে। বারান্দা থেকে ভেজা কাপড়গুলো নামিয়ে মীরা বলে, “এবার আমাকে ফিরতে হবে।”

 

–‌‌ সেকি! এত‌ তাড়াতাড়ি? এইতো এলি।

 

না মানে আসার‌‌ সময় কাউকে বলে আসিনি। আমাকে দেখতে না পেলে অহেতুক চিন্তা করবে সবাই।

 

বেশ চলে যাস। আগে বৃষ্টিটা কমুক।

 

– বৃষ্টির জন্য বসে থাকলে আর ফেরা হবে না।

 

– আচ্ছা‌ ঠিক আছে কিন্তু তোর জামাকাপড় তো এখনও শুকোয়নি! দেখে তো মনে হচ্ছে এখনও ভিজে আছে। আগে হাল্কা শুকিয়ে যাক তারপর না হয় যাবি।

 

– ও কিছু হবে না। এক কাজ করো, তেমন হলে তোমার‌ কাছে প্লাস্টিকের ব্যাগ বা চটের ব্যাগ হবে? সেটায় জামাকাপড়গুলো ভরে নিয়ে চলে যাবো।

 

অদ্রীশ মালপোয়া খেতে খেতে শ্রাগ করে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ঘরের ভেতর থেকে একটা চটের ব্যাগ এনে দিতেই সেটায় জামাকাপড় গুলো ভরে নেয় মীরা। তারপর গেটের দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে অদ্রীশ বলে ওঠে, “এর পরেরবার এলে এমনভাবে আসিস না যাতে ফেরার‌ সময় লজ্জায় মুখ ঢেকে পালাতে হয়।”

 

কথাগুলো শোনামাত্র মীরা থমকে দাঁড়ায়। অদ্রীশ হেসে বলে, আমি এখানে বসে কোনো ছাত্রীর সাথে ফুর্তি করছি এই খবরটা যখন পেয়েছিস তাহলে একটু হোমওয়ার্ক মানে খোঁজখবর করেই আসতে পারতিস! এত কাঁচা কাজ করে কেউ আসে? যাকগে যাবার আগে বাকিটুকু ফ্রম হর্সেস মাউথ শুনে যা। শ্রীতমার বাবা মারা গেছেন তিনমাস হল। বাবার মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা দুবার সুইসাইড অ্যাটেম্পড করে। যদিও দুবারই রুমমেটদের জন্য‌ রক্ষা পেলেও মারাত্মক‌ ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে ওকে ট্রমা থেকে বের করলেও মাঝে মাঝে ডিপ্রেসড হয়ে যায়। ওর ক্লাসমেটরা তাই ওকে সব সময় হাসিখুশি ‌রাখে। মাঝে মাঝে আমরাও মেয়েটার পাগলামিকে প্রশ্রয় দিই। এবার এই প্রশ্রয়টাকে কেউ অন্যচোখে দেখলে সেটা আমার দোষ?”

 

মীরা ঠায় পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে। অদ্রীশ বিদ্রুপের হাসি হেসে বলে, “একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়েও শেষে যদি ইনসিকিউরিটিতে ভুগতে হয় তাহলেই বাকি জীবনটা একসাথে কাটাবো কী করে বলতো? একটুও বিশ্বাস নেই আমার উপর? নিজের ভালোবাসার উপর এতটুকু ভরসা নেই? তোর ফ্রেন্ড সার্কলেও তো কত ছেলে বন্ধু আছে। তাদের সাথে তোর ঘনিষ্ঠতা হয়তো আমার চেয়েও বেশি। হয়তো আমার চেয়েও বেশি তোকে ওরা চেনে। কই ওদের নিয়ে তো আমি জেলাস ফিল করি না। কারণ তোর উপর আমার বিশ্বাস‌ আছে। তাহলে তোর কেন নেই বলতো?

 

মীরা চুপ‌করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে অদ্রীশ‌বলে,আসলে কী জানিস? আমাদের মধ্যে এখনও সেই বিশ্বাসের সম্পর্কটাই গড়ে উঠতে পারেনি। অন্তত তোর দিক থেকে তো নয়ই! একটা সম্পর্কে বিশ্বাস জিনিসটা অনেক ম্যাটার করে। যেখানে বিশ্বাস নেই সেই সম্পর্ক না থাকাই সমান। বিশ্বাস যদি থাকতো তাহলে কলেজে অনুষ্ঠানের ‌সময় সরাসরি দেখা করতে পারতিস। চোরের‌ মতো লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে ফলো করতিস না। এই বৃষ্টিতে ভিজে এতদুর এসে আমার ঘরে কোনো মেয়ে আছে কিনা যাচাই করতে আসতিস না।‌

 

কথাটা শোনার সাথে সাথে মীরা চমকে ওঠে। এবং তার‌ সাথেই একটা অপরাধবোধ‌ শুরু হয় তার। সত্যিই তো! কোনো ভাবনাচিন্তা না করে, খবরটার সত্যতা যাচাই না করে পাগলের মতো ছুটে এসেছে সে। একবারও ভেবে দেখেনি যা শুনেছে তা সত্যি নাও তো হতে পারে! কিন্তু অদ্রীশ কী করে জানলো কলেজে‌ লুকিয়ে দেখার কথাটা? তারমানে ওকে অদ্রীশ ওকে দেখেছে! অদ্রীশ ওর এখানে আসার কারণটাও বুঝতে পেরেছে! লজ্জায় মাথা নত‌হয়ে যায় মীরার ইস! এই মুহূর্তে মাটিতেমিশেযেতেইচ্ছে করছেতার।‌‌‌ কেন একবার খবরটার সত্যতা যাচাই করল না? কেন একবার কলেজেই অদ্রীশের সাথে যোগাযোগ করল না ও! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শোনে অদ্রীশ বলছে, “যে সম্পর্কে বিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই সে সম্পর্ক না রাখাই ভালো। তুই বরং ফিরে যা।‌ আর আসিস না আমার বাড়িতে। বা বলা ভালো আর কোনো যোগাযোগ রাখিস না আমার সাথে। এভাবে সন্দেহের মধ্যে নতুন জীবন শুরু করার চেয়ে সব কিছুর ইতি টেনে নেওয়াই ভালো বুঝলি? আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক‌ না থাকাই ভালো।”

 

বাকি কথাটুকু আর মীরার কানে ঢুকল না। ওর মনে হল যেন আশেপাশের জগতটা আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে।‌ একটা ভয়ংকর দুর্ভেদ্য‌কুয়াসা ওর চারদিকে এসে জমা হচ্ছে। মীরার‌ কানে অনুরণিত ‌হতে‌ লাগল অদ্রীশের শেষ কথাটা, “আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক না থাকাই ভালো।অদ্রীশ এটা কী বলল? বলতে‌ পারল? এভাবে দুম করে সব শেষ করে‌ দেওয়া যায়? পেছন ফিরে মীরা দেখল কথাগুলো বলে অদ্রীশ সদর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। মীরার মনে হল যেন শুধু দরজা নয়, ওর ফেরার পথটাও বন্ধ করে দিয়েছে অদ্রীশ। আচমকা মাথাটা ঘুরে গেল মীরার। এক হাতে দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলালো সে। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল অদ্রীশের কোয়ার্টারের চৌহদ্দি থেকে।

 

বিকেলবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর মীরাকে রুমে দেখতে না পেয়ে প্রথমে সকলে ভেবেছিল হয়তো অদ্রীশের‌ কাছে গেছে সে।‌ কিন্তু অদ্রীশের কাছে মীরা এলেও বেশিক্ষণ থাকেনি জানার পর সকলের কপালে চিন্তার ভাজ পড়তে শুরু করে। সকলে মিলে খুঁজতে বেরোবার কিছুক্ষণ পর মাঝরাস্তায় অদ্রীশের দেওয়া চটের ব্যাগ‌ পড়ে আছে দেখে সে চিন্তা পরিণত হয় দুশ্চিন্তায়। সবার আগে দুশ্চিন্তা গ্রাস করে অদ্রীশকে। ওর বাড়ি থেকে মীরা চলে যাবার সময় যা নয় তাই বলে অপমান করেছিল সে। ওর কথা শুনে মীরা যদি কিছু করে বসে তাহলে সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না। কথাগুলো মাথায় আসতেই সে সকলের সাথে পাগলের‌ মতো খোঁজা‌ শুরু করে মীরাকে। তবে সেই খোঁজ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। লজ থেকে কিছুটা দুরে মীরার প্রিয় বান্ধবী অনুরাধা আবিস্কার করে লজের কাছে একটা পুকুরের ধারে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে মীরা।‌ লজের মালিক পুলিশের ঝামেলায় জড়াতে‌ না চাইলে সকলে মিলে ধরাধরি‌ করে মীরাকে অদ্রীশের কোয়ার্টারে নিয়ে আসা‌ মাত্র একজন দক্ষ অভিভাবকের মতো মীরার দায়িত্ব নিয়েছিল অদ্রীশ।‌ ফোন করে স্থানীয় ডাক্তারকে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে এনেছিল সে। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন বৃষ্টিতে ভিজে জ্বরটা এসেছে। সেই জ্বরের কারণেই সেন্সলেস‌ হয়ে পড়েছিল।‌ দুদিন একটু অবসার্ভেশনে রাখলেই ঠিক হয়ে‌ যাবে।

 

অদ্রীশ ডাক্তারের কথা মতো সারারাত জেগে অক্লান্তভাবে সেবা করে সারিয়ে তুলেছিল মীরাকে। পরদিন সকালে মীরা‌ চোখ মেলে তাকাতেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেছিল, “এখন কেমন বোধ করছিস?” মীরা‌ মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলতেই একটা স্বস্তির‌ নিঃশ্বাস ফেলে‌ ম্লান হাসি‌ হেসেছিল অদ্রীশ। সেদিন সন্ধ্যেবেলা দুজনে বারান্দায় বসে দেখছিল প্রতিপদের চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া শান্তিনিকেতনকে। সেদিকে‌ তাকিয়ে থাকতে‌ থাকতে অদ্রীশ জিজ্ঞেস করেছিল, “কি বলেছিলাম না? জ্যোৎস্নার আলোয় শান্তিনিকেতনের রূপ আরো খোলতাই হয়!

 

দূরে‌ কোথাও মাদলের‌ মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিল মীরা। সেই শব্দটা খুব দ্রুত লয়েরও নয় আবার ঢিমে তালেরও নয়। বরং একটা ছন্দে ভেসে‌ আসছিল। তার‌ সাথে ভেসে আসছিল একটা ভীষণ চেনা গানের সুর। সেই মুহূর্তে গানটা মনে করতে না পারলেও সেই ছন্দের সাথে সুরটা‌ শুনতে শুনতে ক্রমশ ঘোর লেগে যাচ্ছিল মীরার। অদ্রীশ ব্যাপারটা টের পেয়ে‌ বলেছিল, “বিকেলে জ্যামিং সেশনের কথা বলেছিলাম না? বোধহয় সেটাই শুরু হয়েছে। আজকে ওদের আমার বাড়িতে বসার কথা ছিল। কিন্তু তোর কথা ভেবে প্রোগ্রাম বাতিল করেছি। এরপর যখন আসবে তোর‌ সাথে ওদের আলাপ করিয়ে দেব কেমন?”

