অনুসরণকারী

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

বিদায়













“চল ভাগ! দূর হ এখান থেকে মুখপোড়ার দল! খেয়ে দেয়ে কাজ নেই সকাল সকাল বিরক্ত করতে চলে এসেছে! যত্তসব! ধরতে পারলে তোদের ষষ্ঠীপুজো করে দেবো!” কথাগুলো বলতে বলতে বেত হাতে মুর্তিগড়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। অবশ্য যাদের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বলা তারা নগেনখুঁড়োর ঘর থেকে বেরোবার আগেই বেপাত্তা। তারা সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে চটিয়ে দিয়ে যে যার মতো সরে পড়েছে। আমি বাইকে চেপে বাজার সেরে ফিরছিলাম। সাতসকালে নগেনখুঁড়োকে একপাল ছেলেপুলে তাড়া করতে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।

- ব্যাপারটা কী খুঁড়ো? সাতসকালে মেজাজ চড়ে আছে কেন? কিছু করেছে নাকি ওরা?

- করেছে তো! সেই মহালয়ার দিন থেকে আমার বাপের মুণ্ডুপাত করে যাচ্ছে হতভাগার দল। রোজ সকালবেলা এসে বাবুদের মতো গলা করে বলবে ‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো? নাকি এবারও কলকাতা থেকে মুর্তি আনাতে হবে?’ একবার ভেবে দেখো দেখি ছোটোবাবু, এটা কি মানা যায়? মানছি একটু বুড়ো হয়েছি, আগের মতো আর তাড়াতাড়ি হাতের কাজ সাড়তে পারি না। তাই বলে এত হেলাচ্ছেদ্দা করবে আমাকে? ওরে তোদের বাপ-পিতেমোর আমল থেকে মাতৃপ্রতিমা গড়ছি রে! আজ পর্যন্ত তারাও সাহস পায়নি এই কথা বলতে। আর তোরা সেদিন জন্মানো ছেলেপুলের দল কিনা আমার, নগেন পালের কাজ নিয়ে সন্দেহ করিস?

ঘটনাটা বুঝতে আর বাকি রইল না আমার। ইদানিং কয়েক বছর ধরে নব্য বাঙালী প্রজন্মের এক রোগ ধরেছে। অবশ্য এ রোগ আমাদের বেলাতেও পুরোদস্তুরভাবে ছিল। এমনকি আমি নিজেও এই রোগে আক্রান্ত। রোগটা তেমন ভয়াবহ না হলেও হেলাফেলার রোগ নয়। রোগটার নাম ‘ফেলুম্যানিয়া’। অত্যাধিক ফেলুদা পড়লে বা ফেলুদার সিনেমা দেখলে এই রোগ চাপে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে ফেলুদা ভাবতে শুরু করে। কেউ কেউ নিজেকে তোপসে, জটায়ুও ভেবে ফেলেন। এই রোগের দুটো ভাগ আছে। প্রথম ভাগে রুগী নিজের চারপাশে রহস্যের গন্ধ পায়। সব কিছুকে গোয়েন্দাদের দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। পরের ভাগ হল নিজেকে ফেলুদা ভেবে পর্দার মানে সিনেমার ফেলুদার মতো কায়দা করা। এই দ্বিতীয় প্রকারের রুগীরা কথায় কথায় ‘কিছু ভালো লাগছে না রে তোপসে’, ‘আমি হয় এর বদলা নেব নয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব’, ‘আছে! আছে! আমাদের টেলিপ্যাথির জোর আছে!’, ‘মগজাস্ত্র’ বলে বেড়ায়। পুজোর আগে অবশ্য আরেকটা নতুন বাক্য যোগ হয়, ‘‘অমুকদিন তো ষষ্ঠী, আপনার কাজ তার মধ্যে হয়ে যাবে তো?” বুঝলাম নগেনখুঁড়োকে ওরা ফেলুদার স্টাইলেই জিজ্ঞেস করে চটিয়েছে। হাসতে হাসতে বললাম, “ও তুমি কিছু মনে কোরো না। বুঝতেই পারছো ছেলেমানুষ, তোমার সাথে একটু মজা করে ফেলেছে। আচ্ছা বেশ, আমি নাহয় ওদের দেখতে পেলে বকে দেব।”

- মজা করেছে! নিকুচি করেছে মজার! ঠাকুর দ্যাবতাকে নিয়ে মজা এই নগেন পাল সহ্য করবে না। একবার ওদেরকে বাগে পাই! মজা ঘুচিয়ে দেব!

