মেকাপ সেরে ব্যাগ থেকে সালওয়ার কামিজ আর একটা হাউজকোট বের করে বিছানায় রাখল সুজাতা। হাউজকোটটা পরে নিয়ে তারপর গোটা ঘরময় ছড়িয়ে থাকা কাল রাতের পোশাক কুড়িয়ে আরেকটা ব্যাগে ভরে রাখল। কাল রাতের বেসামাল হবার চিহ্ন কাপড়ের এদিকে ওদিকে লেগে আছে। এগুলো বাড়ি ফিরে কাচতে হবে। যদিও ঊর্মি বলেছে এখানে ধোপা আছে। এখানকার রাঁধুনি মানে যাকে ঊর্মি মলিদিদি বলে ডাকে তার বর নাকি কাপড় ধুতে দিয়ে আসেন প্রতি সপ্তাহে। তাও ঊর্মি এসব পোশাক দিতে পারবে না। নিজের কাজ নিজে করার বদঅভ্যেসের ফলে কাউকে দিয়ে কাজ করাতে গেলে তার বাধে। তার চেয়ে বরং ব্যাগে রেখে দেবে জামাকাপড়গুলো। বাড়ি ফিরে কেচে নেবে। তবে বাকি গুলো ধুতে সমস্যা না হলেও তথাগতর জামাটা নিয়ে একটু সমস্যা হবে।
তথাগত মদ খুব কমই খায়। বলতে গেলে অকেশন ছাড়া গ্লাস হাতে নেয় না। নিলেও হজম করতে পারে না। চার পেগের বেশী খেলেই বমি করে ভাসিয়ে দেয় সে। কাল রাতে খাবার পালা শেষ করে তিনজনে বসেছিল অল্প ওয়াইন নিয়ে। রজতাভ হার্ট অ্যাটাকের পর ঊর্মির ঠেলায় মদ খাওয়া কমিয়েছে। এখন ভীষণ রকমের সাবধানী ও। খাবার সময়ও ওরা চিকেন কারি দিয়ে রুটি খেলেও রজতাভ শুধু চিকেন স্যুপ খেয়েছে।
খাবার পর ওরা যখন গ্লাস হাতে বৈঠকখানায় বসল। রজতাভর হাত খালি দেখে তথাগত বলে উঠেছিল, “ আরে একটা দিন তো! কিছু হবে না ভায়া। তাছাড়া ওয়াইন খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো!”
রজতাভ হেসে বলেছিল, “ না হে! অনেকদিন হল ওসব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। বুঝতেই পারছ আমার হৃদযন্ত্রের ক্ষতটি এতটাই প্রবল যে কটা বছর ড্রাই থাকতে বলেছে ডাক্তার। একদম কড়া নিয়মে তেল মশলা বাদ গেছে। বলেছে এক পেগ খেলেই ক'দিন পরেই দেওয়ালে ছবি হয়ে ঝুলতে হবে। প্রাণের দায় বড়ো দায় হে! তোমরা খাও। তাছাড়া তোমরা বেহেড হলে ঘরে পৌঁছে দিতে একজন সুস্থ পাবলিকেরও দরকার! চিন্তা নেই সেই রোলটাও আমিই করবো।”
ঊর্মি বলেছিল,“ আমিও বাবা দু পেগের বেশী নেব না। কাল অনেক কাজ আছে। তোরাও বেশী নিস না। নাহলে কাল সারাদিন হ্যাংওভারের ভারে বসে থাকতে হবে। তার উপর তথাগত শুনেছি বেশী খেতে পারে না।”
- সে আর বলতে? চার পেগেই বাবু উল্টে যান আর ঝক্কি আমাকে সামলাতে হয়।
- আজ আমি অ্যালকোহল ইনটলারেট বলে এভাবে বললে সু?
- বেশ করেছি! শোনো অলরেডি দুই পেগ হয়ে গেছে। এটার পর আর খাবে না। সোজা নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়বে।
- আর তুমি?
বলে ভ্রু কুঁচকে তাকায় তথাগত। ততক্ষণে লাল পানীয়ের নেশা অল্প অল্প করে মৌতাত তৈরী করছে সুজাতার মধ্যে। সে মুচকি হেসে জড়ানো অথচ দুষ্টুমিতে ভরা আদুরে গলায় বলে, “ আমি? উম... আমি বরং আজ সারারাত ঊর্মির সাথে গল্প করে কাটিয়ে দেব। কি রে? মনে আছে? সেই এক্সকারশনের সময় রাতে রেস্টরুমে বসে তুই, আমি, কুসুমিতারা সারা রাত আড্ডা দিতাম? তা আজ হবে নাকি?”
- হুম! তার পরের দিন সব কটাকে হাই তুলে ম্যাডামের বকুনি খেতে হত। তবে আজ আর সেই আশা নেই কারন এখন তোর সাথে বসলে সারারাত তুই ভাট বকবি! তুই কি রে? তথাগতকে তিন পেগের জন্য বকছিস এদিকে নিজে চারপেগ গিলে বসে আছিস!