 

জবাবে মীরা মাথা নাড়ে। তারপর কিছুক্ষণ দুজনে নির্বাক হয়ে বসে থাকার পর অদ্রীশ চেয়ার থেকে উঠে মীরার কপালে হাত রেখে জ্বরের উত্তাপ বোঝার চেষ্টা করে। তারপর ঘর থেকে একটা শাল বের‌ করে এনে মীরার সর্বাঙ্গ ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে বলে, “আর‌ বাইরে বসে কাজ নেই। এরপর মশা ধরবে। তার চেয়ে বরং ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক। জ্বরটা আবার বেড়েছে থাক।

 

মীরার ইচ্ছে করছিল আরেকটু বসে থাকতে, এই নেশাতুর পাগল করা গানের সুরে আরো কিছুক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকতে। কিন্তু সে‌ অদ্রীশকে নিজের ইচ্ছেটা বলতে পারল না। অদ্রীশ ওকে প্রায় পাঁজাকোলা করে ঘরে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল। তারপর দক্ষ অভিভাবকের মতো যত্ন করে সময়মত ওষুধ আর রাতের খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। অথচ একটু খেয়াল করলে দেখতে পেত মীরার চোখের কোণে অল্প‌ অশ্রু জমেছে

 

পরদিন মীরা‌ একটু সুস্থ বোধ করায় বিকেলের দিকে অদ্রীশ ফোন করে নিজের কোয়ার্টারে ডেকে নিয়েছিল মীরার বন্ধুদের। তার সাথে ডেকেছিল ওর ছাত্রছাত্রীদেরও। শ্রীতমাও ছিল ওদের দলে। আড্ডার মাঝে অদ্রীশ দেখেছিল শ্রীতমার সাথে মীরার ভাব হয়ে গেছে। দু'জনে মিলে বেশ খোশগল্প জুড়ে দিয়েছে। তারপর একসময় সুযোগ বুঝে নিজের ছাত্রছাত্রীদের আর মীরার বন্ধুদের সামনে মীরাকে বিবাহপ্রস্তাব দিয়েছিল সেসকলের সামনে লজ্জায় লাল হওয়া মীরা‌র সম্মতি‌ চোখ‌ এড়ায়নি কারোরই। সেদিন রাতে সকলে ফিরে যাবার পর মীরার আঙুলে নিজের আংটি পরিয়ে সারাজীবন একসাথে পথচলার শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিল অদ্রীশ। প্রত্যুত্তরে মীরা অদ্রীশকে দিয়েছিল সবচেয়ে অমুল্য উপহার। প্রেয়সীর প্রথম চুমু।

 

সেদিনের পর কেটে গেছে প্রায় ছয়মাস। এই ছয়মাসে দুপক্ষের বাড়িতেই ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে জানানো হয়ে গেছে। হবু জামাই প্রফেসর জানার পর মীরার বাড়ি থেকে কোনো আপত্তি ওঠেনি। অদ্রীশের বাড়িতেও মীরাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে নিয়েছিলেন ওর শাশুড়িমা। ফলে আর কোনো বাধা রইল না। ঠিক করা হল সামনের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে দু’জনের চার হাত এক করা হবে। সেই মতো প্রস্তুতি নিতে লাগল দুটো পরিবার। আর দুটো হৃদয় অপেক্ষা করতে লাগল এক হওয়ার।

 

******

 

বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বিছানার দিকে তাকাল মীরা। বিছানায় ঘুমন্ত অদ্রীশকে দেখে মৃদু হেসে‌ সোফায় পড়ে থাকা টিশার্ট আর পাজামা-টা পরে নিল সে। তারপর এগিয়ে গিয়ে বারান্দার দিকের দরজাটা খুলল। দরজাটা খুলতেই একরাশ হিমেল হাওয়ার স্পর্শ কাঁপিয়ে দিল মীরার সদ্যস্নাতা শরীরটাকে। ঘরের ভেতর থেকে শালটা বের‌ করে সেটায় নিজেকে আপাদমস্তক জড়িয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ব্যালকনির চেয়ারটায় বসল সে। তারপর নিঃশব্দে শুনতে‌ লাগল প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ। এদিকটায় দার্জিলিং-এর মতো তেমন সূর্যোদয় দেখা না গেলেও প্রাকৃতিক শোভা যা আছে তাও কম নয়। ওদের কটেজটার পাশে একফালি জায়গায় একটু ফুলের বাগান গোছের মতো তৈরি করা হয়েছে। বাগানে নানারকমের ফুল দেখে বোঝা যায় হয় কটেজের মালিকের ফুলের শখ আছে নাহলে এগুলো নিছকই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। বাগানের দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের ফুলশয্যার রাতের কথা মনে পড়ে গেল মীরার। সেদিন রাতেও এরকম অজস্র ফুলে সাজানো হয়েছিল ওর খাট। সারাদিনে বৌভাতের একাধিক স্ত্রীআচার, ও সন্ধ্যেবেলা একাধিক অতিথি আপ্যায়নের পর শাশুড়িদের সাথে প্রবেশ করেছিল অদ্রীশের ঘরে।

 

******

সমস্ত স্ত্রীআচার শেষ করার পর সমস্ত মেয়েবউদের নিয়ে অদ্রীশের মা যখন অদ্রীশের ঘর থেকে বেরোলেন তখন রাত দেড়টা বাজে। মায়েরা বেরিয়ে যেতেই অদ্রীশ ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর এসিটা হাল্কা করে চালিয়ে পরনের পাঞ্জাবী খুলতে খুলতে বলল, “উফ! সারাটা দিন যা গেল বাপ রে বাপ! এবার আমার শান্তি!” বলে পাঞ্জাবীটা খুলে ঘরের এককোণে ঝুলিয়ে রেখে বাথরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে খাটের ছত্রি থেকে নেমে আসা ফুলের মালা গুটিয়ে নিয়ে মীরার পাশে বসে বলল, “একটু সরে বসো তো!” মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ঠাণ্ডা গলায় বলল,

 

– সরে বসবো কেন?

 

– আমি শোবো বলে।

 

– শোবে মানে?

 

– শোবো মানে শোবো! দেখো আজকে সারাদিনের পর আমি ভীষণ টায়ার্ড। তুমিও তো মনে হয় ক্লান্ত। নাও নাও এই ধরাচুঁড়ো খুলে ফ্রেশ হয়ে তুমিও শুয়ে পড়ো।


– শুয়ে পড়বো মানে? আজ যে আমাদের ফুলশয্যা!

 

– তো? তাতে কী হয়েছে? দেখো আজকে সারাদিন যা গেল তারপর ওসব করার ইচ্ছে বা ধৈর্য দুটোই আমার নেই। আজকে আমি ভীষণ ক্লান্ত। তাছাড়া সময় তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না? পরে না হয় হবেক্ষণ? ভীষণ ঘুম পাচ্ছে!

 

কথাগুলো বলে একটা হাই তুলে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল অদ্রীশ। মীরা ভ্রু কুঁচকে অদ্রীশকে দেখতে লাগল। কোথায় বিয়ের পর ফুলশয্যার দিন বউকে একটু আদর করবে, উপহার দেবে তা না সরে বসতে বলছে! ঘুমোবে বলছে! এ কে রে? কিছুক্ষণ পর অদ্রীশের নাকডাকার শব্দে চমকে উঠল মীরা। একি! এরমধ্যেই ফরফর করে নাক ডাকতে শুরু করে দিয়েছে! অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাগে ফোঁসফোঁস করতে লাগলো মীরা। আজকের রাতের জন্য কত কিছু ভেবে রেখেছিল সে। কত স্বপ্ন দেখেছিল! আর তার জায়গায় কিনা এইভাবে… সব নষ্ট হয়ে গেল! কটমট করে অদ্রীশের দিকে তাকালো সে। কিন্তু অদ্রীশ নির্বিকার। কিছুক্ষণ পর পাশ ফিরে শোয়ার সময় বলল, “শোবার সময় ঘরের আলোটা নিভিয়ে দিও প্লিজ!” মীরার ইচ্ছে করলো অদ্রীশকে ধাই করে মেরে দেয়।

 

অনেক কষ্টে নিজের রাগটাকে প্রশমিত করে এক এক করে গয়নাগুলো খুলে ড্রেসিং টেবিলে রেখে দিয়ে পরনের শাড়িটা খুলে ফেলল মীরার। তারপর ঘরের এককোণে রাখা নিজের ট্রলিব্যাগ থেকে একটা নাইটি বের করে বাথরুমে ঢুকল। আর মীরার বাথরুমে ঢোকার সাথে সাথে চোখ মেলে তাকাল অদ্রীশ। বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল সে।

 

বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই ঘরের অবস্থা দেখে চমকে উঠল মীরা। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে সেন্টেড ক্যান্ডেল জ্বালানো হয়েছে। সুগন্ধী মোমের গন্ধে গোটা ঘর ম ম করে উঠেছে। গোটা মেঝে জুড়ে ফুলের পাপড়ি ছড়ানো। খাটের ছত্রিতে গুটিয়ে রাখা ফুলের মালা নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর খাটের মাঝে বসে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে অদ্রীশ। তারমানে পুরোটাই অদ্রীশের অভিনয় ছিল! মীরা বুঝতে পারে নিজের অজান্তে অদ্রীশের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে সে।

 

“তবে রে!” বলে একছুটে দৌড়ে অদ্রীশের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মীরা। কিল চড় ঘুষিতে জেরবার করে তোলার আগে অদ্রীশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মীরাকে। তারপর কপালে চুমু খেয়ে বলে, “পাগলী একটা! তুমি ভাবলে কি করে আজকের রাতটা আমি স্পয়েলড হতে দেব? আমিও যে আজকে রাতের জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম।”

 

– ছাড়ো আমাকে! বাজে লোক একটা! আমার সাথে কথা বলবে না তুমি। সাহস কি করে হয় এরকম ইয়ার্কি মারার? ছাড়ো!

 

– উঁহু! ছাড়বো না। আজকের দিনে কি বউকে ছাড়তে আছে?

 

– আমি কিন্তু চেঁচাবো!

 

– তাই নাকি? বেশ চেঁচাও দেখি?

 

কথাটা বলার সাথে সাথে মীরার পালকের চেয়েও নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় অদ্রীশ। মীরার অব্যক্ত কথারা অদ্রীশের ঠোঁটে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। মীরাকে বিছানায় শুইয়ে মরুভূমির তপ্তবালির মতো মীরার ঠোঁটের সমস্ত আদ্রতা শুষে নিতে থাকে অদ্রীশ। তারপর একসময় মীরার ঠোঁট থেকে নিজেকে মুক্ত করে বালিশের পাশ থেকে বের করে আনে একটা সুদৃশ্য ছোটো বাক্স। বাক্স থেকে আংটিটা বের করে মীরাকে পরিয়ে দেয় সে। মীরা অপলকে তাকিয়ে থাকে আংটিটার দিকে। অদ্রীশ হেসে মীরার কানে কানে বলে ওঠে, “কি? পছন্দ?” মীরা অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে। অদ্রীশ হেসে বলে, “আজ আর কোনো কান্না নয়। আমাদের কাঁদার দিন শেষ! বুঝলে মীরাবাই?” বলে মীরার গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রু মুছিয়ে দেয় অদ্রীশ। তারপর ডুব দেয় মীরা নামের নদীর গভীরে।

 

মীরার ঠোঁটে উন্মাত্ত প্রেমিকের মতো দংশনচিহ্ন অঙ্কিত করতে করতে নিজের সাথে মীরাকেও ক্রমশ নিরাবরণ করে অদ্রীশ। তারপর ধীরে ধীরে নেমে আসে ওর কন্ঠায়। প্রবলসুখে পাগলপারা হয়ে অদ্রীশকে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে মীরা। সুতীক্ষ্ণ নখরে ছিন্নভিন্ন করে দেয় অদ্রীশের বাহু, কামড়ে ধরে ওর বিশাল কাঁধ। মীরার এই অত্যাচার সহ্য করতে করতে আরো প্রবলভাবে আদর করতে থাকে অদ্রীশ। মীরা টের পায় অদ্রীশের ঠোঁট স্পর্শ করছে ওর নাভিমূল, ধীরে ধীরে নেমে আসছে উরুসন্ধীর দিকে। আর ঠিক তখনই একটা তীব্র, নাড়ি ছেঁড়া যন্ত্রণার সৃষ্টি হয় মীরার তলপেটে। একি! এইসময় কেন? এখন কেন? কদিন আগেই তো শেষ হল! আবার কেন? কথাগুলো ভাবার আগেই প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয় মীরার। প্রবল যন্ত্রণায় অস্ফুটে ককিয়ে ওঠে সে। অন্ধকারে সে আর্তনাদকে শীৎকার ভেবে প্রথমে জাগ্রত হলেও পরক্ষণে ভুল ভাঙে অদ্রীশের। সঙ্গে সঙ্গে একলাফে বিছানা থেকে নেমে ঘরে আলোটা জ্বালাতেই যেন নরক দর্শন হয় তার। স্তম্ভিত হয়ে সে দেখে বিছানায় শুয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মীরা কাতরাচ্ছে। ওর যোনীপথ দিয়ে ভেসে আসছে রক্তের অজস্রধারা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে বিছানার শ্বেতশুভ্র চাদর। রক্ত লেগে আছে তার হাতেও।


ডাক্তারের চেম্বার থেকে বাড়ি ফেরার পথে অদ্রীশ শক্ত করে ওকে জড়িয়ে থাকলেও বাড়ি ফেরার পর বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে শাওয়ার চালিয়ে দিয়ে তার নিচে দাঁড়াল মীরা। তারপর নতজানু হয়ে বসে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। ওর কানে তখনও ভাসছে ডাক্তারের কথাগুলো। কাল রাতে ওকে ঐ অবস্থায় দেখে প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেও পরক্ষণে পুরোটা সামাল দিয়েছিল অদ্রীশ। মাটিতে পড়ে থাকা নাইটিটা তুলে মীরার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে থ্রিকোয়ার্টার প্যান্টটা পরতে পরতে বেরিয়ে গিয়েছিল ঘর থেকে। ডেকে এনেছিল ওর মাকে। পরদিন নিয়ে ছুটেছিল ডাক্তারখানায়। ডাক্তার সবটা শোনার পর কিছু পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন। সেটারই রিপোর্ট এসেছে। রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা আছে মীরা মেনোরিজিয়া বা অতি রজঃস্রাব রোগে আক্রান্ত। সঠিক সময় অপারেশন না হলে বিপদ হতে পারে। সবটা শোনার পর মীরার মনে হচ্ছিল যেন ওর পায়ের তলা থেকে ধীরে ধীরে মাটি সরে যাচ্ছে। চারপাশটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা নিজেকে দেখতে পাচ্ছিল সে। মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ভেঙ্গে যাচ্ছিল মীরা। শাওয়ারের জলে সিক্ত হয়ে ধুয়ে যাচ্ছিল ওর স্বপ্ন, ভালোবাসা, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু।

           

******

 

– ভোরবেলা ওভাবে বারান্দায় বসে আছো কেন? ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো!