- আচ্ছা বেশ তাই হবে। আপাতত তুমি ঘরে যাও খুঁড়ো। তোমার মেলা কাজ পড়ে আছে। কালকের মধ্যে ঠাকুর দিতে হবে তো নাকি? কালকের মধ্যে দালানে ঠাকুর না এলে বড়দা আমাদের আস্ত রাখবে না। আমার কথাতেই বড়দা এই শেষবারের মতো তোমাকে সুযোগ দিয়েছে। আমার মুখ রাখতে হবে তো?

কথায় কাজ হল। নিজের রুদ্রমুর্তি সম্বরণ করে বিড়বিড় করে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “তোমাদের কাজই তো করতে যাচ্ছিলুম। হতচ্ছাড়া ছেলেপুলের দল সকাল সকাল মেজাজটাই বিগড়ে দিলে। নাহলে এতক্ষণে অর্ধেক সাজ সারা হয়ে যেত আমার। যাকগে এসে যখন পড়েছ তখন দেখে যাও মায়ের সাজখানা।” বলে আমার হাত চেপে ধরতেই হেসে বললাম, “তা কী করে হয়? আজ যে পঞ্চমী! বোধনের আগে শিল্পী ভিন্ন আর কারো যে মায়ের মুখ দেখার অধিকার নেই! তার চেয়ে বরং বেলা থাকতে থাকতে কাজ সেরে ফেলো। আমি একেবারে কাল ভোরবেলা মাকে নিয়ে ঠাকুরদালানে বসিয়ে দুচোখ ভরে দেখবো। আজ একটু তাড়া আছে। আমি বরং আসি?” বলে বাইক স্টার্ট করে নগেনখুঁড়োকে ছেড়ে এগিয়ে গেলাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইড মিররে তাকিয়ে দেখলাম। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চারদিকে একবার বাজপাখির মতো শ্যেনদৃষ্টি বুলিয়ে ধুতির কোঁচড় থেকে বিড়ির প্যাকেট বের করে একটা বিড়ি ধরিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আবার ঢুকে পড়লেন মুর্তিগড়ার ঘরে। আমি মুচকি হেসে বাইকের স্পিড বাড়ালাম।

নগেন খুঁড়ো মানুষটা এমনি ভালো হলেও স্বভাবগত ভাবে একটু ক্ষ্যাপাটে। ইদানিং খিটখিটে ভাবটা বেশ বেড়েছে। তবে কথার মানুষ। কথা দিলে কথা রাখেন। বংশানুক্রমিক ভাবে আমাদের মানে সামন্তবাড়ির পুজোর মাতৃপ্রতিমা ওনারাই গড়ে আসছেন। প্রায় চারশো বছরের পুজো আমাদের। আশেপাশের গাঁয়ের থেকে লোকে মাতৃপ্রতিমা দেখতে, পুজোর ভোগ খেতে আসে। শুনেছি  এককালে নাকি আমাদের পুজোতে অষ্টমীর দিন মহিষবলি হত। আগেকার দিনে আমাদের পুর্বপুরুষরা নিজে হাতে বলি দিয়ে মহিষ উৎসর্গ করতেন। আশেপাশের গাঁয়ের লোকেরা ভীড় করে দেখতো বলি। এখন অবশ্য কুমড়ো বলি ছাড়া আর কিছু হয় না। আর আগেকার দিনের মতো জমিদারী থাকলেও সেটা খাতায়-কলমে। বাস্তবে এখন তার প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। থাকার মধ্যে শুধু একটা পুরোনো প্রাসাদের মতো একটা দালানকোঠা বাড়ি আর একটা বাগান আছে।

