অনুসরণকারী

শুক্রবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২২

পরিযায়ী



আচমকা ইন্টারকমের শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল সৌরদীপ্তার এত সকালে আবার কে কল করল? রিসেপশনে তো বলাই আছে আর্জেন্ট কিছু না থাকলে ওকে যাতে ডিস্টার্ব না করা হয়তারপরেও কল কীসের? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে বিরক্ত মুখে চোখ বোঁজা অবস্থাতেই কোনোমতে হাতড়ে ফোনটা খোঁজার চেষ্টা করল সেকিছুক্ষণ হাতড়ানোর পর হাতের কাছে ফোনটা পেতেই রিসিভারটা কানের উপর রেখে ঘুমজড়ানো অথচ বিরক্ত গলায় বলে উঠল, “হ্যালো!


– Good Morning Ms. Sengupta!


ওপার থেকে একটা ভরাট অথচ ভীষণ মাদকীয় একটা কণ্ঠস্বর শোনার সাথে সাথে ঘুমের চটকাটা কেটে গেল সৌরদীপ্তার সে ধড়মড় করে উঠে বসে জিজ্ঞেস করল, Who?কথাটা শোনামাত্র ওপারের কণ্ঠস্বরের মালিক একটু থমকে গেলতারপর জিজ্ঞেস করল,


– Is this room no. 104?


– Yes, this room no.104.


– Am I talking to Ms. Sengupta?


– Yes, but who are you?


– You can't recognise me?


– Sorry to say that, but I can't recognise you.


কথাটা শোনামাত্র ওপাশ থেকে তুখোর আমেরিকান উচ্চারণের ইংরেজিতে ভেসে এলঅপার বিস্ময় পাঠকের সুবিধের জন্য সেটাকে বাংলায় অনুবাদ করে দিচ্ছি


সেকি? এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে গেলে তুমি? পরশু বিকেলেই তো আলাপ হল আমাদের! আমি স্মিথ বলছি! ডেভিড জোনাহ স্মিথএবার মনে পড়েছে?


দুঃখিত! এবারও আপনাকে চিনতে পারলাম নাআপনি কে বলুন তো?


দেখেছ কাণ্ড? কি মন্দ কপালআমার! গত দুদিন ধরে যে সুন্দরীর সান্নিধ্যে কাটালাম সেই সুন্দরীই নাকি আমাকে চিনতে পারছে না! গতপরশু বিকেলে বিচে সানসেট দেখতে গিয়ে আলাপ হল আমাদেরতারপর রাতে কথা হলো ডাইনিং হলেগতকাল রেইস মাগোস ফোর্ট বেড়াতে গিয়ে কত আড্ডা দিলাম আমরা! রাত পোহাতেই সব ভুলে মেরে দিয়েছ দেখছি! এটা তো ভালো লক্ষ্যণ নয় মিস সাইক্রিয়াটিস্ট!


কথাগুলো শুনতে শুনতে আচমকা গত দুদিন ধরে চলা ঘটনাগুলো মনে পড়ে গেল সৌরদীপ্তারএখানে আসার দিন বিকেলে এক তরুণের সাথে আলাপ হয়েছিল তারভীষণ হাসিখুশি আর আমুদে এক তরুণনামটা ভারী মিষ্টিপরে ডাইনিং হলে ছেলেটার সাথে ভারী ভাব হয়ে গিয়েছিল সৌরদীপ্তার আজকে দুজনে মিলে চাপোরা ফোর্টে যাবার কথা ছিলগতকালের কথা মনে করতে করতে জিভ কেটে সৌরদীপ্তা বলল,


– Extremely Sorry! আসলে গতকাল একটা মিটিং সেরে শুতে শুতে বেশ রাত হয়েছেআচমকা তোমার কলটা আসায় প্রথমে গলাটা চিনতে পারিনি


সে তো বুঝলাম! তাই বলে এত ঘুম? কটা বাজে খেয়াল আছে?


চট করে ফোনটার দিকে তাকিয়ে চক্ষু স্থির হয়ে গেল সৌরদীপ্তারসর্বনাশ! বেলা এগারোটা বাজে! মানে বেড়াতে এসে এতক্ষণ ধরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিল সে! সঙ্গে সঙ্গে সে ফোনটা কানে নিয়ে সে বলে ওঠে,I'm extremely sorry! তুমি আমাকে দশমিনিট দাওআমি তৈরী হয়েআসছি


ওকে! তাড়াতাড়ি এসোআমি লাউঞ্জে অপেক্ষা করছি


ওকে!


বলে ফোনটা কেটে বিছানা থেকে নেমে তড়িঘড়ি বাথরুমের দিকে দৌড় দেয় সৌরদীপ্তা


*****


পেশায় মনোরোগ চিকিৎসক সৌরদীপ্তার জীবনের অন্যতম শখ হল দেশ-বিদেশ ভ্রমণছোটোবেলা থেকেই বেড়াতে ভীষণ ভালোবাসে ওছোটোবেলায় স্কুলে ছোটোখাটো এক্সকার্সন, পিকনিক হলে যাবার জন্য মুখিয়ে থাকতো সেএখনও মাঝেমাঝে রুগী দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে উঠলে সেক্রেটারি কাম ছাত্রী পূর্বাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে তল্পিতল্পা গুছিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে নিরুদ্দেশের পানেএরই মধ্যে প্রায় গোটা ভারত ভ্রমণ সারা হয়ে গেছে সৌরদীপ্তারএরপর ইচ্ছে আছে বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার


এর আগেও গোয়ায় এলেও সৌরদীপ্তা এবার এসেছে মূলত বিশ্রাম নেওয়ার জন্যলকডাউনের পর মনোরুগীর সংখ্যা আচমকা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিলসকলের মধ্যেই একটা অবসাদ, একটা মৃত্যুভয় দেখা দিতে শুরু করেছিলতার সাথে বেড়েছিল কাজের প্রেশারপ্রায় রোজই ওর চেম্বারে রুগীর ভীড় লেগে থাকতোদিনরাত এতগুলো অবসাদগ্রস্থ মানুষের মনের চিকিৎসা করতে করতে ক্রমশ হাঁপিয়ে উঠলেও হাল ছাড়েনি সৌরদীপ্তাদাঁতে দাঁত চেপে দুটো বছর কোনো ছুটি না নিয়ে কাজ করে গিয়েছিল সেতারপর যা হয়, একটা সময়ের পর রুগীর সংখ্যার সাথে সাথে মানুষের মনের মৃত্যুভয়ও ক্রমশ কমতে শুরু করেএখনো চেম্বারে রুগীর আনাগোনা থাকলেও তা সংখ্যায় অনেকটাই কমে যাওয়ায় খানিকটা বিশ্রাম নিতেই বেরিয়ে পড়েছিল সৌরদীপ্তাপূর্বাকে বলে রেখেছিল তেমন এমার্জেন্সী না হলে যাতে সে নিজেই হ্যান্ডেল করেতেমন বাড়াবাড়ি হলে সে তো আছেই একটা ভিডিও কল করলেই হল সে ভিডিও কলেই না হয় কাউন্সেলিং করবে


