অনুসরণকারী

শুক্রবার, ৪ নভেম্বর, ২০২২

ভ্যাকেশন



স্টুডিও থেকে গাড়িটা বেরোনো মাত্র ব্যাকসিটে হ্যালান দিয়ে বসল মঞ্জুষা। সারাদিন আজ বড্ড ধকল গেছে। এই সোমবার ওদের সেটে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে নাচের সিকোয়েন্স আছে। আজ তারই রিহার্সাল ছিল। আর আজকের রিহার্সালেই ডিরেক্টর আর কোরিওগ্রাফার ওর সমস্ত এনার্জি শুষে নিয়েছে। এমনিতে মঞ্জুষা নাচ ভালোবাসলেও আজকের স্টেপগুলো ভীষণ টাফ ছিল। কিছুতেই আয়ত্তে আসছিল না। এদিকে কোরিওগ্রাফার মহা ত্যাঁদড়! স্টেপ না তুলতে পারলে কিছুতেই ছাড়বে না। ফলে সারাদিন ধরে নাচার কারণে  সারা শরীর যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে ওর। এখন বাড়িতে গিয়ে কোনোমতে বিছানায় এলিয়ে পড়লে বাঁচে ও। একদিকে মন্দের ভালো যে কাল থেকে পর পর তিনদিনই ছুটি আছে। এই তিনদিন সে একটু রেস্ট নিতে পারবে। গত সপ্তাহে সেটে চোট লাগার পর ডাক্তার ওকে রেস্ট নিতে বললেও সিরিয়ালের মেন লিড হওয়ায় সেটা আর নেওয়া সম্ভব হয়নি। মঞ্জুষা নিজেই ইচ্ছে করে নেয়নি। যদিও রেস্টটা ওর দরকার তবুও সারা সপ্তাহের টাইট শিডিউলের মাঝে ডিরেক্টরের কাছে মুখ ফুটে রেস্টের কথা বলতে পারেনি সে। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রামতো এসে গিয়েছিল মঞ্জুষার। আচমকা ফোনের শব্দে উঠে বসে স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। একমুহূর্ত স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল মঞ্জুষা। সঞ্জয় ফোন করেছে। সঞ্জয় সেনগুপ্ত ওর প্রথম সিরিয়ালের হিরো ছিল। বর্তমানে ওর জিম পার্টনার কাম মেন্টর। শুধু তাই নয়, সদ্য চারটে ওয়েবসিরিজ আর একটা সিনেমাতেও সঞ্জয় অভিনয় করেছে। সঞ্জয়ের সাথে মঞ্জুষার আলাপ বছর ছয়েক আগে একটা সিরিয়ালের সেটে। ওরা দুজনে সিরিয়ালের লিড ছিল। যদিও সে আলাপটা তেমন জমেনি। দুʼজনে দুʼজনের মতো কাজ করে যে যার বাড়ি ফিরে যেত। কিন্তু একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটলো যার ফলে মঞ্জুষার একান্ত প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠলো সঞ্জয়। 

একবার শ্যুটিং চলাকালীন একটা দুর্ঘটনায় মঞ্জুষার পা মারাত্মকভাবে জখম হয়। হয়তো ও মারাও পড়তে পারতো যদি না সঞ্জয় এগিয়ে আসত। ওরই তৎপরতায় সেবার বেঁচে যায় মঞ্জুষা। তারপর থেকে ওদের বন্ধুত্বের সূচনা হয়। সেবার গোড়ালিতে চোটটা এতটাই বেশি ছিল যে বেশিক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারতো না মঞ্জুষা। সে সময় সঞ্জয়ের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ইনজুরি সেরে সুস্থ হয় ও। 

মঞ্জুষার মনে আছে সে সময়গুলোয় সঞ্জয় একজন প্রকৃত বন্ধুর মতো ওকে আগলে রেখেছিল। ওর মন ঠিক রাখা থেকে পায়ের ফিজিওথেরাপি সব কিছুর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। সে সময় টলিপাড়ায় ওদের সম্পর্ক নিয়ে কম কানাঘুষো হয়নি। বিশেষ করে যখন সঞ্জয় ওর ক্যাসানোভা ইমেজের ফলে একাধিক অভিনেত্রীর সাথে সম্পর্ক রাখার জন্য টলিপাড়ায় বিখ্যাত। ইন্ডাস্ট্রিতে তখন নবাগতা মঞ্জুষা প্রথমে এসব নিয়ে বিব্রত হলেও পোড়‌খাওয়া আর্টিস্ট সঞ্জয় এসব কি‌ছু‌ই গায়ে মাখেনি। বরং দীর্ঘ অধ্যবসায়ের সাথে মঞ্জুষাকে সুস্থ করে, একবছরের মাথায় গ্রুমিং করে এক অ্যাওয়ার্ড শোয়ে সকলের সামনে দাঁড় করিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল সব নিন্দুকের মুখ। সকলে হা হয়ে দেখছিল একবছর ‌আগে ইন্ডাস্ট্রিতে আসা বেঢপ আনকোরা মেয়েটা বছর ঘুরতে না ঘুরতেই মডেলদের মতো ছিপছিপে আর যথেষ্ট আবেদনময়ী হয়ে উঠেছে। 

তারপর থেকে মঞ্জুষাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে একের পর এক মেগা সিরিয়ালের অফার পেতে শুরু করে সে। বর্তমানে চারটে মেগা সিরিয়াল শেষ করার পর মঞ্জুষা টেলিজগতে এক ভীষণ পরিচিত মুখ। রাস্তায় বেরোলে রীতিমতো ভীড় পড়ে যায়। সবটাই যে সঞ্জয়ের বদান্যতায় সেটা বলাই বাহুল্য। মঞ্জুষা সেটা জানেও এবং এ জন্য সে সঞ্জয়ের প্রতি কৃতজ্ঞও বটে। সঞ্জয় না থাকলে হয়তো ইন্ডাস্ট্রিতে টেঁকা দায় হতো তার। হয়তো কম্পিটিশনের দৌড়ে হারিয়েও যেতে পারত সে। সঞ্জয়ের কারণে সেটা আর সম্ভবপর হয়নি। এই ছয় বছরে অবশ্য সঞ্জয়ের সাথে ওর সম্পর্কটা শুধু বন্ধুত্বতেই আটকে থাকেনি। বরং দিনের পর দিন ওরা পরস্পরের আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, গোপনে বিয়েটাও সেরে ফেলেছে ওরা। মঞ্জুষার আজও মনে আছে সেবার পাহাড়ে শ্যুটিং করতে গিয়ে ওদের প্রথম কাছে আসা। সেবার সঞ্জয়ই আচমকা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল ওকে। প্রস্তাবটা এতটাই নাটকীয় আর রোমান্টিক ছিল যে মঞ্জুষা রাজি না হয়ে থাকতে পারেনি। এখনও পর্যন্ত ব্যাপারটা পাবলিক আর মিডিয়ার কাছে লুকোনো থাকলেও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে থাকা কিছু সুহৃদ বন্ধুরা জানে এই ব্যাপারটা। বাকি সকলে জানে দুজনে লিভ ইন রিলেশনে আছে। ভবিষ্যতে বিয়ে করবে। প্ল্যানটা সঞ্জয়েরই। ও চায় না মঞ্জুষা প্রতিষ্ঠিত হবার আগে কেউ জানুক ও বিবাহিত।তেমন হলে পরে সোশ্যাল ভাবে একটা অনুষ্ঠান করা যাবে। কিন্তু তার আগে ওদের বিয়ের ব্যাপারটা যাতে কাকপক্ষীতেও টের না পায়। মঞ্জুষাকে পইপই করে এ ব্যাপারে মুখ বন্ধ রাখতে বলেছে সঞ্জয়। সঞ্জয়ের কলটা দেখে সেই কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু হেসে ড্রাইভারের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে রিসিভ করল মঞ্জুষা। 

- বলো! 

- কোথায় আছো? 

- এই তো শ্যুটিং সেরে বাড়ি ফিরছি। 

- বাড়ি ফিরছ মানে? তুমি বেরিয়ে পড়েছ? 

- হ্যাঁ! কেন বলো তো? 

- আজ সকালে আমাদের মধ্যে একটা কথা হয়েছিল মনে আছে?

কথাটা শোনামাত্র আচমকা মঞ্জুষার মনে পড়ে গেল আজ বিকেলের দিকে ওদের মন্দারমনিতে যাওয়ার কথা ছিল। সারা সপ্তাহের টাইট শিডিউল শেষে তিনদিন ছুটি থাকায় সঞ্জয়ই এমনভাবে প্রস্তাবটা দিয়েছিল যে মঞ্জুষা রাজি না হয়ে থাকতে পারেনি। কথা ছিল শ্যুটিং সেরেই দুজনে একসাথে রওনা দেবে। সেই মতো দু'জনে দু'জনের লাগেজ গুছিয়ে নিয়ে এসেছিল। সারাদিনের রিহার্সালের চাপে শেষে ক্লান্ত মঞ্জুষা একেবারেই ভুলে গিয়েছিল ব্যাপারটা। জিভ কেটে সে বলে, “এ বাবা! একেবারে মাথা ‌থেকেই বেরিয়ে গিয়েছিল। আসলে আজ সারাদিন রিহার্সালে এমন ব্যস্ত ছিলাম যে...” ওপাশ থেকে সঞ্জয় মঞ্জুষাকে থামিয়ে বলে,“ইটস ওকে৷ খুব টায়ার্ড মনে হচ্ছে৷” মঞ্জুষা হেসে বলে, “তা একটু আছি। আজ সারাদিন ডিরেক্টর আর কোরিওগ্রাফার ধেই ধেই করে নাচিয়েছে কিনা? সারা শরীরের নাটবল্টু ঢিলে হয়ে গেছে!” 

ওপাশ থেকে সঞ্জয়ও হাসে, “তাও বটে। তোমাদের সেটে আজকাল প্রায়ই নাচগান হচ্ছে দেখছি। আচ্ছা বেশ তাহলে থাক। তুমি বরং বাড়ি গিয়ে রেস্ট নাও। সারাদিন নাচার পর তুমি টায়ার্ড এরপর জার্নির ধকল নিতে পারবে না। রাতে রান্নার ঝামেলা করার আর দরকার নেই। খাবার আমি নিয়ে আসবো কেমন? এখন তাহলে রাখছি।” বলে মঞ্জুষাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আচমকা কলটা কেটে দেয় সঞ্জয়। মঞ্জুষা বোঝে সঞ্জয় মুখে না বললেও ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু কিছু করার নেই। আর্টিস্টদের জীবন এমনই হয়। কোনো ছুটি নেই, নিজের মতো বাঁচা নেই। এমনকি বিয়ের পর সঞ্জয়ের সাথে লাস্ট কবে বেড়াতে গেছে সেটাও মনে নেই। 

গতবছর চারটে ওয়েবসিরিজ আর একটা সিনেমায় অভিনয় করে ভালো টাকা পেয়েছিল সঞ্জয়। এছাড়া সিরিয়াল থেকে এবং বিভিন্ন মঞ্চে শো করে মঞ্জুষারও ভালো টাকা জমেছিল। সেই টাকা দিয়ে দুজনে মিলে এবারের ট্রিপে একসাথে সময় কাটাবে বলে মন্দারমনিতে একটু নিরিবিলি এলাকায় একটা কটেজ ভাড়া করেছিল। ভেবেছিল এই তিনদিন দেদার খাওয়া আর মজা করবে ওরা। সোজাসুজি বলতে গেলে এটা ওদের মধুচন্দ্রিমা হতে পারতো। ওর একটু ভুলের জন্য সমস্ত প্ল্যানটা ভেস্তে গেল। ছলছলে চোখে গাড়ির জানলার দিকে তাকাল মঞ্জুষা। ইস কেন রিহার্সালের শেষে থেকে গেল না ও? কেন অপেক্ষা করলো না সঞ্জয়ের? আরেকটু থেকে গেলে... ভাবতে ভাবতে আচমকা একটা আইডিয়া খেলে গেল ওর মাথায়।

আড়চোখে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ফোনের নেট অন করলো সে। তারপর হোয়াটসঅ্যাপে গিয়ে দেখলো সঞ্জয় অনলাইন আছে। চটপট সঞ্জয়ের ইনবক্সে টাইপ করলো সে, “আমাকে রাস্তা থেকে পিকআপ করতে পারবে?” মেসেজটা রিসিভ হওয়ার সাথে সা‌থে সঞ্জয়ের রিপ্লা‌ই এল, “মানে?” মঞ্জুষা ঝড়ের গতিতে টাইপ করল, “বলছি আমাকে মাঝরাস্তায় পিকআপ করতে পারবে? তাহলে একসাথে বেরিয়ে যেতাম।” কিছুক্ষণ পর সঞ্জয়ের রিপ্লাই এল, “পারবো! কিন্তু তোমার শরীর?” মঞ্জুষা সঙ্গে সঙ্গে টাইপ করলো, “সে তোমার সাথে থাকলে এমনিতেও ফিট হয়ে যাবে। যাবে? যদি যেতে চাও তাহলে লোকেশন বলে দেব।” ওপার থেকে সম্মতি আসতেই মঞ্জুষা ওর পিকআপ লোকেশন জানিয়ে নেট অফ করে দিল।

*****

গাড়িটা যখন মঞ্জুষার পাড়াতে ঢুকবো ঢুকবো করছে তখন মঞ্জুষা সঞ্জয়কে মেসেজ করে রেডি থাকতে বলে ড্রাইভারকে সাইডে গাড়ি দাঁড় করাতে বলল। অজুহাত হিসেবে জানাল এ পাড়ায় একজনের জন্মদিনে ওর নিমন্ত্রণ আছে। সেটা অ্যাটেন্ড করতে হবে ওকে। ড্রাইভার প্রথমে গাঁইগুঁই করলেও একসময় বাধ্য হয়ে মঞ্জুষাকে নামিয়ে দিল পাড়ার আগে। গাড়ির ডিক্কি থেকে ব্যাগ নামিয়ে মঞ্জুষা দাঁড়াল মোড়ের মাথায়। ওকে নামিয়ে গাড়িটা ফিরে গেল নিজের আস্তানায়। কিছুক্ষণ পরে মঞ্জুষার সামনে এসে দাঁড়াল আরেকটা কালো রঙের গাড়ি। জানলার কাঁচ নামিয়ে সঞ্জয় বলে উঠল, “কে‌উ দেখে ফেলার আগে ‌উঠে এসো।”
গাড়ির ব্যাকসিটে ব্যাগ রেখে মঞ্জুষা বসল সঞ্জয়ের পাশের সিটে। সঞ্জয় সঙ্গে সঙ্গে জানলার কাঁচ তুলে গাড়ি স্টার্ট করতেই মঞ্জুষা দুহাতে সঞ্জয়কে জড়িয়ে ধরে একটা গভীরভাবে চুমু খেল। কিছুক্ষণ পর সঞ্জয় নিজেকে ছাড়িয়ে অভিমানের সুরে বলে উঠল, 

- আমি তো ভেবেছিলাম এবারের ট্রিপটাও বোধহয় গেল! আমার মঞ্জুবেবিকে আর আদর করতে পাবো না। 

মঞ্জুষা সঞ্জয়ের চুলগুলো ঘেটে দিয়ে বলল, “‌‌তা‌ই কখনো হয়? আমার সঞ্জুবেবি ট্রিপ প্ল্যান করবে ‌আর আমি যাবো না? নাও আর দেরী করো না। এখান থেকে নিয়ে চলো আমাকে অনেক দুরে। কোনো সমুদ্রের তীরে। যেখানে থাকবো শুধু তুমি আর আমি। মাঝে কেউ থাকবে না।” বলে মঞ্জুষা সিটে হেলান দেয়। সঞ্জয় মুচকি হেসে মঞ্জুষার দিকে তাকায়। তারপর গাড়ি চালাতে শুরু করে। মাঝরাতে প্রেমের এই গোপন অভিসারে ব্রতী দুজনকে নিয়ে কলকাতার বুক চিরে বেরিয়ে যায় কালো রংয়ের গাড়িটা।

*****

মন্দারমনিতে আসার সময় মঞ্জুষার ভীষণ ইচ্ছে ছিল সমুদ্রে নামবে। কিন্তু আগের দিন অতো পরিশ্রমের পর সারারাত জেগে অতো দুর জার্নি করার ফলে ওর শরীর আর সায় দিল না। কটেজে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ব্রেক ফাস্ট সেরে নেওয়ার পর বিছানায় লুটিয়ে পড়ল সে। সঞ্জয়ও আর মঞ্জুষাকে ঘাটাল না। প্রায় সারাদিন নিজের ঘরে অচেতন হয়ে পড়ে থাকার পর মঞ্জুষার ঘুম যখন ভাঙল তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়েই সে বুঝল সমগ্র শরীর যন্ত্রণায় টনটন করছে। কিছুক্ষণ পর সঞ্জয় দুটো কফিমগে ব্ল্যাক কফি নিয়ে ঘরে ঢুকে বলল, “ঘুম ভাঙলো বেবি?” তারপর ঘরের সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা রেখে মঞ্জুষার দিকে তাকাতেই বু‌ঝলো কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। মঞ্জুষাকে জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল সারা শরীর যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। সঞ্জয় বুঝলো কাল সারাদিন নাচ করার ফলে মাসলপেইন হচ্ছে মঞ্জুষার। সঙ্গে সঙ্গে সে মঞ্জুষার পাশে গিয়ে বসল। তারপর বলল, “বুঝেছি। মাসলপেইন হচ্ছে। কোনো ব্যাপার না। চট করে বা‌থরুমে গিয়ে ঠাণ্ডা জলে স্নান সেরে নিয়ে কফিটা ‌খেয়ে নাও। দেখবে ‌শরীরটা বে‌‌শ ফ্রি লাগছে। পারবে তো বাথরুমে যেতে?” মঞ্জুষা মাথা নেড়ে কোনোমতে সঞ্জয়ের সাহায্যে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। 