- আরে দুর! ওয়াইনে নেশা হয় নাকি? নেশা তো করেছি আমরা কলেজে! তোর মনে আছে? সেই শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসবে গিয়ে ঘুরে ফেরার পথে তাড়ি খেয়েছিলাম? উফ! ওটার কাছে এটার নেশা তুচ্ছ। এসবে আর কি নেশা হয়?
- হয়! আর তোকে দেখে বোঝা যাচ্ছে কতটা নেশা হয়ে গেছে। আমারই ভুল এসব নিয়ে বসা উচিত হয় নি। অ্যাই ওঠ! আর খেতে হবে না। তথাগত, ওকে ধরো। আর খেতে হবে না। চলো ওকে ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসি। আর এই যে তুমি! ওদিকে বসে কি তামাশা দেখছ? এসো হাত লাগাও! নাহলে সুজাতাদেবী আজ এখানেই শয্যা নেবেন।
রজতাভ দুরে বসে ওদের কাণ্ড দেখছিল আর মুচকি মুচকি হাসছিল। ঊর্মির কথায় হাসতে হাসতে বলল, “ বেশ হবে! কে বলেছিল? খাবার পর ওয়াইন পার্টি করতে? যেখানে একজন অ্যালকোহল ইনটলারেট আর অপরজন ননস্টপ ড্রিঙ্কার! নাও বোঝো ঠেলা !”
- বাজে জ্ঞান না দিয়ে এদিকে এসে হেল্প করো! এই সুজাতা! আরে এতো শুয়ে পড়ছে! তথাগত শক্ত করে ধরো!
- কাউকে লাগবে না। দাঁড়াও আমি ধরছি। অনেক রাত হয়ে গেছে। তোমরাও শুয়ে পড়ো। কাল সকালে কথা হবে। গুডনাইট!
বলে তথাগত হাতের গ্লাসের পানীয়টা শেষ করে গ্লাসটা টেবিলে রেখে সুজাতাকে কোলে তুলে নিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে আবার সোফায় বসে পড়ে। বেগতিক দেখে রজতাভ উঠে আসে নিজের চেয়ার ছেড়ে। তারপর তিনজনে মিলে সুজাতাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়।
ঘরে ঢুকে সুজাতা ইশারায় বাথরুমে যেতে চাইলে তথাগত ওকে ধরে বাথরুমে নিয়ে যায়। বাথরুমে ঢুকে বেসিনের কল খুলে ওর চোখে মুখে জল ছেটায় তথাগত।
চোখে মুখে ঈষদুষ্ণ জলের স্পর্শ পেয়ে কিছু আরাম লাগে সুজাতার। তারপর হঠাৎ রজতাভদের চমকে একটা প্রচণ্ড ‘ওয়াক’ শব্দ তুলে বমি করে বসে সে। সুজাতার মুখ থেকে ঝলকে ঝলকে বেরিয়ে আসে সদ্য উদরস্থ হওয়া লাল ওয়াইন। বাথরুমের বেসিন ভেসে যায় সেই বমিতে। বমির ছিটে এসে পড়ে তথাগতর জামাতেও। বমি না থামা পর্যন্ত তথাগত কিছুক্ষণ নির্বিকারভাবে ধরে থাকে সুজাতাকে। পিঠে হাত বুলিয়ে, কখনো মৃদু চাপড় মেরে দেয় যাতে বমিটা থামে। বেশ কিছুক্ষণ বমি করার পর একটু হাল্কা লাগলে চোখে মুখে আবার জল ছিটিয়ে তথাগতর কাঁধে ভর দিয়ে বেরিয়ে আসে সুজাতা।
সুজাতাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তথাগত একটু ইতস্তত করলে রজতাভ বুঝতে পারে সে কি চাইছে। সে ইশারায় ঘরের একটা কোণ দেখিয়ে বলে, “ওদিকে আপাতত রেখে দিতে পারো। কাল বীরেন্দর দাজু এলে বাসি কাপড়ের বাস্কেটে দিয়ে দেবে। আমরা এলাম। রাতে কোনো প্রবলেম হলে ডাকবে। ঊর্মি এসো। গুড নাইট!”
