অনুসরণকারী
শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০২২
ভ্যাকেশন
শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২
বিদায়
“চল ভাগ! দূর হ এখান থেকে মুখপোড়ার দল! খেয়ে দেয়ে কাজ নেই সকাল সকাল বিরক্ত করতে চলে এসেছে! যত্তসব! ধরতে পারলে তোদের ষষ্ঠীপুজো করে দেবো!” কথাগুলো বলতে বলতে বেত হাতে মুর্তিগড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। অবশ্য যাদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা তারা নগেনখুঁড়োর ঘর থেকে বেরোবার আগেই বেপাত্তা। তারা সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে চটিয়ে দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে। আমি বাইকে চেপে বাজার সেরে ফিরছিলাম। সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে একপাল ছেলেপুলে তাড়া করতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।
- ব্যাপারটা কী খুঁড়ো? সাতসকালে মেজাজ চড়ে আছে কেন? কিছু করেছে নাকি ওরা?
- করেছে তো! সেই মহালয়ার দিন থেকে আমার বাপের মুণ্ডুপাত করে যাচ্ছে হতভাগার দল। রোজ সকালবেলা এসে বাবুদের মতো গলা করে বলবে ‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো? নাকি এবারও কলকাতা থেকে মুর্তি আনাতে হবে?’ একবার ভেবে দেখো দেখি ছোটোবাবু, এটা কি মানা যায়? মানছি একটু বুড়ো হয়েছি, আগের মতো আর তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সাড়তে পারি না। তাই বলে এত হেলাচ্ছেদ্দা করবে আমাকে? ওরে তোদের বাপ-পিতেমোর আমল থেকে মাতৃপ্রতিমা গড়ছি রে! আজ পর্যন্ত তারাও সাহস পায়নি এই কথা বলতে। আর তোরা সেদিন জন্মানো ছেলেপুলের দল কিনা আমার, নগেন পালের কাজ নিয়ে সন্দেহ করিস?
ঘটনাটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমার। ইদানিং কয়েক বছর ধরে নব্য বাঙালী প্রজন্মের এক রোগ ধরেছে। অবশ্য এ রোগ আমাদের বেলাতেও পুরোদস্তুরভাবে ছিল। এমনকি আমি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত। রোগটা তেমন ভয়াবহ না হলেও হেলাফেলার রোগ নয়। রোগটার নাম ‘ফেলুম্যানিয়া’। অত্যাধিক ফেলুদা পড়লে বা ফেলুদার সিনেমা দেখলে এই রোগ চাপে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে ফেলুদা ভাবতে শুরু করে। কেউ কেউ নিজেকে তোপসে, জটায়ুও ভেবে ফেলেন। এই রোগের দুটো ভাগ আছে। প্রথম ভাগে রুগী নিজের চারপাশে রহস্যের গন্ধ পায়। সব কিছুকে গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। পরের ভাগ হল নিজেকে ফেলুদা ভেবে পর্দার মানে সিনেমার ফেলুদার মতো কায়দা করা। এই দ্বিতীয় প্রকারের রুগীরা কথায় কথায় ‘কিছু ভালো লাগছে না রে তোপসে’, ‘আমি হয় এর বদলা নেব নয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব’, ‘আছে! আছে! আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে!’, ‘মগজাস্ত্র’ বলে বেড়ায়। পুজোর আগে অবশ্য আরেকটা নতুন বাক্য যোগ হয়, ‘‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো?” বুঝলাম নগেনখুঁড়োকে ওরা ফেলুদার স্টাইলেই জিজ্ঞেস করে চটিয়েছে। হাসতে হাসতে বললাম, “ও তুমি কিছু মনে কোরো না। বুঝতেই পারছো ছেলেমানুষ, তোমার সাথে একটু মজা করে ফেলেছে। আচ্ছা বেশ, আমি নাহয় ওদের দেখতে পেলে বকে দেব।”
- মজা করেছে! নিকুচি করেছে মজার! ঠাকুর দ্যাবতাকে নিয়ে মজা এই নগেন পাল সহ্য করবে না। একবার ওদেরকে বাগে পাই! মজা ঘুচিয়ে দেব!
- আচ্ছা বেশ তাই হবে। আপাতত তুমি ঘরে যাও খুঁড়ো। তোমার মেলা কাজ পড়ে আছে। কালকের মধ্যে ঠাকুর দিতে হবে তো নাকি? কালকের মধ্যে দালানে ঠাকুর না এলে বড়দা আমাদের আস্ত রাখবে না। আমার কথাতেই বড়দা এই শেষবারের মতো তোমাকে সুযোগ দিয়েছে। আমার মুখ রাখতে হবে তো?
কথায় কাজ হল। নিজের রুদ্রমুর্তি সম্বরণ করে বিড়বিড় করে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “তোমাদের কাজই তো করতে যাচ্ছিলুম। হতচ্ছাড়া ছেলেপুলের দল সকাল সকাল মেজাজটাই বিগড়ে দিলে। নাহলে এতক্ষণে অর্ধেক সাজ সারা হয়ে যেত আমার। যাকগে এসে যখন পড়েছ তখন দেখে যাও মায়ের সাজখানা।” বলে আমার হাত চেপে ধরতেই হেসে বললাম, “তা কী করে হয়? আজ যে পঞ্চমী! বোধনের আগে শিল্পী ভিন্ন আর কারো যে মায়ের মুখ দেখার অধিকার নেই! তার চেয়ে বরং বেলা থাকতে থাকতে কাজ সেরে ফেলো। আমি একেবারে কাল ভোরবেলা মাকে নিয়ে ঠাকুরদালানে বসিয়ে দুচোখ ভরে দেখবো। আজ একটু তাড়া আছে। আমি বরং আসি?” বলে বাইক স্টার্ট করে নগেনখুঁড়োকে ছেড়ে এগিয়ে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইড মিররে তাকিয়ে দেখলাম। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চারদিকে একবার বাজপাখির মতো শ্যেনদৃষ্টি বুলিয়ে ধুতির কোঁচড় থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে একটা বিড়ি ধরিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার ঢুকে পড়লেন মুর্তিগড়ার ঘরে। আমি মুচকি হেসে বাইকের স্পিড বাড়ালাম।