বাথরুমে শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে শীতলধারায় স্নান করার পর শরীরের ক্লান্তিটা সত্যিই অনেকটাই কমে গেল মঞ্জুষার। স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল সঞ্জয় এরমধ্যেই বিকেলের জলখাবার এনে জড়ো করেছে টেবিলে। সেদিন সারা সন্ধ্যে সঞ্জয়ের সাথে আড্ডা দিয়েই কাটানোর পর রাতে মঞ্জুষা যখন ঘুমোতে গেল ততক্ষণে ওর শরীরের ও মনের দুটোরই ক্লান্তি অনেকটাই কমে গেছে। 

*****

পরদিন সকাল সকাল দু'জনে মিলে বেরিয়ে পড়ল আশেপাশের জায়গা দেখতে। গাড়িতে করে একে একে তালসারি, উদয়পুর, ওল্ড দীঘা ঘুরে ওরা যখন ফিরল ততক্ষণে সুর্যদেব পাটে যেতে বসেছেন। গাড়িটাতে গ্যারাজে পার্ক করে কেয়ারটেকারকে কফির অর্ডার দিয়ে সঞ্জয় যখন ঘরে ঢুকল মঞ্জুষা ততক্ষণে ওর রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। বৈঠকখানর সোফায় হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরাল সঞ্জয়। তারপর হাতে পরা কড়ির ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে ক্লান্তভাবে সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। মেজাজটা দুপুরবেলা থেকে খিঁচড়ে আছে। সব ঠিকঠাক থাকলে ওরা আরো আগে ফিরে ‌আসতো কিন্তু বাঁধ সাধলো মঞ্জুষা নিজে।

উদয়পুর সি-বিচে নেমে খাওয়াদাওয়া সেরে ফেলার পর মঞ্জুষা আবদার করে বসল একটা মালা আর একটা কড়ির ব্রেসলেটের। ওর ইচ্ছে এই দুটো জিনিস এই ট্রিপের স্মৃতি হিসেবে রাখবে। সঞ্জয় প্রথমে ‌একটু ‌আপত্তি করেছিল বটে। একে এই ট্রিপটা ভীষণ কনফিডেন্সিয়াল, তার উপর ওরা এখন রীতিমতো সেলেব। আর এরকম ঘিঞ্চি এরিয়ায় কোনো সেলেব এলে কী রকমের হট্টগোল হতে পারে তার কোনো ধারণা মঞ্জুষার নেই। সে মঞ্জুষাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও অবশেষে মঞ্জুষার জেদের কাছে হার মেনে বাজারে ঢোকে। আর বাজারে ঢোকার পর সঞ্জয় যে ভয়টা করছিল সেটাই হয়। দু-তিনজন মহিলা পর্যটক ওদের চিনে ফেলায় রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে যায় বাজারে। তারপর যা হয় আর কি। ভক্তদের সেলফির আবদার মিটিয়ে ওরা যখন রওনা দিল ততক্ষণে ঘড়ির কাটা দুপুর তিনটে পেরিয়ে গেছে। বলাই বাহুল্য ঘটনাটা সঞ্জয়ের ভালো লাগেনি। বস্তুত ওরকমভাবে আচমকা স্টার অফ ক্রাউড হয়ে যাওয়াটা মোটেও ভালো লক্ষ্যণ নয়। যেখানে এই ট্রিপটা একদম গোপনীয় রাখতে চেয়েছিল সে। এতগুলো লোক, এত সেলফি, ওরা যে এখানে একসাথে আছে সেটা চাউর হতে কতক্ষণ? আর একবার সেটা চাউর হলে মঞ্জুষার আর ওর কেরিয়ারের পক্ষে মোটেও ভালো হবে না। সাংবাদিকরা নানা রকম রুমার ছড়াবে, আবার একাধিক কেচ্ছা লেখা হবে, মিম, ট্রোলের বন্যা বয়ে যাবে। যেটা মোটেও ভালো নয়। গাড়ি করে ফেরার পথে সেটা‌ই সে মঞ্জুষাকে বোঝাতে চেয়েছিল, কিন্তু মঞ্জুষা বোঝেনি। উল্টে সঞ্জয়কে ওভার রিঅ্যাক্ট করছে বলে ঝগড়া করেছে। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে একটু ‌আনমনা হয়ে গিয়েছিল সঞ্জয়। কেয়ারটেকারের ডাকে সে সোজা হয়ে বসলো সে। তাকিয়ে দেখল কেয়ারটেকার সেন্টার টেবিলে কফিমগ আর চিকেন পকোড়ার ট্রে-টা রেখে ওর দিকে তাকিয়ে ‌আ‌‌‌ছে। সঞ্জয় ওর দিকে তাকাতেই সে জানাল রাতের খাবার তৈরী হয়ে গেছে। আর কিছু লাগবে কিনা। সঞ্জয় মাথা নেড়ে বলল, “আর কিছু লাগবে না। এক কাজ করো, তুমি বাড়ি চলে যাও। রাতের খাবার আমরাই গরম করে খেয়ে নেব। কাল সকালে চলে ‌এসো কেমন?” কেয়ারটেকার তাও দাঁড়িয়ে ‌আছে দেখে ভ্রু কুঁচকে সঞ্জয় জিজ্ঞেস করে, “কিছু বলবে?” 

- কালকে তো ‌আমার আসা হবে না স্যার। একেবারে পরশু আসবো। 

কথাটা শোনার পর সঞ্জয় কিছুক্ষণ একদৃষ্টে কেয়ারটেকারের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলে, “মানে?” কেয়ারটেকার হাত কচলে বলে, “আসলে স্যার ব্যাপারটা হয়েছে কি...ইয়ে মানে আমি বাবা হতে চলেছি স্যার। কালকেই ডেলিভারীর ডেট পড়েছে। মালিককে জানাব ভেবেছিলাম কিন্তু তার আগেই মালিক জানাল আপনারা ‌আসছেন তাই...” 

কথাটা শোনামাত্র সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সঞ্জয়। তারপর পকেট থেকে পার্স বের করতে করতে বলে, “আগে বলবে তো! ইস ছিঃ! ছিঃ! কি কাণ্ড! তোমার বউ ওদিকে সন্তানসম্ভবা, কোথায় এসময় তোমার তার কাছে থাকা উচিত তা না করে তুমি...কালকেই আমাকে বলতে পারতে! তাহলে কালকেই তোমাকে ছেড়ে দিতাম। আচ্ছা বেশ তুমি বরং পরশুদিনই এসো। দাঁড়াও এটা নিয়ে যাও।” বলে পার্স থেকে দুটো পাঁচশো টাকার নোট বের করে কেয়ারটেকারের দিকে এগিয়ে দিতেই কেয়ারটেকার মাথা নেড়ে টাকাটা নিতে অস্বীকার করে। সঞ্জয় হেসে বলে, “আরে এটা তোমার বকসিসের টাকা নয়, এটা আমার আর ম্যাডাম মানে আমাদের তরফ থেকে তোমার স্ত্রী আর যে আসছে তার জন্য উপহার। যাওয়ার পথে কিছু কিনে নিও। কংগ্রাচুলেশনস!” কেয়ারটেকার হেসে মা‌থা নেড়ে টাকাটা নিয়ে চলে যেতেই সঞ্জয় ভেতর থেকে সদর দরজাটা আটকে দেয়। তারপর একঝলক ব্রেসলেটটার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। 

সত্যি কথা বলতে গেলে উদয়পুর ভ্রমণে সবটা যে খারাপ হয়েছে তা নয়। বরং কিছুটা লাভও হয়েছে বটে। ওখানে না গেলে এরকম সুন্দর ব্রেসলেটটা সে পেত কি? মঞ্জুষা একটু ইমম্যাচিওর তবে ওর চয়েসের প্রশংসা করতে হয়। নাহ! আজ একটু বেশিই রিঅ্যাক্ট করে ফেলেছে মেয়েটার উপর। সত্যিই তো মেয়েটা বেশি কিছু চায়নি। এবার মানভঞ্জন করতে হবে নাহলে ট্রিপটাই মাটি হয়ে যাবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে কফির ট্রে-টা হাতে নিয়ে সঞ্জয় এগোয় মঞ্জুষার ঘরের দিকে। 

*****

উদয়পুর ‌থেকে ফেরার পর থেকে মঞ্জুষার মনটাও ভার হয়ে ‌আছে। কি ‌এমন অন্যায় ‌আবদার করেছিল সে যে সঞ্জয় এভাবে রিঅ্যাক্ট করলো? কোথাও বেড়াতে এলে কিছু কেনাকাটা করবে না তা আবার হয় নাকি? মানছে সে এখন আগের মতো সাধারণ মানুষ নয়, তার কিছুটা পরিচিতি হয়েছে, তাই বলে সে ট্রিপটাকে উপভোগ করবে না? এবার ওকে দেখে বাজারে ভীড় জমে গেলে সেটা ওর দোষ? একটা মালা আর একটা ব্রেসলেটই তো কিনতে চেয়ে‌ছিল সে! তাতেও সঞ্জয় এত বাজেভাবে রিঅ্যাক্ট করবে জানলে কিছুতেই ‌আসতো না ওর সাথে। 

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে পরনের পোশাক খুলতে খুলতে ‌আয়নার দিকে তাকায় মঞ্জুষা। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে একঝলক তাকানোর পর ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করে মালাটা। একটা খুবই সাধারণ পুঁতির মালা। মাঝে কড়ি দিয়ে সাজানো একটা বৃত্তাকার লকেট  ঝুলছে। লকেটের মাঝে একটা সবুজ রঙের পাথর। ফর্সা গায়ের রঙের সাথে দিব্যি মানিয়েছে মালাটা। যেন ওর রূপটাকে আরো খোলতাই করেছে। আয়নায় লকেটটার দিকে তাকিয়ে একটু আনমনা হয়ে পড়েছিল মঞ্জুষা। এমন সময় ওকে প্রায় চমকে দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে সঞ্জয়। 

ঘরে প্রবেশ করামাত্র বিবসনা মঞ্জুষাকে দেখে প্রথমে থমকে গেলেও পরক্ষণে নির্বিকারভাবে ট্রে-টা ঘরের টেবিলে রেখে সোফা থেকে টাওয়েলটা মঞ্জুষার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে সঞ্জয় বলে ওঠে, “ফ্রেশ হয়ে এসো। কফি খেতে খেতে কথা হবে।” প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে টাওয়েলটা দিয়ে কোনোমতে নিজের লজ্জা নিবারণ করে বাথরুমের দিকে দৌড় লাগায় মঞ্জুষা। সেদিকে তাকিয়ে ট্রে-তে রাখা প্লেট থেকে একটা চিকেন পকোড়া তুলে বিছানায় বসে  খেতে খেতে আনমনে হেসে সঞ্জয় বলে ওঠে, “পাগলী একটা।” 

“আশ্চর্য লোক একটা! সামান্য লজ্জাবোধ তো দূর, সামান্য জ্ঞানটুকু পর্যন্ত নেই! কারো ঘরে ঢুকতে গেলে নক করতে হয় সেটুকু সহবত নেই! কেমন গটগট করে ঢুকে গেল দেখো! আবার হুকুম করা হচ্ছে! তোর হুকুমের নিকুচি করেছে! ভাব করতে এসেছে! মানভঞ্জন! হুহ! কেন? তখন গাড়িতে বকার সময় মনে ছিল না?” কথাগুলো মনে মনে বলে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তলায় দাঁড়াল মঞ্জুষা। লোকটাকে দেখলেই রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে!  দাঁতে দাঁত চিপে রাগটাকে প্রশমিত করে মঞ্জুষা শাওয়ার চালিয়ে দিল। 

স্নান সেরে গায়ে টাওয়েল জড়িয়ে বাথরুমের বাইরে বেরিয়ে মঞ্জুষা দেখল সঞ্জয় বিছানায় বসে আয়েস করে চিকেন পকোড়া খাচ্ছে। মঞ্জুষাকে বাথরুম থেকে বেরোতেই হেসে বলল, “পকোড়াটা বেশ করেছে! খাবে নাকি?”

কথাটা শোনামাত্র আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না মঞ্জুষা। ছুটে গিয়ে সঞ্জয়ের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। কিল-চড়-ঘুষি মেরে, আঁচড়ে কামড়ে জেরবার করে তুলল সঞ্জয়কে। দুই হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল ওর পরনের টিশার্ট। আর সঞ্জয়! সে হাসিমুখে সহ্য করতে লাগল মঞ্জুষার এই মিষ্টি অথচ নির্মম শাসনকে। কিছুক্ষণ অত্যাচার করার পর ক্লান্ত হয়ে মঞ্জুষা কাঁদতে কাঁদতে শুয়ে পড়ল সঞ্জয়ের বুকের উপর। সঞ্জয় দুহাতে মঞ্জুষাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, “এবার শান্তি হয়েছে? রাগ কমেছে? না মানে রাগ যদি কমে তাহলে আমার মতটা জানাতে পারি কি?” কথাটার প্রত্যুত্তরে মঞ্জুষা সঞ্জয়ের বুকে একটা আলতো কিল মারলে সঞ্জয় হেসে বলে, “আচ্ছা বাবা আমার ঘাট হয়েছে, সরি। কিন্তু ভেবে দেখো তো, আমি কি তোমায় এমনি এমনি বকেছি নাকি? বকেছি তো তোমার ভালোর জন্য। দেখো মঞ্জু, এই ইন্ডাস্ট্রিতে তুমি ক'বছর হল এসেছ। আর আমি এসেছি প্রায় বছর বারো হতে চলল। এই ইন্ডাস্ট্রিকে যতটা তুমি চেনো, তার চেয়ে বেশি ‌আমি চিনি। বরং নোংরা দিকটাই বেশি চিনি। এখানে টিকে থাকতে গেলে পরিশ্রম যেমন দরকার! তেমনই দরকার লড়াই করে নিজের জায়গা ধরে রা‌খার। এখানে সুযোগ আসে না মঞ্জু, সুযোগ তৈরী করে নিতে হয়। মৈত্রেয়ীদিকে দেখো না। ইন্ডাস্ট্রিতে ছয়বছর হতে চলল অথচ এখনও সেই সিরিয়ালেই আটকে। সিনেমায় রোলের জন্য পাগলের মতো ‌‌খাটছে, একের পর এক ট্রোল সহ্য করে পোর্টফোলিও করাচ্ছে অথচ চান্স পাচ্ছে কি? এদিকে নিজেরই কলিগ ঐশিকাকে দেখো, একটা মেগা শেষ হবার ‌আগেই আরেকটা মেগা, দুটো ওয়েবসিরিজ ধরে বসে আছে। কেন? মৈত্রেয়ীদির পোর্টফোলিওতে বোল্ডনেস থাকলেও ঐশিকার মতো পোর্টফোলিওতে বিকিনি ছবি, বা চুমুর দৃশ্যে অভিনয়ের গাটস নেই। এটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, এখানে যত বেশী ‌খুলবে, তত বেশী চান্স পাবে। একজন ‌অভিনেতার অভিনয় জীবন মানে প্রাইম টা‌ইম যেখানে ষাট বছর, সেখানে একজন অভিনেত্রীদের জন্য বরাদ্দ মাত্র দশবছর। মানে ‌আজ থেকে তিরিশ বছর পরেও যদি এই চেহারা আমার ‌থাকে তাহলে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতে পারবো আমি। কিন্তু তুমি পারবে না। এই দশটা বছর কাজে লাগানো বা লাইমলাইটে থাকা সহজ নয়! তোমার অভিনয়ে দাগ না কাটতে পারলে ঐ আইক্যান্ডি হয়েই থেকে যাবে তুমি। দিনের ‌শেষে বয়স হলে ‌আর পাত্তা পাবে না কারো কাছে। তখন লাইমলাইটে থাকতে হয় কোনো প্রোডিউসারকে বিয়ে করতে হবে, নাহলে এমন বিতর্ক তৈরী করতে হবে যাতে তুমি নিউজে হট টপিক হয়ে থাকো। তোমাকে দেখে বুঝেছি তোমার মধ্যে ছাইচাপা আগুন ‌আছে। শুধু আইক্যান্ডি হয়ে বা হটটপিক হয়ে থাকতে ‌আসোনি তুমি! সেই কারণেই তোমাকে বার বার নিজের অভিনয়স্বত্তাকে ইউটিলাইজ করতে বলি আমি। কোনোরকম কন্ট্রোভার্সি বা নিউজ থেকে দূরে থাকতে বলি। আজ যেটা হল সেটা কিন্তু নিউজের হটটপিক ছাড়া কিছু নয়। এই যে তুমি এত ঘটা করে সেলফি তোলালে এতে টলিপাড়া কতটা সরগরম হবে বুঝতে পেরেছ? কতটা কানাঘুষো, কতটা ফিসফাস হবে ‌আমাদের সম্পর্কটাকে নিয়ে সেটার কোনো ‌ধারণা আছে? একবার যদি আমাদের বিয়ের কথাটা ফাঁস হয়ে যায় তাহলে আমার কিছু যাবে না ঠিকই কিন্তু এফেক্টটা পড়বে তোমারই কেরিয়ারের উপর। সে কারণেই বকেছি তোমাকে। আমাকে প্রমিস করো ‌আর কোনোদিন এভাবে ওপেনলি পাবলিকের সামনে হাজির হবে না।” 

সঞ্জয়কে জড়িয়ে ওর বুকে লেপ্টে থাকা মঞ্জুষা চুপ করে এতক্ষণ ধরে ওর কথাগুলো শুনছিল। তখন সঞ্জয়ের কথায় রাগ হলেও এখন ঠাণ্ডা মাথায় সঞ্জয়ের যুক্তিগুলো শুনে মঞ্জুষার মনে হল সঞ্জয় ঠিক কথাই বলেছে, ওভাবে তখন পাবলিকের সামনে চলে আসাটা সত্যিই ঠিক হয়নি ওর। সত্যি কথা বলতে গেলে এই ট্রিপটা একান্ত গোপনীয় আর ওদের মধ্যেই থাকার কথা ছিল। ওর ভুলের জন্য সেটা আর গোপনীয় রইল না। এবার হয়তো গোটা ইন্ডাস্ট্রি জেনে যাবে ওর আর সঞ্জয়ের ব্যাপারটা। আবার সেই কানাঘুষো শুরু হবে। ফেসবুক পেজ, নিউজপোর্টালগুলো ভরে যাবে কেচ্ছায়। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অস্ফুটে মঞ্জুষা বলে ওঠে, “সরি। আর হবে না। প্রমিস।” মঞ্জুষাকে জড়িয়ে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সঞ্জয় বলে ওঠে, “দ্যাটস মাই লেডি!” বলে মঞ্জুষার কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে, “এবার রাগ কমেছে?”