 

কথাটা শোনামাত্র একটা মুচকি হাসি খেলে গেল মীরার ঠোঁটে। সে হেসে বলল, “লাগুক!” পেছন থেকে একজোড়া হাত ওকে জড়িয়ে ধরল। চোখ বুঁজে মীরা শুনতে পেল অদ্রীশ বলছে, “একে সারারাত জাগা, তার উপর এই ঠাণ্ডার মধ্যে ব্যালকনিতে বসে আছো। মরার ইচ্ছে হয়েছে নাকি মীরাবাই?” মুচকি হেসে মীরা বলল,

 

– যদি বলি হ্যা? কী করবে?

 

অপলকে মীরার দিকে তাকায় অদ্রীশ। দেখে মীরাও ওর দিকে অপলকে তাকিয়েছে। ভোরের আলোয় ভীষণ মিষ্টি লাগছে সদ্যস্নাত মুখখানা। সেদিন ডাক্তারখানা থেকে ফেরার পর অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করেছিল। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেওয়া, উন্মাদের মতো আচরণ করা শুরু করেছিল সে। প্রথম প্রথম দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেও যখন একদিন কলেজে থাকাকালীন মীরার সুইসাইডের খবর পেল তখন আর স্থির থাকতে পারেনি সে। হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী মীরাকে যা নয় তাই বলতে শুরু করেছিল সে। রাগের মাথায় বলেছিল, “কি ভেবেছটা কী? আমাকে মুক্তি দেবে?” হাসপাতালের বিছানায় মিশে যাওয়া মীরার শীর্ণকায় দেহ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এসেছিল একটা ক্ষীণ প্রশ্ন, “যদি বলি হ্যাঁ? কী করবে?” সেদিন কোনো কথা বলেনি অদ্রীশ। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল মীরাকে। তারপর প্রতিজ্ঞা করেছিল যে করেই হোক মীরাকে এই রোগের কবল থেকে বের করে আনবে সে। 

সেই মতো লাইব্রেরী ঘুরে, বইপত্র-জার্নাল পড়ে, ডাক্তার বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে, গুগল ঘেটে বের করেছিল রোগটার সমগ্র ঠিকুজীকুষ্ঠি। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে শুরু করিয়েছিল মীরার চিকিৎসা। অদ্রীশের ভালোবাসার জোরেই হোক বা ডাক্তারের চিকিৎসার কারণেই হোক ধীরে ধীরে জীবনের পথে ফিরে আসছিল মীরা। তারপর অপারেশন হয়ে গেছে তিনবছর হতে চলল। তিনবছরে মীরা অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে। ফিরে এসেছে পুরোনো ছন্দে। কিন্তু আগের মতো সেই প্রগলভতা নেই। বরং আগের চেয়ে অনেক শান্ত হয়ে গেছে সে। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে মীরার দিকে তাকায় অদ্রীশ। তারপর মীরার নাকে নাক ঘষে বলে, “যেতে দেবো না! শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখবো তোমাকে!”

 

– সারাজীবনের মতো?

 

– সারাজীবনের মতো!

 

বলে মীরাকে জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে যায় অদ্রীশ। আর বাগানের এককোণের দেয়ালে গজিয়ে ওঠা বোগেনভিলিয়া গাছের ফুলগুলো থেকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে ঝরে পড়ে কয়েকটা শিশিরবিন্দু।

শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০২২

ভ্যাকেশন



স্টুডিও থেকে গাড়িটা বেরোনো মাত্র ব্যাকসিটে হ্যালান দিয়ে বসল মঞ্জুষা। সারাদিন আজ বড্ড ধকল গেছে। এই সোমবার ওদের সেটে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে নাচের সিকোয়েন্স আছে। আজ তারই রিহার্সাল ছিল। আর আজকের রিহার্সালেই ডিরেক্টর আর কোরিওগ্রাফার ওর সমস্ত এনার্জি শুষে নিয়েছে। এমনিতে মঞ্জুষা নাচ ভালোবাসলেও আজকের স্টেপগুলো ভীষণ টাফ ছিল। কিছুতেই আয়ত্তে আসছিল না। এদিকে কোরিওগ্রাফার মহা ত্যাঁদড়! স্টেপ না তুলতে পারলে কিছুতেই ছাড়বে না। ফলে সারাদিন ধরে নাচার কারণে  সারা শরীর যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে ওর। এখন বাড়িতে গিয়ে কোনোমতে বিছানায় এলিয়ে পড়লে বাঁচে ও। একদিকে মন্দের ভালো যে কাল থেকে পর পর তিনদিনই ছুটি আছে। এই তিনদিন সে একটু রেস্ট নিতে পারবে। গত সপ্তাহে সেটে চোট লাগার পর ডাক্তার ওকে রেস্ট নিতে বললেও সিরিয়ালের মেন লিড হওয়ায় সেটা আর নেওয়া সম্ভব হয়নি। মঞ্জুষা নিজেই ইচ্ছে করে নেয়নি। যদিও রেস্টটা ওর দরকার তবুও সারা সপ্তাহের টাইট শিডিউলের মাঝে ডিরেক্টরের কাছে মুখ ফুটে রেস্টের কথা বলতে পারেনি সে। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রামতো এসে গিয়েছিল মঞ্জুষার। আচমকা ফোনের শব্দে উঠে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। একমুহূর্ত স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল মঞ্জুষা। সঞ্জয় ফোন করেছে। সঞ্জয় সেনগুপ্ত ওর প্রথম সিরিয়ালের হিরো ছিল। বর্তমানে ওর জিম পার্টনার কাম মেন্টর। শুধু তাই নয়, সদ্য চারটে ওয়েবসিরিজ আর একটা সিনেমাতেও সঞ্জয় অভিনয় করেছে। সঞ্জয়ের সাথে মঞ্জুষার আলাপ বছর ছয়েক আগে একটা সিরিয়ালের সেটে। ওরা দুজনে সিরিয়ালের লিড ছিল। যদিও সে আলাপটা তেমন জমেনি। দুʼজনে দুʼজনের মতো কাজ করে যে যার বাড়ি ফিরে যেত। কিন্তু একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটলো যার ফলে মঞ্জুষার একান্ত প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠলো সঞ্জয়। 

একবার শ্যুটিং চলাকালীন একটা দুর্ঘটনায় মঞ্জুষার পা মারাত্মকভাবে জখম হয়। হয়তো ও মারাও পড়তে পারতো যদি না সঞ্জয় এগিয়ে আসত। ওরই তৎপরতায় সেবার বেঁচে যায় মঞ্জুষা। তারপর থেকে ওদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়। সেবার গোড়ালিতে চোটটা এতটাই বেশি ছিল যে বেশিক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারতো না মঞ্জুষা। সে সময় সঞ্জয়ের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ইনজুরি সেরে সুস্থ হয় ও। 

মঞ্জুষার মনে আছে সে সময়গুলোয় সঞ্জয় একজন প্রকৃত বন্ধুর মতো ওকে আগলে রেখেছিল। ওর মন ঠিক রাখা থেকে পায়ের ফিজিওথেরাপি সব কিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। সে সময় টলিপাড়ায় ওদের সম্পর্ক নিয়ে কম কানাঘুষো হয়নি। বিশেষ করে যখন সঞ্জয় ওর ক্যাসানোভা ইমেজের ফলে একাধিক অভিনেত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য টলিপাড়ায় বিখ্যাত। ইন্ডাস্ট্রিতে তখন নবাগতা মঞ্জুষা প্রথমে এসব নিয়ে বিব্রত হলেও পোড়‌খাওয়া আর্টিস্ট সঞ্জয় এসব কি‌ছু‌ই গায়ে মাখেনি। বরং দীর্ঘ অধ্যবসায়ের সাথে মঞ্জুষাকে সুস্থ করে, একবছরের মাথায় গ্রুমিং করে এক অ্যাওয়ার্ড শোয়ে সকলের সামনে দাঁড় করিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল সব নিন্দুকের মুখ। সকলে হা হয়ে দেখছিল একবছর ‌আগে ইন্ডাস্ট্রিতে আসা বেঢপ আনকোরা মেয়েটা বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মডেলদের মতো ছিপছিপে আর যথেষ্ট আবেদনময়ী হয়ে উঠেছে। 

তারপর থেকে মঞ্জুষাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে একের পর এক মেগা সিরিয়ালের অফার পেতে শুরু করে সে। বর্তমানে চারটে মেগা সিরিয়াল শেষ করার পর মঞ্জুষা টেলিজগতে এক ভীষণ পরিচিত মুখ। রাস্তায় বেরোলে রীতিমতো ভীড় পড়ে যায়। সবটাই যে সঞ্জয়ের বদান্যতায় সেটা বলাই বাহুল্য। মঞ্জুষা সেটা জানেও এবং এ জন্য সে সঞ্জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞও বটে। সঞ্জয় না থাকলে হয়তো ইন্ডাস্ট্রিতে টেঁকা দায় হতো তার। হয়তো কম্পিটিশনের দৌড়ে হারিয়েও যেতে পারত সে। সঞ্জয়ের কারণে সেটা আর সম্ভবপর হয়নি। এই ছয় বছরে অবশ্য সঞ্জয়ের সাথে ওর সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বতেই আটকে থাকেনি। বরং দিনের পর দিন ওরা পরস্পরের আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, গোপনে বিয়েটাও সেরে ফেলেছে ওরা। মঞ্জুষার আজও মনে আছে সেবার পাহাড়ে শ্যুটিং করতে গিয়ে ওদের প্রথম কাছে আসা। সেবার সঞ্জয়ই আচমকা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল ওকে। প্রস্তাবটা এতটাই নাটকীয় আর রোমান্টিক ছিল যে মঞ্জুষা রাজি না হয়ে থাকতে পারেনি। এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটা পাবলিক আর মিডিয়ার কাছে লুকোনো থাকলেও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে থাকা কিছু সুহৃদ বন্ধুরা জানে এই ব্যাপারটা। বাকি সকলে জানে দুজনে লিভ ইন রিলেশনে আছে। ভবিষ্যতে বিয়ে করবে। প্ল্যানটা সঞ্জয়েরই। ও চায় না মঞ্জুষা প্রতিষ্ঠিত হবার আগে কেউ জানুক ও বিবাহিত।তেমন হলে পরে সোশ্যাল ভাবে একটা অনুষ্ঠান করা যাবে। কিন্তু তার আগে ওদের বিয়ের ব্যাপারটা যাতে কাকপক্ষীতেও টের না পায়। মঞ্জুষাকে পইপই করে এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখতে বলেছে সঞ্জয়। সঞ্জয়ের কলটা দেখে সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু হেসে ড্রাইভারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রিসিভ করল মঞ্জুষা। 

- বলো! 

- কোথায় আছো? 

- এই তো শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরছি। 

- বাড়ি ফিরছ মানে? তুমি বেরিয়ে পড়েছ? 

- হ্যাঁ! কেন বলো তো? 

- আজ সকালে আমাদের মধ্যে একটা কথা হয়েছিল মনে আছে?

কথাটা শোনামাত্র আচমকা মঞ্জুষার মনে পড়ে গেল আজ বিকেলের দিকে ওদের মন্দারমনিতে যাওয়ার কথা ছিল। সারা সপ্তাহের টাইট শিডিউল শেষে তিনদিন ছুটি থাকায় সঞ্জয়ই এমনভাবে প্রস্তাবটা দিয়েছিল যে মঞ্জুষা রাজি না হয়ে থাকতে পারেনি। কথা ছিল শ্যুটিং সেরেই দুজনে একসাথে রওনা দেবে। সেই মতো দু'জনে দু'জনের লাগেজ গুছিয়ে নিয়ে এসেছিল। সারাদিনের রিহার্সালের চাপে শেষে ক্লান্ত মঞ্জুষা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল ব্যাপারটা। জিভ কেটে সে বলে, “এ বাবা! একেবারে মাথা ‌থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। আসলে আজ সারাদিন রিহার্সালে এমন ব্যস্ত ছিলাম যে...” ওপাশ থেকে সঞ্জয় মঞ্জুষাকে থামিয়ে বলে,“ইটস ওকে৷ খুব টায়ার্ড মনে হচ্ছে৷” মঞ্জুষা হেসে বলে, “তা একটু আছি। আজ সারাদিন ডিরেক্টর আর কোরিওগ্রাফার ধেই ধেই করে নাচিয়েছে কিনা? সারা শরীরের নাটবল্টু ঢিলে হয়ে গেছে!” 