নগেন খুঁড়ো মানুষটা এমনি ভালো হলেও স্বভাবগত ভাবে একটু ক্ষ্যাপাটে। ইদানিং খিটখিটে ভাবটা বেশ বেড়েছে। তবে কথার মানুষ। কথা দিলে কথা রাখেন। বংশানুক্রমিক ভাবে আমাদের মানে সামন্তবাড়ির পুজোর মাতৃপ্রতিমা ওনারাই গড়ে আসছেন। প্রায় চারশো বছরের পুজো আমাদের। আশেপাশের গাঁয়ের থেকে লোকে মাতৃপ্রতিমা দেখতে, পুজোর ভোগ খেতে আসে। শুনেছি এককালে নাকি আমাদের পুজোতে অষ্টমীর দিন মহিষবলি হত। আগেকার দিনে আমাদের পুর্বপুরুষরা নিজে হাতে বলি দিয়ে মহিষ উৎসর্গ করতেন। আশেপাশের গাঁয়ের লোকেরা ভীড় করে দেখতো বলি। এখন অবশ্য কুমড়ো বলি ছাড়া আর কিছু হয় না। আর আগেকার দিনের মতো জমিদারী থাকলেও সেটা খাতায়-কলমে। বাস্তবে এখন তার প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। থাকার মধ্যে শুধু একটা পুরোনো প্রাসাদের মতো একটা দালানকোঠা বাড়ি আর একটা বাগান আছে।
এই বাড়ি তথা জমিদারীর শরিক বলতে গেলে পাঁচজন। চারভাই ও এক বোন। আমি সবার ছোটো। তবে সকলেই যে এ বাড়ির বাসিন্দা তা নয়। থাকার লোক ধরতে গেলে আমি, সেজদা, সেজোবৌদি, বড়দা আর বড়বৌদি থাকি। আর থাকে চারটে দুষ্টু বাঁদর। যারা বছরে বেশিরভাগ সময় হোষ্টেলে থাকলেও ছুটিতে এলেই গোটা বাড়িজুড়ে দাঁপিয়ে বেড়ায়। বাকিরা সকলেই দেশে-বিদেশে সেটলড।
বড়দার কাছে শুনেছি নগেনখুঁড়োর বাবা নাকি ছিলেন যাকে বলে জাত শিল্পী। পাথর হোক বা কাঠের টুকরো, নিখুঁত নৈপুণ্যে খোঁদাই করে মুর্তি বানাতে পারতেন তিনি। ঠাকুর্দার পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিনিকেতন থেকে শিখে এসেছিলেন ফাইন আর্টস এর একাধিক ফর্ম। শিখিয়েছিলেন নগেনখুঁড়োকেও। যদিও সবই শোনা কথা। জ্ঞানত নিজের চোখে কোনোদিন নগেনখুঁড়োকে পাথর, কাঠ খোঁদাই করতে দেখিনি। তবে হ্যাঁ ভদ্রলোক যে তার বাবার মতোই জাত শিল্পী সেটা বুঝেছি তার তৈরী প্রতিমা দেখেই। ওরকম দরদ দিয়ে মাতৃপ্রতিমা তৈরি করতে সবাই পারেন না। মাতৃপ্রতিমা নির্মাণে নবরস কথাটা মাথায় রাখা ভীষণ দরকারী। সাধারণত আমরা বাড়িতে যে দেবী দুর্গার পুজো করি তা মাধুর্য্য আর মমতায় ভরা মাতৃপ্রতিমা। ইনি গৃহের কন্যা রূপে পুজিতা হন। এক্ষেত্রে শান্ত ও শৃঙ্গার রসের ভঙ্গিমা ফুটিয়ে তুলতে হয়। আজকাল যে সব প্রতিমা আমরা দেখে থাকি পুজো প্যান্ডেলে, তাতে এই দুই রস থাকে না। থাকে ক্রূর যোদ্ধৃ রূপ। যেটায় ব্যবহৃত হয় রৌদ্র ও বীর রস। এই মাতৃপ্রতিমা পুজিত হয় দেবী রূপে। আশ্চর্যের ব্যাপার প্রতিবার নগেনখুঁড়ো যখন মাতৃপ্রতিমা গড়েন এই চারটে রস একসাথে মিশিয়ে প্রতিমার মুখ তৈরী করেন। মানে আমাদের বাড়ির মাতৃপ্রতিমা দেখলে যেমন মন ভরে আসবে ঠিক তেমনই সম্ভ্রমও জাগ্রত হবে। আর এই জিনিসটার কোনো বছরই নড়চড় হয় না। অন্য কোনো শিল্পী হলে একটা বা দুটো রসের প্রভাব হয়তো কম বেশী হতে পারে কিন্তু নগেনখুঁড়োর কোনোবার এই ভুল হয় না। প্রতিবার একইরকম পারফেক্ট মুখ বানান নগেনখুঁড়ো। তবে এইবার বড়দা নগেনখুঁড়োকে আর মাতৃপ্রতিমার বরাত দিতে চাননি। আসলে একমাত্র মেয়ে ফুলির মৃত্যুর পর নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোটা ইদানিং ভীষণ বেড়ে যাওয়ায় বড়দা চাননি কাজটা নগেনখুঁড়ো করুন। কে জানে মাতৃপ্রতিমা গড়তে গিয়ে কিছু ক্ষ্যাপামো বসলে যদি পাপ লাগে? অবশ্য আশঙ্কাটা অমূলক নয়। মাঝে মাঝে অল্পবিস্তর ক্ষ্যাপামো করে থাকলেও গত একবছর ধরে নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোর বহরটা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। দিনরাত কথা নেই বার্তা নেই শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন। কখনো সারারাত ধরে গোটা গ্রামের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন। কখনো বা রাস্তায় কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করতেন, “আমার ফুলিকে দেখেছ? দেখবে? ঐ দেখো আগুনে পুড়ছে!”
ফুলি, নগেনখুঁড়োর একমাত্র আদরের কন্যা। মা মরা মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসতেন নগেনখুঁড়ো। বা বলা ভালো চোখে হারাতেন। ফুলিও যাকে বলে বাবা অন্ত প্রাণ ছিল। নগেনখুঁড়ো বড়ো সাধ ছিল ফুলি যাতে তার ঠাকুর্দার মতো বড়ো শিল্পী হয়। সেইমতো নিজে হাতে তাকে শিখিয়েছিলেন মাতৃপ্রতিমা গড়া। টাকা জমিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষার জন্য। মেধাবী ফুলি ক্রমে স্কুল পাশ করে পা রেখেছিল কলেজের দোরগোড়ায়। ইচ্ছে ছিল শিক্ষা শেষে বাবার পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। কলেজে ভর্তি হবার বছর তিনেকের মধ্যেই এক ছেলের প্রেমে পড়ে গেল ফুলি এবং অবশেষে একদিন কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলল। মেয়ের এই হঠকারিতায় প্রথমে রাগ করলেও পরে মেনে নিয়েছিলেন নগেনখুঁড়ো। কাছে ডেকে নিয়েছিলেন মেয়ে-জামাতাকে। বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বিয়ের সাতমাস পর পুজোর সময় গ্রামে স্বামীর সাথে ফুলি ফিরেছিল ঠিকই, তবে সশরীরে নয়। ওরা ফিরেছিল মৃত্যুসংবাদ হয়ে। বিয়ের পর শান্তিনিকেতনেই ছোটো একটা সংসার পেতেছিল ফুলি। স্বামীকে নিয়ে একসাথে কলেজের পড়াশুনো ও সংসার চালিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটছিল তার। কিন্তু বিধাতার মনে হয়তো অন্য ইচ্ছে ছিল। এক ঝড়-জলের রাতে কলেজ থেকে ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল ফুলিরা। ঝড়ের কারণে ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রবল বিদ্যুৎপ্রবাহ ওদের সমগ্র চেতনাকে অসাড় করে প্রাণহীন মৃতদেহে পরিণত করতে একমুহূর্তও সময় নেয়নি। খবরটা পাওয়ার পর সমগ্র গাঁয়ের পুজোর আনন্দ একমুহূর্তে বদলে গিয়েছিল দশমীর বিষাদে।
