সারা রাত বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটানোর পর একসময় বিরক্ত হয়ে বিছানায় উঠে বসল মীরা। মাথাটা বড্ড ধরেছে। স্যারিডনের স্ট্রিপটা সাইড টেবিলেই রাখা ছিল। পাশ ফিরে একটু হাতড়ে নিয়ে সাইড টেবিলের আলোটা জ্বালাল সে। তারপর স্ট্রিপ থেকে একটা ট্যাবলেট বের করে মুখের ভেতর চালান করে হাতের কাছে রাখা জলের বোতল থেকে দুই ঢোক জল খেয়ে বিছানার ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে বসল। বালিশের পাশ থেকে স্মার্টফোনটা বের করে দেখল ভোর পৌনে চারটে বাজে। আরেকটু পরেই সকাল হয়ে যাবে। গোটা ঘরের জানলাগুলো মোটা পর্দায় ঢাকা বলে বাইরের আলো বোঝা যাচ্ছে না। তারমানে প্রতিবারের মতো এইবারও বেড়াতে এসে প্রথমদিন প্রায় গোটা রাত জেগে কাটিয়ে দিল সে! উফ! আবার সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল! প্রতিবার কোথাও বেড়াতে গেলে মেয়েবেলার এই এক বদঅভ্যেস গোটা ট্রিপের বারোটা বাজিয়ে দেয়।
ছোটোবেলা
থেকেই কোথাও বেড়াতে গেলে বাকিরা পথের জার্নিতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমে ঢলে পড়লেও
মীরার কিছুতেই ঘুম আসে না। বাকিদের মতো পথশ্রমে সেও ক্লান্ত হয় ঠিকই, কিন্তু বিছানায়
শোয়া মাত্র ঘুম উবে যায় তার। তারপর সারারাত ধরে বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে
প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে থাকে সে। ঘুমের ওষুধ, আরো অন্যান্য
পদ্ধতি ট্রাই করে দেখেছে, কিন্তু কিছুতেই কোনো লাভ হয়নি।
হাজার চেষ্টা করেও বাইরে বেড়াতে এসে মীরা কিছুতেই ঘুমোতে পারে না। অথচ এই সারারাত
জেগে থাকার জ্বালা পরদিন সে হাড়ে হাড়ে টের পায়। অসম্ভব মাথা ধরা, সারা দিন ঢুলতে থাকা, ক্লান্তিভাব সব একে একে
জাঁকিয়ে বসে তার শরীরে। ফলে ট্রিপে এসে এঞ্জয় করার বদলে ওকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত
হয়ে পড়ে সবাই। একবার তো অদ্রীশের সাথে গোয়া বেড়াতে গিয়ে গোটা ট্রিপটাই পণ্ড
হতে বসেছিল!
এইসব কারণেই আজকাল বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে মীরা। বন্ধুবান্ধবদের
কেউ বেড়াতে যাবার প্ল্যান করে ওকে ডাকলে শরীর খারাপ বা কাজের চাপের দোহাই দিয়ে
এড়িয়ে যায় সে। অথচ তার মানে এটা নয় যে সে বেড়াতে ভালোবাসে না। সকলের মতো সেও
চায় সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গিয়ে হইহই করে স্নান করতে, বিকেলে
সমুদ্রের তীরে বসে ঢেউ গুনতে, ভেজা বালির উপর প্রিয়
মানুষের সাথে পায়ে পায়ে হাটতে, কিংবা পাহাড়ের কোনো বেনামী
হোমস্টে-তে কাছের মানুষটার সাথে এক কম্বলের ভেতর গায়ে গা ঠেকিয়ে পরস্পরের
শরীরের ওম মেখে বসে থাকতে, কোনো হিল স্টেশনের কুয়াশামাখা
রাস্তায় পরস্পরের হাত ধরে হাটতে। সেও চায় বেড়াতে গিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ
করতে। কিন্তু বেড়াতে এসে যদি অসুস্থ হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে থাকার
জন্য ট্রিপটাই মাটি হয়ে যায় তাহলে বেড়াতে আসার মানেটাই বা কী?
সত্যি
কথা বলতে গেলে এবারের ট্রিপেও ওই সারারাত জেগে থাকার ভয়ে মীরার সায় ছিল না। অদ্রীশই
ওকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে এসেছে। প্রথম প্রথম অদ্রীশের উপর রাগ হলেও এখানে পৌঁছে
আশেপাশের দৃশ্য দেখার পর মীরার মত পাল্টে গেছে। এখানে না এলে সত্যিই শরৎকালের
পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটা মিস করে যেত ওরা।
কথাগুলো
ভাবতে ভাবতে মীরা পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পাশে অদ্রীশ উপুড় হয়ে শুয়ে ওর দিকে
মুখ করে শুয়ে আছে। মুখ আলতো হা করে খোলা। সারা মুখে সিঁদুর মেখে যাওয়ার ফলে
দাঁড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখটা দেখতে একটু অদ্ভুত লাগলেও মীরা খেয়াল করে মুখটায় একটা
প্রশান্তির ছাপ নেমে এসেছে। হাল্কা শ্যামবর্ণ মসৃন পিঠে, বাহুতে কাল রাতের
আদরের প্রতিদান রূপে নখের আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট। কিছুক্ষণ অদ্রীশের
ঘুমন্ত মুখটার দিকে অপলকে তাকিয়ে আনমনে হেসে ফেলে মীরা। তারপর কম্বল দিয়ে ঢেকে
দেয় অদ্রীশের নিরাবরণ দেহটাকে। তারপর একটা আড়মোড়া ভেঙে বিছানা থেকে নেমে নগ্ন
অবস্থাতেই আলতো পায়ে এগিয়ে যায় বাথরুমের দিকে।
বাথরুমের
আলো জ্বালিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে একই সাথে লজ্জা আর আনন্দের অনুভূতি হল মীরার। কাল
রাতের আদরে সে যেমন আহত বাঘিনীর মতো অদ্রীশকে ক্ষতবিক্ষত করেছে, অদ্রীশও তাকে
অক্ষত ছাড়েনি। আদরের সময় ওর শরীরের সাথে
সাথে মনের ভেতরেও গভীর প্রেমের আঁচড়ের দাগ রেখে গেছে। প্রেমের এক মিঠেকড়া মরণসুখে ভরে দিয়েছে মীরার সমগ্র মনটাকে।
বন্য সোহাগে মাতিয়ে তোলার সাথে সাথে বুঝে নিয়েছে নিজের জমিটুকু। কণ্ঠা,
বুক আর পেট জুড়ে ভরিয়ে দিয়েছে অজস্র আদরের চিহ্নে অথচ একবারের
জন্যেও জান্তব হয়নি। বরং একজন বন্য প্যাশনেট প্রেমিকের মতো আদরে ভরে দিয়েছে।
এমনকি চরম মুহূর্তে সংযম হারাতে গিয়েও ওর কথা ভেবে পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে অদ্রীশ।
পরম আশ্লেষে মীরা নামের নদীতে অবগাহন করতে করতে নিজের সাথে
ভাসিয়ে নিয়ে গেছে মীরাকেও। প্রায় সারারাত ধরে একে অপরকে
তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেছে ওরা। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ভেসে গেছে দুজনে। কালরাতে
যে সুখ মীরা পেয়েছে সে সুখ বিয়ের এতগুলো বছরেও পায়নি। কালরাতের
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বর দিকে তাকিয়ে থাকে মীরা। ওর মনে
পড়ে যায় অদ্রীশের সাথে দেখা হওয়ার প্রথম দিনটার কথা।
*****
– ফার্স্ট ইয়ার?
– হ্যাঁ!
– কোন ডিপার্টমেন্ট?
– হিস্ট্রি।
– অ তাহলে আমাদের ডিপার্টমেন্ট দেখছি। তা নাম কী?
– মীরা, মীরা মজুমদার।
– বাঃ! নামটা তো সেরা! মীরা! তা মীরা, তোমার কোনো
কানাই বা শ্যাম আছে? নাকি কাঠসিঙ্গেল?
– ওসব কিছু নেই। আপনারা এভাবে আমাদের ইন্টারোগেশন করছেন কেন?
