“পুরানো সেই দিনের কথা, ভুলবি কি রে হায় ও সে…” বারান্দার টেবিলে রাখা ছোটো মিউজিক সিস্টেমটায় আস্তে করে রবীন্দ্র সঙ্গীত চালিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বারান্দার এককোণে থাকা আরামকেদারাটায় বসলেন চতুরানন চক্রবর্তী। ব্যাকরেস্টে হেলান দিয়ে আরাম করে চা খেতে খেতে সুর্যোদয় দেখতে লাগলেন তিনি। ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে আকাশের এককোণ ক্রমশ ফরসা হতে লাগল। আর একটা মৃদু বাতাস থেকে থেকে চতুরাননকে কাঁপিয়ে দিতে লাগল। চা খাওয়া শেষ করে কাপটা মেঝেতে নামিয়ে গায়ের চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে নিলেন তিনি। শীতকাল আসতে এখনও একমাস দেরী হলেও ইদানিং ভোরের দিকটায় বেশ শীত অনুভব হচ্ছে তাঁর। রাতের দিকে তো রীতিমতো মোটা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুতে হচ্ছে। অথচ উনি যে শীতকাতুরে এই বদনাম কেউ দিতে পারবে না। চাকরী জীবনে একাধিক জায়গায় থেকেছেন তিনি। শিমলার কনকনে ঠাণ্ডা হোক বা রাজস্থানের তীব্র গরম কোনোটাই বেশিদিন তাকে কাবু করে রাখতে পারেনি। এককালে সামান্য একটা ওভারকোট আর মাফলার চাপিয়ে ২৫শে ডিসেম্বরের সন্ধ্যায় দার্জিলিং-এর কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যেও স্ত্রী বীণাপাণিকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। অথচ এই বৃদ্ধ বয়সে এসে সামান্য কলকাতার ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারেন না তিনি। চাদর, সোয়েটার, মাফলার পরার পরেও ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপতে থাকেন। পুরোনো দিনের কথা আজও মনে করলে মুখে মৃদু হাসি খেলে যায় তাঁর।
ভোরবেলা বারান্দায়
বসে দেবব্রত বিশ্বাসের কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে সেই সব দিনের কথা মনে করে
সকালের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন চতুরানন। এমন সময় শুনতে পেলেন
রাস্তায় সাইকেলের ঘন্টির শব্দ। নেহাত পেপারের ছেলেটা হবে ভেবে স্মৃতিচারণে আবার মন
দিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর আবার ভেসে এল সাইকেলের ঘন্টির শব্দ, এবার একাধিক সাইকেলের। ক্রমাগত সাইকেলের ঘন্টির
শব্দে ঘোরটা কেটে গেল তাঁর, এত সকালে আবার কে এল? চোখ মেলে দরজার সামনে সামনের দৃশ্য দেখে মুচকি হেসে ফেললেন তিনি। কচিকাঁচার দল আজকে একেবারে
সকাল সকাল হাজির হয়ে গেছে। ওদের দেখামাত্র সোজা হয়ে বসলেন তিনি। তারপর উঠে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিতেই একে একে ভেতরে ঢুকে এলো ওরা। বাগানের একপাশে সাইকেলগুলো রেখে একে একে ওরা এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে।
সদর দরজা লাগিয়ে