একমাত্র মেয়ের মৃত্যু সহজে মেনে নিতে পারেননি খুঁড়ো। ফুলির মৃত্যুর পর থেকেই মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থর মতো আচরণ করতেন। একবার তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। ভাগ্যিস গাঁয়ের ছেলেরা দেখতে পেয়ে রক্ষা করে তাকে। তারপর থেকে অপ্রকৃতিস্থ ভাবটা কমলেও মাঝে মাঝে প্রলাপ বকতেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই এরকম শোকে প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া মানুষের হাতে প্রতিমা তৈরীর ভার দিতে চাননি বড়দা। তাই প্রতিবারের মতো এইবারও রথযাত্রার দিন যখন নগেনখুঁড়ো বরাত নিতে এলেন তখন তাকে একপ্রকার বুঝিয়ে বিদায় করে দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু নগেনখুঁড়ো নাছোড়বান্দা। তিনি কিছুতেই বরাত না নিয়ে যাবেন না। অবস্থা যখন চরমে উঠলো তখন আমাদের বাকি ভাইদেরও নামতে হল আসরে। অবশেষে ঠিক হল নগেনখুঁড়োই আমাদের পুজোর প্রতিমা তৈরী করবেন তবে পঞ্চমীর মধ্যে সম্পুর্ণ ঠাকুর তৈরী করে দিতে হবে। নগেনখুঁড়ো বড়দার শর্তে রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন এবার তিনি ঠাকুরদালানে মাতৃপ্রতিমা তৈরী করবেন না। মাতৃপ্রতিমা তৈরী হবে তার বাড়িতে। ষষ্ঠীর দিন ভোরে আমরা চার ভাই গিয়ে তার বাড়ি গিয়ে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে আসবো। শর্ত অনুযায়ী কালকে ভোরবেলা আমাদের আসার কথা। সেই কারণে আজ এসেছিলাম নগেনখুঁড়োকে তাগাদা দিতে। এবার এখানকার খবর বড়দাকে বলে দিলেই ছুটি আমার।
*****
আজ ষষ্ঠী। আরেকটু পরেই মায়ের বোধন শুরু হবে। জগন্মাতা চারদিনের জন্য আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে যাবেন। সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট ভুলে আমরা মেতে উঠবো তাকে নিয়ে। দেখতে দেখতে চারটে দিন যে কোনদিক দিয়ে কেটে যাবে বোঝা যাবে না। তারপর চারদিন পরে আমাদের সবাইকে ছেড়ে উমা আবার পাড়ি দেবেন কৈলাশে। সেই মতো শর্ত অনুযায়ী আজকে নগেনখুঁড়োর কাছ থেকে মাকে নিয়ে আসার কথা আমাদের। তাই আমরা চারভাই ভ্যানরিক্সা আর ঢাকি নিয়ে উপস্থিত হয়েছি নগেনখুঁড়োর বাড়িতে। কিন্তু ঘরের চারপাশের পরিবেশ এত নিস্তব্ধ কেন? একটা পাখিও ডাকছে না। মনে হচ্ছে যেন একরাশ শোক নেমে এসেছে বাড়িটায়। সাধারণত নগেনখুঁড়ো ভোরে ওঠার মানুষ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যেন তার ঘুম ভাঙেনি। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অন্যদিন তো এরকম হয় না। তাহলে আজ কী হল? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ডাক দিলাম আমি।
বেশ খানিকক্ষণ হাঁকডাক করার পর দরজা খোলার শব্দ হল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার? সেই আগের মতো আলুথালু উন্মাদবেশ, ক্ষ্যাপাটে চাহনি, সারা শরীরে কাদামাটি মাখানো। কই কাল সকালে তো এতটা খারাপ অবস্থা দেখিনি! তবে কি আবার সেই ক্ষ্যাপামোটা ফিরে এলো? উঠোনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঈষৎ ঘোলাটে অথচ মরামাছের মতো ঠাণ্ডা এবং শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম খুঁড়োকে এভাবে দেখে বড়দাও খানিকটা বিব্রত হয়ে গেছেন। মেজদা, সেজদার অবস্থাও তথৈবচ। অগত্যা আমাকেই হাল ধরতে হল। খানিকটা গলা খাঁকড়ে বললাম, “বলছিলাম যে…ইয়ে মানে… আমরা আমাদের ঠাকুর নিতে এসেছি।” কথাটা শুনে শূন্যদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন নগেনখুঁড়ো। তারপর মৃদু হেসে ইশারা করলেন পিছু নিতে। তারপর এগিয়ে চললেন নিজের মুর্তি গড়ার ঘরের দিকে। প্রথমে অবাক হলেও একে একে আমরা চারভাই ওনার পিছু পিছু প্রবেশ করলাম মুর্তি গড়ার ঘরে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। বাইরে থেকে একফোঁটা আলো আসার জো নেই। ঘরের ভেতরে ঢুকে আমরা চারজন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় নগেনখুঁড়ো ঘরের আলোটা জ্বাললেন। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘর আলোয় ভরে গেল, আর আমরা চারভাই সেই আলোয় মুগ্ধ হয়ে দেখলাম মাতৃপ্রতিমাকে। হ্যাঁ, অপ্রকৃতিস্থ, ক্ষ্যাপা, সন্তানশোকে কাতর হলেও নগেনখুঁড়োর শিল্পীস্বত্তার অবনতি বিন্দুমাত্র হয়নি! প্রতিবারের মতো এবারও দারুণ মাতৃপ্রতিমা তৈরী করেছেন তিনি। বরং বলা ভালো এবারের মাতৃপ্রতিমা ছাপিয়ে গেছে নগেন খুঁড়োর আগের সব সৃষ্টিকে। বড়দাকে দেখলাম হাত জোড় করে প্রণাম জানাচ্ছেন মাতৃপ্রতিমার উদ্দেশ্যে।
প্রতিমা ভ্যানরিক্সায় তুলে বড়দা মেজদা আর সেজদা রওনা হলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি থেকে গেলাম প্রতিমার দাম মেটাতে। প্রতিমার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “কি? বলেছিলাম না? পঞ্চমীর আগেই প্রতিমা তৈরী করে দেবো? করে দিলাম তো? এই নগেন পালের কথার নড়চড় হয় না ছোটোবাবু! সে যা বলে, করে দেখায়!”
আমি হেসে বললাম, “সে কি আর আমি জানি না? সেই কারণেই তো বড়দার হাজার আপত্তির পরেও তুমিই বরাতটা পেলে। যাক গে! সে সব কথা ছাড়ো। প্রতিমার দামটা ধরো।”
কথাটা শুনে মৃদু হাসলেন খুঁড়ো। তারপর প্রায় অস্ফুটে বলে উঠলেন, “দাম? কীসের দাম ছোটোবাবু? বাবারা কি মেয়েদের বিদায় করার সময় দাম নেয় নাকি?”
- সে কি কথা! তোমার পরিশ্রম, তোমার কাজের দাম নেবে না?
- আমার আর ওসবে মোহ নেই গো ছোটোবাবু। মায়ের কৃপায় দুবেলা দুমুঠো জুটে যায় এই অনেক। ও আমি নেব না। বরং তার বদলে একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে। দেবে? বলো ছোটোবাবু দেবে?