বলে ঊর্মিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজার নবটা টেনে দেয় রজতাভ। তথাগত এগিয়ে ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়ে সুজাতার আর ওর পরনের জামাটা খুলে ঘরের এককোণে ফেলে দেয় রজতাভ। তারপর বাথরুমে হাত-মুখ ধুতে গিয়ে আপনমনে হেসে ফেলে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে হাত-পা মুছে বিছানায় শুয়ে তথাগত সুজাতার দিকে তাকায়। ঘরের নাইটল্যাম্পের আলোয় দেখে সুজাতা ইতিমধ্যেই প্রায় ঘুমে ঢলে পড়েছে। ওয়াইনের প্রভাবে সুজাতার ফর্সা মুখে হাল্কা লালচে আভা এসেছে। কপালে অল্প ভেজা চুল লেপ্টে আছে। বাকি চুলগুলো গোটা মুখে ছড়িয়ে। যার ফলে লাইটল্যাম্পের আলোয় আরো মোহময়ী লাগছে সুজাতাকে। সুজাতার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে তথাগত। বিয়ের প্রায় তিন বছর হতে চলল। সুজাতার শরীরের সমস্ত বাঁক, সমস্ত অলিগলি, খাঁজ তার চেনা। কিন্তু তবুও যতবার সে সুজাতাকে নিরাবরণ অবস্থায় দেখে ততবার তার মনে হয় তার কিছুই দেখা হয় নি। প্রতিবার সুজাতাকে একইরকম স্নিগ্ধ অথচ রহস্যময়ী লাগে তার। কিছুক্ষণ সুজাতার নিরাবরণ দেহের অপার্থিব সৌন্দর্যের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তথাগত। তারপর মুচকি হেসে সুজাতাকে টেনে নেয় নিজের দিকে।
কাল রাতের কথা মনে পড়তেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় সুজাতা। ইস! কাল রাতে নেশার ঝোঁকে কি কাণ্ডটাই না ঘটিয়েছে ওরা! ছিঃ! ছিঃ! রজতাভরা কি ভাবছে কে জানে? বিয়ের পর এরকম বেসামাল কোনোদিনই হয় নি সে। বরং তথাগত বেসামাল হলে সামলেছে। কাল রাতে কি যে হল ওর কে জানে? ভাবতে ভাবতে তথাগতকে ডাক দেয় সুজাতা। ঘুমের ঘোরে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করার পর তথাগত চোখ মেলে তাকায়। তারপর সুজাতার একটা হাত ধরে হ্যাচকা টান মেরে জড়িয়ে ধরে। সুজাতা লজ্জায় তথাগতর বুকে আদুরে চড় মেরে বলে,“আহ! কী হচ্ছেটা কি? ছাড়ো!কত বেলা হয়েছে খেয়াল আছে?”
সদ্যস্নাতা সুজাতাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ওর ভেজা চুলের আঘ্রান নিতে নিতে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে তথাগত বলে ওঠে, “উহু! এখনও অনেক দেরী। আরেকটু ঘুমোবো।”
- ওরকম করে না লক্ষ্মীটি! বাইরে রজতদা, ঊর্মি আছে। ওরা কি ভাববে বলো তো?
- কিছু ভাববে না। ওরা জানে কাল রাতে ঠিক কি হয়েছে?
“ অ্যাঁ!” বলে ছিটকে ওঠে সুজাতা। তথাগতর দিকে তাকিয়ে থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে “ওরাও জানে?”
একটা প্রকাণ্ড হাই তুলে আদুরে গলায় তথাগত বলে, “ বাহ! জানবে না? কাল রাতে তুমি যে হারে চেঁচিয়েছ , ও চিৎকার বোধহয় মলিদিদির বাড়িতেও পৌঁছে গেছে।”
লজ্জায় লাল হয়ে তথাগতর হাতে একটা চড় মেরে সুজাতা বলে, “ধ্যাত! বাজে বোকো না।”
- আমি বাজে বকছি? বেশ ঊর্মিদের জিজ্ঞেস করে দেখো ওরা কি বলে?
- ইস! ছিঃ! ছিঃ! লোকের বাড়িতে এসে আমরা কিসব করেছি! তোমারও বলিহারি! কাল রাতে একটু কন্ট্রোল করতে পারলে না? ইস! ওদের সামনে কি করে মুখ দেখাবো? রজতদা কি ভাববে?
- কিছুই ভাববে না। আর কাল রাতে যা হওয়ার হয়ে গেছে! আর ভেবে লাভ নেই! ঐ যে তুমি বলো না? কি যেন? হ্যা! গতস্য শোচনা নাস্তি। কালকের চিন্তা বাদ দাও ! যদি ভাবতেই হয় তাহলে ভাবো আমাকে খোরপোশ দেবে কি করে?
- খোরপোশ মানে?
- বাহ রে! কাল রাতে যা হলো তার খোরপোশ দেবে না? তবে সত্যি কথা বলতে গেলে না দিলেও চলবে। কাল রাতে যা হল তাতে আই এম ইমপ্রেসড! এতদিন ধরে প্যাশনেট প্রেমিকাকে আদর করে এসেছি। সে আদরে সমর্পন ছিল, আদর ছিল। কিন্তু কাল রাতে যা হল! কাল এক প্রেমিকার নয় বরং এক বাঘিনীর দর্শন করেছি। এতদিন ধরে বনদপ্তরে প্রচুর বাঘ সামলেছি। কোনোবারই কিছু হয় নি আমার। কিন্তু এই বাঘিনী কাল রাতে পুরো আচড়ে কামড়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে আমাকে। বিশ্বাস না হলে ঘরের আলোটা জ্বেলে দিচ্ছি দেখতে পারো। কাল রাতের সংঘর্ষের চিহ্ন আমার সর্বাঙ্গে পাবে। সর্বাঙ্গে মানে সর্বাঙ্গে। দেখবে?
- অসভ্য!
- বটে? আমি অসভ্য? তা তো বলবেনই! এখন নেশা কেটে গেছে কিনা? এখন তো আমি অসভ্য, জংলী, বর্বর! আর আপনি তো কবির সুরঞ্জনা!