বারান্দায় উঠে এলেন চতুরানন। কচিকাঁচার দল ততক্ষণে মাদুর পেতে বসে পড়েছে বারান্দায়। অবসরের পর স্ত্রী বীণাপাণির কথায় একটা ছোটোখাটো টোলের মতো খুলেছেন চতুরানন। স্থানীয় বাচ্চাদের পড়া দেখিয়ে দেওয়া, নানারকম হাতের কাজ শেখানো সবই চলে। মাঝে মাঝে যখন কচিকাঁচার দলের পড়ার ইচ্ছে থাকে না তখন তিনি বসেন গল্প শোনাতে। নিজের চাকরীজীবনের অভিজ্ঞতায় একাধিক ঘটনার সাক্ষী তিনি। মাঝে মাঝে অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে সেই সব মণিমুক্তোর মতো গল্পগুলো ওদের শোনান তিনি। কোনো কোনো গল্প ভীষণ মজার হয়, আবার কোনো কোনো গল্প ভীষণ কষ্টের। কিন্তু প্রতিটা গল্পের শেষে ওদের জন্য কিছু শিক্ষামূলক উপদেশ থাকে। আজকেও এদেরকে তেমনই একটা গল্প বলবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু মিউজিক সিস্টেমটা
বন্ধ করে আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসামাত্র বাচ্চাগুলোর দিকে তাকাতেই অবাক হলেন চতুরানন। ব্যাপারটা কী? আজকে বাচ্চাগুলোর মুখ এতো শুকনো লাগছে কেন? কিছু হয়েছে নাকি? ভাবতে ভাবতে জিজ্ঞেস করলেন চতুরানন,
“কী ব্যাপার? সবকটা হুতোমপ্যাঁচা মার্কা মুখ করে
বসে আছিস যে! কিছু বলবি নাকি?”
প্রশ্নটা শোনার
পরেও বাচ্চাগুলো কোনো সাড়শব্দ দিচ্ছে না দেখে সোজা হয়ে বসলেন চতুরানন। ব্যাপারখানা কী? অন্যদিন তো একেবারে কিচিরমিচির করে কানের পোকা নাড়িয়ে দেয় বাচ্চাগুলো। আজ এত চুপচাপ কেন? চতুরানন মৃদু হেসে বললেন, “আহা কী হয়েছে বলবি তো! এভাবে চুপ করে থাকলে চলবে? আর
আজকে অনিল,অঞ্জন আর কার্তিক এলো না কেন? ওরা তো তোদের সাথে বিশেষ করে গজা আর তপনের
সাথে ঘুরে বেড়ায়। তা আজ হঠাৎ কী হল? তোরা এলি অথচ ওরা
এল না! এই গজা-তপন, সত্যি করে বল! আবার কী কাণ্ড ঘটিয়েছিস তোরা?”
“আমি বলছি।” মৃদুগলায় বলে
মাথা তুলল গজা। এই কচিকাঁচাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো হল গজা আর তপন। দুজনেই এইবার ক্লাস ফাইভে উঠেছে। পড়াশোনায় এমনি ভালো হলেও বদবুদ্ধি আর দুষ্টুমিতে একেবারে যাকে বলে মার্কামারা দুজনে। এই দুজনকে বাগে আনতে চতুরাননবাবুকে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। চতুরানন তাকালেন গজার দিকে। গজা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে তারপর সটান বলে বসলো, “দাদু আমাদের স্কুলটা নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। মহিম কশাই নাকি স্কুল ভেঙে কীসব বাজার বানাবে, সত্যি
নাকি দাদু? কালকে আমি, অনি, কেতো, অজু আর
তপু স্কুলে গেছিলাম, গিয়ে দেখি কতগুলো লোক স্কুলের গেটের সামনে কিসব কাগজ সাটিয়ে
তালা মেরে দিল। আমরা
এগিয়ে কিছু বলতে যেতেই মহিম কশাইয়ের লোকেরা আমাদের তাড়িয়ে দিল। তপু জোর করতেই তপুকে ধরে পেটালো, অজু, কেতো অনি বাধা
দিতে গিয়ে মার খেল। তারপর
মহিম কশাই জানাল স্কুল নাকি আর হবে না। সত্যি নাকি
দাদু?”