– উহু! একটু ভুল হল বোনটি! এটা ইন্টারোগেশন নয়,
ইন্ট্রোডাকশন। পাতি বাংলায় বলতে গেলে কলেজের সিনিয়ারদের সাথে
জুনিয়ারদের আলাপচারিতা আর একটু মজা করা। তা কী করানো যায় তোমাকে নিয়ে বলো তো?
এই অদ্রীশ? কী করানো যায় বল তো একে দিয়ে?
অনুষার
কথা শুনে বই থেকে মাথা তুলে মেয়েটার দিকে তাকায় অদ্রীশ। ছিপছিপে গড়নের, পাকা গমের মতো
গায়ের রং, চোখে চশমা, এক ঢাল কোঁকড়া
চুল খোপা করা। পরনে ফ্লোরাল চুড়িদার। হাতে একটা ডায়েরী আর কাঁধে একটা ব্যাগ
নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে একটা গম্ভীর অথচ বিরক্তভাব থাকলেও চোখে একটা
বুদ্ধিমত্তার ছাপ প্রকট। মেয়েটার দিকে একঝলক তাকিয়ে আবার বইতে মুখ গুঁজে অদ্রীশ
বলল, “নাম যখন মীরা, তখন একটা মীরার ভজন
গাইতে বল। আমরাও কেষ্ট নামে ধন্য হই। সারাদিন যা পাপ করি গঙ্গায় পুলপার্টি করলেও
ধোয়া যাবে না। তার থেকে এই ভালো। কেষ্ট নামে আজকের দিনের মতো পাপ থেকে মুক্তি
পাবো।”
কথাগুলো
শোনামাত্র ছেলেমেয়েগুলো হইহই করে উঠলেও পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠল
মীরার। আবার! আবার সেই এককথা! মেয়েবেলা থেকে এই নামটা ওর জীবন নরক করে দিল। কি
কুক্ষণেই যে ওর ঠাকুমা এ নামটা দিয়েছিলেন কে জানে? আর মাও
পারে! ছোটোবেলায় গানের স্কুলে ভর্তি করে মাস্টারদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন
অন্যান্য গানের সাথে মীরার ভজনটাও ভালো করে শেখাতে। বাড়িতে আত্মীয় এলে মীরার ভজন
গেয়ে শোনাও, পাড়ার ফাংশনে মীরার ভজন গাও, উফ! সারাজীবন ওর মীরার ভজন গাইতে গাইতে কেটে গেল! কেন ভাই! পৃথিবীতে কি আর
কোনো গান নেই? মীরার ভজনই শুনতে হবে? কথাগুলো
ভাবতে ভাবতে মীরা কটমট করে তাকাল ভজনের কথা তোলা ছেলেটার দিকে।
একরাশ
বাবরি চুল আর ঘন দাঁড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখ। পরনে চেক শার্ট আর ফেডেড জিনস,হাতে একটা মোটা বই
খোলা। ছেলেটা মাথা নামিয়ে একমনে বইটা পড়ছে আর আপনমনে হাসছে। যেন বাইরের জগতের
সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই। একটু আগে মেয়েটির ডাকে সাড়া দিয়ে নিজের মত প্রকাশ
করে যেন ফিরে গেছে নিজের জগতে। দেহের গড়ন মাঝারি, মানে
খর্বাকায়ও নয় আবার জিমে ডাম্বেল ভাজা দৈত্যাকারও নয়। রংটা হাল্কা শ্যামবর্ণর
দিকে। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও ছেলেটার আচরণ, শারীরিক
ভাষায় বোঝা যায় ছেলেটা সাধারণ নয়। অন্তত এই ragging করা
দলটার থেকে সে যে আলাদা এবং কিছুটা বিশেষত্ব যে ওর মধ্যে আছে সেটা প্রথম দেখাতেই
চোখে পড়ে। অবশ্য প্রথম দর্শনে মীরার এত কিছু নজরে পড়ল না। সে দেখল একরাশ
চুল-দাঁড়ির জঙ্গলে ঢাকা মুখওয়ালা কবি গোছের ছেলেটা ফস করে কথাটা বলে আবার বইয়ের
মধ্যে মুখ গুঁজে নিল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা সেটা দেখে বলে ওঠে, “ওদিকে তাকিয়ে আর কোনো লাভ নেই মামনি! অর্ডার দিয়ে উনি ওনার জগতে চলে
গেছেন। এবেলা আর ইহজগতে ফেরার চান্স নেই। গাইতে তোমাকে হবেই! চলো শুরু করো ওয়ান
টু থ্রি...!”
– এভাবে আপনারা আমাকে জোর করতে পারেন না! জানেন না ragging বেআইনি আর নিষিদ্ধ!
– জানি! আর জানি বলেই ইন্ট্রোডাকশনেই ইতি করছি। নাহলে অন্য কিছু দেখতে।
– আমি আপনাদের নামে HoD -এর কাছে কমপ্লেন করবো!
– বটে? তা কী বলবে? সিনিয়ার
দাদারা নাম জানতে চেয়েছে, একটু গান শুনতে চেয়েছে বলে তোমার
খারাপ লাগছে? সিরিয়াসলি? কোথাকার কোন
বড়ো শিল্পী হে তুমি? এত অ্যাটিটিউড
দেখাচ্ছো? নাও নাও শুরু করো!
– শুধু নাম জানতে চাইলে কিছু হতো না। আপনারা তো নাম শুনে ক্যারেক্টার জাজ
করে ragging করছেন।
– এই থামো তো! বড্ড বেশি ফ্যাচ ফ্যাচ করো তুমি! এত কথার কচকচানি ভালো লাগে
না আমাদের। চটপট শুরু করো নাহলে শাস্তি পেতে হবে!
– কী শাস্তি?
– সে দেখতেই পাবে! আগে শুরু করো! ওয়ান... টু... থ্রি...
সেবার
লেকচারার ক্লাসে চলে আসায় আর গান গাইতে হয়নি মীরাকে। তবে সেই দলটা সহজে ছাড়েনি
মীরাকে। প্রায় একবছর পর ইউনিভার্সিটি ফেস্টে মীরাকে দিয়ে ওর সম্মতিতেই গান
গাইয়ে তারপর থেমেছিল। ততদিনে অবশ্য দুটো দলের সম্পর্ক সিনিয়ার-জুনিয়ার থেকে
দাদা-দিদি আর ভাই-বোনের সম্পর্কে পরিণত হয়ে গেছে। সেই ক’টা বছর যেভাবে
কেটেছে তা কোনোদিন ভোলার নয়। আজ এতবছর পরেও সেদিনের কথা ভাবলে একটা মুচকি হাসি
খেলে যায় মীরার ঠোঁটে। ইউনিভার্সিটিতে সিনিয়াররা ওদেরকে গার্জেনের মতো আগলে
রেখেছিল। বিশেষ করে অদ্রীশ তো ওদের ব্যাচে
সকলের ফেভারিট ছিল। লাইব্রেরীতে সিলেবাসের জন্য রেফারেন্স দেওয়া দুস্প্রাপ্য বই
হোক, বা ক্যাম্পাসে বসে ইতিহাসের কোনো টপিকের উপর তর্ক,
এক্সকারশনে ঐতিহাসিক এলাকার ইতিহাস জানা হোক বা যাদুঘরে লম্বা
ট্যুর। অদ্রীশের সব জায়গাতেই নক্ষত্রের মতো জ্বলজ্বলে উপস্থিতি থাকত। এমনকি কোনো
টপিক নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ জাগলে সেটা নিয়ে অদ্রীশের কাছে
গেলেই জলের মতো বুঝিয়ে দিত সে। ইতিহাসের বিভাগে অদ্রীশ ছিল সমস্ত প্রফেসরদের
চোখের মণি। এতটাই যে পোষ্ট গ্রাজুয়েশনের পর অদ্রীশকে আর কাছ ছাড়া করতে চাননি
ইতিহাস বিভাগের প্রধান। রিসার্চ ফেলো হিসেবে প্রস্তাব দিয়ে ডিপার্টমেন্টে জয়েন
করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই থেকে অদ্রীশ রয়ে গেছে ইউনিভার্সিটিতেই।
পি.এইচ.ডি
শেষ করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ইউনিভার্সিটিতেই প্রফেসর হয়ে জয়েন করেছে। তখনও অবশ্য অদ্রীশের সাথে মীরার প্রেমালাপ জমে ওঠেনি।
ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বাকিদের
মতো ওর কাছেও অদ্রীশ শুধু অদ্রীশদা-ই ছিল।
প্রেমটা শুরু হয় মীরার ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে আসার
বছরপাঁচেক পরে।
একদিন
কী একটা কাজে সে বইপাড়ায় গিয়েছিল সে। কাজ সেরে ফেরার পথে কী মনে হতেই ঢুঁ মারল একটা
বইয়ের দোকানে। অবশ্য সেটাকে দোকান না বলে শোরুম বলাই ভালো। যে দিকে তাকাও থরে থরে
সাজানো বই। একদিকে প্রেমের উপন্যাস, তো অপরদিকে
ভৌতিক উপন্যাসের সম্ভার। কিছুক্ষণ সেই শোরুমে ঘোরাঘুরি করে নিজের পছন্দ মতো দুটো
ভৌতিক আর একটা থ্রিলার উপন্যাস বেছে নিল সে। তারপর বইগুলো নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে
বিল মিটিয়ে শোরুম থেকে বেরিয়ে এসে ট্যাক্সি ধরতে যাবে এমন সময় শুনতে পেল একটা
ভীষণ পরিচিত কন্ঠস্বর। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল কোমরে হাত দিয়ে অদ্রীশ তাকিয়ে আছে
একটা ছোটো বইয়ের দোকানের সামনে। মুখে একটা বিরক্তিকর ভাব স্পষ্ট। পাঁচবছরে একটু
মোটা হয়েছে। দাঁড়ি-গোঁফের বহরটা একটু কমেছে। মাথার বাবরি চুল পেছন দিকে পনিটেল
করে বাঁধা। বাকি সব একই আছে। এই পাঁচবছরে বিন্দুমাত্র বদলায়নি সে। মীরা অদ্রীশকে
দেখা মাত্র পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে ডাক দিতেই অদ্রীশ একবার এদিক
ওদিক তাকানোর পর পেছন ফিরে মীরাকে দেখতে পায়। তারপর একগাল
হেসে বলে, “আরে মীরাবাই যে! কী খবর?”