ওপাশ থেকে সঞ্জয়ও হাসে, “তাও বটে। তোমাদের সেটে আজকাল প্রায়ই নাচগান হচ্ছে দেখছি। আচ্ছা বেশ তাহলে থাক। তুমি বরং বাড়ি গিয়ে রেস্ট নাও। সারাদিন নাচার পর তুমি টায়ার্ড এরপর জার্নির ধকল নিতে পারবে না। রাতে রান্নার ঝামেলা করার আর দরকার নেই। খাবার আমি নিয়ে আসবো কেমন? এখন তাহলে রাখছি।” বলে মঞ্জুষাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আচমকা কলটা কেটে দেয় সঞ্জয়। মঞ্জুষা বোঝে সঞ্জয় মুখে না বললেও ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। আর্টিস্টদের জীবন এমনই হয়। কোনো ছুটি নেই, নিজের মতো বাঁচা নেই। এমনকি বিয়ের পর সঞ্জয়ের সাথে লাস্ট কবে বেড়াতে গেছে সেটাও মনে নেই। 

গতবছর চারটে ওয়েবসিরিজ আর একটা সিনেমায় অভিনয় করে ভালো টাকা পেয়েছিল সঞ্জয়। এছাড়া সিরিয়াল থেকে এবং বিভিন্ন মঞ্চে শো করে মঞ্জুষারও ভালো টাকা জমেছিল। সেই টাকা দিয়ে দুজনে মিলে এবারের ট্রিপে একসাথে সময় কাটাবে বলে মন্দারমনিতে একটু নিরিবিলি এলাকায় একটা কটেজ ভাড়া করেছিল। ভেবেছিল এই তিনদিন দেদার খাওয়া আর মজা করবে ওরা। সোজাসুজি বলতে গেলে এটা ওদের মধুচন্দ্রিমা হতে পারতো। ওর একটু ভুলের জন্য সমস্ত প্ল্যানটা ভেস্তে গেল। ছলছলে চোখে গাড়ির জানলার দিকে তাকাল মঞ্জুষা। ইস কেন রিহার্সালের শেষে থেকে গেল না ও? কেন অপেক্ষা করলো না সঞ্জয়ের? আরেকটু থেকে গেলে... ভাবতে ভাবতে আচমকা একটা আইডিয়া খেলে গেল ওর মাথায়।

আড়চোখে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ফোনের নেট অন করলো সে। তারপর হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে দেখলো সঞ্জয় অনলাইন আছে। চটপট সঞ্জয়ের ইনবক্সে টাইপ করলো সে, “আমাকে রাস্তা থেকে পিকআপ করতে পারবে?” মেসেজটা রিসিভ হওয়ার সাথে সা‌থে সঞ্জয়ের রিপ্লা‌ই এল, “মানে?” মঞ্জুষা ঝড়ের গতিতে টাইপ করল, “বলছি আমাকে মাঝরাস্তায় পিকআপ করতে পারবে? তাহলে একসাথে বেরিয়ে যেতাম।” কিছুক্ষণ পর সঞ্জয়ের রিপ্লাই এল, “পারবো! কিন্তু তোমার শরীর?” মঞ্জুষা সঙ্গে সঙ্গে টাইপ করলো, “সে তোমার সাথে থাকলে এমনিতেও ফিট হয়ে যাবে। যাবে? যদি যেতে চাও তাহলে লোকেশন বলে দেব।” ওপার থেকে সম্মতি আসতেই মঞ্জুষা ওর পিকআপ লোকেশন জানিয়ে নেট অফ করে দিল।

*****

গাড়িটা যখন মঞ্জুষার পাড়াতে ঢুকবো ঢুকবো করছে তখন মঞ্জুষা সঞ্জয়কে মেসেজ করে রেডি থাকতে বলে ড্রাইভারকে সাইডে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। অজুহাত হিসেবে জানাল এ পাড়ায় একজনের জন্মদিনে ওর নিমন্ত্রণ আছে। সেটা অ্যাটেন্ড করতে হবে ওকে। ড্রাইভার প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও একসময় বাধ্য হয়ে মঞ্জুষাকে নামিয়ে দিল পাড়ার আগে। গাড়ির ডিক্কি থেকে ব্যাগ নামিয়ে মঞ্জুষা দাঁড়াল মোড়ের মাথায়। ওকে নামিয়ে গাড়িটা ফিরে গেল নিজের আস্তানায়। কিছুক্ষণ পরে মঞ্জুষার সামনে এসে দাঁড়াল আরেকটা কালো রঙের গাড়ি। জানলার কাঁচ নামিয়ে সঞ্জয় বলে উঠল, “কে‌উ দেখে ফেলার আগে ‌উঠে এসো।”
গাড়ির ব্যাকসিটে ব্যাগ রেখে মঞ্জুষা বসল সঞ্জয়ের পাশের সিটে। সঞ্জয় সঙ্গে সঙ্গে জানলার কাঁচ তুলে গাড়ি স্টার্ট করতেই মঞ্জুষা দুহাতে সঞ্জয়কে জড়িয়ে ধরে একটা গভীরভাবে চুমু খেল। কিছুক্ষণ পর সঞ্জয় নিজেকে ছাড়িয়ে অভিমানের সুরে বলে উঠল, 

- আমি তো ভেবেছিলাম এবারের ট্রিপটাও বোধহয় গেল! আমার মঞ্জুবেবিকে আর আদর করতে পাবো না। 

মঞ্জুষা সঞ্জয়ের চুলগুলো ঘেটে দিয়ে বলল, “‌‌তা‌ই কখনো হয়? আমার সঞ্জুবেবি ট্রিপ প্ল্যান করবে ‌আর আমি যাবো না? নাও আর দেরী করো না। এখান থেকে নিয়ে চলো আমাকে অনেক দুরে। কোনো সমুদ্রের তীরে। যেখানে থাকবো শুধু তুমি আর আমি। মাঝে কেউ থাকবে না।” বলে মঞ্জুষা সিটে হেলান দেয়। সঞ্জয় মুচকি হেসে মঞ্জুষার দিকে তাকায়। তারপর গাড়ি চালাতে শুরু করে। মাঝরাতে প্রেমের এই গোপন অভিসারে ব্রতী দুজনকে নিয়ে কলকাতার বুক চিরে বেরিয়ে যায় কালো রংয়ের গাড়িটা।

*****

মন্দারমনিতে আসার সময় মঞ্জুষার ভীষণ ইচ্ছে ছিল সমুদ্রে নামবে। কিন্তু আগের দিন অতো পরিশ্রমের পর সারারাত জেগে অতো দুর জার্নি করার ফলে ওর শরীর আর সায় দিল না। কটেজে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ব্রেক ফাস্ট সেরে নেওয়ার পর বিছানায় লুটিয়ে পড়ল সে। সঞ্জয়ও আর মঞ্জুষাকে ঘাটাল না। প্রায় সারাদিন নিজের ঘরে অচেতন হয়ে পড়ে থাকার পর মঞ্জুষার ঘুম যখন ভাঙল তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েই সে বুঝল সমগ্র শরীর যন্ত্রণায় টনটন করছে। কিছুক্ষণ পর সঞ্জয় দুটো কফিমগে ব্ল্যাক কফি নিয়ে ঘরে ঢুকে বলল, “ঘুম ভাঙলো বেবি?” তারপর ঘরের সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা রেখে মঞ্জুষার দিকে তাকাতেই বু‌ঝলো কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। মঞ্জুষাকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল সারা শরীর যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। সঞ্জয় বুঝলো কাল সারাদিন নাচ করার ফলে মাসলপেইন হচ্ছে মঞ্জুষার। সঙ্গে সঙ্গে সে মঞ্জুষার পাশে গিয়ে বসল। তারপর বলল, “বুঝেছি। মাসলপেইন হচ্ছে। কোনো ব্যাপার না। চট করে বা‌থরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা জলে স্নান সেরে নিয়ে কফিটা ‌খেয়ে নাও। দেখবে ‌শরীরটা বে‌‌শ ফ্রি লাগছে। পারবে তো বাথরুমে যেতে?” মঞ্জুষা মাথা নেড়ে কোনোমতে সঞ্জয়ের সাহায্যে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। 

বাথরুমে শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে শীতলধারায় স্নান করার পর শরীরের ক্লান্তিটা সত্যিই অনেকটাই কমে গেল মঞ্জুষার। স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল সঞ্জয় এরমধ্যেই বিকেলের জলখাবার এনে জড়ো করেছে টেবিলে। সেদিন সারা সন্ধ্যে সঞ্জয়ের সাথে আড্ডা দিয়েই কাটানোর পর রাতে মঞ্জুষা যখন ঘুমোতে গেল ততক্ষণে ওর শরীরের ও মনের দুটোরই ক্লান্তি অনেকটাই কমে গেছে। 

*****

পরদিন সকাল সকাল দু'জনে মিলে বেরিয়ে পড়ল আশেপাশের জায়গা দেখতে। গাড়িতে করে একে একে তালসারি, উদয়পুর, ওল্ড দীঘা ঘুরে ওরা যখন ফিরল ততক্ষণে সুর্যদেব পাটে যেতে বসেছেন। গাড়িটাতে গ্যারাজে পার্ক করে কেয়ারটেকারকে কফির অর্ডার দিয়ে সঞ্জয় যখন ঘরে ঢুকল মঞ্জুষা ততক্ষণে ওর রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বৈঠকখানর সোফায় হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরাল সঞ্জয়। তারপর হাতে পরা কড়ির ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে ক্লান্তভাবে সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। মেজাজটা দুপুরবেলা থেকে খিঁচড়ে আছে। সব ঠিকঠাক থাকলে ওরা আরো আগে ফিরে ‌আসতো কিন্তু বাঁধ সাধলো মঞ্জুষা নিজে।

উদয়পুর সি-বিচে নেমে খাওয়াদাওয়া সেরে ফেলার পর মঞ্জুষা আবদার করে বসল একটা মালা আর একটা কড়ির ব্রেসলেটের। ওর ইচ্ছে এই দুটো জিনিস এই ট্রিপের স্মৃতি হিসেবে রাখবে। সঞ্জয় প্রথমে ‌একটু ‌আপত্তি করেছিল বটে। একে এই ট্রিপটা ভীষণ কনফিডেন্সিয়াল, তার উপর ওরা এখন রীতিমতো সেলেব। আর এরকম ঘিঞ্চি এরিয়ায় কোনো সেলেব এলে কী রকমের হট্টগোল হতে পারে তার কোনো ধারণা মঞ্জুষার নেই। সে মঞ্জুষাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও অবশেষে মঞ্জুষার জেদের কাছে হার মেনে বাজারে ঢোকে। আর বাজারে ঢোকার পর সঞ্জয় যে ভয়টা করছিল সেটাই হয়। দু-তিনজন মহিলা পর্যটক ওদের চিনে ফেলায় রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে যায় বাজারে। তারপর যা হয় আর কি। ভক্তদের সেলফির আবদার মিটিয়ে ওরা যখন রওনা দিল ততক্ষণে ঘড়ির কাটা দুপুর তিনটে পেরিয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য ঘটনাটা সঞ্জয়ের ভালো লাগেনি। বস্তুত ওরকমভাবে আচমকা স্টার অফ ক্রাউড হয়ে যাওয়াটা মোটেও ভালো লক্ষ্যণ নয়। যেখানে এই ট্রিপটা একদম গোপনীয় রাখতে চেয়েছিল সে। এতগুলো লোক, এত সেলফি, ওরা যে এখানে একসাথে আছে সেটা চাউর হতে কতক্ষণ? আর একবার সেটা চাউর হলে মঞ্জুষার আর ওর কেরিয়ারের পক্ষে মোটেও ভালো হবে না। সাংবাদিকরা নানা রকম রুমার ছড়াবে, আবার একাধিক কেচ্ছা লেখা হবে, মিম, ট্রোলের বন্যা বয়ে যাবে। যেটা মোটেও ভালো নয়। গাড়ি করে ফেরার পথে সেটা‌ই সে মঞ্জুষাকে বোঝাতে চেয়েছিল, কিন্তু মঞ্জুষা বোঝেনি। উল্টে সঞ্জয়কে ওভার রিঅ্যাক্ট করছে বলে ঝগড়া করেছে। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে একটু ‌আনমনা হয়ে গিয়েছিল সঞ্জয়। কেয়ারটেকারের ডাকে সে সোজা হয়ে বসলো সে। তাকিয়ে দেখল কেয়ারটেকার সেন্টার টেবিলে কফিমগ আর চিকেন পকোড়ার ট্রে-টা রেখে ওর দিকে তাকিয়ে ‌আ‌‌‌ছে। সঞ্জয় ওর দিকে তাকাতেই সে জানাল রাতের খাবার তৈরী হয়ে গেছে। আর কিছু লাগবে কিনা। সঞ্জয় মাথা নেড়ে বলল, “আর কিছু লাগবে না। এক কাজ করো, তুমি বাড়ি চলে যাও। রাতের খাবার আমরাই গরম করে খেয়ে নেব। কাল সকালে চলে ‌এসো কেমন?” কেয়ারটেকার তাও দাঁড়িয়ে ‌আছে দেখে ভ্রু কুঁচকে সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, “কিছু বলবে?” 

- কালকে তো ‌আমার আসা হবে না স্যার। একেবারে পরশু আসবো। 

কথাটা শোনার পর সঞ্জয় কিছুক্ষণ একদৃষ্টে কেয়ারটেকারের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলে, “মানে?” কেয়ারটেকার হাত কচলে বলে, “আসলে স্যার ব্যাপারটা হয়েছে কি...ইয়ে মানে আমি বাবা হতে চলেছি স্যার। কালকেই ডেলিভারীর ডেট পড়েছে। মালিককে জানাব ভেবেছিলাম কিন্তু তার আগেই মালিক জানাল আপনারা ‌আসছেন তাই...” 