সবটা শোনার পর ভ্রু জোড়া একটু কুঁচকে গেল চতুরাননের। এই মহিম লোকটাকে বিলক্ষণ চেনেন তিনি। মহিম কর্মকার এই এলাকায় মহিম কশাই নামেই বেশি পরিচিত। আগে স্থানীয় বাজারে মাংস বিক্রি করত। পরে এলাকার একজন অ্যান্টিসোশ্যালে পরিণত হয়। একবার নাকি কাকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে জেলেও গিয়েছিল। তবে দশবছর হল সেসব কাজ ছেড়ে স্থানীয় এক নেতার কথায় প্রোমোটারিতে মন দিয়েছে বলে কানাঘুষো শুনেছেন চতুরানন। সেই মহিম এবার স্কুলের দিকে হাত বাড়িয়েছে নাকি? তাহলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে! এই এলাকায় দুটো মাত্র
স্কুল। একটা প্রাইমারী যেটা জয়ন্তবাবু চালান। আরেকটা হাইস্কুল
যেটা স্কুল কম বদমাসের আড্ডা হয়ে যাচ্ছে। প্রাইমারী স্কুলটা
বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তো… আচমকা চতুরাননের
ঘোর কাটলো গজার প্রশ্নে, “স্কুল বন্ধ হলে তো পড়াশুনো বন্ধ হয়ে যাবে দাদু! আবার
আমাদের পড়া ভুলে কাজে লেগে পড়তে হবে তাই না দাদু?"
গজার দিকে তাকালেন চতুরানন। বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে মায়া হল তার। কোনোমতে নিজেকে
সামলে গম্ভীর গলায় উত্তর দিলেন চতুরানন, “এটা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে । এক কাজ কর, আজ আর গল্প বলতে ইচ্ছে করছে না। তোরা বইও আনিস নি যে পড়াবো। বরং তোরা এখন বাড়ি
চলে যা। আজ তোদের ছুটি। কাল সকালে কিন্তু
তোদের পড়াবো। আর শোনো
আজ তাড়াতাড়ি ছাড়ছি, আর আজ ছুটি
মানে এই নয় যে সারাদিন টোটো করে ঘুরে বেড়াবে। বাড়ির কাজ যেগুলো দিয়েছিলাম
সেগুলো মুখস্ত করে আসবি কেমন? যা পালা!"
******
সন্ধ্যেবেলা চতুরানন দেখা করতে এলেন জয়ন্তবাবুর বাড়িতে। জয়ন্তবাবু এই অঞ্চলে জয়ন্তমাষ্টার নামে পরিচিত। গজাদের স্কুলটা এনার জমিতেই তৈরি। আগে সদরে মাষ্টারি করলেও বর্তমানে অবসর নিয়ে বাড়ির এককোণে স্কুল খুলেছেন প্রায় বারোবছর হতে চলল। যা বর্তমানে মহিমের হস্তগত হতে চলেছে। জয়ন্তবাবুর পড়ার ঘরে দুহাত
গুটিয়ে মাথা নীচু করে বসে আছেন চতুরানন। জয়ন্তবাবু মাথা নামিয়ে একনাগারে নিঃশব্দে কেঁদে চলেছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভাঙলেন
চতুরানন নিজেই।
– আমি আর ভাবতে পারছি না! আপনি এতবড়ো ভুল করলেন কি করে?
এতগুলো লোক থাকতে শেষে কিনা আপনি ঐ মহিমের কাছে হাত পাতলেন? একবার আমাদের বললেই তো
পারতেন! অতোগুলো ছেলের কথা একবারও মনে পড়লো না আপনার?”
“আমার মাথা তখন কাজ করছিল না। একমাত্র মেয়ে বুঝতেই পারছেন।
মেয়েটাকে ওভাবে তিলে তিলে মরতে দেখে কোনো বাবা কি চুপ করে থাকতে পারে বলুন?