মঞ্জুষা মাথা তুলে সঞ্জয়ের দিকে ভালো করে তাকায়। সঞ্জয়ের পরনের টিশার্টটা হাতাহাতির ফলে ছিঁড়ে গিয়ে ঘরের এককোণে পড়ে আছে। ফলে উর্ধাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত হয়ে গেছে সঞ্জয়ের। হাল্কা শ্যামবর্ণ বুকের উপর মঞ্জুষার নখের আঁচড়ের ফলে রক্তচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছে। মাথার একরাশ বাবরি চুল ওর অত্যাচারের ফলে উস্কোখুস্কো হয়ে গেছে। সে নিজেও হাতাহাতির ফলে খানিকটা বিধ্বস্ত। পরনের টাওয়েল শরীর থেকে সরে গিয়ে বিছানার এককোণে লুটিয়ে পড়েছে। সদ্যভেজা চুলগুলো ছড়িয়ে গিয়ে লেপ্টে গেছে ওর সারামুখে। তার খেয়াল হয় বিবসনা অবস্থায় সে সঞ্জয়ের বুকের উপর শুয়ে থাকলেও সঞ্জয়ের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বরং তার অত্যাচারে বিধ্বস্ত হয়েও হাসিমুখে তাকিয়ে আছে সঞ্জয়।

এর আগেও সঞ্জয়কে খালি গায়ে দেখেছে মঞ্জুষা। বরং বলা ভালো সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থাতেই দেখেছে। কিন্তু কোনোবার এত মোহময় লাগেনি সঞ্জয়কে। মুগ্ধ চোখে মঞ্জুষা দেখল টেবিল ল্যাম্পের নরম আলো এসে ঠিকড়ে পড়ছে সঞ্জয়ের শরীরের অনাবৃত অংশে। সেই ‌আলোয় ‌শ্যামবর্ণ সঞ্জয়ের দেহের ঘর্মাক্ত মাংসপেশীগুলো চকচক করে উঠেছে। মঞ্জুষার মনে হল যেন কোনো গ্রিক ভাষ্কর্যকে দেখছে সে। হাল্কা কাঁচাপাকা দাঁড়িতে, উস্কোখুস্কো চুলে ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে সঞ্জয়। সেই নির্মল হাসিতে ওকে দেবপুরুষের মতো লাগছে। সঞ্জয় এবার দু’হাতে মঞ্জুষার মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে বলে, “কি হল? রাগ কমেছে?” মঞ্জুষা মাথা নেড়ে সঞ্জয়ের ঠোঁটে চুম্বনচিহ্ন এঁকে দিয়ে বলে, “না কমেনি! ‌আমাকে আদর করে দাও!”

মঞ্জুষার ইঙ্গিতটা বুঝতে বিন্দুমাত্র সময় লাগে না সঞ্জয়ের। সে মৃদু হেসে মাথা নেড়ে মঞ্জুষার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। তারপর এক আদিম বন্য আদরে পাগল করে তোলে মঞ্জুষাকে। মঞ্জুষা সঞ্জয়কে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গেলে সঞ্জয় সেই প্রতিরোধকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে একে একে মঞ্জুষার কপাল, চোখ, গাল, থুতনি, চিবুক, বুকের খাঁজে চুম্বনচিহ্ন আঁকার পর সঞ্জয় নেমে আসে মঞ্জুষার বুকের কাছে। গলা থেকে পুঁতির মালাটা খুলে বিছানার পাশে সাইড টেবিলে রেখে দিয়ে বেডসুইচ টিপে ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়ার পর নিজের মুখ নামিয়ে আনে মঞ্জুষার খাজুরাহোর ভাস্কর্যের মতো পেলব বক্ষদ্বয়ের উপর। এক হাতে মঞ্জুষার মুখ চেপে শীৎকারের শব্দ রোধ করে দিয়ে বন্য মৌখিক আদরে মঞ্জুষাকে ক্রমশ পাগল করে তোলে সে। মঞ্জুষা সঞ্জয়কে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে গেলে সঞ্জয় সেই প্রতিরোধকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে একে একে মঞ্জুষার বক্ষদ্বয়ে ও উদরে চুম্বনচিহ্ন আঁকতে আঁকতে নেমে আসে মঞ্জুষার নাভিমূলের উপর। সঞ্জয়ের এই অচেনা আদরের সুখে ভাসতে ভাসতে গোঙাতে থাকে মঞ্জুষা। ওর ফরসা সরু আঙুলগুলো সঞ্জয়ের মাথায় বিলি কেটে বেড়ায়। 

নাভিমূল আর তলপেটে আদরের চিহ্ন এঁকে দেওয়ার পর উরুসন্ধিতে নামার আগে একপলক মঞ্জুষার দিকে তাকায় সঞ্জয়। দেখে মঞ্জুষা কামাতুর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালেও হাসতে হাসতে দুদিকে মাথা নেড়ে বলছে, “ডোন্ট ‌‌ইভেন থি‌ঙ্ক অ্যাবাউট ইট! আই অ্যাম গনা কিল ইউ!” সঞ্জয় দুষ্টুহাসি হেসে বলে ওঠে, “আই ডোন্ট কেয়ার!” তারপর মঞ্জুষার কোনো আপত্তির পরোয়া না করে মুখ নামিয়ে দেয় উরুসন্ধির উপর। মঞ্জুষা আর সহ্য করতে পারে না। প্রথমে আদরের ঠেলায় বিছানায় মিশে গেলেও পর‌ক্ষণে দুহাতে খামচে ধরে সঞ্জয়ের মাথার চুল। প্রাণপণে সঞ্জয়কে সরানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে আত্মসমপর্ণ করে ক্রমশ সুখের সাগরে ভাসতে থাকে সে। সঞ্জয়ের পাগলপারা আদরে ক্রমশ থরথর করে কেঁপে ওঠে ওর সমগ্র দেহ। 

বাইরে তখন মেঘহীন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্নার আলোয় ভেসে যাচ্ছে সমস্ত চরাচর। সেই চাঁদের আলো কাঁচের জানলা বেয়ে প্রবেশ করেছে ওদের ঘরে। চারদিক নিস্তব্ধ হওয়ায় শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের প্রবল গর্জন। জোয়ারের বলে বলীয়ান সমুদ্রের সফেন ঢেউগুলো একের পর এক আছড়ে পড়ছে বালুকাবেলার উপর। ভাবখানা এমন যেন প্রতি ইঞ্চিতে বুঝে নিতে চাইছে নিজের প্রাপ্য জমিটুকুকে। বদ্ধ ঘরের ভেতরের অবস্থাও তথৈবচ। তফাৎ এই যে এখানে সমুদ্রের পরিবর্তে দুজন মানুষ বন্য আদরের খেলায় মেতে ক্রমশ মেপে নিচ্ছে পরস্পরকে। আদরের প্রবলতায় ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে পরস্পরকে। মঞ্জুষার সুতীক্ষ্ণ নখের আচড়ে সঞ্জয়ের কাঁধ, বাহু, পিঠ যেমন ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে, ঠিক তেমনই সঞ্জয়ের উগ্র বর্বর আদরে মঞ্জুষার কণ্ঠায়, চিবুকে ক্রমশ রক্ত জমাট বেঁধে সৃষ্ট হচ্ছে রক্তিম আল্পনা।

পাগলের মতো চুমু খেতে খেতে মঞ্জুষার ঠোঁটের উপর রীতিমতো অত্যাচার শুরু করে দেয় সঞ্জয়। মঞ্জুষাও ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নয়। সেও পাগলের মতো কামড়ে ধরে সঞ্জয়ের ঠোঁট। দুজনের ধারালো দাঁতের চাপে রক্ত বেরিয়ে এলেও দুজনের মধ্যে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পরস্পরের ঠোঁটকে উন্মাদের মতো শোষণ করে চলে ওরা। পরম আবেশে চুমু খেতে খেতে সঞ্জয়ের পেশিবহুল দেহের উপর হেলান দিয়ে বসে মঞ্জুষা। মৃদু হেসে মঞ্জুষার ঠোঁটে, ঘাড়ে চুমু খেতে খেতে সঞ্জয় বলে চলে একান্ত গোপনীয় অথচ অশ্লীল মিঠেকড়া কিছু কথা যাতে জাগ্রত হয়ে ওঠে মঞ্জুষার দেহ। সেই সঙ্গে সঞ্জয়ের হাতদুটো পৌঁছে যায় মঞ্জুষার বক্ষে ও উরুসন্ধিতে। প্রবল বলিষ্ঠ হাতে সে মঞ্জুষার বক্ষে ও উরুসন্ধিতে তীব্র হস্তসঞ্চালন করতে থাকে। এতটা আদরের বহর আর বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না মঞ্জুষা। পাগলের মতো সঞ্জয়ের হাতে বন্দিনী হয়ে গোঙাতে থাকে সে। সমুদ্রের গর্জনের সাথে মিশে যেতে থাকে তার শীৎকার। একসময় মঞ্জুষার সমগ্র দেহ তিরতির করে কেঁপে ওঠে। সঞ্জয়কে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ক্রমশ রতিসুখে কুঁকড়ে ওঠে সে। সঞ্জয় মঞ্জুষার কপালে একটা চুমু খেয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে অবলোকন করতে থাকে চাঁদের আলোয় নিজের স্ত্রীর অপরূপ সৌন্দর্যকে। একসময় সঞ্জয়ের দেহের উপর ভর দিয়ে এলিয়ে পড়ে মঞ্জুষার রতিক্লান্ত দেহটা। 
 
কিছুক্ষণ পর মঞ্জুষার শরীর থিতু হয়ে আসার পর সঞ্জয় মঞ্জুষার কানের লতিতে আলতো কামড় দিয়ে জিজ্ঞেস করে, "আরো আদর চাই?" প্রত্যুত্তরে মঞ্জুষা মাথা নেড়ে সঞ্জয়ের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে গেলে সঞ্জয় বাধা দিয়ে বলে, "উহু! এভাবে নয়! ইফ ইউ ওয়ান্ট ইট, দেন ইউ মাস্ট বেগ ইট!” আদরের মাঝখানে আচমকা এই বাধা সহ্য করতে পারে না মঞ্জুষা। ওর ধৈর্যের বাঁধ ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে। সঞ্জয়ের কথায় আর থাকতে না পেরে সে কঁকিয়ে বলে ওঠে, “প্লিজ সঞ্জু! আই ওয়ান্ট ইট!”

- এভাবে নয়! সে আই ওয়ান্ট ইউ, আই লাভ ইউ! উই আর মেকিং লাভ জান, নট সেক্স! ধরে নাও বিয়ের পর এটাই আমাদের হানিমুন কাম দ্বিতীয় ফুলশয্যা। 

কথাগুলো শোনামাত্র মঞ্জুষা থমকে যায়। সত্যিই তো! ওরা যেটা করছে সেটা তো লাভমেকিং! লাভমেকিংয়ে পরস্পরের প্রতি প্যাশনেট হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ওরা তো সেরকম বিহেভই করছে না। বরং যেন পরস্পরের যৌনখিদে মেটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে! এই যে একটু আগে সঞ্জয় যে বন্য ‌আদরটা ওকে করল সেটার কি খুব দরকার ছিল? নর্মাল কাডলিং বা চুমুতেই তো কাজ হত! কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সঞ্জয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকায় সে। সঞ্জয় আবার মৃদু গলায় বলে ওঠে, “কাম অন টেল মি জান? হোয়াট ইউ ওয়ান্ট?” 

চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে আসে মঞ্জুষার। এবার সে ধরা গলায় অস্ফুটে বলে ওঠে, “আই ওয়ান্ট ইউ, আই ওয়ান্ট টু এক্সপ্লোর ইউ! আই ওয়ান্ট টু মেক লাভ উইথ ইউ সঞ্জু!” 

মঞ্জুষার কন্ঠস্বর শুনে সঞ্জয় বোঝে অবশেষে মঞ্জুষা ধরা দিয়েছে। এটারই অপেক্ষা করছিল সে। মঞ্জুষার কথাগুলো শোনামাত্র সঞ্জয় মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শুইয়ে দেয় ওকে। তারপর পরম আশ্লেষে চুমু ধীরে ধীরে প্রবেশ করে মঞ্জুষার ভেতরে। একটা অদ্ভুত শিহরনে কেঁপে ওঠে মঞ্জুষার সমগ্র শরীর।অনেকদিনের অনভ্যেসের ফলে প্রবেশের অভিঘাতে প্রথমে মঞ্জুষা চমকে গেলেও পরক্ষণে শীৎকার দেওয়ার আগেই সঞ্জয় ওর ঠোঁটটা নিজের ঠোঁট দিয়ে বন্ধ করে দেয়। সঞ্জয়ের ঠোঁটের ভেতর নীরবে গোঙাতে থাকে মঞ্জুষা। সঞ্জয় দু’হাতে মঞ্জুষার দুটো হাত চেপে ধরে চুমু খেতে খেতে মনের সুখে রমন চালিয়ে যেতে ‌থাকে। মঞ্জুষার সারা শরীর জুড়ে ‌আনন্দের বন্যা বয়ে ‌যায়। সে প্রাণপণে উপভোগ করতে ‌থাকে সঞ্জয়ের জান্তব আদরটাকে। অনেকক্ষণ ‌এভাবে রমন করার পর একসময় সঞ্জয়ের শরীর ক্লান্ত হয়ে এলে মঞ্জুষা সঞ্জয়কে পাশ ফিরিয়ে দিয়ে ওর উপর চড়ে বসে মঞ্জুষা। তারপর চুমুতে, আচড়ে ভরে দিতে থাকে সঞ্জয়ের সমগ্র শরীরটাকে। সঞ্জয় পাল্টা আদরে উত্তেজিত করে তোলে মঞ্জুষাকে। তার বলিষ্ঠ হাতের আঙুলগুলো খেলা করে বেড়ায় মঞ্জুষার দেহের প্রতিটা ভাঁজে। সেই আদরে আত্মহারা মঞ্জুষা অস্ফুটে শীৎকার দিয়ে ওঠে।মঞ্জুষার মিঠে রিনরিনে কন্ঠে শীৎকার শুনতে‌ শুনতে জাগ্রত হয়ে ওঠে সঞ্জয়ের পৌরুষ। উন্মত্ত প্রেমিকের মতো সে আদরে আদরে ভরে তোলে মঞ্জুষার সমগ্র দেহটাকে। সমগ্র ঘরে সমুদ্রের গর্জনের সাথে ভেসে বেড়াতে থাকে আদরে আদরে পাগলিনী হওয়া মঞ্জুষার শীৎকার আর ওদের মধ্যে চলা অশ্লীল কথাবার্তা। আবেগে চোখ বন্ধ হয়ে ‌আসে মঞ্জুষার। একসময় ক্লান্ত হয়ে মঞ্জুষা বিছানায় এলিয়ে পড়লেও সঞ্জয় প্রবলভাবে রমন চালিয়ে যেতে থাকে। 

এইভাবে অনেকক্ষণ পর আদর শেষে মঞ্জুষার ভেতরে নিজেকে সম্পুর্ণভাবে নিঃশেষ করার পর সঞ্জয়ের অবসন্ন দেহটা মঞ্জুষার পাশে এলিয়ে পড়ে। ক্লান্ত বিধ্বস্থ মঞ্জুষা সঞ্জয়ের হাতের আঙুলগুলো নিজের হাতে নিয়ে অস্ফুটে বলে ওঠে, “থ্যাঙ্ক ইউ! থ্যাঙ্ক ইউ ফর বিইং উইথ মি। লাভ ইউ জান!” প্রত্যুত্তরে সঞ্জয় মঞ্জুষাকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা স্নেহচুম্বন এঁকে দিয়ে বলে, "লাভ ইউ টু জান!" উরুসন্ধির মৃদু যন্ত্রণা ছাপিয়ে একটা অদ্ভুত ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে মঞ্জুষার সমগ্র শরীরে। ওর চোখের কোল বেয়ে বেরিয়ে আসে এক ফোঁটা অশ্রু।
 
*****

এক সপ্তাহ পর শট শেষে সকলের হাততালিতে ফেটে পড়ে গোটা সেট। দুর্দান্ত নেচেছে আজ মঞ্জুষা। সকলে তো বটেই এমনকি কোরিওগ্রাফারও মানতে বাধ্য হয়েছেন মেয়েটার মধ্যে ট্যালেন্ট ‌আছে। নাহলে একসপ্তাহ ‌আগেও যে মেয়ে নাচতে গিয়ে স্টেপ ভুল করছিল সেই মেয়েটা আজ প্রত্যেকটা স্টেপ নির্ভুলভাবে করেছে। লা‌ঞ্চটাইমে ওর সহকর্মী ঐশিকা ওকে নিভৃতে জিজ্ঞেস করে, “ব্যাপারটা কি বলতো? একসপ্তাহের মধ্যে এমন কি হল যে এত অসুস্থ মেয়েটা হঠাৎ সুস্থ হয়ে গেল? কী এমন টনিক দিল সঞ্জয়দা যে এনার্জি কমছেই না? সিক্রেটটা কি বস?” 

সারাদিন ধরে নাচার ফলে ক্লান্ত মঞ্জুষা ঐশিকার দিকে তাকায়। তারপর গত সপ্তাহের ট্রিপের কথা ভাবতে ভাবতে মুচকি হেসে চোখ টিপে রহস্যভরা গলায় বলে ওঠে , “ম্যাজিক!” 

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

বিদায়













“চল ভাগ! দূর হ এখান থেকে মুখপোড়ার দল! খেয়ে দেয়ে কাজ নেই সকাল সকাল বিরক্ত করতে চলে এসেছে! যত্তসব! ধরতে পারলে তোদের ষষ্ঠীপুজো করে দেবো!” কথাগুলো বলতে বলতে বেত হাতে মুর্তিগড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। অবশ্য যাদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা তারা নগেনখুঁড়োর ঘর থেকে বেরোবার আগেই বেপাত্তা। তারা সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে চটিয়ে দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে। আমি বাইকে চেপে বাজার সেরে ফিরছিলাম। সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে একপাল ছেলেপুলে তাড়া করতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।

- ব্যাপারটা কী খুঁড়ো? সাতসকালে মেজাজ চড়ে আছে কেন? কিছু করেছে নাকি ওরা?