কথাটা শোনামাত্র সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সঞ্জয়। তারপর পকেট থেকে পার্স বের করতে করতে বলে, “আগে বলবে তো! ইস ছিঃ! ছিঃ! কি কাণ্ড! তোমার বউ ওদিকে সন্তানসম্ভবা, কোথায় এসময় তোমার তার কাছে থাকা উচিত তা না করে তুমি...কালকেই আমাকে বলতে পারতে! তাহলে কালকেই তোমাকে ছেড়ে দিতাম। আচ্ছা বেশ তুমি বরং পরশুদিনই এসো। দাঁড়াও এটা নিয়ে যাও।” বলে পার্স থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে কেয়ারটেকারের দিকে এগিয়ে দিতেই কেয়ারটেকার মাথা নেড়ে টাকাটা নিতে অস্বীকার করে। সঞ্জয় হেসে বলে, “আরে এটা তোমার বকসিসের টাকা নয়, এটা আমার আর ম্যাডাম মানে আমাদের তরফ থেকে তোমার স্ত্রী আর যে আসছে তার জন্য উপহার। যাওয়ার পথে কিছু কিনে নিও। কংগ্রাচুলেশনস!” কেয়ারটেকার হেসে মা‌থা নেড়ে টাকাটা নিয়ে চলে যেতেই সঞ্জয় ভেতর থেকে সদর দরজাটা আটকে দেয়। তারপর একঝলক ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। 

সত্যি কথা বলতে গেলে উদয়পুর ভ্রমণে সবটা যে খারাপ হয়েছে তা নয়। বরং কিছুটা লাভও হয়েছে বটে। ওখানে না গেলে এরকম সুন্দর ব্রেসলেটটা সে পেত কি? মঞ্জুষা একটু ইমম্যাচিওর তবে ওর চয়েসের প্রশংসা করতে হয়। নাহ! আজ একটু বেশিই রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছে মেয়েটার উপর। সত্যিই তো মেয়েটা বেশি কিছু চায়নি। এবার মানভঞ্জন করতে হবে নাহলে ট্রিপটাই মাটি হয়ে যাবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কফির ট্রে-টা হাতে নিয়ে সঞ্জয় এগোয় মঞ্জুষার ঘরের দিকে। 

*****

উদয়পুর ‌থেকে ফেরার পর থেকে মঞ্জুষার মনটাও ভার হয়ে ‌আছে। কি ‌এমন অন্যায় ‌আবদার করেছিল সে যে সঞ্জয় এভাবে রিঅ্যাক্ট করলো? কোথাও বেড়াতে এলে কিছু কেনাকাটা করবে না তা আবার হয় নাকি? মানছে সে এখন আগের মতো সাধারণ মানুষ নয়, তার কিছুটা পরিচিতি হয়েছে, তাই বলে সে ট্রিপটাকে উপভোগ করবে না? এবার ওকে দেখে বাজারে ভীড় জমে গেলে সেটা ওর দোষ? একটা মালা আর একটা ব্রেসলেটই তো কিনতে চেয়ে‌ছিল সে! তাতেও সঞ্জয় এত বাজেভাবে রিঅ্যাক্ট করবে জানলে কিছুতেই ‌আসতো না ওর সাথে। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পরনের পোশাক খুলতে খুলতে ‌আয়নার দিকে তাকায় মঞ্জুষা। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে একঝলক তাকানোর পর ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে মালাটা। একটা খুবই সাধারণ পুঁতির মালা। মাঝে কড়ি দিয়ে সাজানো একটা বৃত্তাকার লকেট  ঝুলছে। লকেটের মাঝে একটা সবুজ রঙের পাথর। ফর্সা গায়ের রঙের সাথে দিব্যি মানিয়েছে মালাটা। যেন ওর রূপটাকে আরো খোলতাই করেছে। আয়নায় লকেটটার দিকে তাকিয়ে একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল মঞ্জুষা। এমন সময় ওকে প্রায় চমকে দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে সঞ্জয়। 

ঘরে প্রবেশ করামাত্র বিবসনা মঞ্জুষাকে দেখে প্রথমে থমকে গেলেও পরক্ষণে নির্বিকারভাবে ট্রে-টা ঘরের টেবিলে রেখে সোফা থেকে টাওয়েলটা মঞ্জুষার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সঞ্জয় বলে ওঠে, “ফ্রেশ হয়ে এসো। কফি খেতে খেতে কথা হবে।” প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে টাওয়েলটা দিয়ে কোনোমতে নিজের লজ্জা নিবারণ করে বাথরুমের দিকে দৌড় লাগায় মঞ্জুষা। সেদিকে তাকিয়ে ট্রে-তে রাখা প্লেট থেকে একটা চিকেন পকোড়া তুলে বিছানায় বসে  খেতে খেতে আনমনে হেসে সঞ্জয় বলে ওঠে, “পাগলী একটা।” 

“আশ্চর্য লোক একটা! সামান্য লজ্জাবোধ তো দূর, সামান্য জ্ঞানটুকু পর্যন্ত নেই! কারো ঘরে ঢুকতে গেলে নক করতে হয় সেটুকু সহবত নেই! কেমন গটগট করে ঢুকে গেল দেখো! আবার হুকুম করা হচ্ছে! তোর হুকুমের নিকুচি করেছে! ভাব করতে এসেছে! মানভঞ্জন! হুহ! কেন? তখন গাড়িতে বকার সময় মনে ছিল না?” কথাগুলো মনে মনে বলে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তলায় দাঁড়াল মঞ্জুষা। লোকটাকে দেখলেই রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে!  দাঁতে দাঁত চিপে রাগটাকে প্রশমিত করে মঞ্জুষা শাওয়ার চালিয়ে দিল। 

স্নান সেরে গায়ে টাওয়েল জড়িয়ে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে মঞ্জুষা দেখল সঞ্জয় বিছানায় বসে আয়েস করে চিকেন পকোড়া খাচ্ছে। মঞ্জুষাকে বাথরুম থেকে বেরোতেই হেসে বলল, “পকোড়াটা বেশ করেছে! খাবে নাকি?”

কথাটা শোনামাত্র আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না মঞ্জুষা। ছুটে গিয়ে সঞ্জয়ের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। কিল-চড়-ঘুষি মেরে, আঁচড়ে কামড়ে জেরবার করে তুলল সঞ্জয়কে। দুই হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল ওর পরনের টিশার্ট। আর সঞ্জয়! সে হাসিমুখে সহ্য করতে লাগল মঞ্জুষার এই মিষ্টি অথচ নির্মম শাসনকে। কিছুক্ষণ অত্যাচার করার পর ক্লান্ত হয়ে মঞ্জুষা কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়ল সঞ্জয়ের বুকের উপর। সঞ্জয় দুহাতে মঞ্জুষাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “এবার শান্তি হয়েছে? রাগ কমেছে? না মানে রাগ যদি কমে তাহলে আমার মতটা জানাতে পারি কি?” কথাটার প্রত্যুত্তরে মঞ্জুষা সঞ্জয়ের বুকে একটা আলতো কিল মারলে সঞ্জয় হেসে বলে, “আচ্ছা বাবা আমার ঘাট হয়েছে, সরি। কিন্তু ভেবে দেখো তো, আমি কি তোমায় এমনি এমনি বকেছি নাকি? বকেছি তো তোমার ভালোর জন্য। দেখো মঞ্জু, এই ইন্ডাস্ট্রিতে তুমি ক'বছর হল এসেছ। আর আমি এসেছি প্রায় বছর বারো হতে চলল। এই ইন্ডাস্ট্রিকে যতটা তুমি চেনো, তার চেয়ে বেশি ‌আমি চিনি। বরং নোংরা দিকটাই বেশি চিনি। এখানে টিকে থাকতে গেলে পরিশ্রম যেমন দরকার! তেমনই দরকার লড়াই করে নিজের জায়গা ধরে রা‌খার। এখানে সুযোগ আসে না মঞ্জু, সুযোগ তৈরী করে নিতে হয়। মৈত্রেয়ীদিকে দেখো না। ইন্ডাস্ট্রিতে ছয়বছর হতে চলল অথচ এখনও সেই সিরিয়ালেই আটকে। সিনেমায় রোলের জন্য পাগলের মতো ‌‌খাটছে, একের পর এক ট্রোল সহ্য করে পোর্টফোলিও করাচ্ছে অথচ চান্স পাচ্ছে কি? এদিকে নিজেরই কলিগ ঐশিকাকে দেখো, একটা মেগা শেষ হবার ‌আগেই আরেকটা মেগা, দুটো ওয়েবসিরিজ ধরে বসে আছে। কেন? মৈত্রেয়ীদির পোর্টফোলিওতে বোল্ডনেস থাকলেও ঐশিকার মতো পোর্টফোলিওতে বিকিনি ছবি, বা চুমুর দৃশ্যে অভিনয়ের গাটস নেই। এটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, এখানে যত বেশী ‌খুলবে, তত বেশী চান্স পাবে। একজন ‌অভিনেতার অভিনয় জীবন মানে প্রাইম টা‌ইম যেখানে ষাট বছর, সেখানে একজন অভিনেত্রীদের জন্য বরাদ্দ মাত্র দশবছর। মানে ‌আজ থেকে তিরিশ বছর পরেও যদি এই চেহারা আমার ‌থাকে তাহলে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে পারবো আমি। কিন্তু তুমি পারবে না। এই দশটা বছর কাজে লাগানো বা লাইমলাইটে থাকা সহজ নয়! তোমার অভিনয়ে দাগ না কাটতে পারলে ঐ আইক্যান্ডি হয়েই থেকে যাবে তুমি। দিনের ‌শেষে বয়স হলে ‌আর পাত্তা পাবে না কারো কাছে। তখন লাইমলাইটে থাকতে হয় কোনো প্রোডিউসারকে বিয়ে করতে হবে, নাহলে এমন বিতর্ক তৈরী করতে হবে যাতে তুমি নিউজে হট টপিক হয়ে থাকো। তোমাকে দেখে বুঝেছি তোমার মধ্যে ছাইচাপা আগুন ‌আছে। শুধু আইক্যান্ডি হয়ে বা হটটপিক হয়ে থাকতে ‌আসোনি তুমি! সেই কারণেই তোমাকে বার বার নিজের অভিনয়স্বত্তাকে ইউটিলাইজ করতে বলি আমি। কোনোরকম কন্ট্রোভার্সি বা নিউজ থেকে দূরে থাকতে বলি। আজ যেটা হল সেটা কিন্তু নিউজের হটটপিক ছাড়া কিছু নয়। এই যে তুমি এত ঘটা করে সেলফি তোলালে এতে টলিপাড়া কতটা সরগরম হবে বুঝতে পেরেছ? কতটা কানাঘুষো, কতটা ফিসফাস হবে ‌আমাদের সম্পর্কটাকে নিয়ে সেটার কোনো ‌ধারণা আছে? একবার যদি আমাদের বিয়ের কথাটা ফাঁস হয়ে যায় তাহলে আমার কিছু যাবে না ঠিকই কিন্তু এফেক্টটা পড়বে তোমারই কেরিয়ারের উপর। সে কারণেই বকেছি তোমাকে। আমাকে প্রমিস করো ‌আর কোনোদিন এভাবে ওপেনলি পাবলিকের সামনে হাজির হবে না।” 

সঞ্জয়কে জড়িয়ে ওর বুকে লেপ্টে থাকা মঞ্জুষা চুপ করে এতক্ষণ ধরে ওর কথাগুলো শুনছিল। তখন সঞ্জয়ের কথায় রাগ হলেও এখন ঠাণ্ডা মাথায় সঞ্জয়ের যুক্তিগুলো শুনে মঞ্জুষার মনে হল সঞ্জয় ঠিক কথাই বলেছে, ওভাবে তখন পাবলিকের সামনে চলে আসাটা সত্যিই ঠিক হয়নি ওর। সত্যি কথা বলতে গেলে এই ট্রিপটা একান্ত গোপনীয় আর ওদের মধ্যেই থাকার কথা ছিল। ওর ভুলের জন্য সেটা আর গোপনীয় রইল না। এবার হয়তো গোটা ইন্ডাস্ট্রি জেনে যাবে ওর আর সঞ্জয়ের ব্যাপারটা। আবার সেই কানাঘুষো শুরু হবে। ফেসবুক পেজ, নিউজপোর্টালগুলো ভরে যাবে কেচ্ছায়। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অস্ফুটে মঞ্জুষা বলে ওঠে, “সরি। আর হবে না। প্রমিস।” মঞ্জুষাকে জড়িয়ে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সঞ্জয় বলে ওঠে, “দ্যাটস মাই লেডি!” বলে মঞ্জুষার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে, “এবার রাগ কমেছে?”