ভেবেছিলাম ধীরে ধীরে শোধ করে দেব। কিন্তু সুদে আসলে যে টাকাটা এত বেড়ে যাবে ভাবিনি।” বলে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন
জয়ন্তবাবু।
দশবছর আগে জয়ন্তবাবুর মেয়ে অসীমা একটা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারাত্মকভাবে জখম হয়। মাথায় গুরুতর চোট থাকায় অপারেশন করাতে হয়। তখন সদ্য অবসর প্রাপ্ত মেয়ের চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাবেন বুঝতে পারছিলেন না জয়ন্তবাবু। এমন সময় খানিকটা দেবদূতের মতো ওনার সামনে হাজির হয় মহিম। অসীমার চিকিৎসার সমস্ত খরচ নিজের কাঁধে নিয়ে নেয় সে। তারপর জয়ন্তবাবুর মেয়ে সুস্থ হতেই স্বমুর্তি ধরে। সে পরিস্কারভাবে জানায় হয় জয়ন্তবাবুকে মহিমের টাকা ফেরত দিতে হবে নাহলে স্কুলের জমিটা লিখে দিতে হবে তাকে। জয়ন্তবাবু বুঝতে পারেন নিজের অজান্তে তিনি মহিমের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু তখন আর কিছু করার নেই। তিনি টাকাটা মাসে মাসে দিতে রাজি হন। মহিম জানায় দশবছরের মধ্যে তার বকেয়া টাকাটা শোধ না হলে সে স্কুল জমিটা দখল নিয়ে নেবে। সেই মতো একটা স্ট্যাম্প পেপারও নিয়ে আসে সে, জয়ন্তবাবু সই করতে বাধ্য হন। তারপর দশবছর ধরে নিজের পেনসনের টাকা দিয়ে মহিমের ধার শোধ করে গেলেও সেই টাকার পরিমাণ বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং দিনের সাথে সাথে সুদের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
জয়ন্তবাবুর দিকে তাকিয়ে মায়া হল চতুরাননের। ভদ্রলোক যে এভাবে ফেঁসে যাবেন ভাবতেই পারেননি। ওনার জায়গায় চতুরানন থাকলে তিনিও একই কাজ করতেন। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার মুখ দিয়ে। কিন্তু এভাবে তো আর হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায়
না। কিছু তো একটা করতেই হবে। কী করা যায়? এমন কিছু করতে হবে যাতে মহিম জব্দ হয় আবার স্কুলটাও
বাঁচে। জয়ন্তবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পথে চতুরানন চুপচাপ মনে মনে ভাবছিলেন, “কিছু একটা করতে হবে। কিছু একটা করতেই
হবে।"
******
বাড়ি ফিরে দেখলেন বীণা মোবাইলে সনতের সাথে কথা বলছেন। বছরে একবারই সনৎ বউ
ছেলে নিয়ে বাড়ি ফেরে এই পুজোর সময়। এবছরও আসার কথা। তাই নিয়ে কথা চলছে।
বীণা চতুরাননকে দেখে মোবাইলটা এগিয়ে দিলেন। চতুরানন ফোনে হু হা করে দু একটা কথা বলে ফোনটা ফেরত দিতে যাচ্ছিলেন হঠাৎ কি মনে হতে ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নাতির সাথে কি গুজুরগুজুর করে কথা বলে ফোনটা ফেরত দিয়ে নিজের স্মার্টফোনটা নিয়ে চলে গেলেন শোওয়ার ঘরে। বীণাপাণি আড়চোখে সেদিকে একবার তাকিয়ে আবার ফোনে মশগুল হয়ে গেলেন।
******
ক্লাবের কালচারাল ফাংশনের দুদিন বাকি। ঘরের ভেতর একা
বসে টাকা গুনতে গুনছিল মহিম। কাল ঘুমোতে
ঘুমোতে বেশ রাত হয়ে গেছে। এবছর চাঁদার ভার
ছিল বিলুর উপর। বিলু
কালেকশনও করেছে মাইরি! একেবারে চার দিনে চল্লিশ লাখ! শেঠ পার্টিদের পকেট ফাঁকা করে দিয়েছে একেবারে। আজকে একটু