গতকাল দুপুরে গোয়ায় এসেছে সৌরদীপ্তাছোটোবেলা থেকেই সমুদ্র ভীষণ ভালোবাসে ওসমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে সৈকত ধরে বিকেলের রোদকে সাক্ষী রেখে পায়ে পায়ে হেটে যাওয়া ওর ভীষণ পছন্দের জিনিসওর মতে সমুদ্রের হাওয়া যেমন মস্তিস্কে টনিকের কাজ করে, ঠিক তেমনই দিগন্তের দিকে ভেসে যাওয়া নৌকোর দিকে, সূর্যের বা চাঁদের আলোয় আলোকিত ঢেউয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেও মনঃসংযোগ বাড়েসমুদ্র যেমন ওর সমগ্র ক্লান্তি শুষে নেয়, তেমনই দ্বিগুণ এনার্জি আর আত্মবিশ্বাস ফিরিয়েও দেয়


গতকাল বিকেলে সমুদ্রের ধারে হাটতে হাটতে এই সব কথাই ভাবছিল সৌরদীপ্তাএমন সময় শুনতে পেল কে যেন খুব কাছ থেকে চিৎকার করে উঠল, “Watch Out!” প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওর নাক ঘেঁষে একটা ভলিবল প্রবল বেগে আছড়ে পড়ল সমুদ্রের মাঝেওর মুখের উপরেই পড়তো যদি না একটা শক্ত হাত ওকে পেছনে না টেনে ধরতোআচমকা পেছন থেকে একটা হ্যাচকা টান আসায় নিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারল না সৌরদীপ্তাপ্রয়ায় সঙ্গে সঙ্গে আছড়ে পড়ল বালির উপরপেছনে টেনে ধরা মানুষটা ততক্ষণে সমুদ্র থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে এগিয়ে গেছে ওর উৎসস্থলের দিকেকাছেই একটা দল বিচভলি খেলছিলসম্ভবত তাদেরই একজনের বেকায়দা থ্রোইংয়ে বল চলে এসেছে ওর দিকেছেলেটা ওদের দিকে বলটা ছুড়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “Be careful man!” তারপর ওর দিকে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল, “Are you ok?”


ততক্ষণে অনেকটাই ধাতস্থ হয়েছে সৌরদীপ্তাবালি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পোশাক থেকে বালি ঝাড়তে ঝাড়তে মৃদু হেসে সে বলল, “আমি ঠিক আছিধন্যবাদআপনি সঠিক সময় না এলে হয়তো বেমালুম নকআউট হয়ে সৈকতে পড়ে থাকতে হতো আমাকেপ্রত্যুত্তরে ছেলেটা হেসে বলল, “ধুস! এ আর এমন কী? আসলে এইদিকটা একটু জনবহুল বলে এরকম দুর্ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে থাকেদিন আগে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের উপরেও এভাবেই বল আছড়ে পড়েছিলতাই এইদিকটা যাতায়াতের সময় একটু সাবধানে চলাফেরা করবেনকথাটা বলে ছেলেটা যেমন আচমকা এসেছিল, ঠিক তেমনই ফিরে যায় খেলতে থাকা দলটার কাছেসৌরদীপ্তা বোঝে ছেলেটা ওই বিচভলি খেলা দলটারই একজনএকটু আগে ওকে একটা সাংঘাতিক বিপদ থেকে বাঁচিয়ে ফিরে গেছে আবার নিজের দলের কাছেদলটার প্রায় প্রত্যেকেই বিদেশী শুধু ঐ ছেলেটা বাদেকিছুক্ষণ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে সৌরদীপ্তাছেলেটার হাবভাব, কথা বলার ধরন এমনকি উচ্চারণটাও আমেরিকার নাগরিকদের মতো হলেও দেহের গঠন মোটেও আমেরিকার নাগরিকদের মতো নয়বরং আপাতদৃষ্টিতে ভারতীয় বলেই মনে হয়খুব সম্ভবত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান হতে পারে ছেলেটাএকঢাল কুচকুচে কালো চুল, কাটা কাটা চোখ-মুখ, ছিপছিপে অথচ পেলব দেহে হাল্কা পেশী বর্তমানএকঝলক দেখলে মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর সেই বিখ্যাত ভাস্কর্যের কথা মনে পড়েতফাৎ একটাই, মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ডেভিড শ্বেতবর্ণের হলেও ছেলেটার গায়ের রং পাকা গমের মতোতবে সবথেকে যে জিনিসটা বেশি নজর কাড়ে সেটা হল ছেলেটার কণ্ঠকি ভীষণ মাদকীয় আর সেক্স অ্যাপিলে ভরা কণ্ঠ ছেলেটার! খুব ভারীও নয় আবার খুব পাতলাও নয়খানিকটা জগজিত সিংহ আর উদিত নারায়ণের কণ্ঠের মিশ্রিত স্বরের মতোশুনলে মনে হয় যেন বার বার শুনতে থাকিছেলেটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর আচমকা সৌরদীপ্তার সম্বিত ফিরতেই সে সৈকতের দিকে তাকিয়ে দেখে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে অনেকক্ষণ হলএকটা অন্ধকার ক্রমশ নেমে আসছে দিগন্তের কোণেকিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর পেছন ফিরে দেখে ছেলেটার দলটাও আর বিচে নেইহয়তো অন্ধকার হচ্ছে দেখে জাল টাল গুটিয়ে চলে গেছে নিজের আস্তানায় রাতের খাবার আর সমুদ্রজাত জিনিসের পশরা সাজিয়ে একটু একটু করে জেগে উঠছে গোয়ার সমুদ্র সৈকতদূরে কোথাও ডিজে বাজছেলোকে বলে গোয়ার সৈকতের দিনেরবেলা এক রূপ, রাতে আরেক রূপ দেখা যায়সৈকতে আসা পর্যটকদের ভীড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সেই রূপ দেখার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছন ফিরে হোটেলের দিকে হাটতে শুরু করে সৌরদীপ্তা


রাতের দিকে ডাইনিং হলে একটা টেবিলে একা বসে রাতের খাবার সেরে নিচ্ছিল সৌরদীপ্তা বরাবরই রাতের দিকে একটু হাল্কা খাবার খায় ওকলকাতায় থাকলে দুটো হাতে গড়া আটার রুটি, চিকেন স্টু আর শেষে অল্প রেড ওয়াইন, ব্যস! আর কিছু চাই না তারঅথচ বাইরে বেড়াতে এলে এই নিয়মটার কিছু হেরফের ঘটায় সেতখন সৌরদীপ্তার রোজকার রুটি-স্টুতে মুখ রোচে না যেখানে এসেছে সেখানকার স্থানীয় পদগুলো এক এক করে চেখে দেখে সেএখন যেমন খাচ্ছে ভাত, ফ্রায়েড বম্বিলফিস(যেটাকে আমরা লোটে মা‌‌ছ বলি) আর পর্ক ভিণ্ডালু রসুন আর ওয়াইন দিয়ে তৈরী পদটা ওর বরাবরের প্রিয়যতবার গোয়ায়এসেছে ততবার এই পদটা একদিন না একদিন খেয়েছে সেকলকাতাতেও একবার তৈরী করার চেষ্টা করেছিল সেতবে এদের মতো পারেনিআসলে গোয়ানিজদের মতো এত বৈচিত্র্যময় জিনিস দিয়ে পদ রান্না খুব কম লোকেই পারে