- করেছে তো! সেই মহালয়ার দিন থেকে আমার বাপের মুণ্ডুপাত করে যাচ্ছে হতভাগার দল। রোজ সকালবেলা এসে বাবুদের মতো গলা করে বলবে ‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো? নাকি এবারও কলকাতা থেকে মুর্তি আনাতে হবে?’ একবার ভেবে দেখো দেখি ছোটোবাবু, এটা কি মানা যায়? মানছি একটু বুড়ো হয়েছি, আগের মতো আর তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সাড়তে পারি না। তাই বলে এত হেলাচ্ছেদ্দা করবে আমাকে? ওরে তোদের বাপ-পিতেমোর আমল থেকে মাতৃপ্রতিমা গড়ছি রে! আজ পর্যন্ত তারাও সাহস পায়নি এই কথা বলতে। আর তোরা সেদিন জন্মানো ছেলেপুলের দল কিনা আমার, নগেন পালের কাজ নিয়ে সন্দেহ করিস?

ঘটনাটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমার। ইদানিং কয়েক বছর ধরে নব্য বাঙালী প্রজন্মের এক রোগ ধরেছে। অবশ্য এ রোগ আমাদের বেলাতেও পুরোদস্তুরভাবে ছিল। এমনকি আমি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত। রোগটা তেমন ভয়াবহ না হলেও হেলাফেলার রোগ নয়। রোগটার নাম ‘ফেলুম্যানিয়া’। অত্যাধিক ফেলুদা পড়লে বা ফেলুদার সিনেমা দেখলে এই রোগ চাপে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে ফেলুদা ভাবতে শুরু করে। কেউ কেউ নিজেকে তোপসে, জটায়ুও ভেবে ফেলেন। এই রোগের দুটো ভাগ আছে। প্রথম ভাগে রুগী নিজের চারপাশে রহস্যের গন্ধ পায়। সব কিছুকে গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। পরের ভাগ হল নিজেকে ফেলুদা ভেবে পর্দার মানে সিনেমার ফেলুদার মতো কায়দা করা। এই দ্বিতীয় প্রকারের রুগীরা কথায় কথায় ‘কিছু ভালো লাগছে না রে তোপসে’, ‘আমি হয় এর বদলা নেব নয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব’, ‘আছে! আছে! আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে!’, ‘মগজাস্ত্র’ বলে বেড়ায়। পুজোর আগে অবশ্য আরেকটা নতুন বাক্য যোগ হয়, ‘‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো?” বুঝলাম নগেনখুঁড়োকে ওরা ফেলুদার স্টাইলেই জিজ্ঞেস করে চটিয়েছে। হাসতে হাসতে বললাম, “ও তুমি কিছু মনে কোরো না। বুঝতেই পারছো ছেলেমানুষ, তোমার সাথে একটু মজা করে ফেলেছে। আচ্ছা বেশ, আমি নাহয় ওদের দেখতে পেলে বকে দেব।”

- মজা করেছে! নিকুচি করেছে মজার! ঠাকুর দ্যাবতাকে নিয়ে মজা এই নগেন পাল সহ্য করবে না। একবার ওদেরকে বাগে পাই! মজা ঘুচিয়ে দেব!

- আচ্ছা বেশ তাই হবে। আপাতত তুমি ঘরে যাও খুঁড়ো। তোমার মেলা কাজ পড়ে আছে। কালকের মধ্যে ঠাকুর দিতে হবে তো নাকি? কালকের মধ্যে দালানে ঠাকুর না এলে বড়দা আমাদের আস্ত রাখবে না। আমার কথাতেই বড়দা এই শেষবারের মতো তোমাকে সুযোগ দিয়েছে। আমার মুখ রাখতে হবে তো?

কথায় কাজ হল। নিজের রুদ্রমুর্তি সম্বরণ করে বিড়বিড় করে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “তোমাদের কাজই তো করতে যাচ্ছিলুম। হতচ্ছাড়া ছেলেপুলের দল সকাল সকাল মেজাজটাই বিগড়ে দিলে। নাহলে এতক্ষণে অর্ধেক সাজ সারা হয়ে যেত আমার। যাকগে এসে যখন পড়েছ তখন দেখে যাও মায়ের সাজখানা।” বলে আমার হাত চেপে ধরতেই হেসে বললাম, “তা কী করে হয়? আজ যে পঞ্চমী! বোধনের আগে শিল্পী ভিন্ন আর কারো যে মায়ের মুখ দেখার অধিকার নেই! তার চেয়ে বরং বেলা থাকতে থাকতে কাজ সেরে ফেলো। আমি একেবারে কাল ভোরবেলা মাকে নিয়ে ঠাকুরদালানে বসিয়ে দুচোখ ভরে দেখবো। আজ একটু তাড়া আছে। আমি বরং আসি?” বলে বাইক স্টার্ট করে নগেনখুঁড়োকে ছেড়ে এগিয়ে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইড মিররে তাকিয়ে দেখলাম। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চারদিকে একবার বাজপাখির মতো শ্যেনদৃষ্টি বুলিয়ে ধুতির কোঁচড় থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে একটা বিড়ি ধরিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার ঢুকে পড়লেন মুর্তিগড়ার ঘরে। আমি মুচকি হেসে বাইকের স্পিড বাড়ালাম।

নগেন খুঁড়ো মানুষটা এমনি ভালো হলেও স্বভাবগত ভাবে একটু ক্ষ্যাপাটে। ইদানিং খিটখিটে ভাবটা বেশ বেড়েছে। তবে কথার মানুষ। কথা দিলে কথা রাখেন। বংশানুক্রমিক ভাবে আমাদের মানে সামন্তবাড়ির পুজোর মাতৃপ্রতিমা ওনারাই গড়ে আসছেন। প্রায় চারশো বছরের পুজো আমাদের। আশেপাশের গাঁয়ের থেকে লোকে মাতৃপ্রতিমা দেখতে, পুজোর ভোগ খেতে আসে। শুনেছি  এককালে নাকি আমাদের পুজোতে অষ্টমীর দিন মহিষবলি হত। আগেকার দিনে আমাদের পুর্বপুরুষরা নিজে হাতে বলি দিয়ে মহিষ উৎসর্গ করতেন। আশেপাশের গাঁয়ের লোকেরা ভীড় করে দেখতো বলি। এখন অবশ্য কুমড়ো বলি ছাড়া আর কিছু হয় না। আর আগেকার দিনের মতো জমিদারী থাকলেও সেটা খাতায়-কলমে। বাস্তবে এখন তার প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। থাকার মধ্যে শুধু একটা পুরোনো প্রাসাদের মতো একটা দালানকোঠা বাড়ি আর একটা বাগান আছে।

এই বাড়ি তথা জমিদারীর শরিক বলতে গেলে পাঁচজন। চারভাই ও এক বোন। আমি সবার ছোটো। তবে সকলেই যে এ বাড়ির বাসিন্দা তা নয়। থাকার লোক ধরতে গেলে আমি, সেজদা, সেজোবৌদি, বড়দা আর বড়বৌদি থাকি। আর থাকে চারটে দুষ্টু বাঁদর। যারা বছরে বেশিরভাগ সময় হোষ্টেলে থাকলেও ছুটিতে এলেই গোটা বাড়িজুড়ে দাঁপিয়ে বেড়ায়। বাকিরা সকলেই দেশে-বিদেশে সেটলড।

বড়দার কাছে শুনেছি নগেনখুঁড়োর বাবা নাকি ছিলেন যাকে বলে জাত শিল্পী। পাথর হোক বা কাঠের টুকরো, নিখুঁত নৈপুণ্যে খোঁদাই করে মুর্তি বানাতে পারতেন তিনি। ঠাকুর্দার পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিনিকেতন থেকে শিখে এসেছিলেন ফাইন আর্টস এর একাধিক ফর্ম। শিখিয়েছিলেন নগেনখুঁড়োকেও। যদিও সবই শোনা কথা। জ্ঞানত নিজের চোখে কোনোদিন নগেনখুঁড়োকে পাথর, কাঠ খোঁদাই করতে দেখিনি। তবে হ্যাঁ ভদ্রলোক যে তার বাবার মতোই জাত শিল্পী সেটা বুঝেছি তার তৈরী প্রতিমা দেখেই। ওরকম দরদ দিয়ে মাতৃপ্রতিমা তৈরি করতে সবাই পারেন না। মাতৃপ্রতিমা নির্মাণে নবরস কথাটা মাথায় রাখা ভীষণ দরকারী। সাধারণত আমরা বাড়িতে যে দেবী দুর্গার পুজো করি তা মাধুর্য্য আর মমতায় ভরা মাতৃপ্রতিমা। ইনি গৃহের কন্যা রূপে পুজিতা হন। এক্ষেত্রে শান্ত ও শৃঙ্গার রসের ভঙ্গিমা ফুটিয়ে তুলতে হয়। আজকাল যে সব প্রতিমা আমরা দেখে থাকি পুজো প্যান্ডেলে, তাতে এই দুই রস থাকে না। থাকে ক্রূর যোদ্ধৃ রূপ। যেটায় ব্যবহৃত হয় রৌদ্র ও বীর রস। এই মাতৃপ্রতিমা পুজিত হয় দেবী রূপে। আশ্চর্যের ব্যাপার প্রতিবার নগেনখুঁড়ো যখন মাতৃপ্রতিমা গড়েন এই চারটে রস একসাথে মিশিয়ে প্রতিমার মুখ তৈরী করেন। মানে আমাদের বাড়ির মাতৃপ্রতিমা দেখলে যেমন মন ভরে আসবে ঠিক তেমনই সম্ভ্রমও জাগ্রত হবে। আর এই জিনিসটার কোনো বছরই নড়চড় হয় না। অন্য কোনো শিল্পী হলে একটা বা দুটো রসের প্রভাব হয়তো কম বেশী হতে পারে কিন্তু নগেনখুঁড়োর কোনোবার এই ভুল হয় না। প্রতিবার একইরকম পারফেক্ট মুখ বানান নগেনখুঁড়ো। তবে এইবার বড়দা নগেনখুঁড়োকে আর মাতৃপ্রতিমার বরাত দিতে চাননি। আসলে একমাত্র মেয়ে ফুলির মৃত্যুর পর নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোটা ইদানিং ভীষণ বেড়ে যাওয়ায় বড়দা চাননি কাজটা নগেনখুঁড়ো করুন। কে জানে মাতৃপ্রতিমা গড়তে গিয়ে কিছু ক্ষ্যাপামো বসলে যদি পাপ লাগে? অবশ্য আশঙ্কাটা অমূলক নয়। মাঝে মাঝে অল্পবিস্তর ক্ষ্যাপামো করে থাকলেও গত একবছর ধরে নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোর বহরটা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। দিনরাত কথা নেই বার্তা নেই শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন। কখনো সারারাত ধরে গোটা গ্রামের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন। কখনো বা রাস্তায় কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করতেন, “আমার ফুলিকে দেখেছ? দেখবে? ঐ দেখো আগুনে পুড়ছে!”

ফুলি, নগেনখুঁড়োর একমাত্র আদরের কন্যা। মা মরা মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসতেন নগেনখুঁড়ো। বা বলা ভালো চোখে হারাতেন। ফুলিও যাকে বলে বাবা অন্ত প্রাণ ছিল। নগেনখুঁড়ো বড়ো সাধ ছিল ফুলি যাতে তার ঠাকুর্দার মতো বড়ো শিল্পী হয়। সেইমতো নিজে হাতে তাকে শিখিয়েছিলেন মাতৃপ্রতিমা গড়া। টাকা জমিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষার জন্য। মেধাবী ফুলি ক্রমে স্কুল পাশ করে পা রেখেছিল কলেজের দোরগোড়ায়। ইচ্ছে ছিল শিক্ষা শেষে বাবার পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। কলেজে ভর্তি হবার বছর তিনেকের মধ্যেই এক ছেলের প্রেমে পড়ে গেল ফুলি এবং অবশেষে একদিন কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলল। মেয়ের এই হঠকারিতায় প্রথমে রাগ করলেও পরে মেনে নিয়েছিলেন নগেনখুঁড়ো। কাছে ডেকে নিয়েছিলেন মেয়ে-জামাতাকে। বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বিয়ের সাতমাস পর পুজোর সময় গ্রামে স্বামীর সাথে ফুলি ফিরেছিল ঠিকই, তবে সশরীরে নয়। ওরা ফিরেছিল মৃত্যুসংবাদ হয়ে। বিয়ের পর শান্তিনিকেতনেই ছোটো একটা সংসার পেতেছিল ফুলি। স্বামীকে নিয়ে একসাথে কলেজের পড়াশুনো ও সংসার চালিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটছিল তার। কিন্তু বিধাতার মনে হয়তো অন্য ইচ্ছে ছিল। এক ঝড়-জলের রাতে কলেজ থেকে ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল ফুলিরা। ঝড়ের কারণে ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রবল বিদ্যুৎপ্রবাহ ওদের সমগ্র চেতনাকে অসাড় করে প্রাণহীন মৃতদেহে পরিণত করতে একমুহূর্তও সময় নেয়নি। খবরটা পাওয়ার পর সমগ্র গাঁয়ের পুজোর আনন্দ একমুহূর্তে বদলে গিয়েছিল দশমীর বিষাদে।

একমাত্র মেয়ের মৃত্যু সহজে মেনে নিতে পারেননি খুঁড়ো। ফুলির মৃত্যুর পর থেকেই মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থর মতো আচরণ করতেন। একবার তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। ভাগ্যিস গাঁয়ের ছেলেরা দেখতে পেয়ে রক্ষা করে তাকে। তারপর থেকে অপ্রকৃতিস্থ ভাবটা কমলেও মাঝে মাঝে প্রলাপ বকতেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই এরকম শোকে প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া মানুষের হাতে প্রতিমা তৈরীর ভার দিতে চাননি বড়দা। তাই প্রতিবারের মতো এইবারও রথযাত্রার দিন যখন নগেনখুঁড়ো বরাত নিতে এলেন তখন তাকে একপ্রকার বুঝিয়ে বিদায় করে দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু নগেনখুঁড়ো নাছোড়বান্দা। তিনি কিছুতেই বরাত না নিয়ে যাবেন না। অবস্থা যখন চরমে উঠলো তখন আমাদের বাকি ভাইদেরও নামতে হল আসরে। অবশেষে ঠিক হল নগেনখুঁড়োই আমাদের পুজোর প্রতিমা তৈরী করবেন তবে পঞ্চমীর মধ্যে সম্পুর্ণ ঠাকুর তৈরী করে দিতে হবে। নগেনখুঁড়ো বড়দার শর্তে রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন এবার তিনি ঠাকুরদালানে মাতৃপ্রতিমা তৈরী করবেন না। মাতৃপ্রতিমা তৈরী হবে তার বাড়িতে। ষষ্ঠীর দিন ভোরে আমরা চার ভাই গিয়ে তার বাড়ি গিয়ে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে আসবো। শর্ত অনুযায়ী কালকে ভোরবেলা আমাদের আসার কথা। সেই কারণে আজ এসেছিলাম নগেনখুঁড়োকে তাগাদা দিতে। এবার এখানকার খবর বড়দাকে বলে দিলেই ছুটি আমার।

                                                  *****

আজ ষষ্ঠী। আরেকটু পরেই মায়ের বোধন শুরু হবে। জগন্মাতা চারদিনের জন্য আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে যাবেন। সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট ভুলে আমরা মেতে উঠবো তাকে নিয়ে। দেখতে দেখতে চারটে দিন যে কোনদিক দিয়ে কেটে যাবে বোঝা যাবে না। তারপর চারদিন পরে আমাদের সবাইকে ছেড়ে উমা আবার পাড়ি দেবেন কৈলাশে। সেই মতো শর্ত অনুযায়ী আজকে নগেনখুঁড়োর কাছ থেকে মাকে নিয়ে আসার কথা আমাদের। তাই আমরা চারভাই ভ্যানরিক্সা আর ঢাকি নিয়ে উপস্থিত হয়েছি নগেনখুঁড়োর বাড়িতে। কিন্তু ঘরের চারপাশের পরিবেশ এত নিস্তব্ধ কেন? একটা পাখিও ডাকছে না। মনে হচ্ছে যেন একরাশ শোক নেমে এসেছে বাড়িটায়। সাধারণত নগেনখুঁড়ো ভোরে ওঠার মানুষ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যেন তার ঘুম ভাঙেনি। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অন্যদিন তো এরকম হয় না। তাহলে আজ কী হল? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ডাক দিলাম আমি।

বেশ খানিকক্ষণ হাঁকডাক করার পর দরজা খোলার শব্দ হল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার? সেই আগের মতো আলুথালু উন্মাদবেশ, ক্ষ্যাপাটে চাহনি, সারা শরীরে কাদামাটি মাখানো। কই কাল সকালে তো এতটা খারাপ অবস্থা দেখিনি! তবে কি আবার সেই ক্ষ্যাপামোটা ফিরে এলো? উঠোনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঈষৎ ঘোলাটে অথচ মরামাছের মতো ঠাণ্ডা এবং শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম খুঁড়োকে এভাবে দেখে বড়দাও খানিকটা বিব্রত হয়ে গেছেন। মেজদা, সেজদার অবস্থাও তথৈবচ। অগত্যা আমাকেই হাল ধরতে হল। খানিকটা গলা খাঁকড়ে বললাম, “বলছিলাম যে…ইয়ে মানে… আমরা আমাদের ঠাকুর নিতে এসেছি।” কথাটা শুনে শূন্যদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন নগেনখুঁড়ো। তারপর মৃদু হেসে ইশারা করলেন পিছু নিতে। তারপর এগিয়ে চললেন নিজের মুর্তি গড়ার ঘরের দিকে। প্রথমে অবাক হলেও একে একে আমরা চারভাই ওনার পিছু পিছু প্রবেশ করলাম মুর্তি গড়ার ঘরে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। বাইরে থেকে একফোঁটা আলো আসার জো নেই। ঘরের ভেতরে ঢুকে আমরা চারজন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় নগেনখুঁড়ো ঘরের আলোটা জ্বাললেন। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘর আলোয় ভরে গেল, আর আমরা চারভাই সেই আলোয় মুগ্ধ হয়ে দেখলাম মাতৃপ্রতিমাকে। হ্যাঁ, অপ্রকৃতিস্থ, ক্ষ্যাপা, সন্তানশোকে কাতর হলেও নগেনখুঁড়োর শিল্পীস্বত্তার অবনতি বিন্দুমাত্র হয়নি! প্রতিবারের মতো এবারও দারুণ মাতৃপ্রতিমা তৈরী করেছেন তিনি। বরং বলা ভালো এবারের মাতৃপ্রতিমা ছাপিয়ে গেছে নগেন খুঁড়োর আগের সব সৃষ্টিকে। বড়দাকে দেখলাম হাত জোড় করে প্রণাম জানাচ্ছেন মাতৃপ্রতিমার উদ্দেশ্যে।

প্রতিমা ভ্যানরিক্সায় তুলে বড়দা মেজদা আর সেজদা রওনা হলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি থেকে গেলাম প্রতিমার দাম মেটাতে। প্রতিমার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “কি? বলেছিলাম না? পঞ্চমীর আগেই প্রতিমা তৈরী করে দেবো? করে দিলাম তো? এই নগেন পালের কথার নড়চড় হয় না ছোটোবাবু! সে যা বলে, করে দেখায়!”