তাড়া থাকায় সকাল সকাল সেই টাকা ভালো করে গুনছে সে। আজ সকালে ক্লাবের ছেলেদের হাতে বক্স আর আলোর টাকা দিতে হবে। তারপর বাকিটা যাবে মদের দোকানে দামী
মদের খোঁজে। তাছাড়া আরেকটা কাজও আছে বটে।
কথাটা ভাবামাত্র মুচকি হাসে মহিম। স্কুলটা এত সহজে
যে পেয়ে যাবে ভাবতে পারেনি সে। দশবছর আগে মাষ্টারের মেয়ে যখন ওর গাড়ির তলায় এসে
পড়লো তখন মারাত্মক ভয় পেলেও সামলে নিয়েছিল সে। মেয়েটার খোঁজ নিতে হাসপাতালে লোক পাঠিয়েছিল মহিম। বলে দিয়েছিল
যদি টেঁসে যায় তাহলে টাকা দিয়ে মাষ্টারের মুখ বন্ধ করে দিতে। কিন্তু লোকটা
যখন জানালো মেয়েটা মরেনি তবে বাঁচাতে গেলে টাকা লাগবে। তখন মনে মনে পরের অঙ্কটা কষতে অসুবিধে হয়নি মহিমের। ঝপ করে অতো টাকা ইনভেস্ট করে
ফেলেছিল সে। ইনভেস্টই
বটে নাহলে চেনে না জানে না এমন একজনের পেছনে খামোখা টাকা নষ্ট করতে যাবে কেন সে?
পরে মাষ্টারকে চেপে ধরার পর যখন কিছু না ভেবে সইটা করে দিল তখন মহিমকে আর
পায় কে? মনে মনে একপাক নেচে নিয়েছিল সে। তারপর দশবছর মাষ্টারকে বোকা বানানোটা এমন আর কি সরল কাজ?
মাষ্টারও বোকার মতো একটা জাল চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে এতবছর তাকে টাকা দিয়ে এসেছে। বেচারা বুঝতেই
পারে নি এটা একটা ফাঁদ। হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘোর কাটে মহিমের। পাঞ্জাবীর
পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখে বিলু কল করেছে। উফ! নির্ঘাত কোনো কেস করেছে! বিপদের
সময় দাদাকে মনে পড়ে এদের! বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে মহিম। আর রিসিভ
করামাত্র চমকে ওঠে! মনে হয় পায়ের তলার
মাটিটা ভীষণভাবে দুলছে। টাকাগুলো আলমারির ভেতরে সাজানো নোটের
থাকের উপর রাখতে রাখতে কোনোমতে মহিমের গলা দিয়ে একটা শব্দ বেরোয়, “আসছি।”
******
স্কুলে কাছাকাছি
পৌছে গেটের কাছে জটলা দেখে বাইক থামায় মহিম। বিলু মহিমকে দেখে দৌড়ে আসে। বিলুকে দেখে চমকে ওঠে
মহিম। কয়েক ঘন্টায় একি চেহারা হয়েছে বিলুর! মুখে
চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ, দেখে মনে হয় যেন কোনো সর্বনাশ ঘটে গেছে। বিলু কাছে এসে বলে, “দাদা! কিচাইন হয়ে গেছে! কাল রাতে মাষ্টার ফেসবুকে কীসব ভাষণ ঝেড়েছে। সেই ভাষণের জোরে এম.এল.এ, কাউন্সিলর সবাই
সকাল সকাল মাষ্টারের বাড়িতে হাজির হয়ে গেছে। ওরা নাকি বলছে স্কুলটা
নাকি আবার খুলিয়ে ছাড়বে।”
চট করে ফোনটা
বের করে ফেসবুক খোলে মহিম। স্ক্রিনে দেখা যায় জয়ন্তবাবুর মুখ। ভিডিওটা দেখতে থাকে
সে। ভিডিওটা দেখতে দেখতে ফোন বেজে ওঠে মহিমের। এবার বউ ফোন করেছে। ফোনটা কেটে বিলুকে নির্দেশ
দেয় মহিম, “শোন! এম.এল.এ চলে যাবার পর মাষ্টারের পরিবারকে গুম করে দিবি। অন্তত যতক্ষণ পর্যন্ত
স্কুলটা বিক্রি করতে না পারছি ততক্ষণ। আর এই ভিডিওটা কে ছেড়েছে খুঁজে বের কর। বহুত ফেমাস হবার সখ
জেগেছে না? ফেমাস হবার সখ ঘুচিয়ে দেবো মাষ্টারের।” বলতে বলতে আবার ফোনটা বেজে ওঠে। বিরক্ত হয়ে মহিম দেখে
বউ আবার কল করেছে। বিরক্ত হয়ে কলটা রিসিভ করে বলে, “কী হয়েছেটা কী? কাজের সময় বার বার এত ফোন
কীসের?”
