অনুসরণকারী

সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

কৃষ্ণচূড়ার ছায়া



পার্কের সামনে বাইকটা দাঁড় করাল অনিরুদ্ধ। চারদিকে একঝলক তাকিয়ে তারপর বাইকটা লক করে শিষ দিতে দিতে পার্কের ভেতরে ঢুকলো সে। এ জায়গাটা এমনিতে ভীষণ নিরিবিলি। এদিক দিয়ে প্রায় যাতায়াত করলেও কোনোদিন এই পার্কে আসেনি সে। আজ হঠাৎ ঊষার ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি চলে এলো। একদিক দিয়ে মন্দের ভালো যে এই জায়গায় দেখা করলে ওদের বাড়ির কেউ জানতে পারবে না। নাহলে দুজনের বাড়িতেই দুজনকে ইতিমধ্যে সন্দেহ করা শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে ঊষার বাড়িতে তো রীতিমতো কড়াকড়ি পড়ে গেছে। ওর বাড়ির লোকেরা এখনই ওর জন্য ছেলে দেখা শুরু করে দিয়েছে। ওদের সাফ কথা,‘অনেক পড়াশুনো হলো। এবার মানে মানে বিয়ের পিড়িতে বসে পড়ো। বিয়ের পর যদি শ্বশুরবাড়ি চায় তাহলে পড়াশোনা চালাতে পারবে।’

একই কেস অনিরুদ্ধর বাড়িতেও। তবে তার বাবা বিয়ের পিড়িতে বসাতে চাইছেন না। বরং তিনি চাইছেন ছেলে পড়ালেখার পাঠ তুলে দিয়ে এবার পৈত্রিক ব্যবসায় বসুক। তার বক্তব্য, ‘আমার ঠাকুর্দা পাঠশালা পর্যন্ত গিয়েছিলেন। আমার বাবা ম্যাট্রিক ফেল। আমি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনবছর ধ্যারিয়ে ক্ষ্যামা দিয়েছি। আর তোর দাদা বি.এ পরীক্ষায় সাপ্লি পেয়ে কলেজের পথ ছেড়েছে। সে তুলনায় তো তুই অনেকদুর পড়েছিস। একেবারে বি.কম ফার্স্টক্লাস করে চার্টাড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পড়ছিস। কিন্তু আর না বাপ আমার। এবার থামো! একা তুমি যদি সব পড়া করে নাও তাহলে আমার বংশধররা কি পড়বে? কাজেই কলেজের গলি ছেড়ে বাপের গদি আলো করে বসো চাঁদ। পড়াশোনায় তোমার পেছনে যত খরচ হয়েছে তার দ্বিগুণ উসুল করে দাও দেখি। পড়াশোনার বাকি পথটা না হয় বংশধরদের জন্যই তোলা থাক। ’

সংসারে বাবার কথাই শেষ কথা। কেউ তার উপর উচ্চবাচ্য করতে পারে না। শুধু ঠাকুমা ছাড়া। অনিরুদ্ধকে ওর ঠাকুমা ভীষণ ভালোবাসেন। বলা যায় অনিরুদ্ধ যে কলেজে পড়াশোনা করছে তার মূল কারন ওর ঠাকুমা। ঠাকুমার আশকারাতেই সে প্রতিবার বাবার কাছ থেকে রক্ষা পায়। যতবার অনিরুদ্ধকে ওর বাবা ব্যবসায় বসতে বলেছেন ততবার মা বিপত্তারিনীরূপে ওর ঠাকুমা এসে ওকে বাঁচিয়ে বলেছেন, ‘আহা একটু থাম দিকিনি খোকা! দাদুভাই আমার ছেলেমানুষ।ও ব্যবসার কি বোঝে? তাছাড়া তুই এতও অথর্ব কিছু হোস নি যে ব্যবসা ছেড়ে আসতে হবে। তোর বাবা, পড়াশোনা ছাড়ার পর আজীবন ব্যবসা সামলেছেন। তোদের বিন্দুমাত্র সাহায্য নেননি। তিনি যাবার পর সেনগুপ্ত কোম্পানীর দায়িত্ব তোদের কাঁধে পড়েছে। তেমনই দাদুভাই বড়ো হোক সব বুঝতে শিখুক তারপর না হয় তোদের সাথে ব্যবসার হাল ধরবে। তাছাড়া আমার বড়োদাদুভাই তো আছেই তোর সাহায্য করার জন্য। ও নাহয় ক’দিন পরেই ঢুকবে। তাছাড়া এই বয়সটা কি দোকানে বসে হিসেবের খাতা দেখার বয়স? অতো খিটখিট করিস না তো বাপু!’