– এই চলে যাচ্ছে। তোমার খবর বলো। কী বই কিনলে?
– আর বই! যে বই আমি খুঁজছি তা এদের কাছে নেই।
– কী বই?
– সে আছে এক দুস্প্রাপ্য বই। অনেকদিন হল আউট অফ প্রিন্ট। এক দোকানে খোঁজ
করতে গিয়ে বলল এখানে পাওয়া যাবে। এসে শুনছি একটা লাস্ট কপি ছিল। কে যেন গতকাল
কিনে নিয়েছে। আর একটাও কপি নেই।
– এ বাবা! তাহলে কী হবে?
– কী আর হবে? ঐ অনলাইনে পিডিএফ খুঁজে পড়াতে হবে।
যাকগে ও কথা ছাড়, তোর কী খবর? কেমন
আছিস? কী করছিস? কী বই নিলি?
– সব কথা এখানেই বলবে? তার চেয়ে বরং চলো কোথাও গিয়ে
বসা যাক। মেঘ করে এসেছে। বৃষ্টি নামল বলে।
– সে যেতে পারি তবে খরচ আমি দেবো।
– না না! সে কী করে হয়?
– হয়! বেশি বকিস না তো! অনুষা ঠিকই বলতো, বড্ড ফ্যাচ
ফ্যাচ করিস তুই। এবার কথা না বাড়িয়ে চল দেখি। বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে।
কথাটা
বলে দুজনে মিলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসে দোকানের সামনে থেকে। তারপর হাটতে হাটতে
এগিয়ে যায় সদর রাস্তার দিকে।
সেদিনের
পর থেকেই অদ্রীশের সাথে প্রায়শই ফোনের মাধ্যমে কথা হত মীরার। কখনো কখনো সেই
কথোপকথন রাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত স্থায়ী হতো। মাঝে মধ্যে ইউনিভার্সিটির চাপ থেকে
মুক্তি পেলে মীরার সাথে দেখা করতে যেত অদ্রীশ। তখন দু'জনকে আর ফোনে পাওয়া যেত না।
বাইরের জগতের সাথে সব যোগাযোগ ছিন্ন করে দু'জনে নিজের মতো ঘুরে বেড়াতো গোটা
শহরজুড়ে। কখনো কোনো কফিশপে ধোঁয়া ওঠা কফির আমেজে মত্ত হয়ে হাতে হাত রেখে গল্প।
কখনো যাদুঘর, বইপাড়ায় হাতে হাত রেখে ঘোরা। কখনো বান্ধবীদের সাথে কাছেপিঠের আউটিং-এ
আচমকা অদ্রীশের আবির্ভাব। এভাবেই চলছিল ওদের প্রেমপর্বের দিনগুলো। তারপর একদিন অদ্রীশ
শহর ছেড়ে শান্তিনিকেতনে চলে আসায় সেই অভিসারেও ভাটা পড়ে। তবুও মাঝে মাঝে
বন্ধুবান্ধবদের সাথে বেড়াতে এলে অদ্রীশের সাথে ওর কোয়ার্টারে এসে দেখা করে যেত মীরা। কখনো বা বন্ধুদের সাথে, কখনো বা
একা। এরকমই একদিন বসন্তোৎসব উপলক্ষ্যে শান্তিনিকেতন বেড়াতে এসে জ্বর বাঁধিয়ে
বসেছিল সে। মীরার আজও মনে আছে সেই সন্ধ্যেটার কথা।
সেদিন
প্রচুর দোল খেলে, নাচে, গানে সারাদিন কাটানোর পর ক্লান্ত হয়ে
সিদ্ধির নেশায় চুর হয়ে ওর বন্ধুরা সকলে যখন লজে যে যার রুমে প্রবল ঘুমে আছন্ন,
সে সময় মীরা চুপিসারে লজ থেকে বেরিয়ে হাজির হয়েছিল অদ্রীশের কোয়ার্টারে। বেরোবার সময় অদ্রীশের সাথে দেখা করার উত্তেজনায় খেয়াল করেনি
ফাল্গুনমাসের সেই দুপুরে হঠাৎ আকাশ জুড়ে জড়ো হয়েছে একরাশ কালো মেঘ।
সেদিন অবশ্য মেঘ জমেছিল মীরার মনেও। ইদানিং একটি মেয়ের সাথে অদ্রীশের ঘনিষ্ঠতার
খবর মীরার কানে এসে পৌঁছেছিল। ব্যাপারটা সত্যি কিনা যাচাই করতেই বসন্তোৎসবে
শান্তিনিকেতন এসেছিল মীরা। মেয়েটাকে চিনে নিতে অসুবিধে হয়নি। তেমন আহামরি দেখতে
না হলেও একটা চটক আছেই মানতে হবে। তবে বড্ড বেশী গায়ে পড়া। আড়াল থেকে মীরা
দেখছিল মেয়েটা ইচ্ছে করে অদ্রীশের গায়ে ঢলে পড়ছে। আর অদ্রীশ এতে বিন্দুমাত্র
বিরক্ত না হয়ে মেয়েটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এই জিনিসটাই ভাবিয়ে তুলেছিল মীরাকে।
তাই অদ্রীশকে সরাসরি প্রশ্ন করার জন্য সে অদ্রীশের কোয়ার্টারের দিকে রওনা দিয়েছিল।
কিন্তু অদ্রীশের
কোয়ার্টার পৌঁছবার আগেই গোটা শান্তিনিকেতন জুড়ে নেমে এসেছিল অকাল বৃষ্টি। ধুয়ে
দিচ্ছিল শাল-শিমূলে ঢাকা, আবিরে রাঙানো সমগ্র
শান্তিনিকেতনকে।
কলিংবেলের
শব্দ শুনে দরজা খোলার পর বৃষ্টিস্নাত মীরাকে দেখে প্রথমে রাগ করলেও পরে পাগলামো
দেখে না হেসে থাকতে পারেনি অদ্রীশ।
- আরে তাই বলে এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে আসতে হবে?
– আরে বৃষ্টি তো এতক্ষণ ছিল না! এই মাত্র শুরু হল!