পুবের আকাশ ক্রমশ ফরসা হয়ে আসছে। সেই আলোতে দেখতে পেলাম নগেনখুঁড়োর চোখের দৃষ্টি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। তবে সেই আগের মতো শূন্য মরা মানুষের মতো দৃষ্টি নেই বরং তার জায়গায় এসে জমেছে একরাশ আকুতি আর কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”
দূরে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে বড়দারা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের বাড়ির দিকে। ভ্যানরিক্সার আগে ঢাকি প্রবল জোরে ঢাক বাজাতে বাজাতে সমগ্র গ্রামকে জাগিয়ে মায়ের আগমনবার্তা জানিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো অস্ফুটে বলে উঠলেন, “ভাসানের পর প্রতিমার কাঠামোটা আমার চাই। দেবে? দেবে আমাকে? আসলে আমার ফুলিকে তো আর আটকে রাখতে পারলাম না। এই প্রতিমার কাঠামোকেই নিজের কাছে রেখে দেবোখন? নিজে হাতে গড়া প্রতিমা, নিজেরই মেয়ের মতোই তো নাকি? পুজোর চারটে দিন নাহয় তোমাদের কাছে পুজো পেল, বাকিটা সারা বছর আমার কাছে থাকবে। বলো ছোটোবাবু? দেবে তো?”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “বেশ! দেবো।”
মঙ্গলবার, ৩ মে, ২০২২
ফেরা
পুজো এবং অঞ্জলীর জন্য ফুল-বেলপাতা বেছে আলাদা আলাদা পুষ্পপত্রে সাজিয়ে ঠাকুরমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে ঠাকুরদালানের এককোণে এসে বসল মৈত্রেয়ী। দালানের এই কোণ থেকে প্রতিমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। প্রতিমার মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে বাইরের উঠোনটার দিকে তাকাল সে। সারাবছর শ্যাওলা পড়ে পড়ে পিছল হয়ে যাওয়া ভাঙা উঠোনটাকে একরাতের মধ্যে পরিস্কার করে আলপনা দিয়ে ছবির মতো সাজিয়েছে কানাইদারা। ঠিক যেমন আগে করত। আপাতত সেই উঠোনে টুবাই তার মামাতুতো ভাই-বোনেদের সাথে খেলতে ব্যস্ত। বয়সে বড়ো বলে সব বাড়ির সব বাচ্চারা ওকে সর্দার বলে মেনে নিয়েছে। সারাদিন ওদের সাথে হুটোপাটি করে কেটে যাচ্ছে টুবাইয়ের। আজ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, তো কাল ডাংগুলি খেলছে। আজকের বিষয় লাট্টু। জিনিসটা প্রথমে দেখে বলেছিল, “আরে! এতো বেব্লেডের মতো!” তারপর তা নিয়েই চলছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে গোটা পুজোটাই এইভাবেই হেসে খেলে কাটিয়ে দেবে ঠিক যেমন মেয়েবেলায় দাদাদের সাথে হুটোপাটি করে ওর পুজো কাটতো। প্রথমে মৈত্রেয়ী বাধা দিতে গিয়েছিল কিন্তু পরে ভেবে দেখেছে সারাবছর তো স্মার্টফোন আর ডেস্কটপের সামনে বসেই কাটিয়ে দেয় ছেলেটা। এখানে এসে না হয় কদিন ঐ জিনিসগুলোর থেকে একটু দুরত্ব বজায় রাখুক। একঝলকে সেই দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৈত্রেয়ী। নাহ সব একই আছে। কিছুই বদলায়নি। শুধু মাঝখান থেকে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে।
মৈত্রেয়ীর মনে আছে বিয়ের আগের বছর কলেজের পুজোর ছুটিতে শেষবারের মতো এসেছিল সে। বাবা-মা, ঠাকুর্দা-ঠাম্মাম, জেঠু-জেঠিমা, মেজকা, ছোটকা, আর দাদাদের সাথে হই হই করে কাটিয়েছিল পুজোর পাঁচটা দিন। সেই শেষবার, তারপর প্রায় পনেরো বছর পর এই বাড়িতে পা দিল সে। পনেরো বছর! কথাটা বলতেই কম সময় লাগে। কাটানোর সময় মনে হয় এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা যুগের মতো করে কাটছে। অন্তত মৈত্রেয়ীর কাছে তো তাই মনে হয়েছে। এই পনেরোটা বছর সে যেন সবার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল একটা নিভৃতবাসে। এই পনেরোটা বছরে মৈত্রেয়ী নিজের পরিবারের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক রাখেনি। মৈত্রেয়ীর বাড়ির লোকেরা এই পনেরো বছরে একদিনও কেউ ওর সাথে কোনোরকম সম্পর্ক, বা ওর কোনো খোঁজ রাখেনি বা বলা ভালো রাখতে চায়নি। সেটাই তো স্বাভাবিক! বাড়ির সকলের অমতে সাত্যকিকে বিয়ে করার পর ঠাকুর্দার আদেশেই বাড়ির সকলে ওর সাথে সমস্ত রকম সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল। বাবা তো বলেই দিয়েছিলেন ও নাকি ওনার কাছে মৃত। মৈত্রেয়ীও মেনে নিয়েছিল ঠাকুর্দার আদেশ। আর কোনোদিন যোগাযোগ করেনি বাপের বাড়ির কারো সাথে। শুধু টুবাইয়ের জন্মের সময় সাত্যকিকে দিয়ে একটা কল করিয়ে খবরটুকু দিয়েছিল। কিন্তু ওপার থেকে শীতল নীরবতা পাওয়ার পর দীর্ঘকাল আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি। ফলে সম্পর্কের সুতোটাও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
ব্যাঙ্গালোরে তিন কামরার ফ্ল্যাটে স্বামী-ছেলেকে নিয়ে দিব্যি একটা সুখের সংসার গড়ে তুলেছিল সে। সংসারের কাজ, অ্যাপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান, আর নিজের বয়সী গৃহিণীদের নিয়ে একটা ছোট গ্রুপ নিয়ে বেশ ছিল সে। তাহলে কীসের টানে এত বছর পর ফিরে আসতে হল তাকে? সে তো সব সম্পর্ক চুকিয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। তাহলে ফিরে এল কেন? কারণটা বোধহয় মৈত্রেয়ীর জানা। কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছে না সে। বেশ কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু একটা ফোন সব পাল্টে দিল। ছোড়দা সেদিন কেন যে ফোনটা করতে গেল কে জানে? সেদিন ফোনটা না করলে হয়তো ওরা অন্য কোথাও বেড়াতে যেত। অন্তত ফোনটা আসার আগে তো সাত্যকি তাই ঠিক করেছিল।
দিনটা এখনও মনে আছে মৈত্রেয়ীর। সেদিন ছিল রবিবার। প্রতিবারের মতো সেদিনও বাড়িতে বসে সারাদিন ল্যাপটপে কাজ করে বিকেলে একটু ফ্রি হয়ে চায়ের কাপ নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল সাত্যকি। সামনেই দুর্গাপুজো। প্রতিবার পুজোর সময় ওরা কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়। এবার কোথায় যাবে সেই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল এমন সময় সাত্যকির ফোনটা এল। মৈত্রেয়ী প্রথমে ভেবেছিল বোধহয় অফিসের ফোন এসেছে। কিন্তু সেই ভুলটা ভাঙতে বেশিক্ষণ লাগেনি। কলটা কাটার পর গম্ভীর মুখ করে সাত্যকি বলেছিল, “এবারের ট্রিপটা ক্যান্সেল করতে হবে বুঝলে? তোমার বাপের বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। তোমার বাবা মৃত্যুশয্যায়। যে কোনো দিন মারা যেতে পারেন।”
“তো আমি কি করব?” বিরক্তির সাথে বলে উঠেছিল মৈত্রেয়ী। সাত্যকি চায়ের কাপে মৃদু চুমুক দিয়ে বলেছিল, “মরার আগে তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। এবারের পুজোতে যাতে তুমি থাকো সেটাই ইচ্ছে তাঁর। বলতে পারো লাস্ট উইশ।”
- রাখো তোমার শেষ ইচ্ছে! যতসব ঢং! এতবছর পর আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে! কই এতগুলো বছর গেল একবারও তো এই মেয়ের কথা মনে পড়েনি! আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি জানার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর এখন দরদ উথলে উঠছে! কেন? আমি নাকি ওদের কাছে মৃত! তা হঠাৎ এই মরা মেয়েকে স্মরণ হল কেন? মরার আগে প্রায়শ্চিত্তের জন্য?