বিলু দেখে পলকে
মহিমের মুখ সাদা হয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে বাড়িতে সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে। কলটা কেটে বিলুর দিকে
তাকিয়ে মহিম অস্ফুটে বলে, “বাড়িতে পুলিশ এসেছে!
সাথে ইনকাম ট্যাক্স।”
******
বিকেলের দিকে
বারান্দায় চা খেতে খেতে গিন্নির সাথে কথা বলছিলেন চতুরানন। আগামীকাল সনৎ কাল বাড়ি ফিরছে। দোতলার দুটো ঘর আজ কাজের
লোককে দিয়ে পরিস্কার করিয়ে দিয়েছেন বীণা। বাথরুমে সাবান, শ্যাম্পু সবই যথেষ্ট পরিমানে মজুত করা আছে। নাতির জন্য, ছেলে-বৌমার জন্য একগাদা শীতের জামা কিনেছেন
বীণাপাণি। সেই নিয়েই কথা হচ্ছিল চতুরাননের সাথে। এমন সময় সদর দরজায় শব্দ
শুনে দুজনেই সামনে দিকে তাকালেন। দেখলেন রমা আর নীলকমল এসেছেন। রমা বীণাপাণির মেয়েবেলার
বন্ধু। মাঝে মধ্যেই ওদের সাথে দেখা করতে আসেন। রমার স্বামী নীলকমল বর্তমানে ইনকাম
ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে কর্মরত। এই সামনের মাসেই অবসর নেবেন। চতুরাননের সাথে স্ত্রীর
সূত্রে আলাপ হলেও এখন দুজনের সম্পর্ক আরো গভীর হয়ে উঠেছে। রমা আর নীলকমলের মেয়ে
রিনির সাথেই নিয়ে হয়েছে সনতের।
বীণাপাণি এগিয়ে
গিয়ে সদর দরজা খুলে দিতেই রমা আর নীলকমল উঠে এলেন বারান্দার দিকে। দুজনের দুহাতে দুটো
ব্যাগ। বারান্দায় ওঠা মাত্র বীণা হেসে বললেন, “করেছিস
কিরে? এত খাবার কে আনে?” রমা টেবিলে ব্যাগটা
রেখে বললেন, “তোর বেয়াইকে বল! আসার সময়
গাড়ি থামিয়ে একগাদা খাবার কিনেছে। বলে কিনা অনেক দিন পর কুটুমবাড়ি
যাচ্ছি, খালি হাতে গেলে চলে?”
“তাই
বলে এত? সত্যি নীল তুমি পারো বটে!” বলে
হাসেন বীণাপাণি।
চতুরানন হেসে
বলেন , “আহা! ভালোবেসে যখন এনেছে
কী আর করা যাবে বলো? সবাইকে অল্প অল্প করে দিলে হয়ে যাবে।”
বীণাপাণি হেসে
বলেন, “ঐ আশাতেই থাকো! এই ছাইপাঁশ
তোমাকে একফোঁটা দেবো না আমি! একে কোলেস্টেরল আর সুগার দুটোই বাড়িয়েছ। এসব খেলে আর দেখতে হবে
না। পুজো হাসপাতালে কাটাতে হবে।”
চতুরানন কাঁদো
কাঁদো গলায় বলেন, “মানেটা কি? আমি কি কাটলেট পাবো না? পাবো না আমি কাটলেট?”