– বটে! আর তুই সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এলি! উফ! তোকে নিয়ে আর পারা যায়
না। একে সর্দির ধাত তার উপর মাইগ্রেনের প্রবলেম, এরমধ্যে ঠাণ্ডা
লাগালে কী হবে বুঝতে পারছিস? যাকগে এসেই যখন পড়েছিস ভেতরে
আয়। আর বৃষ্টিতে ভিজিস না।
বলে বারান্দায়
মেলে রাখা একটা গামছা দিয়ে মীরাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ঘরে নিয়ে এসেছিল অদ্রীশ। ঘরের ভেতর ঢুকে মীরাকে ড্রয়িংরুমে দাঁড় করিয়ে রেখে ছুটে গিয়েছিল
নিজের ঘরে। কিছুক্ষণ পর একসেট পাজামা-পাঞ্জাবী নিয়ে ফিরে বলেছিল, “আপাতত বেডরুমে গিয়ে
ভেজা কাপড়গুলো ছেড়ে এটা পরে নে।”
ভেজা পোশাক
ছেড়ে অদ্রীশের পাজামা-পাঞ্জাবী পরে অদ্রীশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই কড়া কফির গন্ধ ভেসে
এল মীরার নাকে। ভেজা পোশাক বারান্দায় মেলে গামছাটাকে পাগড়ির মতো করে মাথায় বেঁধে নিল
সে। তারপর ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখল সেন্টার টেবিলে একরাশ খাবার সাজিয়ে অদ্রীশ সোফায় কফিমাগ হাতে বসে আছে।
সেদিকে তাকিয়ে মীরা প্রায় আর্তনাদ করে উঠল,
– আরে করেছটা কী? এত খাবার কে খাবে?
– কেন তুই খাবি!
– ক্ষেপেছ? একটু আগে দোল খেলা শেষ করে
পেট ভরে মাংস ভাত খেয়েছি। এরপর এত কিছু খেলে মরে যাবো।
– কিছু হবে না। অন্তত একটা দুটো
মালপোয়ার পিস খেয়ে বদহজম হয়েছে এমন পাবলিকের কথা আমি শুনিনি।
– এটা এক দুই পিস?
– তো কী? শোন আগেকার দিনে এই দোলে
বিকেলবেলা মালপোয়া নাহলে গরম গরম লুচির সাথে আলুর দম বা সাদা আলুর তরকারি
ম্যান্ডেটরি মেনু ছিল। তোদের ঐ এখনকার মতো মাটন দিয়ে কব্জি ডুবিয়ে খাওয়ার চল
ছিল না আগে। ও জিনিস শুধু রবিবারের জন্য তোলা থাকতো। ছেলেবেলায় দোল খেলে বিকেলে
কতবার যে বন্ধুদের বাড়িতে মালপোয়া আর গোবিন্দভোগ চালের পায়েস খেয়ে কাটিয়েছি
ভাবলেই এখনও জিভে জল আসে। বিকেলের দিকে স্টুডেন্টরা এখানে গানের আসর বসাবে বলেছে,
খানিকটা সান্ধ্য আড্ডা বলতে পারিস। ওদের জন্যই বানাব বলে মিক্সচারটা গুলে
রাখছিলাম। ভাগ্যিস তুই চলে এলি। নে অনেক কথা হয়েছে এবার খেয়ে বলতো দেখি কেমন
হয়েছে? রন্ধন পরীক্ষায় পাশ করেছি?
কথাগুলো শোনামাত্র ভ্রু কুঁচকে গেল মীরার। পরক্ষণে
নিজেকে সামলে সোফায় বসে সেন্টার
টেবিল থেকে একটা মালপোয়া তুলে কামড় বসিয়েই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গেল মীরা। তারপর চোখ বুঁজে পরম তৃপ্তিতে গোটা
মালপোয়াটা শেষ করে হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল এক করে প্রশংসাসূচক মুদ্রা করে
বলল, “পারফেক্ট! এত ভালো মালপোয়া আগে কোনোদিন খাইনি। মিক্সচারে কী ছিল গো?”
– যা থাকে! তার সাথে অবশ্য হাল্কা
কাঁচা মৌরি দিয়েছি।
– উফ! বিকেলে এই মেনুটাই যদি তোমার স্টুডেন্টদের দাও, আমি হলফ করে বলছি জলসা পুরো জমে যাবে!
– বলছিস?
– একদম!
– বেশ নে কফিটা খা! ঠাণ্ডা হয়ে গেল
তো!
সেন্টার টেবিল থেকে নিজের কফিমাগটা তুলে মীরা জিজ্ঞেস করল, “তোমার স্টুডেন্টরা ক'টার দিকে আসবে?” ঘড়ির দিকে
একঝলক তাকিয়ে কফিমাগে চুমুক দিয়ে অদ্রীশ বলল, “তা ধরে নে সন্ধ্যে সাতটা। আসলে
সেই সকাল থেকে হাজার ঝক্কি গেছে ওদের উপর দিয়ে তাই দেরী করে আসতে বলেছি।”
পলকে একাধিক অভিব্যক্তি খেলে যায় মীরার মুখে। তারপর
নিজেকে কোনোমতে সামলে।
– তা এই জলসা কি আজকের জন্যই নাকি আগেও
বসেছে?
– আগেও মাঝে মধ্যে দু–একবার বসেছে বটে তবে আমি অতো
অ্যালাউ করি না। ঐ মাঝে মাঝে যখন ওরা আবদার করে তখন আসতে দিই। জলসা তো নয় ঐ
তোদের ভাষায় ‘জ্যামিং সেশন’ বলে।
– বুঝলাম। আচ্ছা তখন থেকে তুমি বাবা কাকাদের মতো ‘তোদের ভাষা’, ‘তোদের
মতো’ কেন বলছো বলো তো?
– বাহ রে! বলবো না? সবসময় ফিটফাট
থাকি বলে তো আর বয়সটা এক জায়গায় থাকছে না। বুড়ো হচ্ছি তো নাকি? একত্রিশ বছর হতে
চলল আমার। টেকনিক্যাল দিক থেকে প্রৌঢ় হতে আর নয় বছর বাকি! তাছাড়া তোরা তো
আমাদের পরের জেনারেশন নাকি? একটা এজ গ্যাপ তো থাকছেই!
– বাজে কথা বলো না তো! মোটেও তুমি
বুড়ো হওনি। তুমি তো আমাদেরই জেনারেশনের। একত্রিশ বছর বয়স হয়েছে বলেই কি তুমি
বুড়ো হয়ে গেছ নাকি?
– আরে ধুস পাগলি! তিরিশের কোঠা পার করলেই মানুষের মধ্যে
বিজ্ঞভাব চলে আসে, জীবনদর্শনে দার্শনিক ভাব আসে। জ্ঞানবৃদ্ধ বলা চলে আমাদের।
– এসব ঢপের কথা তোমার স্টুডেন্টরা বিশ্বাস করলেও আমি করি
না। মানুষের জীবন একটা অনন্ত জিজ্ঞাসা আর অ্যাডভেঞ্চারে ভর্তি। কত কিছু জানার, কত
কিছু শেখার বাকি। শেখার শেষ নেই জীবনে। এমনকি মরার সময়ও মরতে পারাটা শিখে নিতে
হয় নিজের থেকে।
– কত বয়স হল তোর?
– কেন বলবো? জানো না মেয়েদের বয়স আর
ছেলেদের মাইনে জানতে নেই!
– সে জানি আমি শুধু বলতে চাইছিলাম যে তোর বয়সটা এখন কম। জীবনের অনেকটা পড়ে
আছে তোর সামনে। ম্যাচিওরিটি আসেনি। একসময় যখন
বয়স হবে, ম্যাচিওরিটি আসবে তখন বুঝবি জীবনের মানে আলাদা। জীবন মানে…
– থাক! আমি কোনো এক্সপ্লেনেশন চাইনি।
– এই দেখো মেয়েটা রেগে যাচ্ছে! আরে আমি তো এমনিই…আচ্ছা বেশ এই টপিক নিয়ে অন্যদিন হবে তা আজকে থাকছিস
তো শান্তিনিকেতনে? নাকি বিকেলে ফিরছিস?
মীরা জবাব না দিয়ে দুহাতে কফিমাগটা আকড়ে ধরে মাথা নিচু
করে বসে থাকে। তারপর আলগোছে জিজ্ঞেস করে, “শ্রীতমাও আসবে নাকি আজকের অনুষ্ঠানে?”