- আহ মিতু! হচ্ছেটা কি? হাজার হোক সম্পর্কে তিনি তোমার বাবা। নিজের বাবার সম্পর্কে এসব বলতে নেই।
- বেশ করব বলব। যেদিন থেকে ওদের কাছে আমি মৃত হয়ে গেছি। সেদিন থেকে ওরাও আমার কাছে মরে গেছে! কেউ নেই আমার! কেন? মনে নেই? টুবাইয়ের জন্মের খবর যখন দিতে গেলে মানুষটা কি ব্যবহার করেছিল? সটান রং নাম্বার বলে ফোন কেটে দিয়েছিল। তুমি ভুলে যেতে পারলেও আমি ভুলিনি। ওই বাড়ির কাউকে আমি জীবনে ক্ষমা করতে পারব না। তুমি ওদের ফোন করে বলে দাও আমরা আসতে পারব না। কোনো একটা অজুহাত দিয়ে কাটিয়ে দাও।
বলতে বলতে ছলছলে চোখে মেঝের দিকে তাকিয়েছি মৈত্রেয়ী। সাত্যকি বুঝেছিল মৈত্রেয়ী যে এই কথাগুলো বলছে একটাও মন থেকে নয় বরং অভিমানে কষ্ট পেয়ে। অন্তত ওর চোখ থেকে সেটা স্পষ্ট। এতগুলো বছর ভালোবেসে সংসার করতে করতে মৈত্রেয়ীকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। সাত্যকি মুচকি হেসে বলেছিল, “আচ্ছা বেশ তাই করব। তবে একটা কথাই বলার ছিল। মানুষটা তোমার বাবা। তিনি যতই অন্যায় করে থাকুন, আমাদের যতই আঘাত দিয়ে থাকুন বর্তমানে মানুষটা অসুস্থ আর মৃত্যুশয্যায় শয্যাশায়ী। তিনি যতই তোমাকে নিজের থেকে দূর করুন মন থেকে কোনোদিনই দূর করেননি। নাহলে শেষজীবনে এভাবে তোমাকে ডাকতেন না। আমার মতে এই সময় একজন সন্তান হিসেবে তোমার ওনার সামনে দাঁড়ানো উচিৎ।” মৈত্রেয়ী কিছু না বলে চুপ করে মাথা নামিয়ে বসেছিল। সাত্যকি হেসে একহাতে মৈত্রেয়ীর চিবুক ছুঁয়ে বলেছিল, “আঠেরো বছরের প্রেম আর পনেরো বছরের সংসার করেছি তোমার সাথে পাগলী! তোমার মনের কথা আমি জানবো না তো কে জানবে? মুখে যতই বলো না কেন ভেতরে ভেতরে তুমিও তোমার বাবার সাথে দেখা করার জন্য, বাড়ি ফেরার জন্য মরে যাচ্ছ। হাজার হোক রক্তের টানকে কি উপেক্ষা করা যায়?”
“অতশত জানি না। আমরা যাচ্ছি না মানে যাচ্ছি না!” বলে চায়ের কাপ নিয়ে মৈত্রেয়ী সোজা চলে গিয়েছিল রান্নাঘরে। সাত্যকি দু-একবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও মৈত্রেয়ীকে টলাতে পারেনি। শেষে একরকম হাল ছেড়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে ওদের একপ্রকার বাধ্য হয়ে দেশের বাড়ি ফিরে আসতে হল।
এ বাড়িতে আসার পর গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে একবার আলগোছে তাকিয়ে দেখেছিল মৈত্রেয়ী। পনেরো বছরে বাড়িঘর, বাগান, পুকুর, ঠাকুরদালান কিছুই বদলায়নি। সব একইরকম আছে শুধু মানুষগুলো ছাড়া। পনেরো বছর আগের বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ কর্তা-গিন্নিরা অনেকেই আর ইহজগতে নেই। ঠাকুর্দা-ঠাম্মাম, জেঠু-জেঠিমা গত হয়েছেন অনেক বছর হল। মেজকা, ছোটকা দুজনেরই বয়সের কারনে স্বাস্থ্য ভেঙেছে। মেজদা, ছোড়দার চুলেও পাক ধরেছে। সেও কি আর সেদিনের কলেজ পাশ করা মেয়ে আছে নাকি? সেদিনের সেই তারুণ্য ঢাকা পড়ে গেছে মধ্যবয়সের গাম্ভীর্যে।
গাড়ি থেকে নেমে সোজা গটগট করে হেঁটে বাবার ঘরে ঢুকে দোর দিয়েছিল সে। তারপর ঘরের ভেতর বাবা-মেয়ের মধ্যে কি কথা হল কেউ জানে না। ঘন্টাদেড়েক পর ঘর থেকে মৈত্রেয়ী যখন বেরোল তখন তার চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাবা-মেয়ের মানভঞ্জনের সাথে সাথে অশ্রুপাতও অনেক পরিমাণে ঘটেছে। বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখেছিল ইতিমধ্যে দালানের সামনে সাত্যকি আর টুবাইকে নিয়ে বাড়ির লোকেরা মেতে উঠেছে। বিশেষ করে টুবাইকে নিয়ে। দুজনকে একেবারে জামাইআদরে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। ওদের দিকে একঝলক তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল মৈত্রেয়ী।
“এখনই অঞ্জলী শুরু হবে! যারা যারা অঞ্জলী দেবে চলে এসো!” ঠাকুরমশাইয়ের কন্ঠস্বরে ঘোর কেটে গেল মৈত্রেয়ীর। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ঠাকুর দালানের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তারপর টুবাইকে ডাকল সে। মায়ের ডাক শুনে ভাইবোনেরদের নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দালানে হাজির হল টুবাই। এ কদিনে ছেলেটা বাড়ির সকলের আদরের হয়ে উঠেছে। মা-বাবা তো টুবাই বলতে অজ্ঞান। বিশেষ করে মা। রোজ গাদাগুচ্ছের পদ করে খাওয়াচ্ছে। মৈত্রেয়ী বাধা দিতে গেলে বলছে, “থাম দিকিনি! সারাবছরই তো সেই তেল নুন ছাড়া সাঁতলানো খাবার খাস। কটা দিন একটু ভালোমন্দ খেলে কিছু হবে না। জামাইয়ের না হয় শরীর খারাপ বলে বাধ্য হয়ে ওসব অখাদ্য গিলতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমার দাদুভাই? দাদুভাইয়ের কি দোষ? বেচারা তো কিছু খেতেই শিখল না? না সুক্তো, না বড়ি দিয়ে পাঁচমেশালি ঘন্ট। এমনকি বেচারাকে মাছ পর্যন্ত খাওয়া শেখাতে পারলি না। সত্যি করে বল তো মিতু! তুই ওখানে সংসার করিস তো নাকি সারাদিন টিভি দেখে কাটাস?”