মঞ্জুষা মাথা তুলে সঞ্জয়ের দিকে ভালো করে তাকায়। সঞ্জয়ের পরনের টিশার্টটা হাতাহাতির ফলে ছিঁড়ে গিয়ে ঘরের এককোণে পড়ে আছে। ফলে উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে গেছে সঞ্জয়ের। হাল্কা শ্যামবর্ণ বুকের উপর মঞ্জুষার নখের আঁচড়ের ফলে রক্তচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে। মাথার একরাশ বাবরি চুল ওর অত্যাচারের ফলে উস্কোখুস্কো হয়ে গেছে। সে নিজেও হাতাহাতির ফলে খানিকটা বিধ্বস্ত। পরনের টাওয়েল শরীর থেকে সরে গিয়ে বিছানার এককোণে লুটিয়ে পড়েছে। সদ্যভেজা চুলগুলো ছড়িয়ে গিয়ে লেপ্টে গেছে ওর সারামুখে। তার খেয়াল হয় বিবসনা অবস্থায় সে সঞ্জয়ের বুকের উপর শুয়ে থাকলেও সঞ্জয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং তার অত্যাচারে বিধ্বস্ত হয়েও হাসিমুখে তাকিয়ে আছে সঞ্জয়।

এর আগেও সঞ্জয়কে খালি গায়ে দেখেছে মঞ্জুষা। বরং বলা ভালো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থাতেই দেখেছে। কিন্তু কোনোবার এত মোহময় লাগেনি সঞ্জয়কে। মুগ্ধ চোখে মঞ্জুষা দেখল টেবিল ল্যাম্পের নরম আলো এসে ঠিকড়ে পড়ছে সঞ্জয়ের শরীরের অনাবৃত অংশে। সেই ‌আলোয় ‌শ্যামবর্ণ সঞ্জয়ের দেহের ঘর্মাক্ত মাংসপেশীগুলো চকচক করে উঠেছে। মঞ্জুষার মনে হল যেন কোনো গ্রিক ভাষ্কর্যকে দেখছে সে। হাল্কা কাঁচাপাকা দাঁড়িতে, উস্কোখুস্কো চুলে ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে সঞ্জয়। সেই নির্মল হাসিতে ওকে দেবপুরুষের মতো লাগছে। সঞ্জয় এবার দু’হাতে মঞ্জুষার মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে বলে, “কি হল? রাগ কমেছে?” মঞ্জুষা মাথা নেড়ে সঞ্জয়ের ঠোঁটে চুম্বনচিহ্ন এঁকে দিয়ে বলে, “না কমেনি! ‌আমাকে আদর করে দাও!”

মঞ্জুষার ইঙ্গিতটা বুঝতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে না সঞ্জয়ের। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে মঞ্জুষার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। তারপর এক আদিম বন্য আদরে পাগল করে তোলে মঞ্জুষাকে। মঞ্জুষা সঞ্জয়কে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গেলে সঞ্জয় সেই প্রতিরোধকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে একে একে মঞ্জুষার কপাল, চোখ, গাল, থুতনি, চিবুক, বুকের খাঁজে চুম্বনচিহ্ন আঁকার পর সঞ্জয় নেমে আসে মঞ্জুষার বুকের কাছে। গলা থেকে পুঁতির মালাটা খুলে বিছানার পাশে সাইড টেবিলে রেখে দিয়ে বেডসুইচ টিপে ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়ার পর নিজের মুখ নামিয়ে আনে মঞ্জুষার খাজুরাহোর ভাস্কর্যের মতো পেলব বক্ষদ্বয়ের উপর। এক হাতে মঞ্জুষার মুখ চেপে শীৎকারের শব্দ রোধ করে দিয়ে বন্য মৌখিক আদরে মঞ্জুষাকে ক্রমশ পাগল করে তোলে সে। মঞ্জুষা সঞ্জয়কে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গেলে সঞ্জয় সেই প্রতিরোধকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে একে একে মঞ্জুষার বক্ষদ্বয়ে ও উদরে চুম্বনচিহ্ন আঁকতে আঁকতে নেমে আসে মঞ্জুষার নাভিমূলের উপর। সঞ্জয়ের এই অচেনা আদরের সুখে ভাসতে ভাসতে গোঙাতে থাকে মঞ্জুষা। ওর ফরসা সরু আঙুলগুলো সঞ্জয়ের মাথায় বিলি কেটে বেড়ায়। 

নাভিমূল আর তলপেটে আদরের চিহ্ন এঁকে দেওয়ার পর উরুসন্ধিতে নামার আগে একপলক মঞ্জুষার দিকে তাকায় সঞ্জয়। দেখে মঞ্জুষা কামাতুর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেও হাসতে হাসতে দুদিকে মাথা নেড়ে বলছে, “ডোন্ট ‌‌ইভেন থি‌ঙ্ক অ্যাবাউট ইট! আই অ্যাম গনা কিল ইউ!” সঞ্জয় দুষ্টুহাসি হেসে বলে ওঠে, “আই ডোন্ট কেয়ার!” তারপর মঞ্জুষার কোনো আপত্তির পরোয়া না করে মুখ নামিয়ে দেয় উরুসন্ধির উপর। মঞ্জুষা আর সহ্য করতে পারে না। প্রথমে আদরের ঠেলায় বিছানায় মিশে গেলেও পর‌ক্ষণে দুহাতে খামচে ধরে সঞ্জয়ের মাথার চুল। প্রাণপণে সঞ্জয়কে সরানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে আত্মসমপর্ণ করে ক্রমশ সুখের সাগরে ভাসতে থাকে সে। সঞ্জয়ের পাগলপারা আদরে ক্রমশ থরথর করে কেঁপে ওঠে ওর সমগ্র দেহ। 

বাইরে তখন মেঘহীন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে সমস্ত চরাচর। সেই চাঁদের আলো কাঁচের জানলা বেয়ে প্রবেশ করেছে ওদের ঘরে। চারদিক নিস্তব্ধ হওয়ায় শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রবল গর্জন। জোয়ারের বলে বলীয়ান সমুদ্রের সফেন ঢেউগুলো একের পর এক আছড়ে পড়ছে বালুকাবেলার উপর। ভাবখানা এমন যেন প্রতি ইঞ্চিতে বুঝে নিতে চাইছে নিজের প্রাপ্য জমিটুকুকে। বদ্ধ ঘরের ভেতরের অবস্থাও তথৈবচ। তফাৎ এই যে এখানে সমুদ্রের পরিবর্তে দুজন মানুষ বন্য আদরের খেলায় মেতে ক্রমশ মেপে নিচ্ছে পরস্পরকে। আদরের প্রবলতায় ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে পরস্পরকে। মঞ্জুষার সুতীক্ষ্ণ নখের আচড়ে সঞ্জয়ের কাঁধ, বাহু, পিঠ যেমন ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনই সঞ্জয়ের উগ্র বর্বর আদরে মঞ্জুষার কণ্ঠায়, চিবুকে ক্রমশ রক্ত জমাট বেঁধে সৃষ্ট হচ্ছে রক্তিম আল্পনা।

পাগলের মতো চুমু খেতে খেতে মঞ্জুষার ঠোঁটের উপর রীতিমতো অত্যাচার শুরু করে দেয় সঞ্জয়। মঞ্জুষাও ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নয়। সেও পাগলের মতো কামড়ে ধরে সঞ্জয়ের ঠোঁট। দুজনের ধারালো দাঁতের চাপে রক্ত বেরিয়ে এলেও দুজনের মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পরস্পরের ঠোঁটকে উন্মাদের মতো শোষণ করে চলে ওরা। পরম আবেশে চুমু খেতে খেতে সঞ্জয়ের পেশিবহুল দেহের উপর হেলান দিয়ে বসে মঞ্জুষা। মৃদু হেসে মঞ্জুষার ঠোঁটে, ঘাড়ে চুমু খেতে খেতে সঞ্জয় বলে চলে একান্ত গোপনীয় অথচ অশ্লীল মিঠেকড়া কিছু কথা যাতে জাগ্রত হয়ে ওঠে মঞ্জুষার দেহ। সেই সঙ্গে সঞ্জয়ের হাতদুটো পৌঁছে যায় মঞ্জুষার বক্ষে ও উরুসন্ধিতে। প্রবল বলিষ্ঠ হাতে সে মঞ্জুষার বক্ষে ও উরুসন্ধিতে তীব্র হস্তসঞ্চালন করতে থাকে। এতটা আদরের বহর আর বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না মঞ্জুষা। পাগলের মতো সঞ্জয়ের হাতে বন্দিনী হয়ে গোঙাতে থাকে সে। সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে যেতে থাকে তার শীৎকার। একসময় মঞ্জুষার সমগ্র দেহ তিরতির করে কেঁপে ওঠে। সঞ্জয়কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ক্রমশ রতিসুখে কুঁকড়ে ওঠে সে। সঞ্জয় মঞ্জুষার কপালে একটা চুমু খেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে অবলোকন করতে থাকে চাঁদের আলোয় নিজের স্ত্রীর অপরূপ সৌন্দর্যকে। একসময় সঞ্জয়ের দেহের উপর ভর দিয়ে এলিয়ে পড়ে মঞ্জুষার রতিক্লান্ত দেহটা। 
 
কিছুক্ষণ পর মঞ্জুষার শরীর থিতু হয়ে আসার পর সঞ্জয় মঞ্জুষার কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে জিজ্ঞেস করে, "আরো আদর চাই?" প্রত্যুত্তরে মঞ্জুষা মাথা নেড়ে সঞ্জয়ের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে গেলে সঞ্জয় বাধা দিয়ে বলে, "উহু! এভাবে নয়! ইফ ইউ ওয়ান্ট ইট, দেন ইউ মাস্ট বেগ ইট!” আদরের মাঝখানে আচমকা এই বাধা সহ্য করতে পারে না মঞ্জুষা। ওর ধৈর্যের বাঁধ ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে। সঞ্জয়ের কথায় আর থাকতে না পেরে সে কঁকিয়ে বলে ওঠে, “প্লিজ সঞ্জু! আই ওয়ান্ট ইট!”

- এভাবে নয়! সে আই ওয়ান্ট ইউ, আই লাভ ইউ! উই আর মেকিং লাভ জান, নট সেক্স! ধরে নাও বিয়ের পর এটাই আমাদের হানিমুন কাম দ্বিতীয় ফুলশয্যা। 

কথাগুলো শোনামাত্র মঞ্জুষা থমকে যায়। সত্যিই তো! ওরা যেটা করছে সেটা তো লাভমেকিং! লাভমেকিংয়ে পরস্পরের প্রতি প্যাশনেট হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ওরা তো সেরকম বিহেভই করছে না। বরং যেন পরস্পরের যৌনখিদে মেটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে! এই যে একটু আগে সঞ্জয় যে বন্য ‌আদরটা ওকে করল সেটার কি খুব দরকার ছিল? নর্মাল কাডলিং বা চুমুতেই তো কাজ হত! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সঞ্জয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকায় সে। সঞ্জয় আবার মৃদু গলায় বলে ওঠে, “কাম অন টেল মি জান? হোয়াট ইউ ওয়ান্ট?” 

চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে আসে মঞ্জুষার। এবার সে ধরা গলায় অস্ফুটে বলে ওঠে, “আই ওয়ান্ট ইউ, আই ওয়ান্ট টু এক্সপ্লোর ইউ! আই ওয়ান্ট টু মেক লাভ উইথ ইউ সঞ্জু!” 