এই বাড়ি তথা জমিদারীর শরিক বলতে গেলে পাঁচজন। চারভাই ও এক বোন। আমি সবার ছোটো। তবে সকলেই যে এ বাড়ির বাসিন্দা তা নয়। থাকার লোক ধরতে গেলে আমি, সেজদা, সেজোবৌদি, বড়দা আর বড়বৌদি থাকি। আর থাকে চারটে দুষ্টু বাঁদর। যারা বছরে বেশিরভাগ সময় হোষ্টেলে থাকলেও ছুটিতে এলেই গোটা বাড়িজুড়ে দাঁপিয়ে বেড়ায়। বাকিরা সকলেই দেশে-বিদেশে সেটলড।

বড়দার কাছে শুনেছি নগেনখুঁড়োর বাবা নাকি ছিলেন যাকে বলে জাত শিল্পী। পাথর হোক বা কাঠের টুকরো, নিখুঁত নৈপুণ্যে খোঁদাই করে মুর্তি বানাতে পারতেন তিনি। ঠাকুর্দার পৃষ্ঠপোষকতায় শান্তিনিকেতন থেকে শিখে এসেছিলেন ফাইন আর্টস এর একাধিক ফর্ম। শিখিয়েছিলেন নগেনখুঁড়োকেও। যদিও সবই শোনা কথা। জ্ঞানত নিজের চোখে কোনোদিন নগেনখুঁড়োকে পাথর, কাঠ খোঁদাই করতে দেখিনি। তবে হ্যাঁ ভদ্রলোক যে তার বাবার মতোই জাত শিল্পী সেটা বুঝেছি তার তৈরী প্রতিমা দেখেই। ওরকম দরদ দিয়ে মাতৃপ্রতিমা তৈরি করতে সবাই পারেন না। মাতৃপ্রতিমা নির্মাণে নবরস কথাটা মাথায় রাখা ভীষণ দরকারী। সাধারণত আমরা বাড়িতে যে দেবী দুর্গার পুজো করি তা মাধুর্য্য আর মমতায় ভরা মাতৃপ্রতিমা। ইনি গৃহের কন্যা রূপে পুজিতা হন। এক্ষেত্রে শান্ত ও শৃঙ্গার রসের ভঙ্গিমা ফুটিয়ে তুলতে হয়। আজকাল যে সব প্রতিমা আমরা দেখে থাকি পুজো প্যান্ডেলে, তাতে এই দুই রস থাকে না। থাকে ক্রূর যোদ্ধৃ রূপ। যেটায় ব্যবহৃত হয় রৌদ্র ও বীর রস। এই মাতৃপ্রতিমা পুজিত হয় দেবী রূপে। আশ্চর্যের ব্যাপার প্রতিবার নগেনখুঁড়ো যখন মাতৃপ্রতিমা গড়েন এই চারটে রস একসাথে মিশিয়ে প্রতিমার মুখ তৈরী করেন। মানে আমাদের বাড়ির মাতৃপ্রতিমা দেখলে যেমন মন ভরে আসবে ঠিক তেমনই সম্ভ্রমও জাগ্রত হবে। আর এই জিনিসটার কোনো বছরই নড়চড় হয় না। অন্য কোনো শিল্পী হলে একটা বা দুটো রসের প্রভাব হয়তো কম বেশী হতে পারে কিন্তু নগেনখুঁড়োর কোনোবার এই ভুল হয় না। প্রতিবার একইরকম পারফেক্ট মুখ বানান নগেনখুঁড়ো। তবে এইবার বড়দা নগেনখুঁড়োকে আর মাতৃপ্রতিমার বরাত দিতে চাননি। আসলে একমাত্র মেয়ে ফুলির মৃত্যুর পর নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোটা ইদানিং ভীষণ বেড়ে যাওয়ায় বড়দা চাননি কাজটা নগেনখুঁড়ো করুন। কে জানে মাতৃপ্রতিমা গড়তে গিয়ে কিছু ক্ষ্যাপামো বসলে যদি পাপ লাগে? অবশ্য আশঙ্কাটা অমূলক নয়। মাঝে মাঝে অল্পবিস্তর ক্ষ্যাপামো করে থাকলেও গত একবছর ধরে নগেনখুঁড়োর ক্ষ্যাপামোর বহরটা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। দিনরাত কথা নেই বার্তা নেই শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন। কখনো সারারাত ধরে গোটা গ্রামের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতেন। কখনো বা রাস্তায় কাউকে পেলে জিজ্ঞেস করতেন, “আমার ফুলিকে দেখেছ? দেখবে? ঐ দেখো আগুনে পুড়ছে!”