কথাগুলো ভাবতে ভাবতে রাতের খাবার সেরে নিচ্ছিল সৌরদীপ্তা এমন সময় শুনতে পেল খুব কাছ থেকে সন্ধ্যেবেলায় শোনা সেই ভীষণ মাদকীয় কণ্ঠস্বর কাকে যেন ‌‌ইংরেজিতে বকছে, “এই তোদের এক দোষ! কোথাও গেলে সেখানকার প্রচলিত জিনিসটাই খেতে চাস তোরাআরে সেই প্রচলিত জিনিস ছাড়া আরো নানারকম পদও তো মাঝে মাঝে ট্রাই করতে পারিস তো! সেবার প্যারিস বেড়াতে গিয়ে ড্যানিয়েলটা টানা দুদিন দুবেলা ধরে শুধু পাস্তাই গিলিয়ে গেলতার আগেরবার জিমি মালয়েশিয়ায় পোকামাকড় গেলালকেন এছাড়া আর কিছু নেই নাকি?” কণ্ঠস্বরটা শোনামাত্র চমকে সেটার উৎসের দিকে তাকাতেই সৌরদীপ্তা দেখল ওর থেকে কিছুটা দূরে একটা টেবিলে সেই দলটা বসেছেতাদের মধ্যে থাকা সেই অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান ছেলেটাই কথাটা বলেছেছেলেটাকে দেখামাত্র চিনতে পারল সেএই ছেলেটাই তো সন্ধ্যেবেলা ওকে ভলিবলের আঘাত থেকে বাঁচিয়েছিল ছেলেটা এখানে কী করছে? তবে কি এই হোটেলেই উঠেছে ওরা?


কথাগুলো ভাবতে ভাবতে সৌরদীপ্তা দেখে ছেলেটা ওয়েটারকে কী একটা জিজ্ঞেস করতে ওয়েটার একটা আজব পদের নাম বললম্যাকারেল রিসাদম্যাকারেল বা আয়লা মাছের একটা ম্যারিনেটেড ভাজা পদপদটা নাকি গোয়ায় বেশ পরিচিতপদটার বিবরণ শোনামাত্র সেটাকে অর্ডার করতেই ছেলেটার চোখ পড়ল সৌরদীপ্তার দিকেকিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকার পর একটা হাসি ফুটে উঠল ছেলেটার মুখেনির্ঘাত চিনতে পেরেছে ছেলেটানিজের দলের ছেলেদেরকে কিছু একটা বলে ছেলেটা উঠে পড়ল টেবিল থেকেতারপর ওর দিকে এগিয়ে এসে হাসতে হাসতে বলল, “পৃথিবীটা শুধু গোলই নয়, ছোটোও বটে! আবার আমাদের দেখা হয়ে গেল দেখলেন?”


সৌরদীপ্তা প্রত্যুত্তরে শুধু হাসলছেলেটা এবার হেসে খানিকটা ফ্লার্ট করার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, এত সুন্দর একটা রোমান্টিক সন্ধ্যায় আপনি একা কী করছেন?কথাটা শোনামাত্র সৌরদীপ্তার সত্যি সত্যিই হাসি পেয়ে গেল‌পৃথিবীর সব ছেলেরাই একরকমকোথাও একা সুন্দরী মেয়ে দেখলেই আর দেখতে হবে নাএরা পারলে একেবারে গায়ের উপর ঢলে পড়েকলেজে পড়াকালীন এরকম কত ছেলেই যে ওর পিছনে হত্যে দিয়ে পড়েছিল তার হিসেব নেইএই ছেলেটাও ব্যতিক্রম নয়বরং একটু বেশিই সাহসীনাহলে দ্বিতীয় দেখাতেই রীতিমতো ফ্লার্টিং শুরু করতো না! ছেলেটার সাহস দেখে ভীষণ হাসি পাচ্ছে ওরআচ্ছা করে টাইট দিতে হবে একেজানে না কার সামনে খাপ খুলেছে? কলেজে না জানি এরকম কত ফ্লার্টবাজ ছেলের পিলে চমকে দিয়েছে সেকেউ কেউ তো মারাত্মক লেভেলের ছিলসেখানে এ তো নিছকই নভিস গোছেরকথাগুলো ভাবতে ভাবতে কোনোক্রমে নিজের মনের ভাব চেপে রেখে মুখে একটা গাম্ভীর্যের হাসি ফুটিয়ে সৌরদীপ্তা বলল,


আপাতত রাতের খাবার সেরে নিয়ে ঘুমোবার প্ল্যান করছিকাল সকালে অনেক কাজ আছে


আপনার যদি আপত্তি না থাকে আমি কি এখানে বসতে পারি?


তা পারেনতবে আপনার বন্ধুরা কিছু মনে করবে না তো?


না নাওরা কিছুই মনে করবে নাআসলে ওরা জানে আমি কীরকম মানুষ!


বটে? তা কীরকম মানুষ শুনি


সৌরদীপ্তার উল্টোদিকের চেয়ারে বসে ছেলেটা বলে, “তা ধরুন একটু পাগলাটে গোছের একটা বাজে রোগ আছে আমার জানেন?


বটে? তা কীরকম রোগ শুনিআসলে মানসিক রুগীকে নিয়েই আমার কারবার কিনা!


বলে পার্স থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে ছেলেটার হাতে দিতেই ছেলেটার সব ছ্যাবলামো থেমে যায়ছেলেটা একপলক কার্ডে চোখ বুলিয়ে বলে, মাই গড! আপনি সাইক্রিয়াটিস্ট! দেখে তো মনে হয় না! বরং মডেল বা অভিনেত্রী হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায় আপনাকে!”


কথাটা কিন্তু আমি কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিলামযাকগে কীরকম রোগ বলছিলেন শুনি?


ভয়ংকর রকমেরআমার রোগটা হল নতুন জায়গায় গেলেই নতুন বন্ধু বানানো যেখানে লোকে বাইরে বেড়াতে এলে ট্যুরিস্ট স্পট, বা লোকাল এরিয়া ঘুরে বেড়ায়সেখানে এই অধম কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানকার মানুষ, ট্যুরিস্টদের সাথে আলাপ জমাই বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করিধরুন আপনি যদি প্যারিস বেড়াতে যান তাহলে কী করবেন? আইফেল টাওয়ার দেখবেন তাইতো? আমি তা করি নাআমি ঘুরে ফিরে আলাপ জমাই স্থানীয়দের সাথেজানার চেষ্টা করি সেখানকার ইতিহাস


হুম ইন্টারেস্টিং! অভ্যেসটা ভালো তবে অনেকেই হয়তো এই গায়ে পড়ে আলাপটা ভালো চোখে নেন না


নেন না বলছেন কি! দু এক জায়গায় তো রীতিমতো মার খেতে খেতে বেঁচে গেছি ম্যাডাম! কিন্তু তাও অভ্যেসটা ছাড়তে পারিনি


ছাড়া উচিতও নয়তবে কিছু জায়গায় লোক বুঝে আলাপ করাটাই ভালো মিস্টার?