অবশ্য অনিরুদ্ধর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই পৈত্রিক ব্যবসায় বসার। সে পড়াশুনো শেষ করে চাকরী করতে চায়। কিন্তু এই কথাটা আজ পর্যন্ত মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে। তলে তলে সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বটে। কিন্তু মন্দার এই বাজারে চাকরীর আকাল যে কতটা তা পাঠকমাত্রেই জানেন। তাই আপাতত সে কাঠবেকার হয়ে বাইকারোহণ করে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। আর প্রাণপণে চেষ্টা করছে একটা চাকরী পেতে। যাকগে আপাতত এই গুরুগম্ভীর বিষয়ে আলোচনা না করে আমরা আপাতত দেখে নিই যে মে মাসের এই পচা গরমে আমাদের গল্পের নায়ক অনিরুদ্ধকে ঠিক কোন কারনে আমাদের গল্পের নায়িকা ঊষা ডেকে পাঠালো।

তবে তার আগে ঊষার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কেও পাঠককে একবার অবগত করানো দরকার। অনিরুদ্ধ যতটা বড়োলোক বাড়ির ছেলে ঊষা ঠিক ততটাই মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়ে। বাবা পোস্টঅফিসে পোস্টমাস্টার ছিলেন। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। মা গৃহবধূ। একমাত্র ছোটো বোন নিশা সদ্য কলেজে উঠেছে। বাড়িতে লোক বলতে সাকুল্যে চারজন। বাবার পেনশনে আর ঊষা আর নিশার টিউশনির টাকায় কোনোমতে সংসার চলে। তবে একটা জিনিস ওদের পরিবারে ভীষণভাবে বিরাজমান, সেটা হলো শান্তি। এদের পরিবারে যতই ঝড়ঝাপটা আসুক না কেন কেউ কোনোদিন এদের মুখের হাসি মিলিয়ে যেতে দেখেনি। সবসময় হাসিমুখে জীবনের সব কষ্ট মেনে নিয়ে চলছে এরা।

এবার আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে এই অতি সাধারণ মেয়ের সাথে আমাদের হিরোর প্রেম হলো কিভাবে? আলাপই বা হলো কি করে? উত্তরটা হলো কলেজ। অনিরুদ্ধ ঊষার থেকে একবছর সিনিয়ার। অনিরুদ্ধ যে কলেজে পড়ত সেই কলেজে আমাদের ঊষাও স্কলারশিপে চান্স পেয়েছিলো। প্রথমদিন ক্লাসে যেতে গিয়ে অনিরুদ্ধদের ব্যাচের খপ্পরে পড়ে ঊষারা। কিন্তু বুদ্ধির জোরে শেষে ওদেরকেই ঘোল খাইয়ে দিয়েছিলো ঊষা। তারপর যা হয়, রোজ ক্লাসে যাবার সময় করিডোরে দেখা, ক্যান্টিনে খাওয়া, ক্লাস না থাকলে আড্ডা দেওয়া, লাইব্রেরীর বই এক্সচেঞ্জ করে পড়া। ঊষা ধীরে ধীরে ওদের দলে মিশে গেল, এবং একবছর কেটে যাবার পর অনিরুদ্ধ আবিস্কার করল সে এই সাধারণ মেয়েটার প্রেমে পড়েছে। শুধু তাই নয় ঊষাও অনিরুদ্ধর প্রতি হাল্কা হলেও অনুরক্ত। কিন্তু বলতে পারছে না। সেও বা বলবে কি করে? সময় বা সুযোগই তো পাচ্ছে না সে। কারন সামনেই সেমিস্টারের পরীক্ষা। সকলেই ব্যস্ত। ঊষাও ক’দিন কলেজে ডুব মেরে পড়ছে বাড়িতে। অনিরুদ্ধ ঠিক করল শেষ পরীক্ষার দিন সে ঊষাকে প্রপোজ করবে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। শেষ পরীক্ষার দিন পরীক্ষা শেষ হবার পর সকলে ক্যান্টিনে বসে আছে। ক’দিন পর পুজো তাই সকলের মনে একটা আনন্দের রেশ লেগে রয়েছে। সকলে প্ল্যান করছে পুজোর কটাদিন কে কিভাবে কাটাবে। ব্যাতিক্রম ঊষা, সে ক্যান্টিনের এককোণে চুপচাপ বসে আছে। আসলে অনিরুদ্ধদের ব্যাচের সাথে সে মিশে গেলেও কোথাও যেন একটা তাল মেলাতে পারে না। এদের পোশাক, জীবনযাপনের সাথে ওর জীবনের আকাশপাতাল ফারাক। এরা ক্যান্টিনে একদিনে যা খরচ করে সেই টাকাটা ঊষা চারবাড়ি টিউশনি করেও উপার্জন করতে পারে না। এরা যে খাবার খায়। সেই খাবার খাওয়া তো দুরস্থ কেনার কথাও ভাবতে পারে না সে। ঊষার কপালে তখন একগাদা চিন্তা ঘোরাফেরা করছে। পরীক্ষার জন্যে দুটো টিউশনি ছেড়েছে সে। দুটো থেকে যে উপার্জন হতো সেই টাকায় কলেজের রাহাখরচটা উঠে যেত তার। কিন্তু এখন তার সেই সম্বলটাও গেছে। এখন কি করবে সে? বছরের এইসময় টিউশনি পাবে কোথা থেকে? কে দেবে তাকে? এই সবই ভাবছিলো সে এমন সময় পাশ থেকে একটা মৃদু পুরুষকন্ঠে ঘোর কাটলো তার।