মঞ্জুষার কন্ঠস্বর শুনে সঞ্জয় বোঝে অবশেষে মঞ্জুষা ধরা দিয়েছে। এটারই অপেক্ষা করছিল সে। মঞ্জুষার কথাগুলো শোনামাত্র সঞ্জয় মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুইয়ে দেয় ওকে। তারপর পরম আশ্লেষে চুমু ধীরে ধীরে প্রবেশ করে মঞ্জুষার ভেতরে। একটা অদ্ভুত শিহরনে কেঁপে ওঠে মঞ্জুষার সমগ্র শরীর।অনেকদিনের অনভ্যেসের ফলে প্রবেশের অভিঘাতে প্রথমে মঞ্জুষা চমকে গেলেও পরক্ষণে শীৎকার দেওয়ার আগেই সঞ্জয় ওর ঠোঁটটা নিজের ঠোঁট দিয়ে বন্ধ করে দেয়। সঞ্জয়ের ঠোঁটের ভেতর নীরবে গোঙাতে থাকে মঞ্জুষা। সঞ্জয় দু’হাতে মঞ্জুষার দুটো হাত চেপে ধরে চুমু খেতে খেতে মনের সুখে রমন চালিয়ে যেতে ‌থাকে। মঞ্জুষার সারা শরীর জুড়ে ‌আনন্দের বন্যা বয়ে ‌যায়। সে প্রাণপণে উপভোগ করতে ‌থাকে সঞ্জয়ের জান্তব আদরটাকে। অনেকক্ষণ ‌এভাবে রমন করার পর একসময় সঞ্জয়ের শরীর ক্লান্ত হয়ে এলে মঞ্জুষা সঞ্জয়কে পাশ ফিরিয়ে দিয়ে ওর উপর চড়ে বসে মঞ্জুষা। তারপর চুমুতে, আচড়ে ভরে দিতে থাকে সঞ্জয়ের সমগ্র শরীরটাকে। সঞ্জয় পাল্টা আদরে উত্তেজিত করে তোলে মঞ্জুষাকে। তার বলিষ্ঠ হাতের আঙুলগুলো খেলা করে বেড়ায় মঞ্জুষার দেহের প্রতিটা ভাঁজে। সেই আদরে আত্মহারা মঞ্জুষা অস্ফুটে শীৎকার দিয়ে ওঠে।মঞ্জুষার মিঠে রিনরিনে কন্ঠে শীৎকার শুনতে‌ শুনতে জাগ্রত হয়ে ওঠে সঞ্জয়ের পৌরুষ। উন্মত্ত প্রেমিকের মতো সে আদরে আদরে ভরে তোলে মঞ্জুষার সমগ্র দেহটাকে। সমগ্র ঘরে সমুদ্রের গর্জনের সাথে ভেসে বেড়াতে থাকে আদরে আদরে পাগলিনী হওয়া মঞ্জুষার শীৎকার আর ওদের মধ্যে চলা অশ্লীল কথাবার্তা। আবেগে চোখ বন্ধ হয়ে ‌আসে মঞ্জুষার। একসময় ক্লান্ত হয়ে মঞ্জুষা বিছানায় এলিয়ে পড়লেও সঞ্জয় প্রবলভাবে রমন চালিয়ে যেতে থাকে। 

এইভাবে অনেকক্ষণ পর আদর শেষে মঞ্জুষার ভেতরে নিজেকে সম্পুর্ণভাবে নিঃশেষ করার পর সঞ্জয়ের অবসন্ন দেহটা মঞ্জুষার পাশে এলিয়ে পড়ে। ক্লান্ত বিধ্বস্থ মঞ্জুষা সঞ্জয়ের হাতের আঙুলগুলো নিজের হাতে নিয়ে অস্ফুটে বলে ওঠে, “থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ ফর বিইং উইথ মি। লাভ ইউ জান!” প্রত্যুত্তরে সঞ্জয় মঞ্জুষাকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে বলে, "লাভ ইউ টু জান!" উরুসন্ধির মৃদু যন্ত্রণা ছাপিয়ে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে মঞ্জুষার সমগ্র শরীরে। ওর চোখের কোল বেয়ে বেরিয়ে আসে এক ফোঁটা অশ্রু।
 
*****

এক সপ্তাহ পর শট শেষে সকলের হাততালিতে ফেটে পড়ে গোটা সেট। দুর্দান্ত নেচেছে আজ মঞ্জুষা। সকলে তো বটেই এমনকি কোরিওগ্রাফারও মানতে বাধ্য হয়েছেন মেয়েটার মধ্যে ট্যালেন্ট ‌আছে। নাহলে একসপ্তাহ ‌আগেও যে মেয়ে নাচতে গিয়ে স্টেপ ভুল করছিল সেই মেয়েটা আজ প্রত্যেকটা স্টেপ নির্ভুলভাবে করেছে। লা‌ঞ্চটাইমে ওর সহকর্মী ঐশিকা ওকে নিভৃতে জিজ্ঞেস করে, “ব্যাপারটা কি বলতো? একসপ্তাহের মধ্যে এমন কি হল যে এত অসুস্থ মেয়েটা হঠাৎ সুস্থ হয়ে গেল? কী এমন টনিক দিল সঞ্জয়দা যে এনার্জি কমছেই না? সিক্রেটটা কি বস?” 

সারাদিন ধরে নাচার ফলে ক্লান্ত মঞ্জুষা ঐশিকার দিকে তাকায়। তারপর গত সপ্তাহের ট্রিপের কথা ভাবতে ভাবতে মুচকি হেসে চোখ টিপে রহস্যভরা গলায় বলে ওঠে , “ম্যাজিক!” 

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

বিদায়













“চল ভাগ! দূর হ এখান থেকে মুখপোড়ার দল! খেয়ে দেয়ে কাজ নেই সকাল সকাল বিরক্ত করতে চলে এসেছে! যত্তসব! ধরতে পারলে তোদের ষষ্ঠীপুজো করে দেবো!” কথাগুলো বলতে বলতে বেত হাতে মুর্তিগড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। অবশ্য যাদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা তারা নগেনখুঁড়োর ঘর থেকে বেরোবার আগেই বেপাত্তা। তারা সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে চটিয়ে দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে। আমি বাইকে চেপে বাজার সেরে ফিরছিলাম। সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে একপাল ছেলেপুলে তাড়া করতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।

- ব্যাপারটা কী খুঁড়ো? সাতসকালে মেজাজ চড়ে আছে কেন? কিছু করেছে নাকি ওরা?

- করেছে তো! সেই মহালয়ার দিন থেকে আমার বাপের মুণ্ডুপাত করে যাচ্ছে হতভাগার দল। রোজ সকালবেলা এসে বাবুদের মতো গলা করে বলবে ‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো? নাকি এবারও কলকাতা থেকে মুর্তি আনাতে হবে?’ একবার ভেবে দেখো দেখি ছোটোবাবু, এটা কি মানা যায়? মানছি একটু বুড়ো হয়েছি, আগের মতো আর তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সাড়তে পারি না। তাই বলে এত হেলাচ্ছেদ্দা করবে আমাকে? ওরে তোদের বাপ-পিতেমোর আমল থেকে মাতৃপ্রতিমা গড়ছি রে! আজ পর্যন্ত তারাও সাহস পায়নি এই কথা বলতে। আর তোরা সেদিন জন্মানো ছেলেপুলের দল কিনা আমার, নগেন পালের কাজ নিয়ে সন্দেহ করিস?

ঘটনাটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমার। ইদানিং কয়েক বছর ধরে নব্য বাঙালী প্রজন্মের এক রোগ ধরেছে। অবশ্য এ রোগ আমাদের বেলাতেও পুরোদস্তুরভাবে ছিল। এমনকি আমি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত। রোগটা তেমন ভয়াবহ না হলেও হেলাফেলার রোগ নয়। রোগটার নাম ‘ফেলুম্যানিয়া’। অত্যাধিক ফেলুদা পড়লে বা ফেলুদার সিনেমা দেখলে এই রোগ চাপে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে ফেলুদা ভাবতে শুরু করে। কেউ কেউ নিজেকে তোপসে, জটায়ুও ভেবে ফেলেন। এই রোগের দুটো ভাগ আছে। প্রথম ভাগে রুগী নিজের চারপাশে রহস্যের গন্ধ পায়। সব কিছুকে গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। পরের ভাগ হল নিজেকে ফেলুদা ভেবে পর্দার মানে সিনেমার ফেলুদার মতো কায়দা করা। এই দ্বিতীয় প্রকারের রুগীরা কথায় কথায় ‘কিছু ভালো লাগছে না রে তোপসে’, ‘আমি হয় এর বদলা নেব নয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব’, ‘আছে! আছে! আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে!’, ‘মগজাস্ত্র’ বলে বেড়ায়। পুজোর আগে অবশ্য আরেকটা নতুন বাক্য যোগ হয়, ‘‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো?” বুঝলাম নগেনখুঁড়োকে ওরা ফেলুদার স্টাইলেই জিজ্ঞেস করে চটিয়েছে। হাসতে হাসতে বললাম, “ও তুমি কিছু মনে কোরো না। বুঝতেই পারছো ছেলেমানুষ, তোমার সাথে একটু মজা করে ফেলেছে। আচ্ছা বেশ, আমি নাহয় ওদের দেখতে পেলে বকে দেব।”

- মজা করেছে! নিকুচি করেছে মজার! ঠাকুর দ্যাবতাকে নিয়ে মজা এই নগেন পাল সহ্য করবে না। একবার ওদেরকে বাগে পাই! মজা ঘুচিয়ে দেব!

- আচ্ছা বেশ তাই হবে। আপাতত তুমি ঘরে যাও খুঁড়ো। তোমার মেলা কাজ পড়ে আছে। কালকের মধ্যে ঠাকুর দিতে হবে তো নাকি? কালকের মধ্যে দালানে ঠাকুর না এলে বড়দা আমাদের আস্ত রাখবে না। আমার কথাতেই বড়দা এই শেষবারের মতো তোমাকে সুযোগ দিয়েছে। আমার মুখ রাখতে হবে তো?

কথায় কাজ হল। নিজের রুদ্রমুর্তি সম্বরণ করে বিড়বিড় করে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “তোমাদের কাজই তো করতে যাচ্ছিলুম। হতচ্ছাড়া ছেলেপুলের দল সকাল সকাল মেজাজটাই বিগড়ে দিলে। নাহলে এতক্ষণে অর্ধেক সাজ সারা হয়ে যেত আমার। যাকগে এসে যখন পড়েছ তখন দেখে যাও মায়ের সাজখানা।” বলে আমার হাত চেপে ধরতেই হেসে বললাম, “তা কী করে হয়? আজ যে পঞ্চমী! বোধনের আগে শিল্পী ভিন্ন আর কারো যে মায়ের মুখ দেখার অধিকার নেই! তার চেয়ে বরং বেলা থাকতে থাকতে কাজ সেরে ফেলো। আমি একেবারে কাল ভোরবেলা মাকে নিয়ে ঠাকুরদালানে বসিয়ে দুচোখ ভরে দেখবো। আজ একটু তাড়া আছে। আমি বরং আসি?” বলে বাইক স্টার্ট করে নগেনখুঁড়োকে ছেড়ে এগিয়ে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইড মিররে তাকিয়ে দেখলাম। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চারদিকে একবার বাজপাখির মতো শ্যেনদৃষ্টি বুলিয়ে ধুতির কোঁচড় থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে একটা বিড়ি ধরিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার ঢুকে পড়লেন মুর্তিগড়ার ঘরে। আমি মুচকি হেসে বাইকের স্পিড বাড়ালাম।

নগেন খুঁড়ো মানুষটা এমনি ভালো হলেও স্বভাবগত ভাবে একটু ক্ষ্যাপাটে। ইদানিং খিটখিটে ভাবটা বেশ বেড়েছে। তবে কথার মানুষ। কথা দিলে কথা রাখেন। বংশানুক্রমিক ভাবে আমাদের মানে সামন্তবাড়ির পুজোর মাতৃপ্রতিমা ওনারাই গড়ে আসছেন। প্রায় চারশো বছরের পুজো আমাদের। আশেপাশের গাঁয়ের থেকে লোকে মাতৃপ্রতিমা দেখতে, পুজোর ভোগ খেতে আসে। শুনেছি  এককালে নাকি আমাদের পুজোতে অষ্টমীর দিন মহিষবলি হত। আগেকার দিনে আমাদের পুর্বপুরুষরা নিজে হাতে বলি দিয়ে মহিষ উৎসর্গ করতেন। আশেপাশের গাঁয়ের লোকেরা ভীড় করে দেখতো বলি। এখন অবশ্য কুমড়ো বলি ছাড়া আর কিছু হয় না। আর আগেকার দিনের মতো জমিদারী থাকলেও সেটা খাতায়-কলমে। বাস্তবে এখন তার প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। থাকার মধ্যে শুধু একটা পুরোনো প্রাসাদের মতো একটা দালানকোঠা বাড়ি আর একটা বাগান আছে।

এই বাড়ি তথা জমিদারীর শরিক বলতে গেলে পাঁচজন। চারভাই ও এক বোন। আমি সবার ছোটো। তবে সকলেই যে এ বাড়ির বাসিন্দা তা নয়। থাকার লোক ধরতে গেলে আমি, সেজদা, সেজোবৌদি, বড়দা আর বড়বৌদি থাকি। আর থাকে চারটে দুষ্টু বাঁদর। যারা বছরে বেশিরভাগ সময় হোষ্টেলে থাকলেও ছুটিতে এলেই গোটা বাড়িজুড়ে দাঁপিয়ে বেড়ায়। বাকিরা সকলেই দেশে-বিদেশে সেটলড।