— Smith. David Jonah Smith.


নামটা শোনামাত্র মুচকি হাসি খেলে গেল সৌরদীপ্তার মুখেসন্ধ্যেবেলা ছেলেটাকে দেখে মাইকেল এঞ্জেলোর ডেভিডের কথাই মনে পড়েছিল তারসার্থকনামাই বটে! মৃদু হেসে সে জবাব দিল


আমি সৌরদীপ্তা, সৌরদীপ্তা সেনগুপ্ততা গোয়ায় প্রথম? না আগেও এসেছেন?


এই প্রথমবার আসাআপনার?


তা ধরুন তিনবার হলআসলে প্রতিটা সৈকতের নিজস্ব একটা ফ্লেবার, নিজস্ব একটা ভাইব থাকে গোয়ার সমুদ্রের যে মায়া বা টানটা আছে যেটাকে আপনারা ভাইব বলেন সেটা অন্য কোথাও ম্যাচ করে না বলেই প্রতি দু-তিন বছর পর পর আসি


তা বটে! এখানে আসার পর আমি রীতিমতো প্রেমে পড়ে গেছি বিচের আর এখানকার লোকজনেরকি মিষ্টি ব্যবহার এদের! কি মিষ্টি আতিথেয়তা!


এটা শুধু গোয়া বলেই নয়, সমগ্র ভারতেই এটা পাবেনআসলে আমরা ভারতীয়রা বিশ্বাস করি সমগ্র পৃথিবীর মানুষেরা আমাদের আত্মীয়, নিকটজনতাই সেই মতো ব্যবহার করিযাকগে গোয়ায় যখন এসেছেন এখানকার ফোর্টগুলো না দেখে যাবেন নাএখানকার ফোর্টগুলো রীতিমতো হেরিটেজও বটে


তাই নাকি? আপনি ঘুরেছেন?


তা মোটামুটি ঘুরেছি বলতে পারেন


একটু গাইড করতে পারবেন প্লিজ! আসলে আমরা এখানকার কিছুই চিনি না


নিশ্চয়ই! আপনারা এক কাজ করতে পারেনএখানে সবথেকে ফেমাস দুর্গ হল চাপোরা আর আগুয়াডাগতকাল সেটা দেখে আসুনমন্দ লাগবে না


যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলতে পারি?


বলুন


বলছিলাম যে আপনার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আপনি আমাদের সাথে জয়েন করতে পারেন


আমি? মানে...


আচমকা প্রস্তাবটা আসায় একটু বিব্রতবোধ করে সৌরদীপ্তাএ আবার কেমন ফ্যাসাদ রে বাপু? জানা নেই শোনা নেই একটা উটকো ছেলে আচমকা এসে খেঁজুরে আলাপ জুড়ে বসলএই পর্যন্ত তাও সহ্য করা যাচ্ছিল এখন আবার ওদের সাথে যোগ দিতে বলছে! ছেলেটার কি সত্যিই মাথায় ব্যামো আছে নাকি? নাহলে এভাবে অল্পক্ষণের চেনা কাউকে নিজের দলে টেনে নিতে চাইবে কেন? আবার মাওবাদী টাইপ না তো? ওর পরিচয় জেনে ওকে কিডন্যাপ করার প্ল্যান করেছেউফ কেন যে নিজের পরিচয় দিতে গেল ও! এবার যে করেই হোক কাটাতে হবে ছেলেটাকেকথাটা ভাবতে হাবতে সৌরদীপ্তা বলে ওঠে,


দেখুন আসলে এবার গোয়ায় আমি নিছকই বেড়াতে আসার জন্য আসিনিএসেছি কাজের সূত্রেআগামী দুটো দিন আমি ভীষণ ব্যস্ত থাকবোকাজেই সরিতবে আমি আশা করবো আপনাদের ট্রিপটা দারুণ কাটুক


কথাটা শোনামাত্র ছেলেটার মুখটা একটু যেন ম্লান হয়ে গেল বলে মনে হল সৌরদীপ্তারছেলেটা মলিন হেসে বলল, “ভয় পাচ্ছেন? ভাবছেন আমরা বোধহয় মানুষ পাচার করি? না হলে চেনা নেই জানা নেই আচমকা দুম করে একজন বিদেশী আলাপ করতে আসবে কেন? ভয় নেই! আমরা ছেলেধরা বা ড্রাগ মাফিয়ার কেউ নইচাইলে আমাদের পাসপোর্ট দেখতে পারেন


সৌরদীপ্তা চমকে উঠলআশ্চর্য! ছেলেটা থট রিডিং জানে নাকি? না হলে ওর মনের কথা টের পেল কী করে? কোনোমতে নিজেকে সামলে সৌরদীপ্তা বলে উঠল, “না মানে আমি সেভাবে মিন করতে চাইনিআসলে বুঝতেই পারছেন, আমাদের ভীষণ টাইট শিডিউল থাকেতার মধ্যে আচমকা এরকম প্রস্তাবসত্যি কথা বলতে গেলে প্রবলেম না থাকলে আমি নিজেই জয়েন করতাম আপনাদের সাথেকিন্তু কাজ বড়ো বালাইআশা করি বোঝাতে পারছিইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই


এমা! ছিঃ! ছিঃ! একদম বিব্রত হবেন নাআমি জাস্ট ক্যাজুয়ালি প্রস্তাবটা দিয়েছিলামআপনি ডিনাই করলেন মিটে গেল ব্যস! আসলে দোষটা আমারইআমিই দুম করে কিছু না ভেবে বেড়াতে এলে লোকজনের সাথে খেঁজুরে আলাপ জুড়ে দিইএকবারও ভেবে দেখি না সামনের মানুষটা আমার সান্নিধ্য পছন্দ করছে কিনা? এই আগ বাড়িয়ে আলাপ করতে গিয়েই মাঝেমধ্যে কেস খাই বলেই বন্ধুরা আমাকে ক্ষ্যাপাটে বলে ডাকেযাক গে! আপনার সাথে আলাপ করে ভালো লাগল মিস. সাইক্রিয়াটিস্টভালো থাকবেন


বলে ছেলেটা উঠে দাঁড়ায়সৌরদীপ্তা বোঝে ছেলেটা প্রথমে নেহাতই ঠাট্টার ছলে আলাপ জুড়লেও পরে বিপদে পড়ে সাহায্য চাইতে এসেছিলএভাবে প্রত্যাখ্যাত হবার পর হতাশ হয়েছেছেলেটার জন্য খারাপ লাগল তারএভাবে রুড না হলেও চলতোকিন্তু এটা ছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না তারকোনোমতে খাওয়া সেরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে


*****


পরদিন সকালে তেমন কোনো কাজ না থাকায় প্রথমে পূর্বাকে কল করে পেশেন্টদের খবর নেওয়ার পর সৌরদীপ্তা ঠিক করল একটু বেরোবেকিন্তু কোথায় যাওয়া যায়? কথাটা মাথায় আসতেই উত্তরটাও পেয়ে গেল সেচেনা জায়গায় বেড়াতে এসে প্ল্যানিং করার দরকারই বা কী? যেখানে খুশি গেলেই হলকথাটা মাথায় আসতেই সৌরদীপ্তাঠিক করল আজকে আর কোনো প্ল্যানিং করবে না সেযেখানে দুচোখ যায় সেখানে যাবেআগে হোটেল থেকে বেরোলেই হলসেই মতো ট্রলিব্যাগ থেকে একটা হটপ্যান্ট আর একটা ক্রপটপ বের করে সে সেগুলোকে বিছানায় রেখে টাওয়েল কাঁধে নিয়ে ঢুকে যায় বাথরুমে

 

হোটেলথেকে যখন সৌরদীপ্তা বেরোলো তখন সূর্য প্রায় মাঝ আকাশে উঠে গেছে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সৌরদীপ্তা দেখল বেলা সাড়ে এগারোটা বাজেঘড়ির দিকে একপলক তাকিয়ে সে হাটা দিল কাছের একটা কার রেন্টাল অফিসেসেখানে ভাড়া নিয়ে অনেক দরদাম করার পর অবশেষে যখন একটা গাড়ি নিয়ে সে রওনা দিল রেইস মাগোস ফোর্টের উদ্দেশ্যে, ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর পেরিয়ে গেছে

 

রেইস মাগোস ফোর্টে পৌঁছতেই সৌরদীপ্তা দেখল রীতিমতো ভীড় জমে গেছে ফোর্টের সামনেএকদল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছে, আবার কোনো দল গাইডদের সাথে ফোর্ট দেখানোর জন্য চাওয়া দাম নিয়ে দরাদরি করছেপার্কিং জোনে গাড়ি পার্ক করে গেটের দিকে এগোতেই ওর দিকেও কয়েকজন গাইড আর ফোটোগ্রাফার এগিয়ে এলকোনো মতে তাদের পাশ কাটিয়ে সে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোতে যাবে এমন সময় আবার দেখতে পেল ডেভিডের দলটাকেদলটা ওর থেকে কিছুদূরেই দাঁড়িয়ে এক গাইডের সাথে কথা বলছেদলটাকে দেখামাত্র ভ্রু কুঁচকে গেল সৌরদীপ্তারআশ্চর্য! এতগুলো দুর্গ থাকতে এই দুর্গটাকেই বাছতে হল ওদের? ইশ! একবার ওকে দেখতে পেলে বিচ্ছিরি রকমের কেলেঙ্কারী হবে! গতকালকেই ছেলেটাকে যা ঢপ দিয়েছে সব ধরা পড়ে যাবেকথাগুলো ভাবতে ভাবতে ভীড়ের মধ্যে নিজেকে যতটা সম্ভব আড়াল করে সে এগিয়ে গেল কাউন্টারের দিকে


টিকিট কেটে ফোর্টের দরজার কাছে এগোতে যাবে এমন সময় শুনতে পেল গেটের কাছে প্রবল চিৎকার চ্যাঁচামেচির শব্দপেছন ফিরে দেখল গাইডের সাথে ডেভিডদের দলটার রীতিমতো ঝগড়া বেঁধে গেছেনির্ঘাত গাইডটা বেশি পারিশ্রমিক হেঁকে বসেছেএই চত্বরে এটা নতুন কিছু নয়এরকম গণ্ডগোল হামেশাই ঘটেকিন্তু ডেভিডদের সাথে নয়গাইডদের ঝগড়াটা হয় মূলত ভারতীয় পর্যটকদের সাথেতবে বেশিক্ষণ সেটা স্থায়ী হয় নাএমনিতেও জায়গাটা বিশেষ ভালো নয়শুনেছে এই গাইডগুলোর কী সব দল আছেডেভিডরা তর্কাতর্কিতে একবার এদের গায়ে হাত দিলেই হয়েছেছেলেগুলো মারাত্মক বিপদে পড়ে যাবেঅন্য কেউ হলে হয়তো কিছুক্ষণ ঝগড়াটা দেখে হাটা দিত দুর্গের ভেতরেকিন্তু সৌরদীপ্তা পারল নাওর ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠলছেলেগুলো দেশের অতিথি, বিদেশ-বিভুঁইতে এসে বিপদে পড়েছেএভাবে ছেড়ে যাওয়াটা ঠিক হবে নাওদের পাশে দাঁড়ানো উচিতকথাটা মাথায় আসতেই দোটানায় পড়ে গেল সৌরদীপ্তাছেলেগুলোকে এভাবে বিপদের মুখে ফেলে যেতেও মন সায় দিচ্ছে নাআবার সামনে গেলেও বিড়ম্বনাকী করবে বুঝতে না পেরে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সেতারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল দলটার দিকে


*****


চারদিন হয়ে গেছে গোয়ায় বেড়াতে এসেছে সৌরদীপ্তারাএরই মধ্যে গোয়ার দু-একটা বিচ আর কাছেপিঠের ফোর্ট গুলো ডেভিডদের দেখা হয়ে গেছে সৌরদীপ্তার কল্যাণে সেদিন সৌরদীপ্তা না এগিয়ে গেলে ডেভিডরা সত্যিই বিপদে পড়তোগাইডটা আরেকটু হলে নিজের দলের লোকজনদের ডেকেই ফেলেছিলআচমকা সৌরদীপ্তার আগমনে হচকিয়ে যায় সেসৌরদীপ্তা নিজের স্টাইলে হ্যান্ডেল করে গাইডদেরএখানকার লোকেরা যতই ঝামেলাবাজ হোক না কেন একবার বোঝালে বোঝেসেইমতো সে পুরোদস্তুর মরাঠি ভাষায় ওদের বোঝাতেই লোকগুলো ছেড়ে দেয় ওদেরগাইডের দলকে ম্যানেজ করার পর ডেভিডের দলটার দিকে তাকাতেই দেখে ওরা হা করে ওরদিকে তাকিয়ে আছেসৌরদীপ্তা হেসে জিজ্ঞেস করে, “কী হল? ওরকম হা করে তাকিয়ে আছেন কেন? চলুন ভেতরে! একমিনিট আপনাদের কাছে টিকিট আছে তো? না থাকলে কাউন্টারটা ওদিকেআসুন টিকিট কেটে নেবেনডেভিডের যেন বিশ্বাস হয় না নিজের চোখকেসে অস্ফুটে বলে ওঠে,আপনি মানে…” সৌরদীপ্তা সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতর একটা উত্তর ভেবে নেয় তারপর বলে,  


কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাওয়ায় এখানে ঘুরতে এসেছিলামএসেই দেখি আপনারা বিপদে পড়েছেন অগত্যা এগিয়ে আসতে হলতাছাড়া কালরাতে ভেবে দেখলাম আপনাদের প্রস্তাবটা মন্দ নয়এমনিতেও কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর একা একা ভূতের মতো ঘুরে বেড়াতে হত আমায়তারচেয়ে বরং আপনাদের দলে জয়েন করাটাই ভালোঅন্তত আপনাদের গাইড করতে পারবো আমিতাছাড়া আমি মানুষ চড়িয়ে খাই মিস্টার স্মিথমানুষ চিনতে আমার সচরাচর ভুল হয় নাআর আপনাদের দেখে যতটা চিনেছি আপনারা আর যাই হোন না কেন খারাপ মানুষ ননসো আপনাদের সঙ্গী হতে আমার কোনো আপত্তি নেই


আপনাকে যে কী বলে


কিছু বলতে হবে নাআপাতত টিকিট কেটে নিন সকলেরতারপর আসুন আমার সাথেভেতরে যেতে যেতে কথা হবে


বলে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায় সৌরদীপ্তাওর পেছন পেছন এগিয়ে যায় ডেভিডদের পুরো দলটাতারপর থেকে সৌরদীপ্তা ওদেরকে নিজে ঘুরিয়ে দেখিয়েছে সিঙ্কোরিম, আগুয়াডা, চাপোরা দুর্গডেভিডের কথায় সৌরদীপ্তাও ট্রাই করেছে লোভনীয় সব মাছের পদ, বিশেষ করে ম্যাকারেল রিসাদ পদটার স্বাদ তো এখনও জিভে লেগেআছে তারকীভাবে দেখতে দেখতে দিনগুলো কেটে গেল বুঝতেই পারেনি সৌরদীপ্তাআজ বাদে কাল গোয়ায় ওর শেষ দিনতারপর পরশু বিকেলে ও ফিরে যাবে কলকাতায়আবার সেই রোগীদের মনের গহীন কোণে ঘোরাফেরা করা, সেই রুটিনমাফিক জীবনযাপনে ফিরে যেতে হবে ওকেফিরতে হবে ডেভিডকেওতবে ওর বাড়িতে নয়, ওর শিকড়ের কাছে, চন্দননগরেফলে ওর বন্ধুরা গত পরশুই বিদায় নিলেও ডেভিড ওর সাথে থেকে গেছে গোয়াতেইসেদিন রেইস মাগোস থেকে ফেরার পর রাতেই খাবার টেবিলে ডেভিড ওকে সবটা জানিয়েছে


ডেভিডের আসল বাড়ি লস এঞ্জেলেসেবন্ধুদের সাথে ভারতে এলেও বাকিদের মতো সে নিছকই বেড়াতে আসেনিসে এসেছে নিজের শিকড়ের খোঁজেডেভিডের বাবা আমেরিকান হলেও মা ভারতীয় বংশোদ্ভূতশুধু তাই নয়, তিনি বাঙালীও বটেডেভিডের ভারতে আসার মূল কারণ হলেনওর দাদুডেভিডের দাদু আসলে চন্দননগরের বাসিন্দা১৯৭০ সালে আমেরিকায় ছাত্র হিসেবে পড়তে এলেও পরে আমেরিকাতেই সেটল করেন তিনি দেশে ফেরার ইচ্ছে থাকলেও আর ফেরা হয়নি তাঁরগতবছর আমেরিকাতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনিমৃত্যুশয্যায় নিজের প্রিয় নাতিকে নিজের শেষ ইচ্ছে বলে যান তিনিসেই ইচ্ছের কারণেই সে এসেছে ভারতেইচ্ছে আছে কলকাতায় সৌরদীপ্তাদের বাড়ি ঘুরে একবার চন্দননগরে যাবার


কথাগুলো ভাবতে ভাবতে হাসি পেল সৌরদীপ্তারইস! এই ছেলেটাকেই কিনা সে প্রথমদিন কিডন্যাপার, নারী পাচারকারী, আর না জানি কত কিছু ভেবে বসেছিল সে! অথচ এ কদিনে ছেলেটার সাথে মিশে একবারও খারাপ কিছু মনে হয়নি তারবরং ছেলেটাকে বেশ খানিকটা সরল বলেই মনে হয়েছে তারশুধু তাই নয়, এই কদিনে ছেলেটার উপর কেমন যেন একটা মায়া জমে গেছে তারকতই বা বয়স হবে ছেলেটার? বড়োজোর সাতাশ-আঠাশএই বয়সেই শুধু দাদুকে দেওয়া কথা রাখতে এতদূর ছুটে এসেছে ছেলেটাআজকালকার যুগে এই জিনিসটাই কজনই বা করে?


কথাটা ভাবতে ভাবতে একটু ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল সৌরদীপ্তাআচমকা ওর ঘোর কাটল একটা সমবেত চিৎকারেসামনের দিকে তাকিয়ে দেখল হোটেলের প্রায় সকলে জড়ো হয়েছে কনফারেন্স হলের মাঝখানেআজ হোটেলের একজন গেস্টের মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে হোটেলের সকল বোর্ডারদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছেসৌরদীপ্তারাও বাদ যায়নিআজকে ডিনার আর ড্রিঙ্কটা সেই গেস্টই স্পনসর করেছেনসৌরদীপ্তা তাকিয়ে দেখে একটা পনেরো-ষোলো বছরের মেয়ে ভীড়ের মধ্যমণি হয়ে বসে থাকলেও জন্মদিনের কেক বা আয়োজনের দিকে মেয়েটার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেইমেয়েটা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সামনের দরজার দিকেমেয়েটার দৃষ্টি অনুসরণ করে দরজার দিকে তাকাতেই থমকে যায় সৌরদীপ্তাতাকিয়ে দেখে দরজার সামনে ডেভিড এসে দাঁড়িয়েছেপরনে একটা অফ হোয়াইট টিশার্ট, ডার্ক ব্লু ট্রাউজার আর ব্লেজারে দারুণ লাগছে তাকেহাতে একটা ফুলের বোঁকে নিয়ে সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকেতারপর বোঁকেটা দিয়ে উইশ করতেই মেয়েটার মুখের লাজুক হাসিটা সৌরদীপ্তার চোখ এড়াল নাকিছুক্ষণ পর কেক কাটার পর্ব শেষ হতেই শুরু হল নাচের অনুষ্ঠানগোটা হলের জোরালো আলোগুলো নিভে গিয়ে নিয়ন আলোয় ভরে উঠল গোটা ঘরতারপর ডিজের গানে তাল মেলাতে শুরু করল অভ্যাগতরাকেকের জন্য রাখা টেবিল সরিয়ে হলের মাঝখানটা ড্যান্স ফ্লোরের চেহারা নিতে বেশিক্ষণ সময় নিল নাসৌরদীপ্তা দূরে একটা টেবিলে বসেছিলসেখান থেকে হুইস্কি খেতে খেতে সে দেখল ডেভিড এগিয়ে আসছে ওর দিকে