আমি হেসে বললাম, “সে কি আর আমি জানি না? সেই কারণেই তো বড়দার হাজার আপত্তির পরেও তুমিই বরাতটা পেলে। যাক গে! সে সব কথা ছাড়ো। প্রতিমার দামটা ধরো।”

কথাটা শুনে মৃদু হাসলেন খুঁড়ো। তারপর প্রায় অস্ফুটে বলে উঠলেন, “দাম? কীসের দাম ছোটোবাবু? বাবারা কি মেয়েদের বিদায় করার সময় দাম নেয় নাকি?”

- সে কি কথা! তোমার পরিশ্রম, তোমার কাজের দাম নেবে না?

- আমার আর ওসবে মোহ নেই গো ছোটোবাবু। মায়ের কৃপায় দুবেলা দুমুঠো জুটে যায় এই অনেক। ও আমি নেব না। বরং তার বদলে একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে। দেবে? বলো ছোটোবাবু দেবে?

পুবের আকাশ ক্রমশ ফরসা হয়ে আসছে। সেই আলোতে দেখতে পেলাম নগেনখুঁড়োর চোখের দৃষ্টি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। তবে সেই আগের মতো শূন্য মরা মানুষের মতো দৃষ্টি নেই বরং তার জায়গায় এসে জমেছে একরাশ আকুতি আর কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

দূরে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে বড়দারা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের বাড়ির দিকে। ভ্যানরিক্সার আগে ঢাকি প্রবল জোরে ঢাক বাজাতে বাজাতে সমগ্র গ্রামকে জাগিয়ে মায়ের আগমনবার্তা জানিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো অস্ফুটে বলে উঠলেন, “ভাসানের পর প্রতিমার কাঠামোটা আমার চাই। দেবে? দেবে আমাকে? আসলে আমার ফুলিকে তো আর আটকে রাখতে পারলাম না। এই প্রতিমার কাঠামোকেই নিজের কাছে রেখে দেবোখন? নিজে হাতে গড়া প্রতিমা, নিজেরই মেয়ের মতোই তো নাকি? পুজোর চারটে দিন নাহয় তোমাদের কাছে পুজো পেল, বাকিটা সারা বছর আমার কাছে থাকবে। বলো ছোটোবাবু? দেবে তো?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “বেশ! দেবো।”


মঙ্গলবার, ৩ মে, ২০২২

ফেরা

 





পুজো এবং অঞ্জলীর জন্য ফুল-বেলপাতা বেছে আলাদা আলাদা পুষ্পপত্রে সাজিয়ে ঠাকুরমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে ঠাকুরদালানের এককোণে এসে বসল মৈত্রেয়ী। দালানের এই কোণ থেকে প্রতিমার মুখটা স্পষ্ট দেখা যায়। প্রতিমার মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে বাইরের উঠোনটার দিকে তাকাল সে। সারাবছর শ্যাওলা পড়ে পড়ে পিছল হয়ে যাওয়া ভাঙা উঠোনটাকে একরাতের মধ্যে পরিস্কার করে আলপনা দিয়ে ছবির মতো সাজিয়েছে কানাইদারা। ঠিক যেমন আগে করত। আপাতত সেই উঠোনে টুবাই তার মামাতুতো ভাই-বোনেদের সাথে খেলতে ব্যস্ত। বয়সে বড়ো বলে সব বাড়ির সব বাচ্চারা ওকে সর্দার বলে মেনে নিয়েছে। সারাদিন ওদের সাথে হুটোপাটি করে কেটে যাচ্ছে টুবাইয়ের। আজ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, তো কাল ডাংগুলি খেলছে। আজকের বিষয় লাট্টু। জিনিসটা প্রথমে দেখে বলেছিল, “আরে! এতো বেব্লেডের মতো!” তারপর তা নিয়েই চলছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে গোটা পুজোটাই এইভাবেই হেসে খেলে কাটিয়ে দেবে ঠিক যেমন মেয়েবেলায় দাদাদের সাথে হুটোপাটি করে ওর পুজো কাটতো। প্রথমে মৈত্রেয়ী বাধা দিতে গিয়েছিল কিন্তু পরে ভেবে দেখেছে সারাবছর তো স্মার্টফোন আর ডেস্কটপের সামনে বসেই কাটিয়ে দেয় ছেলেটা। এখানে এসে না হয় কদিন ঐ জিনিসগুলোর থেকে একটু দুরত্ব বজায় রাখুক। একঝলকে সেই দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৈত্রেয়ী। নাহ সব একই আছে। কিছুই বদলায়নি। শুধু মাঝখান থেকে অনেকগুলো বছর কেটে গেছে।


মৈত্রেয়ীর মনে আছে বিয়ের আগের বছর কলেজের পুজোর ছুটিতে শেষবারের মতো এসেছিল সে। বাবা-মা, ঠাকুর্দা-ঠাম্মাম, জেঠু-জেঠিমা, মেজকা, ছোটকা, আর দাদাদের সাথে হই হই করে কাটিয়েছিল পুজোর পাঁচটা দিন। সেই শেষবার, তারপর প্রায় পনেরো বছর পর এই বাড়িতে পা দিল সে। পনেরো বছর! কথাটা বলতেই কম সময় লাগে। কাটানোর সময় মনে হয় এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা যুগের মতো করে কাটছে। অন্তত মৈত্রেয়ীর কাছে তো তাই মনে হয়েছে। এই পনেরোটা বছর সে যেন সবার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল একটা নিভৃতবাসে। এই পনেরোটা বছরে মৈত্রেয়ী নিজের পরিবারের সাথে কোনোরকম সম্পর্ক রাখেনি। মৈত্রেয়ীর বাড়ির লোকেরা এই পনেরো বছরে একদিনও কেউ ওর সাথে কোনোরকম সম্পর্ক, বা ওর কোনো খোঁজ রাখেনি বা বলা ভালো রাখতে চায়নি। সেটাই তো স্বাভাবিক! বাড়ির সকলের অমতে সাত্যকিকে বিয়ে করার পর ঠাকুর্দার আদেশেই বাড়ির সকলে ওর সাথে সমস্ত রকম সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল। বাবা তো বলেই দিয়েছিলেন ও নাকি ওনার কাছে মৃত। মৈত্রেয়ীও মেনে নিয়েছিল ঠাকুর্দার আদেশ। আর কোনোদিন যোগাযোগ করেনি বাপের বাড়ির কারো সাথে। শুধু টুবাইয়ের জন্মের সময় সাত্যকিকে দিয়ে একটা কল করিয়ে খবরটুকু দিয়েছিল। কিন্তু ওপার থেকে শীতল নীরবতা পাওয়ার পর দীর্ঘকাল আর কোনো যোগাযোগ রাখেনি। ফলে সম্পর্কের সুতোটাও ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

ব্যাঙ্গালোরে তিন কামরার ফ্ল্যাটে স্বামী-ছেলেকে নিয়ে দিব্যি একটা সুখের সংসার গড়ে তুলেছিল সে। সংসারের কাজ, অ্যাপার্টমেন্টের অনুষ্ঠান, আর নিজের বয়সী গৃহিণীদের নিয়ে একটা ছোট গ্রুপ নিয়ে বেশ ছিল সে। তাহলে কীসের টানে এত বছর পর ফিরে আসতে হল তাকে? সে তো সব সম্পর্ক চুকিয়ে দূরে সরে গিয়েছিল। তাহলে ফিরে এল কেন? কারণটা বোধহয় মৈত্রেয়ীর জানা। কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছে না সে। বেশ কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু একটা ফোন সব পাল্টে দিল। ছোড়দা সেদিন কেন যে ফোনটা করতে গেল কে জানে? সেদিন ফোনটা না করলে হয়তো ওরা অন্য কোথাও বেড়াতে যেত। অন্তত ফোনটা আসার আগে তো সাত্যকি তাই ঠিক করেছিল।

দিনটা এখনও মনে আছে মৈত্রেয়ীর। সেদিন ছিল রবিবার। প্রতিবারের মতো সেদিনও বাড়িতে বসে সারাদিন ল্যাপটপে কাজ করে বিকেলে একটু ফ্রি হয়ে চায়ের কাপ নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল সাত্যকি। সামনেই দুর্গাপুজো। প্রতিবার পুজোর সময় ওরা কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়। এবার কোথায় যাবে সেই নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল এমন সময় সাত্যকির ফোনটা এল। মৈত্রেয়ী প্রথমে ভেবেছিল বোধহয় অফিসের ফোন এসেছে। কিন্তু সেই ভুলটা ভাঙতে বেশিক্ষণ লাগেনি। কলটা কাটার পর গম্ভীর মুখ করে সাত্যকি বলেছিল, “এবারের ট্রিপটা ক্যান্সেল করতে হবে বুঝলে? তোমার বাপের বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল। তোমার বাবা মৃত্যুশয্যায়। যে কোনো দিন মারা যেতে পারেন।”

“তো আমি কি করব?” বিরক্তির সাথে বলে উঠেছিল মৈত্রেয়ী। সাত্যকি চায়ের কাপে মৃদু চুমুক দিয়ে বলেছিল, “মরার আগে তোমাকে দেখতে চেয়েছেন। এবারের পুজোতে যাতে তুমি থাকো সেটাই ইচ্ছে তাঁর। বলতে পারো লাস্ট উইশ।”

- রাখো তোমার শেষ ইচ্ছে! যতসব ঢং! এতবছর পর আদিখ্যেতা দেখানো হচ্ছে! কই এতগুলো বছর গেল একবারও তো এই মেয়ের কথা মনে পড়েনি! আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি জানার প্রয়োজন বোধ করেনি। আর এখন দরদ উথলে উঠছে! কেন? আমি নাকি ওদের কাছে মৃত! তা হঠাৎ এই মরা মেয়েকে স্মরণ হল কেন? মরার আগে প্রায়শ্চিত্তের জন্য?

- আহ মিতু! হচ্ছেটা কি? হাজার হোক সম্পর্কে তিনি তোমার বাবা। নিজের বাবার সম্পর্কে এসব বলতে নেই।

- বেশ করব বলব। যেদিন থেকে ওদের কাছে আমি মৃত হয়ে গেছি। সেদিন থেকে ওরাও আমার কাছে মরে গেছে! কেউ নেই আমার! কেন? মনে নেই? টুবাইয়ের জন্মের খবর যখন দিতে গেলে মানুষটা কি ব্যবহার করেছিল? সটান রং নাম্বার বলে ফোন কেটে দিয়েছিল। তুমি ভুলে যেতে পারলেও আমি ভুলিনি। ওই বাড়ির কাউকে আমি জীবনে ক্ষমা করতে পারব না। তুমি ওদের ফোন করে বলে দাও আমরা আসতে পারব না। কোনো একটা অজুহাত দিয়ে কাটিয়ে দাও।

বলতে বলতে ছলছলে চোখে মেঝের দিকে তাকিয়েছি মৈত্রেয়ী। সাত্যকি বুঝেছিল মৈত্রেয়ী যে এই কথাগুলো বলছে একটাও মন থেকে নয় বরং অভিমানে কষ্ট পেয়ে। অন্তত ওর চোখ থেকে সেটা স্পষ্ট। এতগুলো বছর ভালোবেসে সংসার করতে করতে মৈত্রেয়ীকে সে হাড়ে হাড়ে চেনে। সাত্যকি মুচকি হেসে বলেছিল, “আচ্ছা বেশ তাই করব। তবে একটা কথাই বলার ছিল। মানুষটা তোমার বাবা। তিনি যতই অন্যায় করে থাকুন, আমাদের যতই আঘাত দিয়ে থাকুন বর্তমানে মানুষটা অসুস্থ আর মৃত্যুশয্যায় শয্যাশায়ী। তিনি যতই তোমাকে নিজের থেকে দূর করুন মন থেকে কোনোদিনই দূর করেননি। নাহলে শেষজীবনে এভাবে তোমাকে ডাকতেন না। আমার মতে এই সময় একজন সন্তান হিসেবে তোমার ওনার সামনে দাঁড়ানো উচিৎ।” মৈত্রেয়ী কিছু না বলে চুপ করে মাথা নামিয়ে বসেছিল। সাত্যকি হেসে একহাতে মৈত্রেয়ীর চিবুক ছুঁয়ে বলেছিল, “আঠেরো বছরের প্রেম আর পনেরো বছরের সংসার করেছি তোমার সাথে পাগলী! তোমার মনের কথা আমি জানবো না তো কে জানবে? মুখে যতই বলো না কেন ভেতরে ভেতরে তুমিও তোমার বাবার সাথে দেখা করার জন্য, বাড়ি ফেরার জন্য মরে যাচ্ছ। হাজার হোক রক্তের টানকে কি উপেক্ষা করা যায়?”

“অতশত জানি না। আমরা যাচ্ছি না মানে যাচ্ছি না!” বলে চায়ের কাপ নিয়ে মৈত্রেয়ী সোজা চলে গিয়েছিল রান্নাঘরে। সাত্যকি দু-একবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও মৈত্রেয়ীকে টলাতে পারেনি। শেষে একরকম হাল ছেড়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু শেষপর্যন্ত পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে ওদের একপ্রকার বাধ্য হয়ে দেশের বাড়ি ফিরে আসতে হল।

এ বাড়িতে আসার পর গাড়ি থেকে নেমে চারদিকে একবার আলগোছে তাকিয়ে দেখেছিল মৈত্রেয়ী। পনেরো বছরে বাড়িঘর, বাগান, পুকুর, ঠাকুরদালান কিছুই বদলায়নি। সব একইরকম আছে শুধু মানুষগুলো ছাড়া। পনেরো বছর আগের বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ কর্তা-গিন্নিরা অনেকেই আর ইহজগতে নেই। ঠাকুর্দা-ঠাম্মাম, জেঠু-জেঠিমা গত হয়েছেন অনেক বছর হল। মেজকা, ছোটকা দুজনেরই বয়সের কারনে স্বাস্থ্য ভেঙেছে। মেজদা, ছোড়দার চুলেও পাক ধরেছে। সেও কি আর সেদিনের কলেজ পাশ করা মেয়ে আছে নাকি? সেদিনের সেই তারুণ্য ঢাকা পড়ে গেছে মধ্যবয়সের গাম্ভীর্যে।

গাড়ি থেকে নেমে সোজা গটগট করে হেঁটে বাবার ঘরে ঢুকে দোর দিয়েছিল সে। তারপর ঘরের ভেতর বাবা-মেয়ের মধ্যে কি কথা হল কেউ জানে না। ঘন্টাদেড়েক পর ঘর থেকে মৈত্রেয়ী যখন বেরোল তখন তার চোখদুটো টকটকে লাল হয়ে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাবা-মেয়ের মানভঞ্জনের সাথে সাথে অশ্রুপাতও অনেক পরিমাণে ঘটেছে। বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে সে দেখেছিল ইতিমধ্যে দালানের সামনে সাত্যকি আর টুবাইকে নিয়ে বাড়ির লোকেরা মেতে উঠেছে। বিশেষ করে টুবাইকে নিয়ে। দুজনকে একেবারে জামাইআদরে আপ্যায়ন করা হচ্ছে। ওদের দিকে একঝলক তাকিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল মৈত্রেয়ী।

“এখনই অঞ্জলী শুরু হবে! যারা যারা অঞ্জলী দেবে চলে এসো!” ঠাকুরমশাইয়ের কন্ঠস্বরে ঘোর কেটে গেল মৈত্রেয়ীর। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ঠাকুর দালানের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তারপর টুবাইকে ডাকল সে। মায়ের ডাক শুনে ভাইবোনেরদের নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দালানে হাজির হল টুবাই। এ কদিনে ছেলেটা বাড়ির সকলের আদরের হয়ে উঠেছে। মা-বাবা তো টুবাই বলতে অজ্ঞান। বিশেষ করে মা। রোজ গাদাগুচ্ছের পদ করে খাওয়াচ্ছে। মৈত্রেয়ী বাধা দিতে গেলে বলছে, “থাম দিকিনি! সারাবছরই তো সেই তেল নুন ছাড়া সাঁতলানো খাবার খাস। কটা দিন একটু ভালোমন্দ খেলে কিছু হবে না। জামাইয়ের না হয় শরীর খারাপ বলে বাধ্য হয়ে ওসব অখাদ্য গিলতে বাধ্য হয়। কিন্তু আমার দাদুভাই? দাদুভাইয়ের কি দোষ? বেচারা তো কিছু খেতেই শিখল না? না সুক্তো, না বড়ি দিয়ে পাঁচমেশালি ঘন্ট। এমনকি বেচারাকে মাছ পর্যন্ত খাওয়া শেখাতে পারলি না। সত্যি করে বল তো মিতু! তুই ওখানে সংসার করিস তো নাকি সারাদিন টিভি দেখে কাটাস?”