“না পাবে
না!” বলে হাসতে হাসতে রমাকে নিয়ে ভেতর চলে যান বীণাপাণি। বারান্দায় চতুরানন আর
নীলকমল দুজনে চুপ করে বসে থাকেন। কিছুক্ষণ পর নীরবতা ভেঙ্গে নীলকমল বলে, “মিশন সাকসেসফুল। মহিমের বাড়িতে আচমকা
রেড করে প্রচুর ব্ল্যাকমানি পাওয়া গেছে। প্রোমোটারির আড়ালে এমন কোনো কাজ
নেই যা ও করতো না। আপাতত ওর অফিস, ক্লাব,
সব সিলড করা হয়েছে। আর শুধু মাষ্টারমশাই একা নন। ওনার মতো আরো অনেকে
এভাবে প্রতারিত হয়েছেন মহিমের দ্বারা। সকলের জমির কাগজ উদ্ধার করা হয়েছে। মহিম প্রোমোটার আপাতত
জেলে।”
কথাটা শোনামাত্র
একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেন চতুরানন। গতপরশু জয়ন্তবাবুর বাড়ি থেকে ফেরার পর নাতির সাথে কথা বলতেই গিয়ে কি একটা মনে হওয়ায় নাতিকে আলাদা ভিডিও কল করতে বলেছিলেন তিনি। নাতির কাছে শিখে নিয়েছিলেন কীভাবে ফেসবুকে লাইভ করে, কীভাবে ভিডিও রেকর্ডিং হয়, কীভাবে ফেক আইডি বানায় সবটা। সবটা শিখে নেওয়ার পর ফোন করেছিলেন নীলকমলকে। নীলকমল সবটা শোনার পর সমস্তটা পরিকল্পনা করেন। সেই মতো গতকাল রাতে ফেক আইডি দিয়ে জয়ন্তবাবুর লাইভটা করেন তিনি। তারপর নাতিকে জানাতেই সে নিজে শেয়ার করে ভিডিওটা। ছড়িয়ে দেয় সমাজমাধ্যমে। দেখতে দেখতে ভাইরাল হয়ে যায় ভিডিওটা যার ফলস্বরূপ নড়ে ওঠে প্রশাসন। আর সেই চাপেই এলাকার এম.এল.এ থেকে নেতামন্ত্রীরা ভীড় জমান জয়ন্তবাবুর বাড়িতে। আর সেই সুযোগে উপর মহলের আদেশে নীলকমল ফোর্স পাঠান মহিমের বাড়িতে। নীলকমলের দিকে তাকিয়ে চতুরানন বলেন,
– গুড!
আর স্ট্যাম্প পেপারটা?
নীলকমল কিছুক্ষণ
মুচকি মুচকি হাসেন তারপর বলেন, “ওম ফট স্বাহা!”
চতুরানন হেসে বলেন, “যাক! শান্তি! ভাগ্যিস সেদিন দাদুভাইয়ের সাথে কথা বলার সময়
মনে পড়লো বলে জানতে পারলাম ফেসবুকে একটা ভিডিও কি করে ভাইরাল হয়।”
– তা
ঠিক! এই মিশনের পুরো কৃতিত্ব ওর। ওই তো একাই ভিডিওটাকে
রীতিমতো ভাইরাল করে দিলো!
“কাদের
নাতি দেখতে হবে তো? কম্পিউটার নিয়ে তুখোর জ্ঞান দাদুভাইয়ের। ভাবছি এবার কলকাতায়
এলে দাদুভাইকে ট্রিট দেব। কি বলো?” বলে হাসেন চতুরানন।
নীলকমল হেসে
বলেন, “তা আর বলতে!”