টুবাইরা আসার পর ঠাকুরমশাই আরেকবার হাক দিলেন, “এখনই অঞ্জলী শুরু হবে! যারা যারা অঞ্জলী দেবে চলে এসো!” এবার সেই ডাক শুনে দালানের আশেপাশে যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল একে একে দালানের সামনে জড়ো হতে শুরু করল। পুষ্পপত্র থেকে ফুল-বেলপাতা নিয়ে টুবাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে মৈত্রেয়ী একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল সাত্যকি নেই। আশ্চর্য! একটু আগেই তো ঐখানে বসে মেজদাদের সাথে আড্ডা মারছিল। কোথায় গেল? মৈত্রেয়ী উঠে দাঁড়াল। তারপর টুবাইকে জিজ্ঞেস করল, “তোর বাবা কোথায় গেল রে? এই তো ওখানে বসেছিল।”
- বাবা তো এইমাত্র দোতলায় গেল।
- দোতলায় গেল? কেন?
- কে জানে? গল্প করতে করতে আচমকা ফোন এল। সেটা রিসিভ করতে করতে দোতলার সিড়ির দিকে চলে গেল।
- ঠিক আছে তুমি এখানে দিদানের কাছে দাঁড়াও। এখনই অঞ্জলী শুরু হবে। ঠাকুরমশাই যে মন্ত্র বলবেন সেটাকে রিপিট করবে।তারপর সবাই যখন ঠাকুরের দিকে ফুল ছুঁড়বে তুমিও ফুল ছুঁড়বে। তারপর দিদানের থেকে ফুল নিয়ে আবার একই কাজ রিপিট করবে। আমি বাবাকে নিয়ে আসছি।
বলে টুবাইকে অঞ্জলী দেওয়ার জন্য দাঁড়াতে বলে মৈত্রেয়ী এগিয়ে গেল দোতলার সিড়ির দিকে।
ঘরে ঢুকে মৈত্রেয়ী দেখল সাত্যকি বিছানার উপর শুয়ে আছে। একহাত দিয়ে চোখ ঢাকা। কাছে গিয়ে দেখল ঘেমে স্নান হয়ে গেছে সাত্যকি। সকালে পরা নীল পাঞ্জাবীটা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। মৈত্রেয়ী অবাক হয়ে খাটে বসে জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? অবেলায় শুয়ে আছো যে!” চোখ থেকে হাত না সরিয়ে সাত্যকি জবাব দিল, “ও কিছু না। শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল তাই শুয়েছি। অঞ্জলী শুরু হলে ডেকো।”
- শরীর খারাপ লাগছে মানে? সুগার ফল করেনি তো? এই সকালে ওষুধ খেয়েছ?
- আগে অঞ্জলী দিয়ে নিই। তারপর নাহয়...
- রাখো তোমার অঞ্জলী! আগে বাঁচলে তারপর অঞ্জলী দেবে।
বলে গজগজ করতে করতে ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করতে গিয়ে মৈত্রেয়ী দেখল সাত্যকির সুগারের ওষুধটা নিলেও প্রেসারের ওষুধটা তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। মৈত্রেয়ী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল খাটে। সর্বনাশ! কি হবে এখন? এখানে তো সেই ওষুধটা পাওয়াও যাবে না! মেজকাকে বললে ও ম্যানেজ করে অন্য ব্র্যান্ডের ওষুধ দিতে পারে কিন্তু একটু আগেই তো মেজকাকে দালানে অঞ্জলী দিতে দেখল তারমানে তো ওষুধের দোকান বন্ধ! এখন কী করবে? কী করা যায়? ছোড়দাকে একবার ডাকবে? ওতো ডাক্তার...চকিতে সাত্যকির দিকে একবার তাকিয়ে মৈত্রেয়ী বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সাত্যকির শরীর তখন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাসের গতি কমছে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সে। ক্রমশ চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সাত্যকি বুঝতে পারছে প্রেসার ফল করার জন্য ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছে ও। মৈত্রেয়ীকে বেরিয়ে যেতে দেখে সে একবার চেষ্টা করল ওকে থামানোর, কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে সাত্যকি তলিয়ে যেতে লাগল অচৈতন্যভাবের অন্ধকারে। একসময়ে মৈত্রেয়ীর কন্ঠস্বর শুনতে পেল সে। তারপর আর কিছু মনে নেই।
হাতে একটা চিনচিনে ব্যথা টের পেতেই জ্ঞান ফিরল সাত্যকির। আর জ্ঞান ফিরতেই পাশ ফিরে সে দেখল ছোট শ্যালক ওর পাশে বসে আছে। শেষ দুপুরের আলোয় ঘরটা ঝলমলে হয়ে উঠেছে। সেই আলোয় সাত্যকি একঝলক চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল ওদের ঘরে একাধিক লোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শাশুড়ি, শ্বশুর, শ্যালক-শ্যালিকারা বিছানার চারদিকে দাঁড়িয়ে। লজ্জায় উঠে বসতে যাবে এমন সময় পাশ থেকে একটা নরম হাত ওকে বাধা দিল। সাত্যকি তাকিয়ে দেখল ওর মাথার কাছে মৈত্রেয়ী বসে আছে। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল সাত্যকি। চোখ বুঁজে জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ?”
“তা এই ঘন্টাচারেক তো হবে।” ছোটো শ্যালকের গলা পেল সে। ছোটো শ্যালক বলে চলল, “যা টেনশনে ফেলে দিয়েছিলেন আপনি! ব্লাড প্রেসার এত ফ্ল্যাকচুয়েট করে জেনেও উপোস থাকতে গেলেন কেন? ভাগ্যিস মিতু বুদ্ধি করে আমাকে ডাকল। নাহলে তো সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেত। অবশ্য শরীরের আর দোষ কি? কদিন ধরে যা চোব্য চোষ্য চলছে এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে। এবার বুঝলে মা? কেন আমি আর মিতু তোমাকে বারণ করতাম অতো অয়েলি ফুড না দিতে? আগেকার দিন আর নেই! এখন সকলের বয়স হয়েছে। এত রিচ খাবার হজম করার মতো শক্তি আমাদের কারোরই নেই। হতে পারে ওটা তোমাদের কাছে ভালোমন্দ খাবার কিন্তু সুগার-প্রেসার রুগীর কাছে সেটা বিষ!