“কিরে কি ভাবছিস? পেপার ভালো যায়নি বুঝি?”

চমক কেটে গিয়ে ঊষা দেখলো পাশে অনিরুদ্ধ বসে আছে। সে হেসে বলল, “ নাগো পরীক্ষা ভালোই হয়েছে। ডি.জি স্যারের নোট ভীষণভাবে হেল্প করেছে। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। আমার কথা বাদ দাও তোমার পেপার কেমন গেল?”

“আর কেমন যাবে? প্রতিটা সেমে যেমন যায় তেমনই গেল। এবারও সাপ্লি পাবো নির্ঘাত। জানিসই তো সারা সেমেস্টারে যা টোটো করে ঘুরে বেড়াই পড়াশোনা হবে কি করে?”

“ইহ! কি মিথ্যুক রে বাবা! তুমি আর সাপ্লি? হতেই পারে না। মানছি গোটা সেমেস্টারে তুমি তোমার পক্ষিরাজে সওয়ার হয়ে সেঁজুতিদিদের সাথে ঘুরে বেড়াও কিন্তু পরীক্ষার সময় তুমি একদম সিরিয়াস। কাজেই ওসব ঢপ অন্য কাউকে দিও। ”

“নারে সত্যি বলছি এবারের সেমে অতোটা মন বসাতে পারিনি। ”

“বললেই হলো? তা কিসে মন আটকে ছিলো শুনি? কাজলদি? সেঁজুতিদি না নয়নাদি?”

“এই মেয়ে! তুই কিন্তু ভুলে যাচ্ছিস আমি তোর সিনিয়ার। সে হিসেবে তোর আমাকে সম্মান দেওয়া উচিত! ”

“কাঁচকলা! তোমার মতো সিনিয়ারকে সম্মান দিতে আমার বয়েই গেছে!” বলে ফিক করে হাসে ঊষা।

“বটে! আচ্ছা দেখাচ্ছি মজা! এই স্নেহা, কাজল ,সেঁজুতি, দেবাশিস এসে শুনে যা তোদের আদরের জুনিয়ার জিনিয়াস কি বলছে!” বলে চিৎকার করে নিজের দলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে ডাকে অনিরুদ্ধ।

“এই এই কি হচ্ছেটা কি? এরকম হল্লা করছো কেন?” ছদ্মরাগে ভ্রু কুঁচকে বলে ঊষা।

“যা বাব্বা! ক্যান্টিনে চ্যাঁচাবো না তো কোথায় চ্যাঁচাবো?” 

“উফ! এত বকো কেন তুমি বলো তো?”

“তুইই বা এত কি ভাবিস বলতো?”

“সে তুমি বুঝবেনা। নিম্ন মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েদের হাজারটা চিন্তা থাকে। তোমাদের মতো আরামের জীবন নাকি যে উঠলো বাই তো মন্দারমণি যাই। ”

“আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। সরি টু ডিস্টার্ব ইউ। তা সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েছে? নাকি উপোষ করেই পরীক্ষা দিতে আসা হয়েছে?”

“আমার খিদে পায়নি অনিরুদ্ধদা। তোমার খিদে পেলে খেয়ে নাও।” 

“সে খেতেই পারি। কিন্তু আমার সাথে বসে থাকা মানুষটা হা করে তাকিয়ে থাকবে আর আমি গোঁৎ গোঁৎ করে গিলবো তা হবে না। শেষে আমার পেটখারাপ হলে কে দায় নেবে?”

“উফ! কি বলতে এসেছো বলো না!”