- অ্যাই! সুনীলবাবুকে নিয়ে কোনো কথা বলবে না!
- আচ্ছা বেশ! তাহলে বাবলি বলি?
- ধুস! আমি কি বুদ্ধদেব গুহর নায়িকা নাকি?
- তাহলে কি বলি? হ্যা! তন্বীশ্যামা, শিখরদশনা, অবলতাঙ্গী, পক্কো বিম্বোষ্ঠা, পীনোন্নত পয়োধরা,রম্ভোরু... রম্ভোরু...
- ব্যাস! হয়ে গেল? মিস্টার রম্ভোরু? এবার যাও ফ্রেশ হয়ে ড্রইংরূমে এসো। আমি যাচ্ছি।
- আরে ওসব পরে হবেক্ষণ! এখন আর ওসব করতে ইচ্ছে করছে না।
- তাহলে কি করতে ইচ্ছে করছে?
- ওটাই যা হানিমুনে কাপলদের ইচ্ছে করে।
বলে সুজাতাকে কাছে টেনে নিবিড় ভাবে পরম আশ্লেষে চুমু খায় তথাগত। যেভাবে প্রজাপতি ফুলের মধু শুষে নেয় ঠিক সেইভাবে সুজাতার নরম ফুলের পাপড়ির মতো ঠোঁটের যাবতীয় আদ্রতা শুষে নিয়ে তিলে তিলে চেটে পুটে খেতে থাকে তথাগত। সুজাতা চোখ বুঁজে পরম আশ্লেষে তথাগতর এই আদরে সাড়া দেয়। ওর শঙ্খধবল হাতের সরু সরু আঙুলগুলো তথাগতর চুলে বিলি কাটতে থাকে। তথাগত দুহাতে সুজাতার মুখটা স্থির করে ধরে রাখে যাতে সুজাতা পালাতে না পারে। একসময় সুজাতা তথাগতকে মৃদু ধাক্কা মেরে সরিয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটটা মুছে বলে, “ আর নয় মশাই! ঢের হয়েছে! সকালের পক্ষে ডোজটা বেশীই হয়ে গেছে। এবার উঠে পড়ো।” তথাগত বাধ্য হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, “একটা কথা বলবো?” সুজাতা তথাগতর দিকে তাকিয়ে বলে,
- কি?
- মাঝে মাঝে এরকম মাতাল হলে মন্দ হয় না! বাড়ি ফিরে আরেকবার ট্রাই করতে হবে।
বলে চোখ মেরে বাথরুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয় তথাগত। সুজাতা দরজার সামনে তেড়ে এসে থমকে দাঁড়ায় তারপর ফিক করে হেসে বলে, “ বর্বর!”
দরজা খুলে ঘর থেকে বেরোয় সুজাতা। পায়ে পায়ে ড্রইংরুমে পৌঁছতেই দেখে ঊর্মি সোফায় বসে চা খাচ্ছে। সুজাতা মাথা নিচু করে ঊর্মির পাশের সোফায় বসা মাত্র ঊর্মি একটা কাপ সুজাতার দিকে এগিয়ে দেয়।
কাপের মধ্যে হাল্কা সবুজাভ একটা তরল দেখে প্রথমে একটু ইতস্তত করে সুজাতা। তারপর এক চুমুক দিতেই প্রচণ্ড টক এবং প্রচণ্ড তেঁতোর একটা মিশ্রণের স্বাদে অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসার উপক্রম হয়। কোনো মতে বমি সামলে সুজাতা জিজ্ঞেস করে
- ওয়াক! এটা কি?
- চিনিছাড়া কড়া লিকার চায়ের সাথে লেবুর রস এবং একটু নিমপাতা্র নির্যাস। ডিটক্স করতে কাজে লাগে। কাল রাতে যা খেল দেখিয়েছিস , সেটার হ্যাঙ্গওভার থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র পথ।
- কি? লেবু চায়ে নিমপাতা কে দেয়?
- বায়না না করে পুরোটা খেয়ে নে। দেখবি মাথা ধরাটা ঠিক হয়ে গেছে। তোর বর বুঝি এখনও ঘুমোচ্ছে? স্বাভাবিক! ওর জন্যেও এককাপ তৈরী করা আছে। দুজনে মিলে লক্ষ্মী ছেলে মেয়ের মতো এটা খেয়ে নিয়ে চুপচাপ রেস্ট নেবে। কাল রাতে অনেক ধকল গেছে দুজনের। জাতে মাতাল হলে কি হবে? দুজনে কাল রাতে তাল ঠিকই দিয়েছ! না নিজে ঘুমিয়েছ না আমাদের ঘুমোতে দিয়েছ!
কাপের পানীয়তে সবে চুমুক দিয়েছিল সুজাতা। ঊর্মির কথা শুনে বিষম খেয়ে বসে। ঊর্মি দুষ্টু হেসে বলে,
- থাক আর লজ্জা পেয়ে বিষম খেতে হবে না! তোদের ভাগ্য ভালো রাতে এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ থাকি না। বাপরে! কাল রাতে যেভাবে চিৎকার জুড়েছিলি তুই! মনে হচ্ছিল শুধু আমরা না আশেপাশের প্রত্যেকে শুনে ফেলবে। তা হ্যা রে? তথাগতকে কি খাওয়াস বলতো? নেশায় টাল হয়েও এত স্ট্যামিনা?চার পাঁচ রাউণ্ড তো হবেই! না মানে তোর রজতদাকেও খাওয়াতাম। হার্টের অপারেশনের পর স্ট্যামিনা কমে গেছে কিনা!