ফুলি, নগেনখুঁড়োর একমাত্র আদরের কন্যা। মা মরা মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসতেন নগেনখুঁড়ো। বা বলা ভালো চোখে হারাতেন। ফুলিও যাকে বলে বাবা অন্ত প্রাণ ছিল। নগেনখুঁড়ো বড়ো সাধ ছিল ফুলি যাতে তার ঠাকুর্দার মতো বড়ো শিল্পী হয়। সেইমতো নিজে হাতে তাকে শিখিয়েছিলেন মাতৃপ্রতিমা গড়া। টাকা জমিয়ে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষার জন্য। মেধাবী ফুলি ক্রমে স্কুল পাশ করে পা রেখেছিল কলেজের দোরগোড়ায়। ইচ্ছে ছিল শিক্ষা শেষে বাবার পাশে দাঁড়ানোর। কিন্তু মানুষ ভাবে এক আর হয় আরেক। কলেজে ভর্তি হবার বছর তিনেকের মধ্যেই এক ছেলের প্রেমে পড়ে গেল ফুলি এবং অবশেষে একদিন কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলল। মেয়ের এই হঠকারিতায় প্রথমে রাগ করলেও পরে মেনে নিয়েছিলেন নগেনখুঁড়ো। কাছে ডেকে নিয়েছিলেন মেয়ে-জামাতাকে। বাবার ডাকে সাড়া দিয়ে বিয়ের সাতমাস পর পুজোর সময় গ্রামে স্বামীর সাথে ফুলি ফিরেছিল ঠিকই, তবে সশরীরে নয়। ওরা ফিরেছিল মৃত্যুসংবাদ হয়ে। বিয়ের পর শান্তিনিকেতনেই ছোটো একটা সংসার পেতেছিল ফুলি। স্বামীকে নিয়ে একসাথে কলেজের পড়াশুনো ও সংসার চালিয়ে বেশ সুখেই দিন কাটছিল তার। কিন্তু বিধাতার মনে হয়তো অন্য ইচ্ছে ছিল। এক ঝড়-জলের রাতে কলেজ থেকে ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হল ফুলিরা। ঝড়ের কারণে ছিঁড়ে যাওয়া বিদ্যুতের তার দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রবল বিদ্যুৎপ্রবাহ ওদের সমগ্র চেতনাকে অসাড় করে প্রাণহীন মৃতদেহে পরিণত করতে একমুহূর্তও সময় নেয়নি। খবরটা পাওয়ার পর সমগ্র গাঁয়ের পুজোর আনন্দ একমুহূর্তে বদলে গিয়েছিল দশমীর বিষাদে।