শ্যালকের কথায় শাশুড়ি মুখে আঁচলচাপা দিয়ে কাঁদছেন দেখে সাত্যকি শ্যালককে থামিয়ে বলল, “আহা খামোখা ওনাকে বকছো! ওনার কোনো দোষ নেই। সত্যি কথা বলতে গেলে দোষ আমারই। মিতু ওষুধ এনেছিল ঠিকই। কাল রাতে ফুরিয়ে যাওয়ায় স্ট্রিপটা ফেলে দিয়েছিলাম। আজ বিকেলেই কিনে আনতাম। ভেবেছিলাম একবেলায় তেমন কিছু হবে না। এতটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি। ইস! আমার জন্য তোমাদের পুজোটাই মাটি হয়ে গেল। শুধু শুধু তোমাদের অহেতুক টেনশনে ফেলে দিলাম, সরি। মা আপনি কিছু মনে করবেন না। চিন্তা নেই আমি এখন ঠিক আছি।”
ছোটো শ্যালক ডাক্তারি সরঞ্জামগুলো ব্যাগে গুছিয়ে বলল, “সে আপনি যাই বলুন সাত্যকিদা। ঐ খাবারগুলো আপনার পক্ষে বিষই। আর আজকের পর আর কেউ দিক বা না দিক অন্তত আমি খেতে দেবো না। মিতুকে বলা আছে। আজ রাত থেকে শুধু চিকেন স্টু আর রুটি আপনার খাদ্য। দুবেলা ওটাই গলাধঃকরণ করতে হবে। আর বাড়ি ফিরে আরেকবার চেকআপ করিয়ে নেবেন। সুগারটাও একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে। আপাতত আজকের দিনটা রেস্ট নিন।” বলে সকলকে ঘর থেকে বেরোবার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল ছোটো শ্যালক। কিছুক্ষণ সেখানে থাকার পর একে একে সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর মৈত্রেয়ীর হাত ধরে সাত্যকি বলল, “টুবাই…?”
সাত্যকির মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মৈত্রেয়ী বলল, “এসেছিল। এখন নিচে বাকি বাচ্চাদের সাথে খেলছে।” চোখ বুঁজে মৃদু হেসে সাত্যকি বলল, “থ্যাঙ্কস!” মৈত্রেয়ী সেটার জবাব না দিয়ে বলল, “থাক! অনেক হয়েছে! সারাদিন অনেক জ্বালিয়েছ এখন আপাতত একটু ঘুমোও। ভালো লাগবে।”
মৈত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে আরেকবার হাসল সাত্যকি। তারপর ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “এখানে আসার পর থেকে দেখছি শাশুড়িমা আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমাকে আর টুবাইকে নিয়ে ওনার আদরের আর শেষ নেই। ‘মেজো জামাই এই...’, ‘মেজো জামাই ঐ...’,‘মেজো জামাই না থাকলে কী যে হত?’ তা আজ তো তাকে তাঁর মেজো মেয়ের প্রশংসা করতে দেখলাম না। তাঁর মেয়েও যে যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে।”
- বাজে কথা না বলে ঘুমোও।
- আমি বাজে কথা বলছি না। সত্যিই তুমি না থাকলে হয়তো এতক্ষণে বৈতরণী পাড়ে চোখ খুলতো আমার।
শশব্যস্তে সাত্যকির মুখে হাত চাপা দেয় মৈত্রেয়ী। তারপর কড়াগলায় বলে, “চুপ! একদম চুপ! আরেকটা কথা বললে ভালো হবে না বলে দিলাম! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না? একে শরীরের এই অবস্থা করে আমাকে পাগল করে দিয়েছ। তারপর মরার কথা বলে জ্বালাচ্ছ! লজ্জা করে না! জানো সারাটা দিন কীভাবে কেটেছে আমার? আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল পুরো! এরপর যদি আরেকবার তোমাকে অনিয়ম করতে দেখি তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন!” বলেই পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে সাত্যকির মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয় মৈত্রেয়ী। সাত্যকি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মৈত্রেয়ীর দিকে। মৈত্রেয়ী নীচু গলায় বলে, “সরি!” সাত্যকি চোখ বুঁজে আলতো গলায় বলে,
- এতে সরি বলার দরকার নেই। দোষ আমারই। আমিই ওষুধের কথা জানাইনি তোমাকে। ভেবেছিলাম তেমন ঝামেলা হবে না, কিন্তু কপাল মন্দ আমার।
- আমি সেভাবে বলতে চাইনি।
- জানি। তুমি আমার স্ত্রী মৈত্রেয়ী। আমাকে ভালোবাসার অধিকার যেমন তোমার আছে তেমনই শাসন করারও আছে। আর শাসন করা তাকেই সাজে সোহাগ করে যে। তবে একটাই আক্ষেপ আছে জানো?
- কী?
একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৈত্রেয়ীর দিকে তাকায় সাত্যকি তারপর বলে, “তুমি না দিন দিন বড্ড বড্ড ঝগড়ুটে বুড়ি হয়ে যাচ্ছ। খালি শাসন করো!” মৈত্রেয়ীও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “কি করব বলো? বর যদি বাচ্চাদের মতো আবদার করে তখন শাসন না করে লাভ আছে? মা বলেছিল ব্যাঙ্গালোরে আমি সংসার করি না। সারাদিন টিভি দেখে বেড়াই। মা কি করে জানবে দুটো ধেড়ে বাচ্চাকে নিয়ে সারাদিন এমন কাটে যে টিভি দেখার প্রয়োজন পড়ে না। নিজের সংসারটাই সিরিয়াল বলে মনে হয়।”
- কি? আমি ধেড়ে খোকা?
- না তো কি? সারাদিন তোমার পেছনে যা ঘুরতে হয় টুবাইয়ের ছেলেবেলাতেও অতো ঘুরতে হয়নি। লকডাউনের আগে তাও ছুটির দিনে আমাকে হেল্প করতে। এখন তো তাও করো না। সারাদিন হয় খাবার নিয়ে নাহয় ওষুধ নিয়ে তোমার পেছনে দৌড়তে হয়। বাচ্চাদের মতো চোখে চোখে রাখতে হয়।
- রাখতে হবে না আমার খেয়াল! কে বলেছে আমার পেছন পেছন দৌড়তে? আমারটা আমিই দেখে নিতে পারি।
- থাক! তোমার দৌড় আমার জানা আছে। নিজে থেকে তো কিছুই করতে পারো না। সব সময় এই আমাকে লাগে তোমার। সারাদিন ‘মিতু আমার চশমা কই?’, ‘মিতু আমার ফোনটা কোথায়?’, ‘মিতু গাড়ির চাবি পাচ্ছি না।’ সবসময় মিতু মিতু আর মিতু। আমি না থাকলে বা একদিনের জন্য বাইরে গেলে বাপ-ব্যাটায় চোখে সর্ষেফুল দেখো। মনে নেই? সেবার সোসাইটির সব মহিলাদের সাথে একটু সিনেমা দেখতে গেছি ওমনি বাবু অফিস থেকে ফিরে গোঁসা করে বসে আছে। অন্যদিন তো রাত আটটার আগে ফেরা হয় না। সেদিন ছটা বাজতে না বাজতে ফিরে আসা হয়েছে।
- বেশ করেছি! অন্যদিন মুভিডেটের কথা বললে বলো, ‘আজ থাক! শরীর ভালো নেই’, ‘টুবাইয়ের পরীক্ষা চলছে।’ আমিও মানুষ! আমারও ইচ্ছে করে নিজের বউকে নিয়ে ডেটে যেতে!