বড়দার কাছে শুনেছি নগেনখুঁড়োর বাবা নাকি ছিলেন যাকে বলে জাত শিল্পী। পাথর হোক বা কাঠের টুকরো, নিখুঁত নৈপুণ্যে খোঁদাই করে মুর্তি বানাতে পারতেন তিনি। ঠাকুর্দার পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিনিকেতন থেকে শিখে এসেছিলেন ফাইন আর্টস এর একাধিক ফর্ম। শিখিয়েছিলেন নগেনখুঁড়োকেও। যদিও সবই শোনা কথা। জ্ঞানত নিজের চোখে কোনোদিন নগেনখুঁড়োকে পাথর, কাঠ খোঁদাই করতে দেখিনি। তবে হ্যাঁ ভদ্রলোক যে তার বাবার মতোই জাত শিল্পী সেটা বুঝেছি তার তৈরী প্রতিমা দেখেই। ওরকম দরদ দিয়ে মাতৃপ্রতিমা তৈরি করতে সবাই পারেন না। মাতৃপ্রতিমা নির্মাণে নবরস কথাটা মাথায় রাখা ভীষণ দরকারী। সাধারণত আমরা বাড়িতে যে দেবী দুর্গার পুজো করি তা মাধুর্য্য আর মমতায় ভরা মাতৃপ্রতিমা। ইনি গৃহের কন্যা রূপে পুজিতা হন। এক্ষেত্রে শান্ত ও শৃঙ্গার রসের ভঙ্গিমা ফুটিয়ে তুলতে হয়। আজকাল যে সব প্রতিমা আমরা দেখে থাকি পুজো প্যান্ডেলে, তাতে এই দুই রস থাকে না। থাকে ক্রূর যোদ্ধৃ রূপ। যেটায় ব্যবহৃত হয় রৌদ্র ও বীর রস। এই মাতৃপ্রতিমা পুজিত হয় দেবী রূপে। আশ্চর্যের ব্যাপার প্রতিবার নগেনখুঁড়ো যখন মাতৃপ্রতিমা গড়েন এই চারটে রস একসাথে মিশিয়ে প্রতিমার মুখ তৈরী করেন। মানে আমাদের বাড়ির মাতৃপ্রতিমা দেখলে যেমন মন ভরে আসবে ঠিক তেমনই সম্ভ্রমও জাগ্রত হবে। আর এই জিনিসটার কোনো বছরই নড়চড় হয় না। অন্য কোনো শিল্পী হলে একটা বা দুটো রসের প্রভাব হয়তো কম বেশী হতে পারে কিন্তু নগেনখুঁড়োর কোনোবার এই ভুল হয় না। প্রতিবার একইরকম পারফেক্ট মুখ বানান নগেনখুঁড়ো। তবে এইবার বড়দা নগেনখুঁড়োকে আর মাতৃপ্রতিমার বরাত দিতে চাননি। আসলে একমাত্র মেয়ে ফুলির মৃত্যুর পর নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোটা ইদানিং ভীষণ বেড়ে যাওয়ায় বড়দা চাননি কাজটা নগেনখুঁড়ো করুন। কে জানে মাতৃপ্রতিমা গড়তে গিয়ে কিছু ক্ষ্যাপামো বসলে যদি পাপ লাগে? অবশ্য আশঙ্কাটা অমূলক নয়। মাঝে মাঝে অল্পবিস্তর ক্ষ্যাপামো করে থাকলেও গত একবছর ধরে নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোর বহরটা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। দিনরাত কথা নেই বার্তা নেই শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন। কখনো সারারাত ধরে গোটা গ্রামের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন। কখনো বা রাস্তায় কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করতেন, “আমার ফুলিকে দেখেছ? দেখবে? ঐ দেখো আগুনে পুড়ছে!”

ফুলি, নগেনখুঁড়োর একমাত্র আদরের কন্যা। মা মরা মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসতেন নগেনখুঁড়ো। বা বলা ভালো চোখে হারাতেন। ফুলিও যাকে বলে বাবা অন্ত প্রাণ ছিল। নগেনখুঁড়ো বড়ো সাধ ছিল ফুলি যাতে তার ঠাকুর্দার মতো বড়ো শিল্পী হয়। সেইমতো নিজে হাতে তাকে শিখিয়েছিলেন মাতৃপ্রতিমা গড়া। টাকা জমিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষার জন্য। মেধাবী ফুলি ক্রমে স্কুল পাশ করে পা রেখেছিল কলেজের দোরগোড়ায়। ইচ্ছে ছিল শিক্ষা শেষে বাবার পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। কলেজে ভর্তি হবার বছর তিনেকের মধ্যেই এক ছেলের প্রেমে পড়ে গেল ফুলি এবং অবশেষে একদিন কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলল। মেয়ের এই হঠকারিতায় প্রথমে রাগ করলেও পরে মেনে নিয়েছিলেন নগেনখুঁড়ো। কাছে ডেকে নিয়েছিলেন মেয়ে-জামাতাকে। বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বিয়ের সাতমাস পর পুজোর সময় গ্রামে স্বামীর সাথে ফুলি ফিরেছিল ঠিকই, তবে সশরীরে নয়। ওরা ফিরেছিল মৃত্যুসংবাদ হয়ে। বিয়ের পর শান্তিনিকেতনেই ছোটো একটা সংসার পেতেছিল ফুলি। স্বামীকে নিয়ে একসাথে কলেজের পড়াশুনো ও সংসার চালিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটছিল তার। কিন্তু বিধাতার মনে হয়তো অন্য ইচ্ছে ছিল। এক ঝড়-জলের রাতে কলেজ থেকে ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল ফুলিরা। ঝড়ের কারণে ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রবল বিদ্যুৎপ্রবাহ ওদের সমগ্র চেতনাকে অসাড় করে প্রাণহীন মৃতদেহে পরিণত করতে একমুহূর্তও সময় নেয়নি। খবরটা পাওয়ার পর সমগ্র গাঁয়ের পুজোর আনন্দ একমুহূর্তে বদলে গিয়েছিল দশমীর বিষাদে।

একমাত্র মেয়ের মৃত্যু সহজে মেনে নিতে পারেননি খুঁড়ো। ফুলির মৃত্যুর পর থেকেই মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থর মতো আচরণ করতেন। একবার তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। ভাগ্যিস গাঁয়ের ছেলেরা দেখতে পেয়ে রক্ষা করে তাকে। তারপর থেকে অপ্রকৃতিস্থ ভাবটা কমলেও মাঝে মাঝে প্রলাপ বকতেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই এরকম শোকে প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া মানুষের হাতে প্রতিমা তৈরীর ভার দিতে চাননি বড়দা। তাই প্রতিবারের মতো এইবারও রথযাত্রার দিন যখন নগেনখুঁড়ো বরাত নিতে এলেন তখন তাকে একপ্রকার বুঝিয়ে বিদায় করে দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু নগেনখুঁড়ো নাছোড়বান্দা। তিনি কিছুতেই বরাত না নিয়ে যাবেন না। অবস্থা যখন চরমে উঠলো তখন আমাদের বাকি ভাইদেরও নামতে হল আসরে। অবশেষে ঠিক হল নগেনখুঁড়োই আমাদের পুজোর প্রতিমা তৈরী করবেন তবে পঞ্চমীর মধ্যে সম্পুর্ণ ঠাকুর তৈরী করে দিতে হবে। নগেনখুঁড়ো বড়দার শর্তে রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন এবার তিনি ঠাকুরদালানে মাতৃপ্রতিমা তৈরী করবেন না। মাতৃপ্রতিমা তৈরী হবে তার বাড়িতে। ষষ্ঠীর দিন ভোরে আমরা চার ভাই গিয়ে তার বাড়ি গিয়ে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে আসবো। শর্ত অনুযায়ী কালকে ভোরবেলা আমাদের আসার কথা। সেই কারণে আজ এসেছিলাম নগেনখুঁড়োকে তাগাদা দিতে। এবার এখানকার খবর বড়দাকে বলে দিলেই ছুটি আমার।

                                                  *****

আজ ষষ্ঠী। আরেকটু পরেই মায়ের বোধন শুরু হবে। জগন্মাতা চারদিনের জন্য আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে যাবেন। সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট ভুলে আমরা মেতে উঠবো তাকে নিয়ে। দেখতে দেখতে চারটে দিন যে কোনদিক দিয়ে কেটে যাবে বোঝা যাবে না। তারপর চারদিন পরে আমাদের সবাইকে ছেড়ে উমা আবার পাড়ি দেবেন কৈলাশে। সেই মতো শর্ত অনুযায়ী আজকে নগেনখুঁড়োর কাছ থেকে মাকে নিয়ে আসার কথা আমাদের। তাই আমরা চারভাই ভ্যানরিক্সা আর ঢাকি নিয়ে উপস্থিত হয়েছি নগেনখুঁড়োর বাড়িতে। কিন্তু ঘরের চারপাশের পরিবেশ এত নিস্তব্ধ কেন? একটা পাখিও ডাকছে না। মনে হচ্ছে যেন একরাশ শোক নেমে এসেছে বাড়িটায়। সাধারণত নগেনখুঁড়ো ভোরে ওঠার মানুষ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যেন তার ঘুম ভাঙেনি। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অন্যদিন তো এরকম হয় না। তাহলে আজ কী হল? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ডাক দিলাম আমি।

বেশ খানিকক্ষণ হাঁকডাক করার পর দরজা খোলার শব্দ হল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার? সেই আগের মতো আলুথালু উন্মাদবেশ, ক্ষ্যাপাটে চাহনি, সারা শরীরে কাদামাটি মাখানো। কই কাল সকালে তো এতটা খারাপ অবস্থা দেখিনি! তবে কি আবার সেই ক্ষ্যাপামোটা ফিরে এলো? উঠোনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঈষৎ ঘোলাটে অথচ মরামাছের মতো ঠাণ্ডা এবং শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম খুঁড়োকে এভাবে দেখে বড়দাও খানিকটা বিব্রত হয়ে গেছেন। মেজদা, সেজদার অবস্থাও তথৈবচ। অগত্যা আমাকেই হাল ধরতে হল। খানিকটা গলা খাঁকড়ে বললাম, “বলছিলাম যে…ইয়ে মানে… আমরা আমাদের ঠাকুর নিতে এসেছি।” কথাটা শুনে শূন্যদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন নগেনখুঁড়ো। তারপর মৃদু হেসে ইশারা করলেন পিছু নিতে। তারপর এগিয়ে চললেন নিজের মুর্তি গড়ার ঘরের দিকে। প্রথমে অবাক হলেও একে একে আমরা চারভাই ওনার পিছু পিছু প্রবেশ করলাম মুর্তি গড়ার ঘরে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। বাইরে থেকে একফোঁটা আলো আসার জো নেই। ঘরের ভেতরে ঢুকে আমরা চারজন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় নগেনখুঁড়ো ঘরের আলোটা জ্বাললেন। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘর আলোয় ভরে গেল, আর আমরা চারভাই সেই আলোয় মুগ্ধ হয়ে দেখলাম মাতৃপ্রতিমাকে। হ্যাঁ, অপ্রকৃতিস্থ, ক্ষ্যাপা, সন্তানশোকে কাতর হলেও নগেনখুঁড়োর শিল্পীস্বত্তার অবনতি বিন্দুমাত্র হয়নি! প্রতিবারের মতো এবারও দারুণ মাতৃপ্রতিমা তৈরী করেছেন তিনি। বরং বলা ভালো এবারের মাতৃপ্রতিমা ছাপিয়ে গেছে নগেন খুঁড়োর আগের সব সৃষ্টিকে। বড়দাকে দেখলাম হাত জোড় করে প্রণাম জানাচ্ছেন মাতৃপ্রতিমার উদ্দেশ্যে।

প্রতিমা ভ্যানরিক্সায় তুলে বড়দা মেজদা আর সেজদা রওনা হলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি থেকে গেলাম প্রতিমার দাম মেটাতে। প্রতিমার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “কি? বলেছিলাম না? পঞ্চমীর আগেই প্রতিমা তৈরী করে দেবো? করে দিলাম তো? এই নগেন পালের কথার নড়চড় হয় না ছোটোবাবু! সে যা বলে, করে দেখায়!”

আমি হেসে বললাম, “সে কি আর আমি জানি না? সেই কারণেই তো বড়দার হাজার আপত্তির পরেও তুমিই বরাতটা পেলে। যাক গে! সে সব কথা ছাড়ো। প্রতিমার দামটা ধরো।”

কথাটা শুনে মৃদু হাসলেন খুঁড়ো। তারপর প্রায় অস্ফুটে বলে উঠলেন, “দাম? কীসের দাম ছোটোবাবু? বাবারা কি মেয়েদের বিদায় করার সময় দাম নেয় নাকি?”

- সে কি কথা! তোমার পরিশ্রম, তোমার কাজের দাম নেবে না?

- আমার আর ওসবে মোহ নেই গো ছোটোবাবু। মায়ের কৃপায় দুবেলা দুমুঠো জুটে যায় এই অনেক। ও আমি নেব না। বরং তার বদলে একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে। দেবে? বলো ছোটোবাবু দেবে?

পুবের আকাশ ক্রমশ ফরসা হয়ে আসছে। সেই আলোতে দেখতে পেলাম নগেনখুঁড়োর চোখের দৃষ্টি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। তবে সেই আগের মতো শূন্য মরা মানুষের মতো দৃষ্টি নেই বরং তার জায়গায় এসে জমেছে একরাশ আকুতি আর কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

দূরে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে বড়দারা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের বাড়ির দিকে। ভ্যানরিক্সার আগে ঢাকি প্রবল জোরে ঢাক বাজাতে বাজাতে সমগ্র গ্রামকে জাগিয়ে মায়ের আগমনবার্তা জানিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো অস্ফুটে বলে উঠলেন, “ভাসানের পর প্রতিমার কাঠামোটা আমার চাই। দেবে? দেবে আমাকে? আসলে আমার ফুলিকে তো আর আটকে রাখতে পারলাম না। এই প্রতিমার কাঠামোকেই নিজের কাছে রেখে দেবোখন? নিজে হাতে গড়া প্রতিমা, নিজেরই মেয়ের মতোই তো নাকি? পুজোর চারটে দিন নাহয় তোমাদের কাছে পুজো পেল, বাকিটা সারা বছর আমার কাছে থাকবে। বলো ছোটোবাবু? দেবে তো?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “বেশ! দেবো।”


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...