আচমকা প্রশ্নটা শুনে প্রথমে চমকে গেলেও অদ্রীশ বোঝে
আচমকা এই বিনা নোটিশে আগমন, আচমকা এই অযাচিত তর্কের কারণটা কী? নির্ঘাত শ্রীতমার
কথাটা কোনোভাবে মীরার কানে গেছে। সে বোঝে এখন যদি সত্যিটা বলে দেয় তাহলে এই
বাঘিনীর হাত থেকে ওকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। একটু বুঝে হ্যান্ডেল করতে হবে
পরিস্থিতিটা। চোখে মুখে অবাক হবার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে সে জিজ্ঞেস করে, “তা আমার
স্টুডেন্ট যখন তাকে তো আসতেই হবে। একমিনিট! এর মধ্যে শ্রীতমা আবার এল কোথা থেকে?
তুই কী করে জানলি যে ও আসবে? তুই কি ওকে চিনিস নাকি?”
এভাবে পাল্টা প্রশ্নের জন্য তৈরী ছিল না মীরা। সে
ভেবেছিল হয়তো অদ্রীশ চমকে উঠবে, না বলবে, কিংবা ধরা পড়ে যাবার পর অভিনয় করবে।
আর সে অদ্রীশকে বাছা বাছা বাক্যবাণে বিদ্ধ করবে। কিন্তু অদ্রীশ এইভাবে আকাশ থেকে
পড়ে পাল্টা প্রশ্ন করায় সবটা গুলিয়ে গেল মীরার। সে আমতা আমতা করে বলে, “ হ্যা
মানে…চিনি। ও আমার…ইয়ে মানে দুর সম্পর্কের বোন হয়।”
– বোন হয়? কই শ্রীতমা তো আমাকে
বলেনি!
– বলেনি মানে? ও কি জানে নাকি আমাদের
ব্যাপারে?
– না, তেমন
জানে না। তবে তোর সাথে আমার যে বেশ খাতির তা আমার স্টুডেন্টরা যেমন প্রায় সকলেই
জানে তেমনই শ্রীতমাও জানে।
– ও! তা ও কি আসবে আজ?
– বললাম তো আসবে। তা তোরা থাকবি না আজই
চলে যাবি। না মানে বলতে চাইছি যে থেকে গেলে ভালো হত। তাহলে তোরাও জয়েন করতে
পারতিস।
– না বিকেলেই বেরিয়ে যাবো।
বলে কফিটা শেষ করে উঠে দাঁড়ায় মীরা। তারপর বাইরের দিকে
তাকিয়ে দেখে বৃষ্টিটা অনেক ধরে এসেছে। বারান্দা থেকে ভেজা কাপড়গুলো নামিয়ে মীরা
বলে, “এবার আমাকে ফিরতে হবে।”
– সেকি! এত
তাড়াতাড়ি? এইতো এলি।
– না মানে আসার সময় কাউকে বলে
আসিনি। আমাকে দেখতে না পেলে অহেতুক চিন্তা করবে সবাই।
– বেশ চলে যাস। আগে বৃষ্টিটা কমুক।
– বৃষ্টির জন্য বসে থাকলে আর ফেরা হবে না।
– আচ্ছা ঠিক আছে কিন্তু তোর জামাকাপড় তো এখনও
শুকোয়নি! দেখে তো মনে হচ্ছে এখনও ভিজে আছে। আগে হাল্কা শুকিয়ে যাক তারপর না হয়
যাবি।
– ও কিছু হবে না। এক কাজ করো, তেমন হলে তোমার কাছে
প্লাস্টিকের ব্যাগ বা চটের ব্যাগ হবে? সেটায় জামাকাপড়গুলো ভরে নিয়ে চলে যাবো।
অদ্রীশ মালপোয়া খেতে খেতে শ্রাগ করে উঠে দাঁড়ায়।
তারপর ঘরের ভেতর থেকে একটা চটের ব্যাগ এনে দিতেই সেটায় জামাকাপড় গুলো ভরে নেয়
মীরা। তারপর গেটের দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে অদ্রীশ বলে ওঠে, “এর পরেরবার এলে
এমনভাবে আসিস না যাতে ফেরার সময় লজ্জায় মুখ ঢেকে পালাতে হয়।”
কথাগুলো শোনামাত্র মীরা থমকে দাঁড়ায়। অদ্রীশ হেসে বলে,
“আমি এখানে বসে কোনো ছাত্রীর সাথে ফুর্তি করছি এই খবরটা
যখন পেয়েছিস তাহলে একটু হোমওয়ার্ক মানে খোঁজখবর করেই আসতে পারতিস! এত কাঁচা কাজ
করে কেউ আসে? যাকগে যাবার আগে বাকিটুকু ফ্রম হর্সেস মাউথ শুনে যা। শ্রীতমার বাবা
মারা গেছেন তিনমাস হল। বাবার মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা দুবার সুইসাইড
অ্যাটেম্পড করে। যদিও দুবারই রুমমেটদের জন্য রক্ষা পেলেও মারাত্মক ট্রমার মধ্যে
চলে গিয়েছিল। অনেক কষ্টে ওকে ট্রমা থেকে বের করলেও মাঝে মাঝে ডিপ্রেসড হয়ে যায়।
ওর ক্লাসমেটরা তাই ওকে সব সময় হাসিখুশি রাখে। মাঝে মাঝে আমরাও মেয়েটার
পাগলামিকে প্রশ্রয় দিই। এবার এই প্রশ্রয়টাকে কেউ অন্যচোখে দেখলে সেটা আমার দোষ?”
মীরা ঠায় পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে। অদ্রীশ বিদ্রুপের
হাসি হেসে বলে, “একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়েও শেষে যদি ইনসিকিউরিটিতে ভুগতে হয়
তাহলেই বাকি জীবনটা একসাথে কাটাবো কী করে বলতো? একটুও বিশ্বাস নেই আমার উপর? নিজের
ভালোবাসার উপর এতটুকু ভরসা নেই? তোর ফ্রেন্ড সার্কলেও তো কত ছেলে বন্ধু আছে। তাদের
সাথে তোর ঘনিষ্ঠতা হয়তো আমার চেয়েও বেশি। হয়তো আমার চেয়েও বেশি তোকে ওরা চেনে।
কই ওদের নিয়ে তো আমি জেলাস ফিল করি না। কারণ তোর উপর আমার বিশ্বাস আছে। তাহলে
তোর কেন নেই বলতো?”
মীরা চুপ করে দাঁড়িয়ে
আছে দেখে অদ্রীশ বলে, “আসলে কী
জানিস? আমাদের মধ্যে এখনও সেই বিশ্বাসের সম্পর্কটাই গড়ে উঠতে পারেনি। অন্তত তোর দিক
থেকে তো নয়ই! একটা সম্পর্কে বিশ্বাস জিনিসটা অনেক ম্যাটার করে। যেখানে বিশ্বাস
নেই সেই সম্পর্ক না থাকাই সমান। বিশ্বাস যদি থাকতো তাহলে কলেজে অনুষ্ঠানের সময়
সরাসরি দেখা করতে পারতিস। চোরের মতো লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে ফলো করতিস না। এই
বৃষ্টিতে ভিজে এতদুর এসে আমার ঘরে কোনো মেয়ে আছে কিনা যাচাই করতে আসতিস না।”
কথাটা শোনার সাথে সাথে মীরা চমকে ওঠে। এবং তার সাথেই
একটা অপরাধবোধ শুরু হয় তার। সত্যিই তো! কোনো
ভাবনাচিন্তা না করে, খবরটার সত্যতা যাচাই না করে পাগলের
মতো ছুটে এসেছে সে। একবারও ভেবে দেখেনি যা শুনেছে তা সত্যি নাও তো হতে পারে! কিন্তু অদ্রীশ কী করে জানলো কলেজে লুকিয়ে দেখার কথাটা? তারমানে ওকে অদ্রীশ
ওকে দেখেছে! অদ্রীশ ওর এখানে আসার কারণটাও বুঝতে পেরেছে! লজ্জায়
মাথা নত হয়ে যায় মীরার ইস!