- ইস! শখ কত? বলি বয়সটা দিন দিন বাড়ছে না কমছে?
- বয়সের আর কি দোষ? এরকম সুন্দরী বউ থাকলে সকলের মাথা ঘুড়ে যেতে বাধ্য।
বলে সাত্যকি জড়িয়ে ধরে মৈত্রেয়ীকে। দরজার দিকে একবার তাকিয়ে মৈত্রেয়ী শশব্যস্ত হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে ওঠে, “কি হচ্ছেটা কি? ছাড়ো! বাড়িভর্তি লোকজন! কেউ দেখে ফেললে কি হবে?” মৈত্রেয়ীকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সাত্যকি বলে, “কিছু হবে না। আমার বউকে আমি আদর করছি এতে কে কি ভাবল আই ডোন্ট কেয়ার। তাছাড়া সবাই জানে এ বাড়ির জামাই এখন অসুস্থ। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। আর সেই কারনে অন্তত এবেলা কেউ এদিকে আসবে না। কাজেই এবেলা ম্যারাথন খেললে ধরা পড়ার চান্স নেই।”
“সে গুড়ে বালি মশাই! আরেকটু পরে সন্ধিপুজো শুরু হবে। আর বাড়ির মেয়ে হিসেবে আমাকে থাকতে হবে সেখানে।” বলে সাত্যকির গালে একটা চুমু খেয়ে হাতে চিমটি কাটে মৈত্রেয়ী। মৃদু যন্ত্রণায় সাত্যকির বাহুডোরের জোর একটু আলগা হয়। সেই সুযোগে নিজেকে ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় মৈত্রেয়ী। ওর দিকে তাকিয়ে হতভম্ব সাত্যকি বলে, “আর আমার কি হবে? শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী সেবা পাবো না?” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মৈত্রেয়ী চটুল হেসে “সে পরে দেখা যাবে!” বলে বেরিয়ে যায়। সেদিকে তাকিয়ে আপন মনে হেসে বিছানায় শুয়ে চোখ বোজে সাত্যকি। অনেকদিন পর মৈত্রেয়ীকে এতটা প্রগলভ দেখল সে। ঠিক বিয়ের আগের মতো। নাহ এখানে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ভুল করেনি সে। বরং না এলে আফসোস থেকে যেত চিরকালের মতো। না এলে মৈত্রেয়ীকে এত হাসিখুশি দেখতে পারত সে?
সত্যি কথা বলতে গেলে অনেকদিন ধরে একটা অভিমান জমেছিল দুপক্ষের মধ্যে। যার কারনে কষ্ট পাচ্ছিল দুপক্ষই। কেন পুজোর সময়টাতেই মৈত্রেয়ী বাইরে যাবার প্ল্যান করতে বলতো সে কি আর জানে না? যাতে নিজের মনকে ভুলিয়ে রাখা যায়। যাতে পুজোর সময় নিজের লোকেদের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্টটা ভোলা যায়। কিন্তু পারত কি? সাত্যকি দেখেছে বাইরে বেরোতে গেলেও কীরকম যেন আনমনা হয়ে যেত মৈত্রেয়ী। বাইরে থেকে দেখাত বটে যে এই ট্যুরটা সে এঞ্জয় করছে কিন্তু ভেতর ভেতর গুমড়ে মরত সে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম বাইরে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ রাতে ঘুম ভেঙে সে মৈত্রেয়ীকে কাঁদতে দেখেছে। মৈত্রেয়ীকে সে ভালোবাসে। তাই আজীবন এই অভিমানের খেলায় মৈত্রেয়ী ওর পরিবারের থেকে দূরে থাকুক চায়নি সে। তাই এবছর নিজে থেকেই ছোটো শ্যালকের সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করেছিল সে। তারপর ছোটো শ্যালকের সাথে মিলেই এই পরিকল্পনাটা করে সে। কিন্তু দুজনের কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল মৈত্রেয়ী আর শ্বশুরমশাইকে কনভিন্স করা। মৈত্রেয়ীকে নাহয় ম্যানেজ করা গেল কিন্তু শ্বশুরমশাই? তাকে কিভাবে ম্যানেজ করবে সেটা নিয়েই চিন্তিত ছিল সে। কিন্তু এখানে আসার পর সেই মুশকিলটাও আসান করে দিল টুবাই। নাতিকে সামনে দেখে শ্বশুরমশাই এমন গলে গেলেন যে বাকি কাজটাও সহজ হয়ে গেল। ভাবতে ভাবতে আলতো হাই তোলে সাত্যকি।
ওদিকে মায়ের সন্ধি-পুজো প্রায় শুরুর মুখে। বাড়ির সমস্ত মেয়ে-বউরা একে একে জড়ো হয়েছে ঠাকুর দালানে। মৈত্রেয়ী দোতলা থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে মিশে যায় সেই মেয়ে-বউদের দলে। সকলে মিলে লজ্জাবস্ত্র তুলে ধরে মায়ের সামনে। ঠাকুরমশাইয়ের মন্ত্রোচ্চারণে, ঢাকিদের ঢাকের শব্দে, ঠাকুরদালানের পরিবেশ তখন বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত জ্বলে ওঠা ধূপের ধোঁয়ায় দেবীপ্রতিমার মুখটা প্রায় আবছা হয়ে এলেও সে মুখে আজ যেন বেশ অন্যরকম দীপ্তি দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন প্রতিমার ঠোঁটের হাসিটা একটু চওড়া হয়েছে। এ হাসি ভারী আমোদের হাসি। যেমনটা অনেকবছর পর নিজের প্রিয়জনের সাথে দেখা করার সময় দেখা যায়। যে হাসিটা বহুদিন পর বাড়ির মেয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলে আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে দেখা যায়। যখন মা তার সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসেন চারদিনের জন্য তখন যে হাসিটা আমাদের মধ্যে সঞ্চালিত হয়, এ হাসি সেই হাসি। ধীরে ধীরে সেই হাসিটা ছড়িয়ে পড়ে দালানে উপস্থিত সকলের মধ্যে।
রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২
মায়া
সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব
হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...
-
রেস্তরাঁর ছাদ থেকে অস্তপ্রায় সুর্যর দিকে তাকিয়ে মুখে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন রজতাভ। “কিরে? আর কতক্ষণ?” বলে ঐশ্বর্...
-
“Ladies and gentlemen, may I have your attention please? Thank you! আজ আমরা সকলে এখানে উপস্থিত হয়েছি আমার প্রিয় বন্ধু প্রখ্যাত চিত্রশিল্প...
-
স্টুডিও থেকে গাড়িটা বেরোনো মাত্র ব্যাকসিটে হ্যালান দিয়ে বসল মঞ্জুষা। সারাদিন আজ বড্ড ধকল গেছে। এই সোমবার ওদের সেটে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে না...