টুবাইরা আসার পর ঠাকুরমশাই আরেকবার হাক দিলেন, “এখনই অঞ্জলী শুরু হবে! যারা যারা অঞ্জলী দেবে চলে এসো!” এবার সেই ডাক শুনে দালানের আশেপাশে যারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল একে একে দালানের সামনে জড়ো হতে শুরু করল। পুষ্পপত্র থেকে ফুল-বেলপাতা নিয়ে টুবাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে মৈত্রেয়ী একবার চারদিকে তাকিয়ে দেখল সাত্যকি‌ নেই। আশ্চর্য! একটু আগেই তো ঐখানে বসে মেজদাদের সাথে আড্ডা মারছিল। কোথায় গেল? মৈত্রেয়ী উঠে দাঁড়াল। তারপর টুবাইকে জিজ্ঞেস করল, “তোর বাবা কোথায় গেল রে? এই তো ওখানে বসেছিল।”

- বাবা তো এইমাত্র দোতলায় গেল।

- দোতলায় গেল? কেন?

- কে জানে? গল্প করতে করতে আচমকা ফোন এল। সেটা রিসিভ করতে করতে দোতলার সিড়ির দিকে চলে গেল।

- ঠিক আছে তুমি এখানে দিদানের কাছে দাঁড়াও। এখনই অঞ্জলী শুরু হবে। ঠাকুরমশাই যে মন্ত্র বলবেন সেটাকে রিপিট করবে।তারপর সবাই যখন ঠাকুরের দিকে ফুল ছুঁড়বে তুমিও ফুল ছুঁড়বে। তারপর দিদানের থেকে ফুল নিয়ে আবার একই কাজ রিপিট করবে। আমি বাবাকে নিয়ে আসছি।

বলে টুবাইকে অঞ্জলী দেওয়ার জন্য দাঁড়াতে বলে মৈত্রেয়ী এগিয়ে গেল দোতলার সিড়ির দিকে।

ঘরে ঢুকে মৈত্রেয়ী দেখল সাত্যকি বিছানার উপর শুয়ে আছে। একহাত দিয়ে চোখ ঢাকা। কাছে গিয়ে দেখল ঘেমে স্নান হয়ে গেছে সাত্যকি। সকালে পরা নীল পাঞ্জাবীটা ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। মৈত্রেয়ী অবাক হয়ে খাটে বসে জিজ্ঞেস করল, “কি ব্যাপার? অবেলায় শুয়ে আছো যে!” চোখ থেকে হাত না সরিয়ে সাত্যকি জবাব দিল, “ও কিছু না। শরীরটা একটু খারাপ লাগছিল তাই শুয়েছি। অঞ্জলী শুরু হলে ডেকো।”

- শরীর খারাপ লাগছে মানে? সুগার ফল করেনি তো? এই সকালে ওষুধ খেয়েছ?

- আগে অঞ্জলী দিয়ে নিই। তারপর নাহয়...

- রাখো তোমার অঞ্জলী! আগে বাঁচলে তারপর অঞ্জলী দেবে।

বলে গজগজ করতে করতে ব্যাগ থেকে ওষুধ বের করতে গিয়ে মৈত্রেয়ী দেখল সাত্যকির সুগারের ওষুধটা নিলেও প্রেসারের ওষুধটা তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। মৈত্রেয়ী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল খাটে। সর্বনাশ! কি হবে এখন? এখানে তো সেই ওষুধটা পাওয়াও যাবে না! মেজকাকে বললে ও ম্যানেজ করে অন্য ব্র্যান্ডের ওষুধ দিতে পারে কিন্তু একটু আগেই তো মেজকাকে দালানে অঞ্জলী দিতে দেখল তারমানে তো ওষুধের দোকান বন্ধ! এখন কী করবে? কী করা যায়? ছোড়দাকে একবার ডাকবে? ওতো ডাক্তার...চকিতে সাত্যকির দিকে একবার তাকিয়ে মৈত্রেয়ী বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

সাত্যকির শরীর তখন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাসের গতি কমছে। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে সে। ক্রমশ চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। সাত্যকি বুঝতে পারছে প্রেসার ফল করার জন্য ধীরে ধীরে জ্ঞান হারাচ্ছে ও। মৈত্রেয়ীকে বেরিয়ে যেতে দেখে সে একবার চেষ্টা করল ওকে থামানোর, কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে সাত্যকি তলিয়ে যেতে লাগল অচৈতন্যভাবের অন্ধকারে। একসময়ে মৈত্রেয়ীর কন্ঠস্বর শুনতে পেল সে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

হাতে একটা চিনচিনে ব্যথা টের পেতেই জ্ঞান ফিরল সাত্যকির। আর জ্ঞান ফিরতেই পাশ ফিরে সে দেখল ছোট শ্যালক ওর পাশে বসে আছে। শেষ দুপুরের আলোয় ঘরটা ঝলমলে হয়ে উঠেছে। সেই আলোয় সাত্যকি একঝলক চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল ওদের ঘরে একাধিক লোক ওর দিকে তাকিয়ে আছে। শাশুড়ি, শ্বশুর, শ্যালক-শ্যালিকারা বিছানার চারদিকে দাঁড়িয়ে। লজ্জায় উঠে বসতে যাবে এমন সময়‌ পাশ থেকে একটা নরম হাত ওকে বাধা দিল। সাত্যকি তাকিয়ে দেখল ওর মাথার কাছে মৈত্রেয়ী বসে আছে। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল সাত্যকি। চোখ বুঁজে জিজ্ঞেস‌ করল, “কতক্ষণ?”

“তা এই ঘন্টাচারেক তো হবে।” ছোটো শ্যালকের গলা পেল সে। ছোটো শ্যালক বলে চলল, “যা টেনশনে ফেলে দিয়েছিলেন আপনি! ব্লাড প্রেসার এত ফ্ল্যাকচুয়েট করে জেনেও উপোস থাকতে গেলেন কেন? ভাগ্যিস মিতু বুদ্ধি করে আমাকে ডাকল। নাহলে তো সাংঘাতিক কিছু ঘটে যেত। অবশ্য শরীরের আর দোষ কি? কদিন ধরে যা চোব্য চোষ্য চলছে এতে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে যাবে। এবার বুঝলে মা? কেন আমি আর মিতু তোমাকে বারণ করতাম অতো অয়েলি ফুড না দিতে? আগেকার দিন আর নেই! এখন সকলের বয়স হয়েছে। এত রিচ খাবার হজম করার মতো শক্তি আমাদের কারোরই নেই। হতে পারে ওটা তোমাদের কাছে ভালোমন্দ খাবার কিন্তু সুগার-প্রেসার রুগীর কাছে সেটা বিষ!


শ্যালকের কথায় শাশুড়ি মুখে আঁচলচাপা দিয়ে কাঁদছেন দেখে সাত্যকি শ্যালককে থামিয়ে বলল, “আহা খামোখা ওনাকে বকছো! ওনার কোনো দোষ নেই। সত্যি কথা বলতে গেলে দোষ আমারই। মিতু ওষুধ এনেছিল ঠিকই। কাল রাতে ফুরিয়ে যাওয়ায় স্ট্রিপটা ফেলে দিয়েছিলাম। আজ বিকেলেই কিনে আনতাম। ভেবেছিলাম একবেলায় তেমন কিছু হবে না। এতটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি। ইস! আমার জন্য তোমাদের পুজোটাই মাটি হয়ে গেল। শুধু শুধু তোমাদের অহেতুক টেনশনে ফেলে দিলাম, সরি। মা আপনি কিছু মনে করবেন না। চিন্তা নেই আমি এখন ঠিক আছি।”

ছোটো শ্যালক ডাক্তারি সরঞ্জামগুলো ব্যাগে গুছিয়ে বলল, “সে আপনি যাই বলুন সাত্যকিদা। ঐ খাবারগুলো আপনার পক্ষে বিষই। আর আজকের পর আর কেউ দিক বা না দিক অন্তত আমি খেতে দেবো না। মিতুকে বলা আছে। আজ রাত থেকে শুধু চিকেন স্টু আর রুটি আপনার খাদ্য। দুবেলা ওটাই গলাধঃকরণ করতে হবে। আর বাড়ি ফিরে আরেকবার চেকআপ করিয়ে নেবেন। সুগারটাও একটু বেড়েছে মনে হচ্ছে। আপাতত আজকের দিনটা রেস্ট নিন।” বলে সকলকে ঘর থেকে বেরোবার নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে গেল ছোটো শ্যালক। কিছুক্ষণ সেখানে থাকার পর একে একে সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর মৈত্রেয়ীর হাত ধরে সাত্যকি বলল, “টুবাই…?”

সাত্যকির মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে মৈত্রেয়ী বলল, “এসেছিল। এখন নিচে বাকি বাচ্চাদের সাথে খেলছে।” চোখ বুঁজে মৃদু হেসে সাত্যকি বলল, “থ্যাঙ্কস!” মৈত্রেয়ী সেটার জবাব না দিয়ে বলল, “থাক! অনেক হয়েছে! সারাদিন অনেক জ্বালিয়েছ এখন আপাতত একটু ঘুমোও। ভালো লাগবে।”

মৈত্রেয়ীর দিকে তাকিয়ে আরেকবার হাসল সাত্যকি। তারপর ওর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “এখানে আসার পর থেকে দেখছি শাশুড়িমা আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আমাকে আর টুবাইকে নিয়ে ওনার আদরের আর শেষ নেই। ‘মেজো জামাই এই...’, ‘মেজো জামাই ঐ...’,‘মেজো জামাই না থাকলে কী যে হত?’ তা আজ তো তাকে তাঁর মেজো মেয়ের প্রশংসা করতে দেখলাম না। তাঁর মেয়েও যে যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে।”

- বাজে কথা না বলে ঘুমোও।

- আমি বাজে কথা বলছি না। সত্যিই তুমি না থাকলে হয়তো এতক্ষণে বৈতরণী পাড়ে চোখ খুলতো আমার।

শশব্যস্তে সাত্যকির মুখে হাত চাপা দেয় মৈত্রেয়ী। তারপর কড়াগলায় বলে, “চুপ! একদম চুপ! আরেকটা কথা বললে ভালো হবে না বলে দিলাম! তোমার মুখে কি কিছু আটকায় না? একে শরীরের এই অবস্থা করে আমাকে পাগল করে দিয়েছ। তারপর মরার কথা বলে জ্বালাচ্ছ! লজ্জা করে না! জানো সারাটা দিন কীভাবে কেটেছে আমার? আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল পুরো! এরপর যদি আরেকবার তোমাকে অনিয়ম করতে দেখি তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন!” বলেই পরক্ষণেই সম্বিত ফিরে পেয়ে সাত্যকির মুখ থেকে হাত সরিয়ে নেয় মৈত্রেয়ী। সাত্যকি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মৈত্রেয়ীর দিকে। মৈত্রেয়ী নীচু গলায় বলে, “সরি!” সাত্যকি চোখ বুঁজে আলতো গলায় বলে,

- এতে সরি বলার দরকার নেই। দোষ আমারই। আমিই ওষুধের কথা জানাইনি তোমাকে। ভেবেছিলাম তেমন ঝামেলা হবে না, কিন্তু কপাল মন্দ আমার।

- আমি সেভাবে বলতে চাইনি।

- জানি। তুমি আমার স্ত্রী মৈত্রেয়ী। আমাকে ভালোবাসার অধিকার যেমন তোমার আছে তেমনই শাসন করারও আছে। আর শাসন করা তাকেই সাজে সোহাগ করে যে। তবে একটাই আক্ষেপ আছে জানো?

- কী?

একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৈত্রেয়ীর দিকে তাকায় সাত্যকি তারপর বলে, “তুমি না দিন দিন বড্ড বড্ড ঝগড়ুটে বুড়ি হয়ে যাচ্ছ। খালি শাসন করো!” মৈত্রেয়ীও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “কি করব বলো? বর যদি বাচ্চাদের মতো আবদার করে তখন শাসন না করে লাভ আছে? মা বলেছিল ব্যাঙ্গালোরে আমি সংসার করি না। সারাদিন টিভি দেখে বেড়াই। মা কি করে জানবে দুটো ধেড়ে বাচ্চাকে নিয়ে সারাদিন এমন কাটে যে টিভি দেখার প্রয়োজন পড়ে না। নিজের সংসারটাই সিরিয়াল বলে মনে হয়।”

- কি? আমি ধেড়ে খোকা?

- না তো কি? সারাদিন তোমার পেছনে যা ঘুরতে হয় টুবাইয়ের ছেলেবেলাতেও অতো ঘুরতে হয়নি। লকডাউনের আগে তাও ছুটির দিনে আমাকে হেল্প করতে। এখন তো তাও করো না। সারাদিন হয় খাবার নিয়ে নাহয় ওষুধ নিয়ে তোমার পেছনে দৌড়তে হয়। বাচ্চাদের মতো চোখে চোখে রাখতে হয়।

- রাখতে হবে না আমার খেয়াল! কে বলেছে আমার পেছন পেছন দৌড়তে? আমারটা আমিই দেখে নিতে পারি।

- থাক! তোমার দৌড় আমার জানা আছে। নিজে থেকে তো কিছুই করতে পারো না। সব সময় এই আমাকে লাগে তোমার। সারাদিন ‘মিতু আমার চশমা কই?’, ‘মিতু আমার ফোনটা কোথায়?’, ‘মিতু গাড়ির চাবি পাচ্ছি না।’ সবসময় মিতু মিতু আর মিতু। আমি না থাকলে বা একদিনের জন্য বাইরে গেলে বাপ-ব্যাটায় চোখে সর্ষেফুল দেখো। মনে নেই? সেবার সোসাইটির সব মহিলাদের সাথে একটু সিনেমা দেখতে গেছি ওমনি বাবু অফিস থেকে ফিরে গোঁসা করে বসে আছে। অন্যদিন তো রাত আটটার আগে ফেরা হয় না। সেদিন ছটা বাজতে না বাজতে ফিরে আসা হয়েছে।

- বেশ করেছি! অন্যদিন মুভিডেটের কথা বললে বলো, ‘আজ থাক! শরীর ভালো নেই’, ‘টুবাইয়ের পরীক্ষা চলছে।’ আমিও মানুষ! আমারও ইচ্ছে করে নিজের বউকে নিয়ে ডেটে যেতে!

- ইস! শখ কত? বলি বয়সটা দিন দিন বাড়ছে না কমছে?

- বয়সের আর কি দোষ? এরকম সুন্দরী বউ থাকলে সকলের মাথা ঘুড়ে যেতে বাধ্য।

বলে সাত্যকি জড়িয়ে ধরে মৈত্রেয়ীকে। দরজার দিকে একবার তাকিয়ে মৈত্রেয়ী শশব্যস্ত হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে ওঠে, “কি হচ্ছেটা কি? ছাড়ো! বাড়িভর্তি লোকজন! কেউ দেখে ফেললে কি হবে?” মৈত্রেয়ীকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সাত্যকি বলে, “কিছু হবে না। আমার বউকে আমি আদর করছি এতে কে কি ভাবল আই ডোন্ট কেয়ার। তাছাড়া সবাই জানে এ বাড়ির জামাই এখন অসুস্থ। তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। আর সেই কারনে অন্তত এবেলা কেউ এদিকে আসবে না। কাজেই এবেলা ম্যারাথন খেললে ধরা পড়ার চান্স নেই।”

“সে গুড়ে বালি মশাই! আরেকটু পরে সন্ধিপুজো শুরু হবে। আর বাড়ির মেয়ে হিসেবে আমাকে থাকতে হবে সেখানে।” বলে সাত্যকির গালে একটা চুমু খেয়ে হাতে চিমটি কাটে মৈত্রেয়ী। মৃদু যন্ত্রণায় সাত্যকির বাহুডোরের জোর একটু আলগা হয়। সেই সুযোগে নিজেকে ছাড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যায় মৈত্রেয়ী। ওর দিকে তাকিয়ে হতভম্ব সাত্যকি বলে, “আর আমার কি হবে? শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী সেবা পাবো না?” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মৈত্রেয়ী চটুল হেসে “সে পরে দেখা যাবে!” বলে বেরিয়ে যায়। সেদিকে তাকিয়ে আপন মনে হেসে বিছানায় শুয়ে চোখ বোজে সাত্যকি। অনেকদিন পর মৈত্রেয়ীকে এতটা প্রগলভ দেখল সে। ঠিক বিয়ের আগের মতো। নাহ এখানে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়ে ভুল করেনি সে। বরং না এলে আফসোস থেকে যেত চিরকালের মতো। না এলে মৈত্রেয়ীকে এত হাসিখুশি দেখতে পারত সে?