ডেভিড সৌরদীপ্তার কাছে এসে বলল, “আমি তোমাকে গোটা হলে খুঁজে বেড়াচ্ছি আর তুমি কিনা এখানে বসে আছো? Bye the way, You look stunning today!” সৌরদীপ্তা ডেভিডের দিকে তাকিয়ে হাসলজন্মদিনের পার্টিতে কী পরবে বুঝতে না পেরে শেষমেশ একটা লাল অফশোল্ডার গাউন পরেছিল সেএই ভীড়ের মধ্যেও সেটা ডেভিডের চোখে পড়েছে দেখে একটু লজ্জা পেল সেডেভিড এবার সৌরদীপ্তার হাত ধরে বলল, “ অনেক বসে ড্রিঙ্ক করা হয়েছেচলো এবার নাচবে চলো!” পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ষোড়শীর দিকে একঝলক তাকাল সৌরদীপ্তাঘরের স্বল্প আলোতেও মেয়েটার ম্লান মুখটা কল্পনা করে নিতে অসুবিধে হল না তারমনে মনে মেয়েটার জন্য একটু দুঃখ হলেও হাসি পেল সৌরদীপ্তারসেটা গ্লাসে থাকা পানীয়টার প্রভাবের জন্য নাকি অন্য কারণে বুঝতে পারল না সেডেভিড আরেকবার জিজ্ঞেস করল, “Shall we?” গ্লাসে থাকা অবশিষ্ট তরলটা গলায় ঢেলে উঠে দাঁড়াল সৌরদীপ্তাতারপর ডেভিডের হাত ধরে এগিয়ে গেল হলের মাঝখানে


ডিজের বাজানো গানের তালে নাচতে শুরু করল ওরাহাতে হাত রেখে দুজনে মিলে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল গোটা ড্যান্স ফ্লোরএকসময় নাচতে নাচতে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে এল দুজনেপ্রায় অন্ধকার ঘরে মত্ত অবস্থায় নৃত্যরত ভীড়ের মাঝে দুজনের মধ্যে দূরত্ব কমে এল অনেকটাইনাচের আনন্দে প্রথমে ডেভিড সৌরদীপ্তাকে সঙ্গ দিলেও পরে টের পেল প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ছে সৌরদীপ্তাযেভাবে চন্দনগাছের গুড়িকে সাপ আঁকড়ে ধরে সেইভাবে মেয়েটা আঁকড়ে ধরেছে তাকে


নারীসঙ্গ কোনো নতুন বিষয় নয় ডেভিডের কাছেকলেজে পড়ার সময় থেকে একাধিক সম্পর্কে জড়িয়েছে সেনারীর হৃদয়ের ভাব, নারীর আহ্বান সে ভালো করেই জানেসে বুঝতে পারে যেভাবে পতঙ্গ বহ্নির দিকে আকৃষ্ট হয় ঠিক সেইভাবেই মদমত্ত অবস্থায় ওর দিকে এগিয়ে এসেছে সৌরদীপ্তাসৌরদীপ্তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ওকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ডেভিডকিন্তু সৌরদীপ্তাও নাছোড়বান্দাসে আরো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ডেভিডকেবেপরোয়াভাবে ডেভিডের ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে আসেসৌরদীপ্তার এই আচরণে ডেভিড প্রমাদ গোনেওদের দুজনের ঠোঁটের ব্যবধান ক্রমশ কমে এসেছেপরস্পরের শ্বাসপ্রশ্বাস টের পাচ্ছে ওরাসৌরদীপ্তাকে এখনই না থামালে সর্বনাশ অবসম্ভাবী


অন্য কোনো মেয়ে হলে অবশ্য ডেভিড এই ব্যবধানটুকুও আর রাখতো নাসোজা ডুব দিত সেই বিপদজনক খাদের অতলেসে প্রেমিক মানুষ, নারীদেহ তার কাছে শুধু উপভোগ্য নয়, ভালোবাসার বিষয়ও বটেনারীকে দলিত মথিত করে নয় বরং যৌনতায় লিপ্ত হবার সময় নারীদেহের এই অপার সৌন্দর্যকে তিলে তিলে উপভোগ করাতেই যেন আনন্দ তারকিন্তু সেই সব মেয়ে আর সৌরদীপ্তার মধ্যে তফাৎ আছেসৌরদীপ্তা যে তার বন্ধু! তার উপর মত্ত অবস্থায় থাকায় কী করছে না করছে সে বিষয়ে কোনো হুঁশই নেই তারএই অবস্থায় অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে সর্বনাশ হয়ে যাবে মরিয়া হয়ে শেষবারের মতো চেষ্টা করে ডেভিড


– Behave yourself  Dipta! কী করছোটা কী তুমি? সকলে দেখছে!


দেখুক! আমি পরোয়া করি না


– You are drunk Dipta. তুমি তোমার মধ্যে নেই চলো আমি তোমাকে তোমার রুমে পৌঁছে দিই


না আমি যাবো না The night is still young David. এখন রুমে গেলে চলে?


কথাটা বোঝার চেষ্টা করো You are drunk! কী করছো না করছো এ বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই তোমার এই অবস্থায় কিছু হয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে


হোক! আমি পরোয়া করি না


অগত্যা বাধ্য হয়ে ডেভিড একপ্রকার পাঁজাকোলা করে মত্ত সৌরদীপ্তাকে নিয়ে হল ঘর থেকে বেরিয়ে আসে


সৌরদীপ্তাকে কোনোক্রমে হল থেকে ওর রুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে রুম সার্ভিসকে ফোন করে ডিটক্সের জিনিসপত্র আনিয়ে নেয় ডেভিড তারপর একটা বাটিতে জল ঢেলে সেটায় লেবু আর তেঁতুল চটকে একটা কাত্থ মতো বানিয়ে নিয়ে সেটা একটা গ্লাসে ঢেলে নেয় সে তারপর  সৌরদীপ্তাকে বিছানা থেকে তুলে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে সেই মিশ্রণটা খাইয়ে দিতেই হড়হড় করে বমি করতে শুরু করে সে নিমেষে গোটা বাথরুম একটা টক গন্ধে ভরে যায় কমোডের উপর ঝুঁকে সৌরদীপ্তা উগড়ে দেয় একটু আগে উদরস্থ করা সমস্ত খাদ্যদ্রব্য, তরল পানীয় ডেভিড পাশে দাঁড়িয়ে সৌরদীপ্তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে এভাবে অনেকক্ষণ বমি করার পর ডেভিড বেসিনের কল খুলে সৌরদীপ্তার মুখ ধুইয়ে দেয় তারপর কমোড ফ্লাশ করে সৌরদীপ্তাকে নিয়ে চলে আসে বেডরুমে সৌরদীপ্তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়


এবার তুমি ঘুমোও কাল কথা হবেবলে উঠতে গিয়ে ডেভিড দেখে সৌরদীপ্তা ওর হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে মুচকি হেসে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “এটা ঠিক নয় দীপ্তা আমরা শুধু ভালো বন্ধু সম্পর্কটাকে এভাবে নষ্ট হতে দিও নাসৌরদীপ্তা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে, “Everything is fare in love and war. And I love you David.” কথাটা শোনার পর একটা ব্যথাতুর হাসি হাসে ডেভিডতারপর সৌরদীপ্তার কপালে একটা চুমু খেয়ে বসে পড়ে সামনের চেয়ারে


*****


বোর্ডিং পাসটা নিয়ে ট্রলি ঠেলে ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়ে বসল ডেভিডরাওর ফ্লাইট ছাড়তে এখনো আধঘন্টা দেরী আছেকিছুক্ষণ পর ফুড কোর্ট থেকে একটা ট্রে-তে দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ আর দুটো কফির কাপ নিয়ে এল সৌরদীপ্তাকফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ডেভিড বলল, তো এরপর কী প্ল্যান মিস সাইক্রিয়াটিস্ট? আমার দেশে কবে আসছো বলো?