এই মুহূর্তে মাটিতে মিশে যেতে
ইচ্ছে করছে তার। কেন একবার খবরটার সত্যতা যাচাই করল না? কেন একবার কলেজেই অদ্রীশের
সাথে যোগাযোগ করল না ও! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে শোনে অদ্রীশ বলছে, “যে সম্পর্কে
বিশ্বাসের কোনো জায়গা নেই সে সম্পর্ক না রাখাই ভালো। তুই বরং ফিরে যা। আর আসিস
না আমার বাড়িতে। বা বলা ভালো আর কোনো যোগাযোগ রাখিস না আমার সাথে। এভাবে সন্দেহের
মধ্যে নতুন জীবন শুরু করার চেয়ে সব কিছুর ইতি টেনে নেওয়াই ভালো বুঝলি? আমাদের
মধ্যে কোনো সম্পর্ক না থাকাই ভালো।”
বাকি কথাটুকু আর মীরার কানে ঢুকল না। ওর মনে হল যেন আশেপাশের জগতটা আচমকা স্তব্ধ হয়ে গেছে। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। একটা ভয়ংকর দুর্ভেদ্য কুয়াসা ওর চারদিকে এসে জমা হচ্ছে। মীরার কানে অনুরণিত হতে লাগল অদ্রীশের শেষ কথাটা, “আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক না থাকাই ভালো।” অদ্রীশ এটা কী বলল? বলতে পারল? এভাবে দুম করে সব শেষ করে দেওয়া যায়? পেছন ফিরে মীরা দেখল কথাগুলো বলে অদ্রীশ সদর দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। মীরার মনে হল যেন শুধু দরজা নয়, ওর ফেরার পথটাও বন্ধ করে দিয়েছে অদ্রীশ। আচমকা মাথাটা ঘুরে গেল মীরার। এক হাতে দেওয়াল ধরে নিজেকে সামলালো সে। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল অদ্রীশের কোয়ার্টারের চৌহদ্দি থেকে।
বিকেলবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর মীরাকে রুমে দেখতে না পেয়ে প্রথমে সকলে ভেবেছিল হয়তো অদ্রীশের কাছে গেছে
সে। কিন্তু অদ্রীশের কাছে মীরা এলেও বেশিক্ষণ থাকেনি জানার পর সকলের কপালে
চিন্তার ভাজ পড়তে শুরু করে। সকলে মিলে খুঁজতে বেরোবার কিছুক্ষণ পর মাঝরাস্তায়
অদ্রীশের দেওয়া চটের ব্যাগ পড়ে আছে দেখে সে চিন্তা পরিণত হয় দুশ্চিন্তায়। সবার আগে দুশ্চিন্তা গ্রাস করে অদ্রীশকে। ওর বাড়ি থেকে মীরা চলে যাবার সময় যা নয় তাই বলে অপমান করেছিল সে। ওর কথা শুনে মীরা যদি কিছু করে বসে তাহলে সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না। কথাগুলো মাথায় আসতেই সে সকলের সাথে পাগলের মতো খোঁজা শুরু করে মীরাকে। তবে সেই খোঁজ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। লজ থেকে
কিছুটা দুরে মীরার
প্রিয় বান্ধবী অনুরাধা আবিস্কার করে লজের কাছে একটা
পুকুরের ধারে অচৈতন্য
হয়ে পড়ে আছে মীরা। লজের মালিক পুলিশের ঝামেলায়
জড়াতে না চাইলে সকলে মিলে ধরাধরি করে মীরাকে অদ্রীশের কোয়ার্টারে নিয়ে আসা
মাত্র একজন দক্ষ
অভিভাবকের মতো মীরার দায়িত্ব নিয়েছিল অদ্রীশ। ফোন করে স্থানীয় ডাক্তারকে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে
এনেছিল সে। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন “বৃষ্টিতে
ভিজে জ্বরটা এসেছে। সেই জ্বরের কারণেই সেন্সলেস হয়ে পড়েছিল। দুদিন একটু
অবসার্ভেশনে রাখলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
অদ্রীশ ডাক্তারের কথা মতো সারারাত জেগে অক্লান্তভাবে সেবা করে সারিয়ে তুলেছিল মীরাকে। পরদিন সকালে মীরা চোখ মেলে তাকাতেই হাসিমুখে জিজ্ঞেস করেছিল, “এখন কেমন বোধ করছিস?” মীরা মাথা নেড়ে ঠিক আছে বলতেই একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ম্লান হাসি হেসেছিল অদ্রীশ। সেদিন সন্ধ্যেবেলা দুজনে বারান্দায় বসে দেখছিল প্রতিপদের চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া শান্তিনিকেতনকে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অদ্রীশ জিজ্ঞেস করেছিল, “কি বলেছিলাম না? জ্যোৎস্নার আলোয় শান্তিনিকেতনের রূপ আরো খোলতাই হয়!”
দূরে কোথাও মাদলের মৃদু শব্দ শুনতে পাচ্ছিল মীরা। সেই শব্দটা খুব দ্রুত লয়েরও নয় আবার ঢিমে তালেরও নয়। বরং একটা ছন্দে ভেসে আসছিল। তার সাথে ভেসে আসছিল একটা ভীষণ চেনা গানের সুর। সেই মুহূর্তে গানটা মনে করতে না পারলেও সেই ছন্দের সাথে সুরটা শুনতে শুনতে ক্রমশ ঘোর লেগে যাচ্ছিল মীরার। অদ্রীশ ব্যাপারটা টের পেয়ে বলেছিল, “বিকেলে জ্যামিং সেশনের কথা বলেছিলাম না? বোধহয় সেটাই শুরু হয়েছে। আজকে ওদের আমার বাড়িতে বসার কথা ছিল। কিন্তু তোর কথা ভেবে প্রোগ্রাম বাতিল করেছি। এরপর যখন আসবে তোর সাথে ওদের আলাপ করিয়ে দেব কেমন?”
জবাবে
মীরা মাথা নাড়ে। তারপর কিছুক্ষণ দুজনে নির্বাক হয়ে বসে থাকার পর অদ্রীশ চেয়ার
থেকে উঠে মীরার কপালে হাত রেখে জ্বরের উত্তাপ বোঝার চেষ্টা করে। তারপর ঘর থেকে
একটা শাল বের করে এনে মীরার সর্বাঙ্গ ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে বলে, “আর বাইরে বসে
কাজ নেই। এরপর মশা ধরবে। তার চেয়ে বরং ঘরে গিয়ে শুয়ে থাক। জ্বরটা আবার বেড়েছে থাক।”
মীরার
ইচ্ছে করছিল আরেকটু বসে থাকতে, এই নেশাতুর পাগল করা গানের সুরে আরো কিছুক্ষণ বুঁদ
হয়ে থাকতে। কিন্তু সে অদ্রীশকে নিজের ইচ্ছেটা বলতে পারল না। অদ্রীশ ওকে প্রায়
পাঁজাকোলা করে ঘরে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল। তারপর দক্ষ অভিভাবকের মতো যত্ন করে
সময়মত ওষুধ আর রাতের খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিল। অথচ একটু খেয়াল করলে দেখতে
পেত মীরার চোখের কোণে অল্প অশ্রু জমেছে।
পরদিন মীরা একটু সুস্থ বোধ করায় বিকেলের দিকে অদ্রীশ ফোন করে নিজের কোয়ার্টারে ডেকে নিয়েছিল মীরার বন্ধুদের। তার সাথে ডেকেছিল ওর ছাত্রছাত্রীদেরও। শ্রীতমাও ছিল ওদের দলে। আড্ডার মাঝে অদ্রীশ দেখেছিল শ্রীতমার সাথে মীরার ভাব হয়ে গেছে। দু'জনে মিলে বেশ খোশগল্প জুড়ে দিয়েছে। তারপর একসময় সুযোগ বুঝে নিজের ছাত্রছাত্রীদের আর মীরার বন্ধুদের সামনে মীরাকে বিবাহপ্রস্তাব দিয়েছিল সে। সকলের
সামনে লজ্জায় লাল হওয়া মীরার সম্মতি চোখ এড়ায়নি কারোরই। সেদিন রাতে
সকলে ফিরে যাবার পর মীরার আঙুলে নিজের আংটি পরিয়ে সারাজীবন একসাথে পথচলার শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ
হয়েছিল অদ্রীশ। প্রত্যুত্তরে মীরা অদ্রীশকে দিয়েছিল সবচেয়ে অমুল্য উপহার। প্রেয়সীর
প্রথম চুমু।
সেদিনের পর কেটে গেছে প্রায় ছয়মাস। এই ছয়মাসে দুপক্ষের বাড়িতেই
ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে জানানো হয়ে গেছে। হবু জামাই প্রফেসর জানার পর মীরার বাড়ি থেকে
কোনো আপত্তি ওঠেনি। অদ্রীশের বাড়িতেও মীরাকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে নিয়েছিলেন ওর
শাশুড়িমা। ফলে আর কোনো বাধা রইল না। ঠিক করা হল সামনের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে দু’জনের
চার হাত এক করা হবে। সেই মতো প্রস্তুতি নিতে লাগল দুটো পরিবার। আর দুটো হৃদয় অপেক্ষা
করতে লাগল এক হওয়ার।
******
বাথরুম
থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে বিছানার দিকে তাকাল মীরা। বিছানায় ঘুমন্ত অদ্রীশকে
দেখে মৃদু হেসে সোফায় পড়ে থাকা টিশার্ট আর পাজামা-টা পরে নিল সে। তারপর এগিয়ে
গিয়ে বারান্দার দিকের দরজাটা খুলল। দরজাটা খুলতেই একরাশ হিমেল হাওয়ার স্পর্শ
কাঁপিয়ে দিল মীরার সদ্যস্নাতা শরীরটাকে। ঘরের ভেতর থেকে শালটা বের করে সেটায়
নিজেকে আপাদমস্তক জড়িয়ে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ব্যালকনির চেয়ারটায় বসল সে।
তারপর নিঃশব্দে শুনতে লাগল প্রকৃতির নিজস্ব শব্দ। এদিকটায় দার্জিলিং-এর মতো তেমন
সূর্যোদয় দেখা না গেলেও প্রাকৃতিক শোভা যা আছে তাও কম নয়। ওদের কটেজটার পাশে একফালি জায়গায় একটু
ফুলের বাগান গোছের মতো তৈরি করা হয়েছে। বাগানে নানারকমের ফুল দেখে বোঝা যায় হয় কটেজের
মালিকের ফুলের শখ আছে নাহলে এগুলো নিছকই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। বাগানের দিকে
আনমনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের ফুলশয্যার রাতের কথা মনে পড়ে গেল মীরার। সেদিন রাতেও
এরকম অজস্র ফুলে সাজানো হয়েছিল ওর খাট। সারাদিনে বৌভাতের একাধিক স্ত্রীআচার, ও সন্ধ্যেবেলা
একাধিক অতিথি আপ্যায়নের পর শাশুড়িদের সাথে প্রবেশ করেছিল অদ্রীশের ঘরে।
******
সমস্ত স্ত্রীআচার
শেষ করার পর সমস্ত মেয়েবউদের নিয়ে অদ্রীশের মা যখন অদ্রীশের ঘর থেকে বেরোলেন তখন রাত
দেড়টা বাজে। মায়েরা বেরিয়ে যেতেই অদ্রীশ ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিল। তারপর এসিটা হাল্কা
করে চালিয়ে পরনের পাঞ্জাবী খুলতে খুলতে বলল, “উফ! সারাটা দিন যা গেল বাপ রে বাপ! এবার
আমার শান্তি!” বলে পাঞ্জাবীটা খুলে ঘরের এককোণে ঝুলিয়ে রেখে বাথরুমে ঢুকে গেল। কিছুক্ষণ
পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে খাটের ছত্রি থেকে নেমে আসা ফুলের মালা গুটিয়ে নিয়ে মীরার
পাশে বসে বলল, “একটু সরে বসো তো!” মীরা কিছুক্ষণ চুপ করে অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে থাকার
পর ঠাণ্ডা গলায় বলল,
– সরে বসবো
কেন?
– আমি শোবো
বলে।
– শোবে মানে?
– শোবো মানে
শোবো! দেখো আজকে সারাদিনের পর আমি ভীষণ টায়ার্ড। তুমিও তো মনে হয় ক্লান্ত। নাও নাও
এই ধরাচুঁড়ো খুলে ফ্রেশ হয়ে তুমিও শুয়ে পড়ো।
– শুয়ে পড়বো
মানে? আজ যে আমাদের ফুলশয্যা!
– তো? তাতে
কী হয়েছে? দেখো আজকে সারাদিন যা গেল তারপর ওসব করার ইচ্ছে বা ধৈর্য দুটোই আমার নেই।
আজকে আমি ভীষণ ক্লান্ত। তাছাড়া সময় তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না? পরে না হয় হবেক্ষণ? ভীষণ
ঘুম পাচ্ছে!
কথাগুলো
বলে একটা হাই তুলে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল অদ্রীশ। মীরা ভ্রু কুঁচকে অদ্রীশকে
দেখতে লাগল। কোথায় বিয়ের পর ফুলশয্যার দিন বউকে একটু আদর করবে, উপহার দেবে তা না সরে
বসতে বলছে! ঘুমোবে বলছে! এ কে রে? কিছুক্ষণ পর অদ্রীশের নাকডাকার শব্দে চমকে উঠল মীরা।
একি! এরমধ্যেই ফরফর করে নাক ডাকতে শুরু করে দিয়েছে! অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে
রাগে ফোঁসফোঁস করতে লাগলো মীরা। আজকের রাতের জন্য কত কিছু ভেবে রেখেছিল সে। কত স্বপ্ন
দেখেছিল! আর তার জায়গায় কিনা এইভাবে… সব নষ্ট হয়ে গেল! কটমট করে অদ্রীশের দিকে তাকালো
সে। কিন্তু অদ্রীশ নির্বিকার। কিছুক্ষণ পর পাশ ফিরে শোয়ার সময় বলল, “শোবার সময় ঘরের
আলোটা নিভিয়ে দিও প্লিজ!” মীরার ইচ্ছে করলো অদ্রীশকে ধাই করে মেরে দেয়।
অনেক কষ্টে
নিজের রাগটাকে প্রশমিত করে এক এক করে গয়নাগুলো খুলে ড্রেসিং টেবিলে রেখে দিয়ে পরনের
শাড়িটা খুলে ফেলল মীরার। তারপর ঘরের এককোণে রাখা নিজের ট্রলিব্যাগ থেকে একটা নাইটি বের
করে বাথরুমে ঢুকল। আর মীরার বাথরুমে ঢোকার সাথে সাথে চোখ মেলে তাকাল অদ্রীশ। বাথরুমের
দরজার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ফেলল সে।
বাথরুম থেকে
ফ্রেশ হয়ে বেরোতেই ঘরের অবস্থা দেখে চমকে উঠল মীরা। ঘরের আলো নিভিয়ে দিয়ে সেন্টেড ক্যান্ডেল
জ্বালানো হয়েছে। সুগন্ধী মোমের গন্ধে গোটা ঘর ম ম করে উঠেছে। গোটা মেঝে জুড়ে ফুলের
পাপড়ি ছড়ানো। খাটের ছত্রিতে গুটিয়ে রাখা ফুলের মালা নামিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর খাটের মাঝে
বসে ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে অদ্রীশ। তারমানে পুরোটাই অদ্রীশের অভিনয় ছিল!
মীরা বুঝতে পারে নিজের অজান্তে অদ্রীশের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছে সে।
“তবে রে!”
বলে একছুটে দৌড়ে অদ্রীশের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মীরা। কিল চড় ঘুষিতে জেরবার করে তোলার
আগে অদ্রীশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মীরাকে। তারপর কপালে চুমু খেয়ে বলে, “পাগলী একটা! তুমি
ভাবলে কি করে আজকের রাতটা আমি স্পয়েলড হতে দেব? আমিও যে আজকে রাতের জন্য অপেক্ষা করে
ছিলাম।”
– ছাড়ো আমাকে!
বাজে লোক একটা! আমার সাথে কথা বলবে না তুমি। সাহস কি করে হয় এরকম ইয়ার্কি মারার? ছাড়ো!
– উঁহু!
ছাড়বো না। আজকের দিনে কি বউকে ছাড়তে আছে?
– আমি কিন্তু
চেঁচাবো!
– তাই নাকি?
বেশ চেঁচাও দেখি?