একমাত্র মেয়ের মৃত্যু সহজে মেনে নিতে পারেননি খুঁড়ো। ফুলির মৃত্যুর পর থেকেই মাঝে মাঝে অপ্রকৃতিস্থর মতো আচরণ করতেন। একবার তো গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন। ভাগ্যিস গাঁয়ের ছেলেরা দেখতে পেয়ে রক্ষা করে তাকে। তারপর থেকে অপ্রকৃতিস্থ ভাবটা কমলেও মাঝে মাঝে প্রলাপ বকতেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই এরকম শোকে প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া মানুষের হাতে প্রতিমা তৈরীর ভার দিতে চাননি বড়দা। তাই প্রতিবারের মতো এইবারও রথযাত্রার দিন যখন নগেনখুঁড়ো বরাত নিতে এলেন তখন তাকে একপ্রকার বুঝিয়ে বিদায় করে দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু নগেনখুঁড়ো নাছোড়বান্দা। তিনি কিছুতেই বরাত না নিয়ে যাবেন না। অবস্থা যখন চরমে উঠলো তখন আমাদের বাকি ভাইদেরও নামতে হল আসরে। অবশেষে ঠিক হল নগেনখুঁড়োই আমাদের পুজোর প্রতিমা তৈরী করবেন তবে পঞ্চমীর মধ্যে সম্পুর্ণ ঠাকুর তৈরী করে দিতে হবে। নগেনখুঁড়ো বড়দার শর্তে রাজি হলেন তবে শর্ত দিলেন এবার তিনি ঠাকুরদালানে মাতৃপ্রতিমা তৈরী করবেন না। মাতৃপ্রতিমা তৈরী হবে তার বাড়িতে। ষষ্ঠীর দিন ভোরে আমরা চার ভাই গিয়ে তার বাড়ি গিয়ে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে আসবো। শর্ত অনুযায়ী কালকে ভোরবেলা আমাদের আসার কথা। সেই কারণে আজ এসেছিলাম নগেনখুঁড়োকে তাগাদা দিতে। এবার এখানকার খবর বড়দাকে বলে দিলেই ছুটি আমার।

                                                  *****

আজ ষষ্ঠী। আরেকটু পরেই মায়ের বোধন শুরু হবে। জগন্মাতা চারদিনের জন্য আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে যাবেন। সারা বছরের দুঃখ-কষ্ট ভুলে আমরা মেতে উঠবো তাকে নিয়ে। দেখতে দেখতে চারটে দিন যে কোনদিক দিয়ে কেটে যাবে বোঝা যাবে না। তারপর চারদিন পরে আমাদের সবাইকে ছেড়ে উমা আবার পাড়ি দেবেন কৈলাশে। সেই মতো শর্ত অনুযায়ী আজকে নগেনখুঁড়োর কাছ থেকে মাকে নিয়ে আসার কথা আমাদের। তাই আমরা চারভাই ভ্যানরিক্সা আর ঢাকি নিয়ে উপস্থিত হয়েছি নগেনখুঁড়োর বাড়িতে। কিন্তু ঘরের চারপাশের পরিবেশ এত নিস্তব্ধ কেন? একটা পাখিও ডাকছে না। মনে হচ্ছে যেন একরাশ শোক নেমে এসেছে বাড়িটায়। সাধারণত নগেনখুঁড়ো ভোরে ওঠার মানুষ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যেন তার ঘুম ভাঙেনি। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। অন্যদিন তো এরকম হয় না। তাহলে আজ কী হল? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ডাক দিলাম আমি।

বেশ খানিকক্ষণ হাঁকডাক করার পর দরজা খোলার শব্দ হল। তারপর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন নগেনখুঁড়ো। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে তার? সেই আগের মতো আলুথালু উন্মাদবেশ, ক্ষ্যাপাটে চাহনি, সারা শরীরে কাদামাটি মাখানো। কই কাল সকালে তো এতটা খারাপ অবস্থা দেখিনি! তবে কি আবার সেই ক্ষ্যাপামোটা ফিরে এলো? উঠোনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে ঈষৎ ঘোলাটে অথচ মরামাছের মতো ঠাণ্ডা এবং শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তিনি। আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম খুঁড়োকে এভাবে দেখে বড়দাও খানিকটা বিব্রত হয়ে গেছেন। মেজদা, সেজদার অবস্থাও তথৈবচ। অগত্যা আমাকেই হাল ধরতে হল। খানিকটা গলা খাঁকড়ে বললাম, “বলছিলাম যে…ইয়ে মানে… আমরা আমাদের ঠাকুর নিতে এসেছি।” কথাটা শুনে শূন্যদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন নগেনখুঁড়ো। তারপর মৃদু হেসে ইশারা করলেন পিছু নিতে। তারপর এগিয়ে চললেন নিজের মুর্তি গড়ার ঘরের দিকে। প্রথমে অবাক হলেও একে একে আমরা চারভাই ওনার পিছু পিছু প্রবেশ করলাম মুর্তি গড়ার ঘরে।

ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। বাইরে থেকে একফোঁটা আলো আসার জো নেই। ঘরের ভেতরে ঢুকে আমরা চারজন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় নগেনখুঁড়ো ঘরের আলোটা জ্বাললেন। মুহূর্তের মধ্যে গোটা ঘর আলোয় ভরে গেল, আর আমরা চারভাই সেই আলোয় মুগ্ধ হয়ে দেখলাম মাতৃপ্রতিমাকে। হ্যাঁ, অপ্রকৃতিস্থ, ক্ষ্যাপা, সন্তানশোকে কাতর হলেও নগেনখুঁড়োর শিল্পীস্বত্তার অবনতি বিন্দুমাত্র হয়নি! প্রতিবারের মতো এবারও দারুণ মাতৃপ্রতিমা তৈরী করেছেন তিনি। বরং বলা ভালো এবারের মাতৃপ্রতিমা ছাপিয়ে গেছে নগেন খুঁড়োর আগের সব সৃষ্টিকে। বড়দাকে দেখলাম হাত জোড় করে প্রণাম জানাচ্ছেন মাতৃপ্রতিমার উদ্দেশ্যে।

প্রতিমা ভ্যানরিক্সায় তুলে বড়দা মেজদা আর সেজদা রওনা হলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি থেকে গেলাম প্রতিমার দাম মেটাতে। প্রতিমার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো বলে উঠলেন, “কি? বলেছিলাম না? পঞ্চমীর আগেই প্রতিমা তৈরী করে দেবো? করে দিলাম তো? এই নগেন পালের কথার নড়চড় হয় না ছোটোবাবু! সে যা বলে, করে দেখায়!”

আমি হেসে বললাম, “সে কি আর আমি জানি না? সেই কারণেই তো বড়দার হাজার আপত্তির পরেও তুমিই বরাতটা পেলে। যাক গে! সে সব কথা ছাড়ো। প্রতিমার দামটা ধরো।”

কথাটা শুনে মৃদু হাসলেন খুঁড়ো। তারপর প্রায় অস্ফুটে বলে উঠলেন, “দাম? কীসের দাম ছোটোবাবু? বাবারা কি মেয়েদের বিদায় করার সময় দাম নেয় নাকি?”

- সে কি কথা! তোমার পরিশ্রম, তোমার কাজের দাম নেবে না?

- আমার আর ওসবে মোহ নেই গো ছোটোবাবু। মায়ের কৃপায় দুবেলা দুমুঠো জুটে যায় এই অনেক। ও আমি নেব না। বরং তার বদলে একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে। দেবে? বলো ছোটোবাবু দেবে?

পুবের আকাশ ক্রমশ ফরসা হয়ে আসছে। সেই আলোতে দেখতে পেলাম নগেনখুঁড়োর চোখের দৃষ্টি আরো ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। তবে সেই আগের মতো শূন্য মরা মানুষের মতো দৃষ্টি নেই বরং তার জায়গায় এসে জমেছে একরাশ আকুতি আর কিছু চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

দূরে মাতৃপ্রতিমা নিয়ে বড়দারা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের বাড়ির দিকে। ভ্যানরিক্সার আগে ঢাকি প্রবল জোরে ঢাক বাজাতে বাজাতে সমগ্র গ্রামকে জাগিয়ে মায়ের আগমনবার্তা জানিয়ে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। সেদিকে তাকিয়ে নগেনখুঁড়ো অস্ফুটে বলে উঠলেন, “ভাসানের পর প্রতিমার কাঠামোটা আমার চাই। দেবে? দেবে আমাকে? আসলে আমার ফুলিকে তো আর আটকে রাখতে পারলাম না। এই প্রতিমার কাঠামোকেই নিজের কাছে রেখে দেবোখন? নিজে হাতে গড়া প্রতিমা, নিজেরই মেয়ের মতোই তো নাকি? পুজোর চারটে দিন নাহয় তোমাদের কাছে পুজো পেল, বাকিটা সারা বছর আমার কাছে থাকবে। বলো ছোটোবাবু? দেবে তো?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “বেশ! দেবো।”


সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...