- বেশী কিছু না! একটা ডিম, একটা কলা আর দুপিস মাখন লাগানো সেঁকা পাউরুটি আর সকাল সকাল একটা লম্বা মিষ্টি চুমু। ব্যস! তাহলেই দেখবে রজতাভর সারাদিনের এনার্জি ফিরে এসেছে।
দুজনে চমকে পেছন ফিরে তাকায়। দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে তথাগত। তথাগতর কথায় সুজাতা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। ইস কার সামনে কি বলতে হয় সেটুকু সেন্স নেই লোকটার! ঊর্মি যে ওর বন্ধু হয় এইটুকু খেয়ালও নেই ওর! কে জানে ঊর্মি কি ভাবছে? পায়ে পায়ে ড্রইংরুমে এসে সুজাতার পাশে বসে তথাগত। ঊর্মি চায়ের মিশ্রনের কাপটা এগিয়ে দিতে অবলীলায় সেটা একঢোকে শেষ করে বলে, “ হুম! নট ব্যাড! কাল রাতের মিষ্টির পর এত ভালো ডিটক্স! সত্যি কথা বলতে তোমার জবাব নেই ঊর্মি! সত্যি কাল রাতে আমরা বড্ড জ্বালিয়েছি তোমাদের। একে ওর বমি করে ভাসানো, তারপর সারারাত ধরে লতা মঙ্গেশকরের মতো রেওয়াজ করা, আমরা সত্যিই লজ্জিত! আরেকটা কাজ করবে প্লিজ? এটার রেসিপিটা আমাকে বা সুজাতাকে লিখে দেবে? না মানে আবার কোনো দিন যদি আবার এরকম মুহূর্ত তৈরী হয় তখন ব্যাকআপ হিসেবে এটা বানানো থাকবে। বেসামাল হতে দেখলেই পেগ পাল্টে দিয়ে ডিটক্সটা ধরিয়ে দেব। ” মৃদু হেসে ঊর্মি বলে,
- ডিটক্সের দরকার নেই! তোমার মতো কেয়ারিং বর থাকলেই হবে। যেভাবে কাল সামলালে ওকে সত্যি বলছি আমার এই সখীটির পতিভাগ্য অতীব ভালো।
- অথচ ও মানতে চায় না জানো?
লজ্জায় মাথা কাটা যাবার উপক্রম হয় সুজাতার। একে কাল রাতে নেশার ঝোকে কী করছে তার কোনো খেয়াল ছিল না তার উপর সুযোগ বুঝে তথাগত ইচ্ছে করে ওকে টিজ করছে... ইস! কেন যে মরতে কাল খেতে গেল ও! ঊর্মি কি ভাবছে ওর ব্যাপারে? ছিঃ! ছিঃ! তথাগতকে একা পাক একবার! ওর কপালে দুঃখ আছে। কথার প্রসঙ্গ ঘোরাতে সুজাতা জিজ্ঞেস করে, "ওর কথা বাদ দে তো! সব জায়গাতেই বাড়াবাড়ি! রজতদা কোথায়? বাইরেও দেখতে পাচ্ছি না। সেও ঘুমোচ্ছে নাকি?"
তথাগত ফুট কাটে, “ঘুমোতেই পারে! কাল রাতে যা হল! বেচারা হয়তো একফোঁটা ঘুমোতেই পারেনি!”
- আমার ঘুম এমনিতেও কম হে ভায়া! রাতে মোট চারঘন্টা কি পাঁচঘন্টা ঘুমোই। বরং ঊর্মি অনেকক্ষণ ঘুমোয়!
বলতে বলতে ঘরে ঢুকে জুতোর ফিতে খুলে সোফায় এসে বসে রজতাভ। তথাগত হেসে বলে, “ ইস! আগে বলবে তো মর্নিংওয়াকে বেরোচ্ছ! আমিও যেতাম!”
- ইচ্ছে তো ছিল! কিন্তু কাল রাতের খ্যাটনের পর ক্লান্ত হয়ে ঘুমোনোর পর সকাল সকাল রূপসী বউয়ের সঙ্গ ছেড়ে এই হার্টের রুগীর সাথে বেরোবে কিনা সেই আশঙ্কায় আর ডাকিনি।
লজ্জায় সুজাতার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। শেষমেশ রজতদাও এ নিয়ে ইয়ার্কি মারছে! মনে মনে কান ধরে সুজাতা। আর জীবনেও ওয়াইন তো দুরস্থ অ্যালকোহলও ছোঁবে না সে! সুজাতার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে ঊর্মি বলে ওঠে ,“ আচ্ছা হয়েছে! এবার থামো তোমরা! একে মেয়েটা কাল রাতের কাণ্ডের পর লজ্জায় মিশে যাচ্ছে তার উপর তোমরা ওকে আরো লজ্জায় ফেলে দিচ্ছো! বাদ দাও ও কথা। তা সকলেই যখন আছি তখন আজকের ট্যুরের প্ল্যানটা করে নেওয়া যাক!”