আপাতত কোনও প্ল্যান নেইতবে যদি যাই, তোমার শহর দেখাবে আমাকে?


আরে তুমি এসোই না একবার! তোমাকে হলিউড থিম পার্ক দেখাবোদেখবে সেখানকার জৌলুষ কাকে বলে!


আর কী দেখাবে?


আর দেখাবো ওয়াল্ট ডিজনি কনসার্ট হল, হলিউড সাইন আরো অনেক কিছুতুমি একবার এসো তো!


যাবো, তবে তার আগে বলো তোমার কেমন লাগল আমাদের দেশটা? কেমন লাগল নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে?


গোয়া থেকে ফেরার পর দুই সপ্তাহ কেটে গেছেগোয়া থেকে কলকাতায় ফেরার পর দু'দিন সৌরদীপ্তার ফ্ল্যাটে ছিল ডেভিডতারপর দুজনে মিলে একদিন চন্দননগর গিয়েছিল ডেভিডের শেকড়ের খোঁজ করতেতবে সেখানে তেমন কিছু না পেলেও চন্দননগর ভ্রমণটা বিফলে যায়নি ওদেরদুʼজনে মিলে ঘুরে বেড়িয়েছে চন্দননগরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানদাদুর স্মৃতি বিজড়িত শহরে ঘুরে বেড়ানোটাই বা ডেভিডের কাছে কম কীসে? সেইদিন গুলোর কথা ভাবতে ভাবতে ডেভিড বলে উঠল, দারুণ! দেখতে দেখতে কীভাবে দিনগুলো কেটে গেল টেরই পেলাম নাওখানে গিয়ে খুব মিস করবো এই দেশটাকে


আর এই দেশের মানুষগুলোকে?


কথাটা শুনে সৌরদীপ্তার দিকে একপলক তাকায় ডেভিডওর মনে পড়ে যায় সেদিন রাতের কথাযদি সৌরদীপ্তার কোনো অসুবিধে হয় সেই কথা ভেবে সেদিন সারারাত দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি সেসারারাত জেগে থাকারফলে যতবার ওর স্নায়ুগুলো বিদ্রোহ করতেশুরু করেছে ততবার বা‌থরুমে গিয়ে চোখেমুখে ঠাণ্ডা জল দিয়ে এসেছে সেপরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর যখন সৌরদীপ্তা নিজের কাজের জন্যঅনুতপ্ত হয়েছে সে তাকে বু‌ঝিয়েছে সে কিছু মনে করেনি‌‌


ডেভিডের মনে আছে কলকাতায় ফেরার পরদিন দুপুরে আড্ডা দিতে দিতে সৌরদীপ্তা যখন ওকে জিজ্ঞেস করল, সুযোগ থাকার পরেও তুমি আমাকে মানে কেন? যেখানে তোমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো সুযোগ নিত হয়তো চরম সর্বনাশ করতে পারতো আমার আমি চাইলেও বাধা দিতে পারতাম না ডেভিড হেসে বলেছিল, কারণ তুমি যে আমার বন্ধু দীপ্তাআমি ওম্যানাইজার হতে পারি, নারীদেহের আকর্ষণে সাড়া দিয়ে তাদের সেই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করাটা আমার কাছে নতুন নয় কিন্তু তাই বলে এতটাও অমানুষ নই যে মত্ত অবস্থায় থাকা নিজের বন্ধুর অসহায়তার সুযোগ নেব

 

সৌরদীপ্তা অন্ধকার মুখে জিজ্ঞেস করেছিল, আমরা শুধুই বন্ধু? আর কিছু নই?

 

মৃদু হেসে ডেভিড বলেছিল,  এর চেয়ে বেশি কিছু আশা না করা‌ই ভালো ভুলে যেও না আমি একজন বিদেশীতোমাদের ভাষায় একজন পরিযায়ী। আজ এদেশে, কাল অন্য দেশে ভ্রমণ করাটাই আমার ভবিতব্য হয়তো কোনোদিনও আর সামনাসামনি দেখা হবে না আমাদের যেখানে কয়েকদিন পরেই পরস্পরের থেকে অনেক দূরে সরে যাবো আমরা সেখানে পিছুটান রেখে কী লাভ? আমরা যে যাযাবর তোমাদের ভাষায়, ‘ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে  আমাদের যে একস্থানে থিতু হওয়া নিষেধ! আজ এসেছি দাদুর কথায় নিজের শেকড়কে খুঁজে নিতে অভিষ্ট পূরণ হলেই আমাকে ফিরে যেতে হবে নিজের দেশে তারপর বন্ধুদের সাথে হয়তো আবার পাড়ি দিতে হবে অন্য কোনো দেশে যেখানে আমার কোথাও স্থির থাকাটাই পরিযায়ী পাখিদের মতো অনিশ্চয়তায় ভরা সেখানে ভালোবাসায় জড়িয়ে কী লাভ? তারচেয়ে বরং বন্ধুত্বটা থাকুক আর থাকুক এই মুহূর্তটা 


সেদিনের কথা মনে হতেই মুচকি হেসে ফেলে ডেভিডতারপর সৌরদীপ্তার হাত নিজের হাতে নিয়ে বলে, আলবাত মিস করবোবিশেষ করে এই দেশের মানুষদের মধ্যে থাকা আমার খুব কাছের একজনকে তো বটেইআবেগে কথা বন্ধ হয়ে যায় সৌরদীপ্তারঅশ্রুসজল চোখে সে তাকিয়ে থাকে ডেভিডের দিকেআর এসময় ভেসে আসে ঘোষকের কণ্ঠস্বর, “Flight no. 4536 is ready to board, all boarders are requested to join the checking line.”


ডেভিডদের প্লেনটা যখন রানওয়ে ধরে ছুটে চলেছে তখন শেষবারের মতো প্লেনের জানলা দিয়ে শহরটাকে প্রাণভরে দেখে নেয় ডেভিড‌আর সেই সময় শহরের রাজপথ দিয়ে একটা ওলা ক্যাব সৌরদীপ্তাকে নিয়ে ফিরে যায় ওর গন্তব্যের দিকে

 


 

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...