সত্যি কথা বলতে গেলে অনেকদিন ধরে একটা অভিমান জমেছিল দুপক্ষের মধ্যে। যার কারনে কষ্ট পাচ্ছিল দুপক্ষই। কেন পুজোর সময়টাতেই মৈত্রেয়ী বাইরে যাবার প্ল্যান করতে বলতো সে কি আর জানে না? যাতে নিজের মনকে ভুলিয়ে রাখা যায়। যাতে পুজোর সময় নিজের লোকেদের কাছ থেকে দূরে থাকার কষ্টটা ভোলা যায়। কিন্তু পারত কি? সাত্যকি দেখেছে বাইরে বেরোতে গেলেও কীরকম যেন আনমনা হয়ে যেত মৈত্রেয়ী। বাইরে থেকে দেখাত বটে যে এই ট্যুরটা সে এঞ্জয় করছে কিন্তু ভেতর ভেতর গুমড়ে মরত সে। বিয়ের পর প্রথম প্রথম বাইরে বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ রাতে ঘুম ভেঙে সে মৈত্রেয়ীকে কাঁদতে দেখেছে। মৈত্রেয়ীকে সে ভালোবাসে। তাই আজীবন এই অভিমানের খেলায় মৈত্রেয়ী ওর পরিবারের থেকে দূরে থাকুক চায়নি সে। তাই এবছর নিজে থেকেই ছোটো শ্যালকের সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করেছিল সে। তারপর ছোটো শ্যালকের সাথে মিলেই এই পরিকল্পনাটা করে সে। কিন্তু দুজনের কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল মৈত্রেয়ী আর শ্বশুরমশাইকে কনভিন্স করা। মৈত্রেয়ীকে নাহয় ম্যানেজ করা গেল কিন্তু শ্বশুরমশাই? তাকে কিভাবে ম্যানেজ করবে সেটা নিয়েই চিন্তিত ছিল সে। কিন্তু এখানে আসার পর সেই মুশকিলটাও আসান করে দিল টুবাই। নাতিকে সামনে দেখে শ্বশুরমশাই এমন গলে গেলেন যে বাকি কাজটাও সহজ হয়ে গেল। ভাবতে ভাবতে আলতো হাই তোলে সাত্যকি।

ওদিকে মায়ের সন্ধি-পুজো প্রায় শুরুর মুখে। বাড়ির সমস্ত মেয়ে-বউরা একে একে জড়ো হয়েছে ঠাকুর দালানে। মৈত্রেয়ী দোতলা থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে মিশে যায় সেই মেয়ে-বউদের দলে। সকলে মিলে লজ্জাবস্ত্র তুলে ধরে মায়ের সামনে। ঠাকুরমশাইয়ের মন্ত্রোচ্চারণে, ঢাকিদের ঢাকের শব্দে, ঠাকুরদালানের পরিবেশ তখন বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। ক্রমাগত জ্বলে ওঠা ধূপের ধোঁয়ায় দেবীপ্রতিমার মুখটা প্রায় আবছা হয়ে এলেও সে মুখে আজ যেন বেশ অন্যরকম দীপ্তি দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন প্রতিমার ঠোঁটের হাসিটা একটু চওড়া হয়েছে। এ হাসি ভারী আমোদের হাসি। যেমনটা অনেকবছর পর নিজের প্রিয়জনের সাথে দেখা করার সময় দেখা যায়। যে হাসিটা বহুদিন পর বাড়ির মেয়ে বাপের বাড়ি ফিরে এলে আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে দেখা যায়। যখন মা তার সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে আসেন চারদিনের জন্য তখন যে হাসিটা আমাদের মধ্যে সঞ্চালিত হয়, এ হাসি সেই হাসি। ধীরে ধীরে সেই হাসিটা ছড়িয়ে পড়ে দালানে উপস্থিত সকলের মধ্যে।


রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০২২

মায়া




নিজের রুমে ঢুকেই সিলিংফ্যানের সুইচ অন করে ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে চেয়ারে বসলেন অতীনবাবু। দিন দিন যা অসম্ভব গরম পড়ছে তাতে তাঁর মতো মোটা মানুষের টেকা দায়। কতদুর হবে বাড়ি থেকে স্কুলের দুরত্ব? বড়োজোর কুড়িমিনিটের হাটা পথ। সাইকেল চালালে মিনিট দশেক লাগে। অথচ সেটুকু পথ সাইকেলে পেরোতেই আজ প্রায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল তাঁর। জামাকাপড় ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে গেছে। চেয়ারে বসে ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে ফ্যানের তলায় চোখ বুঁজে কিছুক্ষণ বসে রইলেন তিনি।


সত্যি কথা বলতে গেলে গরমকাল তাঁর কোনো কালেই পছন্দ নয়। ছেলেবেলা থেকেই গরম সহ্য করতে পারেন না তিনি। পারদের মাত্রা তিরিশের উপরের গেলেই তাঁর নানারকম অস্বস্তি শুরু হয়। তার উপর ঘামাচি, র‍্যাশ হওয়া তো লেগেই আছে। এই গরমকালের চেয়ে শীতকাল ঢের ভালো। কত সুন্দর মিঠে রোদের ওমে পিঠ রেখে কাজ করা যায়। অতীনবাবুর মনে আছে ছেলেবেলায় ছুটির দিনে শীতের সকালে ছাদে শতরঞ্চি পেতে বসে পড়তেন পড়ার বই নিয়ে। তারপর সারাটা দিন যে কোথা দিয়ে কেটে যেত টেরই পেতেন না। খেয়াল হত যখন দুপুরে মা স্নানের তাগাদা দিয়ে ডাকতেন। এখনও যে সেই অভ্যেসটা নেই তা নয়। এখনও ছুটির দিনে ছাদে শতরঞ্চি পেতে গল্পের বই নিয়ে বসে যান তিনি। যতক্ষণ পর্যন্ত একতলা থেকে সৌমির ডাক না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত ধ্যান ভাঙে না তাঁর।

কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটু ঘোরের মতো এসে গিয়েছিল অতীনবাবুর। প্রেয়ারের বেলের শব্দ শুনে সেটা কেটে গেল। সোজা হয়ে চেয়ারে বসলেন তিনি। খেয়াল করলেন শরীরের ক্লান্তিটা এখন অনেকটাই কেটে গেছে। আগের চেয়ে এখন বেশ সুস্থ বোধ করছেন তিনি। একটু আগের সেই দমবন্ধ বন্ধ করা ভাবটাও অনেকটাই কমে গেছে। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন প্রেয়ারে যোগ দিতে।

অতীনবাবু পেশায় একজন বাংলা শিক্ষক। এই পার্বতীচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে আজ তিরিশ বছর হল তিনি শিক্ষকতা করে আসছেন। প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদান করেছেন এই বছর পাঁচেক হল। সাধারণত প্রধান শিক্ষক বলতে আমাদের চোখের সামনে যে চেহারাটা ভাসে অতীনবাবুর ব্যক্তিত্ব তার ঠিক উল্টো। কোনো উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলতে আমরা বুঝি রাশভারী, গম্ভীর, ব্যক্তিত্বময় একজন মানুষ। যার মুখটা সব সময় পেঁচার মতো গম্ভীর হয়ে আছে। কিন্তু অতীনবাবুকে দেখলে মনে হবে হয় আমরা এতদিন যা জেনে এসেছি তা ভুল, নাহলে প্রধান শিক্ষক বলে যে মানুষটার সাথে আমাদের ছেলেবেলায়, বা বলা ভালো স্কুলবেলায় পরিচয় ঘটেছে তিনি অন্য কোনো গ্রহের লোক ছিলেন। পদমর্যাদায় একজন প্রধান শিক্ষক হলেও অতীনবাবু লোকটা ভীষণ অমায়িক, আমুদে, আর ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয়। প্রধানশিক্ষক হলেও নিজের চাকরীজীবনের শিকড়কে তিনি ভোলেননি। নিজের রুমে থেকে যাবতীয় কাজ করলেও নিয়মিত ছাত্রদের ক্লাস নেওয়া, টিফিন পিরিয়ডে স্টাফরুমে বসে অন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সাথে আড্ডা দেওয়া, মালির সাথে নতুন ফুল গাছের বিষয় গল্প করা সবই তিনি হাসি মুখে করে থাকেন। এতবছরের চাকরীজীবনে অতীনবাবুকে কেউ কোনোদিন রাগতে বা গম্ভীর মুখে দেখেনি। বরং সারাক্ষণ ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি লেগেই রয়েছে তাঁর। স্কুলে কেউ কোনো অপরাধ করলে, কেউ শয়তানি করলেও তিনি রাগ করেন না। এমনকি ছাত্রদের শাস্তিও দেন না। না ভুল বলা হল, শাস্তি তিনি দেন ঠিকই। কিন্তু সে শাস্তিগুলোও বড়ো আজব।

ধরা যাক কোনো ছাত্র আরেক ছাত্রের জামায় কলমের আঁচড় কেটে দিল, বা জামাটা নোংরা করে দিল। তার শাস্তি হবে নিজের জামায় কলম দিয়ে ‘আমি অমুকের জামায় কলমের দাগ কেটে ভীষণ দুঃখিত। আমি প্রতিজ্ঞা করছি জীবনে কারো জামায় দাগ দেব না।’ লিখে কান ধরে সেই জামায় দাগ খাওয়া ছেলেটার সামনে দশবার উঠবোস করা। কেউ যদি টিফিন টাইমের আগে খাবার খেতে গিয়ে ধরা পড়ে, পরদিন গোটা ক্লাসকে সে দুটো করে সিঙ্গারা খাওয়াবে। কারন সে টিফিন টাইমের আগে খেয়ে যেমন নিয়ম ভেঙেছে, তেমনই ক্লাসের সহপাঠীদেরকেও খাবারের লোভ দেখিয়ে পড়ার মনঃসংযোগ নষ্ট করে নিয়ম ভাঙতে প্রলুব্ধ করেছে। কেউ যদি স্কুল থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে, তাহলে তাকে গোটা সপ্তাহ স্কুল খোলার আগে স্কুল আসতে হবে। প্রেয়ারে সবার সামনে জাতীয় সংগীত গাইতে হবে এবং গান শেষে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জাতীয় পতাকাকে স্পর্শ করে শপথ করতে হবে যে আর কোনোদিন সে এই কাজ করবে না। পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়লে পরীক্ষার পর গোটা স্কুলের সমস্ত ক্লাসের মেঝেতে পড়ে থাকা নকলের টুকরো কুড়িয়ে ক্লাসরুমগুলো পরিস্কার করতে হবে। আর ধরা যাক ব্যাপারটা মারপিটে গড়াল। তাহলে যে মারপিট আগে শুরু করেছে সেই মূল অপরাধীকে সে দিনের মতো মেয়েদের ক্লাসের সামনে নিলডাউন হয়ে বসে থাকতে হবে। এবং পরের একসপ্তাহ যার সাথে মারপিট হয়েছিল তাকে বুকে জড়িয়ে সরি বলতে হবে।

অতীনবাবুর এই বিধানে কেউ কেউ অবাক হন, কেউ হাসেন, কেউ কেউ রাগ করেন। একবার তো অঙ্কের স্যার তুষারবাবু বলেই বসলেন, “দূর! ওটা কোনো শাস্তি হল নাকি? এরা সব বেতের ভুত। বাবা-বাছা করে ভুলিয়ে উদ্ভট শাস্তি দিলে শোধরাবে না। বেতই হল এদের মোক্ষম ওষুধ। দু-চার ঘা বেতের বাড়ি দিলে সব শুধরে যাবে।” অতীনবাবু সবটা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “বেশ তো! তা আপনার বাড়ির সন্তানদেরও এইভাবে মানুষ করেন বুঝি?” তুষারবাবু গর্বিতভাবে হেসে বলেন, “কি যে বলেন স্যার? আমার বাড়ির বাচ্চারা অন্তত এদের মতো ত্যাঁদড়, লেজকাটা হনুমান নয়। ওরা অনেক ভদ্র সভ্য।” উত্তরটা শুনে আরো মুচকি হেসে অতীনবাবু বলেন, “আমি সেই কথা বলছি না। আমি বলতে চাইছি, ধরুন আপনার বাড়ির বাচ্চা একদিন ঘরের জিনিস ভুল করে ভেঙে ফেলল। ধরা যাক আপনার সাধের ফোনটাই আছড়ে ফেলল। সেক্ষেত্রেও কি আপনি বাচ্চাটাকে বেতপেটা করবেন?” পলকে তুষারবাবু চমকে নিজের বুক পকেট খামচে ধরে দামী ফোনটা বের করে বলেন, “কি যে বলেন? নিজের সন্তানকে কি আর ওভাবে মারা যায়? তাছাড়া আমার বাড়ির সন্তান তো অবুঝ, দুগ্ধপোষ্য!”

কথাটা শুনে হেসে অতীনবাবু জবাব দেন, “আমার স্কুলের বাচ্চারাও যে সে নিয়মে আমারই সন্তান। হ্যা ওরা ঠিক দুগ্ধপোষ্য নয়, তবে অবুঝ বটে। ভালো-মন্দের বিচার করার মত বোধ ওদের নেই। কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়, শত্রুতা-বন্ধুত্বের সঠিক হিসেব ওরা জানে না। বলতে পারেন ওরা মাটির তাল মাত্র। যাকে গড়ে সুন্দর মাটির সব বস্তু বানানোর দায়িত্ব আমাদের। ওরা আমাদের যেমন দেখবে তেমনই শিখবে। আর কাউকে বেত মেরে শেখানোর ব্যবস্থার আমি ঘোরতর বিরোধী। এতে কোনো লাভ তো হয় নাই, তার উপর শাস্তি সম্পর্কে ওদের ভুল জ্ঞান তৈরি হয়। হ্যা শাস্তি দেবেন না কেন? দিন যতখুশি পারেন দিন। কিন্তু সেটা যাতে শারীরিক বা মানসিক আঘাতের কারন না হয়। বরং এমন শাস্তি দিন যেটায় ওদের বিবেক, মননের বিকাশ হয়, চরিত্রের উন্নতি ঘটে। যে শাস্তির প্রভাবে সত্যিই ওদের মনের সংশোধন হয়। যার সাথে অন্যায় করা হয়েছে, তার যন্ত্রণাটা যতক্ষণ দোষী অনুভব না করছে, অন্যায়ের জন্য যতক্ষণ দোষীর অনুতাপ না হচ্ছে ততক্ষণ শাস্তির কোনো মানেই হয় না। ওরা যদি দেখে অন্যায় করলে একটা বেতের বাড়ি খেলে, বা লাঠির আঘাত পেলেই সাতখুন মাফ হয়ে যাচ্ছে। তাহলে শাস্তির প্রতি ওদের ভয়টাই থাকবে না। আর যাদের শাস্তির প্রতি ভয় থাকে না তাদের কি বলে জানেন? বেপরোয়া। আর একজন শিক্ষক হয়ে আমার কোনো শিক্ষার্থীকে বেপরোয়া হতে দিতে আমি পারি না। তাছাড়া এদের বাবা-মায়েরা এদের স্কুলে পাঠান আমাদের ভরসায়। একজন শিক্ষক হিসেবে সেই ভরসার মান রাখা আমাদের কর্তব্য। এটা ভুললে চলবে না স্কুলে প্রেয়ারের বেল পড়ার পর থেকে ছুটির বেল পড়া পর্যন্ত এদের দায়িত্ব আমাদের উপর। এই সময়টুকু আমরাই এদের বাবা-মা। এরা ভালো কিছু করলে যেমন আমাদের উৎসাহ দেওয়া উচিৎ, তেমনই ভুল করলে বকাঝকা বা মারধোর না করে ওদের ভুলটা ধরিয়ে দেওয়াটাও আমাদের কর্তব্য। আপনারা এটাকে পাগলামো বা ছাত্রদের প্রশ্রয় দেওয়া বলতেই পারেন কিন্তু যতক্ষণ আমি এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে আছি বা এই শিক্ষকতার পেশায় আছি ততদিন এইভাবেই ছাত্রদের প্রশ্রয় দিয়ে যাব।”

শোনা যায় তুষারবাবু সেই সময় কিছু না বললেও পরে জনান্তিকে ইংরেজির ম্যাডাম ঐন্দ্রিলাদেবীকে বলেছিলেন, “অতীনবাবুর অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো উচিৎ। আগে তো মিনি ক্র্যাকড ছিলেনই, হেডু হবার পর ফুল ক্র্যাকড হয়ে গেছেন। আরে রুটি দু-পিঠে সেঁকতে হয়। নাহলে ভালো রুটি তৈরি হয় না। এতবছর হয়ে গেল আমরা স্কুলে কম বাচ্চা মানুষ করিনি। উনি যাদের অবুঝ বাচ্চা বলছেন তারা চৌবাচ্চা ছাড়া আর কিছু নয়। ক্লাস সেভেনের অপুর্বকে কাল দেখলাম, এই বয়সেই সিগারেট ধরেছে। নেহাত আমাকে দেখে পালিয়ে গেল। নাহলে ধরে ওখানেই পিঠের ছাল তুলে নিতাম।”

প্রত্যুত্তরে ঐন্দ্রিলাদেবী বলেছিলেন, “সে আপনি যাই বলুন তুষারদা। লোকটার প্রতি ছাত্রদের একটা আলাদাই ক্রেজ আছে। অন্য স্কুলের প্রিন্সিপালদের দেখলে স্টুডেন্টরা ভয়ে তটস্থ থাকে। এদিকে আমাদের অতীনবাবুকে দেখলে ছেলেরা আনন্দে নাচে। কিছু তো একটা আছে লোকটার মধ্যে।”

“হুম আছে তো! অন্ধস্নেহ!” বলে গজগজ করে ক্লাস নিতে চলে গিয়েছিলেন তুষারবাবু।

*****

- আজ তবে এইটুকু থাক। কাল কিন্তু সবাই পড়া করে আসবি। আমি পড়া ধরব। পড়া না পারলে কি হবে মনে আছে তো?

বলে ক্লাসের দরজার বাইরের দিকে তাকান অতীনবাবু। বাইরে নীলডাউন হয়ে কান ধরে বসে আছে ক্লাস সিক্সের সুনীল। ক্লাসের সবচেয়ে বেশি অমনোযোগী ছাত্র। স্কুলে ডানপিটে ছাত্রদের মধ্যে এর নামও শুনেছেন তিনি। ছাত্ররা অতীনবাবুর সঙ্গে ক্লাসের বাইরে তাকাল। তারপর সমস্বরে বলল, “বাইরে নীলডাউন!”

- কথাটা মনে থাকে যেন!

বলে চক-ডাস্টার নিয়ে ক্লাসের বাইরে বেরিয়ে আসেন অতীনবাবু। তারপর সুনীলের কাছে গিয়ে বলেন, “থাক! অনেক শাস্তি পাওয়া হয়েছে! এবার ক্লাসে গিয়ে আমাকে উদ্ধার করা হোক।” সুনীল কান ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অতীনবাবু হেসে বলেন, “আর কতদিন এই ক্লাসে পড়ে থাকবি? তিনবছর তো হতে চলল! তোর বয়সের সব ছেলেরা, তোর সহপাঠীরা সব সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। আর তুই এত বড়ো হয়ে…পড়াশোনাটা একটু ভালো করে কর বাবা! জানি তোর বাবা অসুস্থ হবার পর তোকেই দোকানে বসতে হয়। অনেক চাপ তোর মাথায়! তাই বলে এইভাবে বছর বছর ফেল করবি?”