কথাটা বলার
সাথে সাথে মীরার পালকের চেয়েও নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় অদ্রীশ। মীরার অব্যক্ত
কথারা অদ্রীশের ঠোঁটে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। মীরাকে বিছানায় শুইয়ে মরুভূমির তপ্তবালির মতো মীরার
ঠোঁটের সমস্ত আদ্রতা শুষে নিতে থাকে অদ্রীশ। তারপর একসময় মীরার ঠোঁট থেকে নিজেকে মুক্ত
করে বালিশের পাশ থেকে বের করে আনে একটা সুদৃশ্য ছোটো বাক্স। বাক্স থেকে আংটিটা বের
করে মীরাকে পরিয়ে দেয় সে। মীরা অপলকে তাকিয়ে থাকে আংটিটার দিকে। অদ্রীশ হেসে মীরার
কানে কানে বলে ওঠে, “কি? পছন্দ?” মীরা অদ্রীশের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে। অদ্রীশ হেসে
বলে, “আজ আর কোনো কান্না নয়। আমাদের কাঁদার দিন শেষ! বুঝলে মীরাবাই?” বলে মীরার গাল
বেয়ে নেমে আসা অশ্রু মুছিয়ে দেয় অদ্রীশ। তারপর ডুব দেয় মীরা নামের নদীর গভীরে।
মীরার ঠোঁটে
উন্মাত্ত প্রেমিকের মতো দংশনচিহ্ন অঙ্কিত করতে করতে নিজের সাথে মীরাকেও ক্রমশ নিরাবরণ
করে অদ্রীশ। তারপর ধীরে ধীরে নেমে আসে ওর কন্ঠায়। প্রবলসুখে পাগলপারা হয়ে অদ্রীশকে
খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে মীরা। সুতীক্ষ্ণ নখরে ছিন্নভিন্ন করে দেয় অদ্রীশের বাহু, কামড়ে
ধরে ওর বিশাল কাঁধ। মীরার এই অত্যাচার সহ্য করতে করতে আরো প্রবলভাবে আদর করতে থাকে
অদ্রীশ। মীরা টের পায় অদ্রীশের ঠোঁট স্পর্শ করছে ওর নাভিমূল, ধীরে ধীরে নেমে আসছে উরুসন্ধীর
দিকে। আর ঠিক তখনই একটা তীব্র, নাড়ি ছেঁড়া যন্ত্রণার সৃষ্টি হয় মীরার তলপেটে। একি!
এইসময় কেন? এখন কেন? কদিন আগেই তো শেষ হল! আবার কেন? কথাগুলো ভাবার আগেই প্রচণ্ড যন্ত্রণা
শুরু হয় মীরার। প্রবল যন্ত্রণায় অস্ফুটে ককিয়ে ওঠে সে। অন্ধকারে সে আর্তনাদকে শীৎকার
ভেবে প্রথমে জাগ্রত হলেও পরক্ষণে ভুল ভাঙে অদ্রীশের। সঙ্গে সঙ্গে একলাফে বিছানা থেকে
নেমে ঘরে আলোটা জ্বালাতেই যেন নরক দর্শন হয় তার। স্তম্ভিত হয়ে সে দেখে বিছানায় শুয়ে রক্তাক্ত
অবস্থায় মীরা কাতরাচ্ছে। ওর যোনীপথ দিয়ে ভেসে আসছে রক্তের অজস্রধারা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে
বিছানার শ্বেতশুভ্র চাদর। রক্ত লেগে আছে তার হাতেও।
ডাক্তারের
চেম্বার থেকে বাড়ি ফেরার পথে অদ্রীশ শক্ত করে ওকে জড়িয়ে থাকলেও বাড়ি ফেরার পর বাথরুমে
ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিয়ে শাওয়ার চালিয়ে দিয়ে তার নিচে দাঁড়াল মীরা। তারপর নতজানু হয়ে
বসে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। ওর কানে তখনও ভাসছে ডাক্তারের কথাগুলো। কাল রাতে ওকে ঐ
অবস্থায় দেখে প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেও পরক্ষণে পুরোটা সামাল দিয়েছিল অদ্রীশ। মাটিতে
পড়ে থাকা নাইটিটা তুলে মীরার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে থ্রিকোয়ার্টার প্যান্টটা পরতে পরতে বেরিয়ে
গিয়েছিল ঘর থেকে। ডেকে এনেছিল ওর মাকে। পরদিন নিয়ে ছুটেছিল ডাক্তারখানায়। ডাক্তার সবটা
শোনার পর কিছু পরীক্ষা করতে দিয়েছিলেন। সেটারই রিপোর্ট এসেছে। রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা
আছে মীরা মেনোরিজিয়া বা অতি রজঃস্রাব রোগে আক্রান্ত। সঠিক সময় অপারেশন না হলে বিপদ
হতে পারে। সবটা শোনার পর মীরার মনে হচ্ছিল যেন ওর পায়ের তলা থেকে ধীরে ধীরে মাটি সরে
যাচ্ছে। চারপাশটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। অপারেশন টেবিলে শুয়ে থাকা নিজেকে দেখতে পাচ্ছিল
সে। মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ভেঙ্গে যাচ্ছিল মীরা। শাওয়ারের জলে সিক্ত
হয়ে ধুয়ে যাচ্ছিল ওর স্বপ্ন, ভালোবাসা, বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকু।
******
– ভোরবেলা
ওভাবে বারান্দায় বসে আছো কেন? ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো!
কথাটা শোনামাত্র
একটা মুচকি হাসি খেলে গেল মীরার ঠোঁটে। সে হেসে বলল, “লাগুক!” পেছন থেকে একজোড়া হাত
ওকে জড়িয়ে ধরল। চোখ বুঁজে মীরা শুনতে পেল অদ্রীশ বলছে, “একে সারারাত জাগা, তার উপর
এই ঠাণ্ডার মধ্যে ব্যালকনিতে বসে আছো। মরার ইচ্ছে হয়েছে নাকি মীরাবাই?” মুচকি হেসে
মীরা বলল,
– যদি বলি
হ্যা? কী করবে?
অপলকে মীরার দিকে তাকায় অদ্রীশ। দেখে মীরাও ওর দিকে অপলকে তাকিয়েছে। ভোরের আলোয় ভীষণ মিষ্টি লাগছে সদ্যস্নাত মুখখানা। সেদিন ডাক্তারখানা থেকে ফেরার পর অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করেছিল। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেওয়া, উন্মাদের মতো আচরণ করা শুরু করেছিল সে। প্রথম প্রথম দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেও যখন একদিন কলেজে থাকাকালীন মীরার সুইসাইডের খবর পেল তখন আর স্থির থাকতে পারেনি সে। হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী মীরাকে যা নয় তাই বলতে শুরু করেছিল সে। রাগের মাথায় বলেছিল, “কি ভেবেছটা কী? আমাকে মুক্তি দেবে?” হাসপাতালের বিছানায় মিশে যাওয়া মীরার শীর্ণকায় দেহ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এসেছিল একটা ক্ষীণ প্রশ্ন, “যদি বলি হ্যাঁ? কী করবে?” সেদিন কোনো কথা বলেনি অদ্রীশ। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল মীরাকে। তারপর প্রতিজ্ঞা করেছিল যে করেই হোক মীরাকে এই রোগের কবল থেকে বের করে আনবে সে।
সেই মতো লাইব্রেরী ঘুরে, বইপত্র-জার্নাল পড়ে, ডাক্তার বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে, গুগল ঘেটে বের
করেছিল রোগটার সমগ্র ঠিকুজীকুষ্ঠি। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে শুরু করিয়েছিল মীরার
চিকিৎসা। অদ্রীশের ভালোবাসার জোরেই হোক বা ডাক্তারের চিকিৎসার কারণেই হোক ধীরে ধীরে জীবনের পথে
ফিরে আসছিল মীরা। তারপর অপারেশন হয়ে গেছে তিনবছর হতে চলল। তিনবছরে মীরা অনেকটাই সুস্থ
হয়ে উঠেছে। ফিরে এসেছে পুরোনো ছন্দে। কিন্তু আগের মতো সেই প্রগলভতা নেই। বরং আগের চেয়ে
অনেক শান্ত হয়ে গেছে সে। কথা গুলো ভাবতে ভাবতে মীরার দিকে তাকায় অদ্রীশ। তারপর মীরার নাকে
নাক ঘষে বলে, “যেতে দেবো না! শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখবো তোমাকে!”
– সারাজীবনের
মতো?
– সারাজীবনের
মতো!
বলে মীরাকে
জড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে যায় অদ্রীশ। আর বাগানের এককোণের দেয়ালে গজিয়ে ওঠা বোগেনভিলিয়া গাছের ফুলগুলো থেকে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে ঝরে পড়ে কয়েকটা শিশিরবিন্দু।