*****
নদীর ধারের পাথরের চাইয়ের উপর বসে হাতের মোজাটা খুলে জলে আঙুল ডোবালো সুজাতা। বরফের মতো শীতল কনকনে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে প্রথম সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠলেও পরক্ষণে কনকনে ভাবটা সয়ে এলো আর সুজাতা অনুভব করতে লাগল জলের আলগা স্রোতটাকে। গতবছর জুন মাসে ওরা কাশ্মীরে গিয়েছিল। সেবারই নৌকোবিহারের প্রেমে পড়ে সে। ডাল লেকে নৌকোতে ঘোরার সময় ইচ্ছে থাকলেও হাত ডোবাতে পারেনি সে। সেই সাধ মেটাতে একবছর পর আজ তিরতির করে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর স্রোতে হাত ডুবিয়ে চোখ বুঁজে একটা আরাম অনুভব করল সে। অবশ্য বেশীক্ষণ এই সুখ সহ্য হল না সুজাতার। ঊর্মির তারস্বরে ডাকাডাকিতে বাধ্য হয়ে ফিরে এসে ঊর্মির পাশে বসল সে।
জায়গাটার নাম আগেও শুনেছে সে। ভীষণ অদ্ভুত আর মিষ্টি একটা নাম, কালীঝোড়া। এই জায়গাটা মানে নদীর এই তীরটা পিকনিক স্পট বলেই পরিচিত। শুধু ওরাই নয় আরো অনেক পর্যটক এসে ভীড় করেছে এখানে। বেলা দশটা বাজলেও জায়গাটা লোকের ভীড়ে সরগরম। আশেপাশে পাথরের উপর বসে অনেকে সেরে নিচ্ছে প্রাতরাশ। কেউ কেউ গাড়ি থেকে বাসনপত্র বের করে রান্নার তোড়জোর শুরু করে দিয়েছে। কিছু লোক দুরে গিয়ে ছিপ হাতে বসে পড়েছে। কাছেই একটা দল বসেছে। ছজনের একটা গ্রুপ, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সকলেই কলেজপড়ুয়া। খাবার পালা শেষ করে গিটার, ড্রাম নিয়ে চারজন গানের আসর বসিয়েছে। মাঝে মাঝে গানের দু-একটা কলি ভেসে আসছে। গানগুলো বেশিরভাগ বাংলা ব্যান্ডের গান। বেশীরভাগই ‘ফসিল’, ‘ক্যাকটাস’, ‘মহিনের ঘোড়াগুলি’র গানগুলো ঘুরেফিরে গাইছে ছেলে-মেয়েগুলো। ঊর্মির সাথে বসে ছেলেগুলোর গান শুনতে লাগলো সুজাতা। ডিম সেদ্ধ আর স্যান্ডউইচ প্লেটে করে এগিয়ে দিল তথাগতদের দিকে। তথাগতদের মনও তখন ছেলেমেয়েগুলোর দিকে চলে গেছে। খাবার পালা শেষ করে ক্যামেরাহাতে ওরাও জুড়ে গেছে ওদের সাথে। হাতছানি দিয়ে ডাকছে সুজাতাদেরও।
সুজাতা যেতে চাইলেও বাধ সেধেছে ঊর্মি, বিড়বিড় করে বলছে, “ কোনো দরকার নেই! একে নতুন জায়গা, তার উপর অজানা অচেনা ছেলে-মেয়েগুলো। চুপচাপ বসে থাক! পিকনিক সেরে দুপুরের মধ্যে বেরোলে সন্ধ্যে সন্ধ্যে ফিরতে পারবো। রজতকে বলে লাভ নেই। ওখানে থেকে ওকে নড়ানো অসাধ্য। তারচেয়ে বরং তুই তোর বরকে ডাক। ” ফিক করে হেসে সুজাতা বলে,
- হুম, তারপর তিনজনে বসে ঐ মনাস্ট্রির সাধুদের মতো ধ্যানে বসি। ওম মণিপদ্মে হুং।
- ঠাট্টা করছিস?
- করবো না? পিকনিকে লোকে মজা করতে আনন্দ করতে আসে। চুপচাপ বসে কী করবে? লুডো খেলবে? তুইও যেমন! নতুন জায়গায় নতুন মানুষের সাথে না মিশলে, তাদের সাথে দেখা না করলে মজা কোথায়? আর ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখ! কি সুন্দর গাইছে! মনে আছে? সেবার বসন্তোৎসবে শান্তিনিকেতনে পিকনিকে আমরা গিয়েছিলাম? তুই, আমি, চৈতি, সাথী। সাথীটা কি সুন্দর নাচতো। সেবার পিকনিকে আমরা ‘ আয় তবে সহচরী’ গাইলাম, চৈতি আর সাথী নাচলো মনে নেই।
- ওসব দিন আর নেই! চলে গেছে। বিয়ের পর ওসব আর আমাদের মানায় না।
- তো কি মানায় শুনি? সারাদিন রান্নাঘরে রান্নাবান্না, কাজের লোকের সাথে কূটকচালি, আর রাতে খাবার পর বরের সাথে ইয়ে? তা তো বছরে ৩৬৫ দিনই করি আমরা। মাঝেমধ্যে স্বাদবদলের জন্য একটু বাধনছাড়া, একটু বেলাগাম হতে ক্ষতি কি? আগে তো এত গোঁড়া ছিলি না তুই!