সুনীল মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে। অতীনবাবু হেসে সুনীলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “শোন ছেলে! তোর মাথা ভালো কিন্তু তা পড়াশোনায় না লাগিয়ে অপুর্বদের সাথে মিশে বদকাজে লাগাস বলেই তোকে শাস্তিটা দিই। হ্যা বদমাইসি করবি না কেন? অবশ্যই করবি! হাজারবার করবি। কিন্তু তার সাথে পড়াশোনাটাও করতে হবে তো! যা ক্লাসে যা। ভালো করে পড়। কাল কিন্তু আমি পড়া ধরবো। মনে থাকবে তো?”

সুনীল মাথা নেড়ে ক্লাসে চলে যায়। অতীনবাবু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন, তারপর আপন মনে হাসতে হাসতে মাথা নেড়ে এগিয়ে যান স্টাফরুমের দিকে।

*****

স্কুলের সব কাজ সেরে অতীনবাবু যখন স্কুল থেকে বেরোলেন ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা বিকেল পাঁচটার ঘর ছুঁয়েছে। স্কুলের দারোয়ান কাম পিয়ন নিবারণ হেডমাস্টারের ঘরের বাইরে বসেছিল। তিনি বেরিয়ে যেতেই দরজা আটকে তালা মেরে দিল। অতীনবাবু সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাজারের উদ্দেশ্যে। কদিন ধরে সৌমির শরীরটা খুব খারাপ। জ্বরের মুখ থাকায় কদিন ধরে কোনো খাবারের স্বাদ পাচ্ছে না সৌমি। এদিকে অসুস্থ সৌমি বিছানায় শয্যাশায়ী হওয়ায় তাকেই রান্নাঘরের ভার নিতে হয়েছে। এসব কাজে তিনি যে কতটা অপটু তা তিনি এই কদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গেছেন। কোনোদিন তরকারী নুনে পুড়িয়েছেন, কোনোদিন আবার ডালে নুনই দেননি। জ্বরে ভোগা সৌমী সেই সব অখাদ্য খাবার মুখ বুঁজে খেয়ে নিলেও নিজে খেতে গিয়ে লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেছে তাঁর। আজকে সকাল মাপতে গিয়ে দেখলেন আগের তুলনায় সৌমির জ্বরটা একটু কমেছে। মুখের স্বাদও ফিরে এসেছে কিছুটা। তাই সকালবেলা ভাত ডাল আর আলুভাজা করলেও বিকেলের দিকে বাজার থেকে বেশ অনেকটা মাংস কিনে নিয়ে যাবেন ঠিক করেছেন তিনি। সৌমি মাংস খেতে খুব ভালোবাসে। সদ্য জ্বর থেকে ওঠা অরুচির মুখে ঝাল ঝাল মাংসের চেয়ে ভালো খাবার আর হয় না। ভাবতে ভাবতে বাজারে ঢুকলেন তিনি।

বাজার থেকে মাংস, আলু ইত্যাদি সবজি কিনে অতীনবাবু যখন বাড়ি পৌঁছলেন ততক্ষণে চারদিকে সন্ধ্যের গাঢ় অন্ধকার ক্রমশ তাঁর আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে। গোটা পাড়া মহিলাদের উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে গমগম করছে। সাইকেল থেকে নেমে মেনগেট খুলতেই পিছন থেকে, ‘মাস্টারমশাই!’ ডাক শুনে থমকে গেলেন অতীনবাবু। পিছন ফিরে দেখলেন সামনের বাড়ির তারিণীবাবু গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুচকি হেসে অতীনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু বলবেন?” একটু হেসে ইতস্তত হয়ে তারিণীবাবু বললেন, “স্কুল থেকে ফিরলেন বুঝি?”

- হ্যা। আসলে ফেরার পথে একটু বাজার হয়ে এলাম বলে একটু দেরি হয়ে গেল।

- বৌঠান কেমন আছেন? জ্বরটা কমেছে?

- তা কমেছে। আজ সকালেই তো দেখলাম উঠে বসল। কেন বলুন তো?

- না এমনিই জিজ্ঞেস করছিলাম। আসলে বুঝতেই পারছেন আমার গিন্নি আর বৌঠান দুজনেই ভীষণ বন্ধু। ওড় কাছেই শুনেছিলাম বৌঠানের শরীর খারাপের খবরটা।

- তা বটে! সৌমি আর বৌঠান তো যাকে বলে একেবারে হরিহর আত্মা!

- আসলে আজ দুপুরে আমার গিন্নি বৌঠানের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। অনেক ডেকেও সাড়া পায়নি। তাই চিন্তা করছিল।

অতীনবাবু একটু থমকে তাকান তারিণীবাবুর দিকে তারপর হেসে বলেন, “ও এই ব্যাপার? আসলে কি হয়েছে জানেন? কদিন ধরেই সৌমিকে কড়া ডোজের ওষুধ খেতে হচ্ছে।তার উপর কদিনের জ্বরে কাহিল হয়ে গেছে বেচারি। সেই কারনেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাই বৌঠান ডেকেও সাড়া পাননি। সৌমির ব্যবহারে আমি অত্যন্ত দুঃখিত! ক্ষমা করবেন।”

- এবাবা! ছিঃ! ছিঃ! আপনি ক্ষমা চাইছেন কেন? ভুল তো আমাদের। আমার গিন্নিরই বোঝা উচিৎ ছিল ব্যাপারটা। আসলে বুঝতেই পারছেন, সই অন্ত প্রাণ মহিলা। কদিন ধরে সইকে দেখতে পারছে না। আজ দেখা করতে গিয়ে ডেকেও সাড়া পায়নি। অহেতুক ভুলভাল ভেবে ফেলেছে। জানেনই তো মহিলাদের মন…

- সন্দেহবাতিক সারাক্ষণ! হে হে বুঝেছি! চিন্তা নেই! সৌমি একদম ঠিক আছে। আচ্ছা চলি! আমাকে আবার রাতের রান্না চাপাতে হবে। বুঝতেই পারছেন হোম মিনিস্টার যখন সিক লাইভ তখন এই শর্মাকেই হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে।

- তা আর জানি না? আমার বাড়িতেও একই নিয়ম চালু আছে। গিন্নি অসুস্থ হলে আমাকেই মাঠে নামতে হয়।

- আচ্ছা আসি তাহলে।

- এই দেখেছেন! যে কারনে আপনাকে ডাকলাম সেটাই বলতে ভুলে গেছি। আচ্ছা অতীনবাবু আপনি কোনো গন্ধ পাচ্ছেন?

- গন্ধ মানে? ঠিক বুঝলাম না।

- না মানে বেশ কয়েকদিন ধরেই পাড়ার সকলে একটা গন্ধ পাচ্ছে। ভীষণ বিচ্ছিরি আর পঁচা গন্ধ। অনেকটা ইঁদুর মরলে যে গন্ধ বেরোয় সেরকম।

- কই আমি তো সেরকম কিছু গন্ধ পাচ্ছি না। হ্যাঁ একটা গন্ধ ভেসে আসছে বটে। বোধহয় কোনো ইঁদুর মরেছে কোথাও।

- তাই হবে হয়তো। আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আসুন। আর কোনো রকম প্রয়োজন হলে আমাদের ডাকবেন। বিপদে প্রতিবেশী হিসেবে যদি এগিয়ে না আসি তাহলে প্রতিবেশী হবার কি মানে?

- সে তো বটেই। আচ্ছা এলাম।

বলে মেনগেটের একটা পাল্লা খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকে যান অতীনবাবু। তারিণীবাবুও কিছুক্ষণ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ঢুকে যান নিজের বাড়িতে।

ঘরের ঢোকার পর সুইচ টিপে এক এক করে ঘরের সব আলো জ্বেলে দিলেন অতীনবাবু। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘর আলোতে ঝলমল করে উঠল। বাজারের থলেটা রান্নাঘরে রেখে শোয়ার ঘরে ঢুকে আলোটা জ্বেলে বিছানার দিকে ঘুমন্ত সৌমির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন তিনি। কদিনের রোগভোগে সৌমির চেহারা শুকিয়ে একেবারে কঙ্কালসার হয়ে গেছে। সৌমির দিকে কিছুক্ষণ অপলকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে কাঁধে গামছা নিয়ে সোজা কলঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন অতীনবাবু।

স্নান সেরে ঘরের পোশাক পরে রাতের রান্নার তোড়জোড়ে লেগে পড়লেন অতীনবাবু। চটপট গরম গরম কষা মাংস আর ভাত রান্না করে খাবারগুলো ঢেকে দিয়ে নিজের স্টাডিরুমে ঢুকলেন তিনি। রাতের খাবার খেতে এখনও অনেক দেরী আছে। ততক্ষণ একটু বই নিয়ে বসলে মন্দ হয় না। ভাবতে ভাবতে স্টাডিরুমের দিকে এগোতে যাবেন এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে থমকে দাঁড়ালেন অতীনবাবু। এতরাতে আবার কে এল? কোনো ছাত্র নাকি? কই কাউকে তিনি বাড়িতে আসতে বলেছিলেন মনে পড়ছে না তো। কিছুক্ষণ পর আবার দরজায় কড়ার নাড়ার শব্দ ভেসে এল। অবাক হয়ে অতীনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” কোনো উত্তর এল না। ভ্রু কুঁচকে গেল অতীনবাবু। কাউকে তো তিনি বাড়িতে আসতে বলেননি। তাহলে এত রাতে কে দরজায় কড়া নাড়ছে? ভাবতে ভাবতে আবার কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। এবার অতীনবাবু একপলক নিজের বেডরুমের দিকে তাকান। তারপর বেডরুমের দরজা বাইরে থেকে আটকে সদর দরজার সামনে এগিয়ে এসে আরেকবার উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কে?” এবার জবাব এল, “আমরা!” কন্ঠস্বর শুনে অতীনবাবু অবাক হলেন। এতো কোনো বাচ্চা বা কিশোরের গলা নয়। তাহলে কে? ভাবতে ভাবতে অতীনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা কে?” এবার ওপার থেকে জবাব এল, “আমরা লক্ষ্মীপুর থানা থেকে আসছি। দরজাটা খুলুন মাস্টারমশাই।”

অতীনবাবু একটু অবাক হয়ে দরজাটা একটু ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলেন একজন অফিসার এবং কয়েকজন কনস্টেবল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন অতীনবাবু।

- কি ব্যাপার অফিসার? এতরাতে আপনারা?

- এতরাতে আপনাকে বিব্রত করার জন্য একান্তভাবে দুঃখিত। আসলে আপনার থেকে কয়েকটা কথা জানার ছিল।

- বেশ! বলুন।

- আচ্ছা এই মুহূর্তে আপনার বাড়িতে আর কে কে আছেন?

অতীনবাবু মুচকি হেসে বলেন, “এত রাতে আপনারা নিশ্চয়ই ঠাট্টা করতে আসেননি? কে আবার থাকবে? আমি আর আমার স্ত্রী আছেন।” অফিসার একটু হেসে বললেন, “ আচ্ছা তাকে একবার ডেকে দিতে পারবেন?” অতীনবাবু হেসে বললেন, “ দুঃখিত অফিসার! আপনার এই অনুরোধটি রাখতে পারব না। আসলে বিগত কয়েকদিন ধরে আমার স্ত্রী অসুস্থ। তীব্র জ্বরের ফলে আজ ছয়দিন হল শয্যাশায়ী হয়ে আছেন। এখন ঘুমোচ্ছেন।” অফিসার কিছুক্ষণ অতীনবাবুর দিকে অপলকে তাকিয়ে থেকে বললেন, “কিছু মনে করবেন না মাস্টারমশাই, আমরা আপনার ঘরটা একটু তল্লাশি করতে চাই। আমাদের কাছে ওয়ারেন্ট আছে।” বলে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে অতীনবাবুর দিকে এগিয়ে দেন। অতীনবাবু হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ান। তারপর বলেন, “বেশ! ভেতরে আসুন। তবে এই সার্চের কোনো মানে নেই। আমার কাছে এমন কিছু নেই যা আপনাদের কাছে বেআইনি বলে মনে হতে পারে।”

একে একে সকলে ঘরের ভেতর ঢোকেন। অতীনবাবু ঘরে ঢুকে বৈঠকখানার সোফায় বসতে বসতে বললেন, “সমস্ত ঘর সার্চ করার আগে একটা অনুরোধ ছিল। কনস্টেবলদের বলবেন ওরা যাতে স্টাডিরুম আর আমার বেডরুমে বেশি শব্দ বা জিনিসপত্র ওলটপালট না করে। আসলে স্টাডিরুমটা একটু অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে। সেখানে বই বা কাগজপত্র এদিক-ওদিক হলে আমিই বিপদে পড়ব। আর আমার স্ত্রী এখন ঘুমিয়ে আছেন। তাই বেডরুমে অহেতুক শব্দ হলে যেমন তার ঘুমের ব্যাঘাত হবে তেমনই এত রাতে ঘরের ভেতর পুলিশ দেখে বিব্রতও হতে পারেন।” অফিসার মাথা নেড়ে কনস্টেবলদের তল্লাশির আদেশ দেন। সকলে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। একজন কনস্টেবল অতীনবাবুর বেডরুমের দরজাটা খোলামাত্র ছিটকে আসে। অফিসার সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে দেন। সেই কনস্টেবলটাও দুহাতে নিজের নাক ঢেকে ফেলে। কারন দরজাটা খোলার সাথে সাথে যে গন্ধটা এতক্ষণ প্রছন্নভাবে তার নাকে আসছিল সেটা একলহমায় বেড়ে গেছে। মাংস রান্নার গন্ধ ছাপিয়ে গোটা ঘর ম ম করছে এই ঘরটায়। এ গন্ধ তার চেনা। পুলিশের চাকরিতে এই গন্ধের সাথে তার পরিচয় বহুকাল আগেই হলেও যতবার এই গন্ধটা তার নাকে আসে প্রতিবার মনে হয় যেন পেটের ভাত বেরিয়ে আসবে। এ গন্ধ হল মৃতদেহের গন্ধ। তিন-চারদিন ধরে মৃতদেহ পচে গেলে যে গন্ধ বেরোয় সেই গন্ধ।

নাকে রুমাল চাপা দিয়ে বিছানার সামনে এসে দাঁড়ান অফিসার। একপলক বিছানায় শুয়ে থাকা সৌমির মুখের দিকে তাকিয়ে একটানে খুলে ফেলেন বুকের উপর চাপা দেওয়া চাদরটাকে। আর চাদরটা টানার সাথে সাথে সৌমির দেহটার দিকে তাকিয়ে গা গুলিয়ে ওঠে ঘরে উপস্থিত সকলের। সৌমির গলা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ট্রান্সপারেন্ট প্লাস্টিকে ঢাকা। সেই প্লাস্টিকের পর্দার বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে সৌমির দেহে পচন ধরতে শুরু করেছে। এই দৃশ্য দেখে সকলে যখন ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে তখন একমাত্র অতীনবাবু নির্বিকার থেকে বলে উঠলেন, “আহা! করছেনটা কী? ও জেগে যাবে তো!”

*****

সেদিনের ঘটনার পর দুমাস কেটে গেছে। পুলিশ সৌমির বিকৃত মৃতদেহ উদ্ধার করে সেদিনই মর্গে চালান করেছিল। অতীনবাবুকে গ্রেফতার না করা হলেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে তাকে মানসিক চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয়েছে। ঠিক কি ঘটেছিল সেটা না জানা গেলেও কানাঘুষোয় শোনা গেছে প্রবল জ্বরে সৌমি তিনদিনের মাথায় মারা যান। স্ত্রী বিয়োগের শোকে পাগল হয়ে অতীনবাবু এতদিন ধরে স্ত্রীর মৃতদেহ আগলে বসেছিলেন। এ বিষয়ে প্রথম প্রথম পাড়ায়, স্কুলে অনেক আলোচনা হলেও সময়ের সাথে সাথে এখন তা স্তিমিতপ্রায়। তাও মাঝে মাঝে অতীনবাবুর প্রসঙ্গ উঠলে ছাইচাপা আগুনের মতো তাকে নিয়ে আলোচনাগুলোও বেরিয়ে আসে। পার্বতীচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ে নতুন হেডমাস্টার এসেছেন। ইনি কিন্তু অতীনবাবুর মতো অমায়িক নন। বরং রাশভারী এবং বেজায় বদরাগী একজন। কথায় কথায় বেত বের করেন। ছাত্রদের মন খারাপ। কবে তাদের অতীনস্যার আসবেন সেই অপেক্ষায় আছে তারা। আর বাকি রইলেন তারিণীবাবু। তিনি প্রতি সপ্তাহে একবার করে মানসিক হাসপাতালে অতীনবাবুর কাছে দেখা করতে যান। হাজার হোক পুরোনো প্রতিবেশী বলে কথা। তাছাড়া সেদিনের ঘটনার দায় কিছুটা তারও বটে। বিকেলবেলা অফিস থেকে ফিরে গিন্নির কাছে সবটা শুনে তার সন্দেহ হয়েছিল। সেই সন্দেহের বসে তিনি ফোন করেছিলেন লোকাল থানায়। আর তার ফলেই ব্যাপারটা প্রকাশ্যে চলে আসে। মানসিক হাসপাতালে গেলে আজও দেখা পাওয়া যাবে বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী এক প্রাক্তনশিক্ষককে। যিনি কথায় কথায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতা আউড়ে বেড়ান। সাহিত্যের কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলে অমায়িক এক হাসি হেসে উত্তর দেন। কিন্তু স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করলেই বিছানায় শোয়ানো বালিশের দিকে দেখিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলেন, “শশস! চুপ! ও এখন ঘুমোচ্ছে! বিরক্ত করবেন না। অনেকে বলছে বটে ও মরে গেছে। লোকের কথায় বিশ্বাস করবেন না। ও কিন্তু মরেনি। ও ঘুমোচ্ছে!”

(স্ত্রীর মৃতদেহ আগলে রাখার ঘটনা বাদে গল্পের স্থান-কাল-পাত্র লেখকের মস্তিস্কপ্রসূত এবং একেবারে কাল্পনিক। কোথাও মিল খুঁজে পেলে সেটা একেবারে কাকতালীয়)

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...