- ক্ষতি নেই? বেলাগাম হলেই তো যত ক্ষতি! বেলাগাম হলেই ঘোড়া হোক বা মন অবাধ্য হয়ে ওঠে।
- তা উঠুক না! মনকে তো সারাজীবন চাবুক মেরে চুপ করিয়ে রাখি আমরা। কষ্ট পেলেও মুখ ফুটে বলি না। কটা দিন যদি অবাধ্য হয় হোক! মন এটা কোনো বুনো ঘোড়া নয় যে পালিয়ে যাবে। একসময় দাপাদাপি করে ক্ষতবিক্ষত হয়ে নিজে ফিরে আসবে তোর কাছে।
- আর মনের মানুষটাই যদি অবাধ্য হয়ে ওঠে?
- মানে?
- ধুস কি ভাবে বোঝাই? ঐ ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখ। ওদের বেশভুষা কেমন যেন হিপিদের মতো। কোথা থেকে এসেছে কে জানে? সাথে কোনো গার্জেনও নেই। তার উপর ঐ যে ফরসা করে মেয়েটা, ঐ যে সিগারেট খাচ্ছে। কী বাজে দেখতে লাগছে বল।
- তো? কী বলতে চাইছিস বুঝতে পারছি না। সিগারেট খাওয়াটা খারাপ জানি। তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য। এতে বাজে দেখার কী আছে?
- আরে অন্ধ! দেখতে পারছিস না মেয়েটা তথাগতদের সাথে ঢলাঢলি করছে! বাজে মেয়েছেলে একটা! দেখেই মনে হচ্ছে ছেলে ঢলানি মেয়ে। এসব মেয়েদের পাল্লায় পড়লে সংসার ভেসে যায়! তুই তাড়াতাড়ি তথাগতকে ডাক। তোর রজতদার ব্যবস্থা আমি করছি। এতদিন তো বিয়ে হলো এটাও বলে দিতে হবে? স্বামীকে ধরে রাখতে শেখ! অন্য জায়গায় যেতে দিবি না!
- বুঝলাম! তোর মাথাটা পুরো গেছে! তোকে মাথার ডাক্তার দেখাতে হবে। মেয়েটাকে দেখ! হ্যা ডেঁপো মেয়ে বলা যেতে পারে কিন্তু আসলে তো বাচ্চা মেয়ে! আঠেরো- উনিশ হবে বয়স! ও ভোলাবে বুড়ো দুটোকে?
- সুজাতা তুই বুঝতে পারছিস না।
- ধুস! সবসময় পাড়ার কাকিমাদের মতো খিটখিট করিস না তো! বেড়াতে এসে এটুকু আনন্দও করবো না? তাহলে এলাম কেন? বাড়িতেই থাকতে পারতাম! আচ্ছা বেশ! এতই যখন হারানোর ভয় তখন চল একসাথে গিয়ে নিয়ে আসি ওদের।
- না আমি যাবো না!
- কেন?
- ওখানে কতগুলো ছেলে বসে আছে না? অতোগুলো ছেলের সামনে আমি যাবো? আশেপাশে এত লোক আছে। ওরা কি বলবে?
ঊর্মির কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায় সুজাতা তারপর হো হো করে হেসে বলে, “ব্যস? দম ফুড়ুত? এই সাহসে স্বামীকে ধরে রাখবি? স্বামীকে বাঁচাতে সাবিত্রী যমরাজের দরবারে ঢুকে গিয়েছিল। আর তুই সামান্য কটা বাচ্চা ছেলেকে ভয় পাচ্ছিস? না রজতদা ঠিকই বলে! তুই দিন দিন টিপিক্যাল কাকিমা হয়ে যাচ্ছিস!তবে তুই থাক আমি যাচ্ছি!”
বলে ঊর্মিকে রেখে তথাগতদের দিকে এগিয়ে যায় সুজাতা। তথাগত সুজাতার সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর রজতাভ ফিরে এসে একরকম জোর করে টেনে নিয়ে আসে ঊর্মিকে। প্রথম প্রথম আড়ষ্ট থাকলেও পরে ঊর্মিও সহজ হতে শুরু করে। গানের আসর শুরু হয় আবার। তবে এবার রজতাভ গান ধরে,
- ভালোবাসি জ্যোৎস্নায় কাশ বনে ছুটতে/ছায়া ঘেরা মেঠো পথে ভালোবাসি হাঁটতে।
দূর পাহাড়ের গায়ে গোধূলীর আলো মেখে/ কাছে ডাকে ধান খেত সবুজ দিগন্তে।
তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগে না কেন/উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেন
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।
ছেলে-মেয়েগুলো গানের তালে তালে গিটার, ড্রাম বাজাতে থাকে। সুজাতা রজতাভর সুরে সুর মিলিয়ে গেয়ে ওঠে,
- ভালো লাগে ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে ভাসতে/প্রজাপতি বুনো হাঁস ভালো লাগে দেখতে।
জানলার কোণে বসে উদাসী বিকেল দেখে/ভালোবাসি এক মনে কবিতা পড়তে।
তবুও কিছুই যেন ভালো যে লাগে না কেন/উদাসী পথের মাঝে মন পড়ে থাকে যেন,
কোথায় রয়েছে ভাবি লুকিয়ে বিষাদ তবুও।
এরপর সকলে একসাথে কোরাসে গেয়ে ওঠে,
- যখন… দেখি ওরা কাজ করে গ্রামে বন্দরে/ শুধুই.. ফসল ফলায় ঘাম ঝরায় মাঠে প্রান্তরে।
তখন.. ভালোলাগে না, লাগে না কোন কিছুই
সুদিন.. কাছে এসো,
ভালোবাসি একসাথে এই সব কিছুই।
ওদের গানের তালে আশেপাশে উপস্থিত সকলে একে একে যোগ দেয়। একসময় আশেপাশের চার-পাঁচটা দল একটা দলে পরিণত হয়। মেয়েরা একসাথে সকলের দুপুরের খাবারের আয়োজন করে। ছেলেরা নাচে-গানে, খেলায় জমিয়ে দেয় পিকনিক স্পটটাকে। খাবার তৈরী হলে পাত পেড়ে বসে পড়ে সকলে।
ফেরার পথে গাড়িতে লুকিং মিররে তাকায় রজতাভ। দেখে তথাগতর কাঁধে মাথা রেখে ক্লান্ত সুজাতা ঘুমিয়ে পড়েছে। তথাগতর অবস্থাও তাই। পাশ ফিরে দেখে ঊর্মি জানলার দিকে মুখ করে বসে। একদৃষ্টে সে চেয়ে আছে খাঁদের দিকে। রজতাভ সামনের রাস্তায় মনোযোগ দেয়। আর কিছুক্ষণ ঊর্মির দিকে তাকালে সে দেখতে পেত ঊর্মির চোখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে অশ্রুধারা। সে অশ্রু অনুতাপের। যে মেয়েটাকে নিয়ে সুজাতার কাছে নিন্দে করছিল সে, পরে রজতাভর কাছে জানতে পেরেছে মেয়েটা সদ্য মাকে হারিয়ে ক্রমশ অবসাদে ভুগে নিজেকে শেষ করে ফেলছিল। মেয়েটা শোক দূর করতে, আর মন ভালো করতেই ওর বন্ধুবান্ধবরা ওকে নিয়ে এসেছে। সত্যি মেয়েটার ব্যাপারে না জেনে কত কথাই না বলেছে সে। দুপুরে মাংসের এক্সট্রা পিস দেওয়ায় কি খুশি হয়েছিল মেয়েটা! মিষ্টি করে হেসে থ্যাঙ্ক ইউ বলেছিল। এরকম একটা মিষ্টি মেয়ে পাওয়ার ইচ্ছে ঊর্মির চিরকালের। কিন্তু বিয়ের চার বছর পরেও আজও ওরা সন্তানহীন। অথচ ওদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই!
আছে কি? তা আছে! রজতাভ যতবার এগিয়ে এসেছে, ততবার ওকে সরিয়ে দিয়েছে। যতবার আদর করতে চেয়েছে ততবার ওকে শরীর খারাপের কথা বলে থামিয়েছে। অবশেষে হাজার মান-অভিমানের পর একবারই মিলিত হয়েছিল ওরা। তারপর তো... হার্ট অ্যাটাকের পর রজতাভ আর মিলিত হয় নি। বলাবাহুল্য ওই মিলিত হতে দেয়নি। কেন জানে না ওর মনে একটা ধারনা বদ্ধমূল হয়েছে যে ওর সাথে মিলিত হলে রজতাভ আর বাঁচবে না। এই ভয়ে সে আর মিলিত হয় নি। সেদিনের পর থেকে আজকাল রজতাভকে হারানোর একটা ভয় প্রায়ই ওকে কুড়ে কুড়ে খায়। অথচ ওরও ইচ্ছে করে রজতাভ ওকে ভালবাসুক, বেলাগাম আদর করুক। শরীরে, মনে কানায় কানায় সুখের আদরে ভরে তৃপ্ত করুক। কিন্তু ওকে হারানোর ভয়ে কাছে আসতে দেয় না।
সুজাতা বলেছিল মাঝে মাঝে বেলাগাম হলে দোষ নেই। কিন্তু বেলাগাম হতে গিয়ে মানুষটা কে চিরতরে হারিয়ে ফেললে যে ও শেষ হয়ে যাবে! কাজেই চাইলেও মনকে প্রশ্রয় দেয় না ও। শরীরে দাবানল জ্বলে উঠলেও পাত্তা দেয় না ও।
(চলবে...)