“বলছি বলছি আগে কিছু মুখে তুলে নিই। সেই সকালবেলা বেরিয়েছি। দাঁড়া, হরিদা দুটো ডিমটোস্ট। আর দুটো চা। আমার খাতায় লিখে নাও।”

“বললাম তো খিদে নেই আমার।”

“আমার আছে। চুপ করে বসে থাক।”

টোস্ট আর চা আসার পরে কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলো ঊষা, তারপর খেতে শুরু করেছে। ওর খাওয়া দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটা সকাল থেকে কিছু খায়নি। অনিরুদ্ধ খাওয়া থামিয়ে দেখতে লাগলো ঊষাকে। তারপর খেতে খেতে বলল, “তারপর? পরীক্ষা তো শেষ আর পুজো তো এসেই গেলো। পুজোতে কি প্ল্যান?” 

ঊষার ডিমটোস্ট খাওয়া শেষ করে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “আমার আবার প্ল্যান? ঐ পুজোর চারদিন পাড়ার পুজোমন্ডপে মায়ের সাথে থাকবো। ”

“ব্যাস? আর কোনো প্ল্যান নেই? কলকাতার পুজো দেখবি না ? ”

“নাগো! এবার আর হবে না। আসলে বাবার প্রেশারটা বেড়েছে। তার উপর মহালয়ার দিন ঠান্ডা জলে স্নান করে সর্দিও বাঁধিয়েছে। তাই এবার আর বেরোবো না।”

এদিকে অনিরুদ্ধর মনে একটা দোলাচলের সৃষ্টি হয়েছে। সে বলবে কি বলবে না? বললে যদি মেয়েটা রাজি না হয় তাহলে কি হবে? মেয়েটা যদি তাকে লম্পট ভেবে বসে? একটু আগেই কাজলদের নিয়ে যেভাবে খোঁটা দিলো। এতদিনের একটা মিষ্টি সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। কাজে বলবে কি বলবে না ভাবতে ভাবতে শেষমেশ বলেই ফেলবে ভেবে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অনিরুদ্ধ বলে উঠল, “ঊষা!”

“বলো অনিরুদ্ধদা।” বলে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাগজের গ্লাসটা টেবিলে রেখে অনিরুদ্ধর দিকে তাকায় ঊষা।”

“তোর সাথে একটা কথা ছিলো।”

“জানি কি বলবে আমাকে। কিন্তু তা সম্ভব নয়।”

মুহূর্তের মধ্যে সবটা গুলিয়ে গেল অনিরুদ্ধর। আচমকা ঊষার মুখে এই কথা শুনে বিষম খেয়ে গেলো অনিরুদ্ধ। ঊষা জলের জগটা এগিয়ে দিতেই সেটা থেকে অল্প জল খেয়ে কোনোমতে নিজেকে সামলে বলল, “জানিস মানে? ক্কি কি জানিস তুই?”

“যেটা বলতে এসেছো। কিন্তু তা সম্ভব নয় অনিরুদ্ধদা।” বলে নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঊষা। পেছন পেছন বেরিয়ে আসে অনিরুদ্ধ। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে বলে, “ঊষা দাঁড়া। যাবি না বলছি। দাঁড়া।” বলে এগিয়ে গিয়ে করিডোরে ঊষার হাতটা ধরে অনিরুদ্ধ। ঊষা পেছন না ফিরেই বলে, “হাতটা ছাড়ো অনিরুদ্ধদা। সবাই দেখছে। একটা বিচ্ছিরি কান্ড ঘটে যাবে। প্লিজ হাতটা ছাড়ো। ” অনিরুদ্ধ সোজা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, “ না ছাড়বো না। আগে বল কি সম্ভব নয়? আর আমি যা বলতে এসেছি তা তুই জানলি কি করে? একবার আমার দিকে ফিরে তাকা। তাকা দেখি? মাই গড ঊষা! তার মানে তুইও!”

কথায় কাজ হয়। ঊষা ফিরে তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ দেখে ঊষার চোখের কোল বেয়ে জল প্রায় বেরোবো বেরোবো করছে। কোনো ক্রমে কান্না চেপে রয়েছে মেয়েটা। অনিরুদ্ধ হাতটা ছেড়ে দেয়। তারপর অস্ফুটে বলে, “বাধাটা কোথায় বলতে পারিস। আমার জীবনযাত্রায়, চরিত্রে, চাকচিক্যে, বংশগরিমায় না আর্থিক দিক থেকে?”

ঊষা নীরবভাবে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। অনিরুদ্ধ হেসে বলে , “বল না! আমাদের সম্পর্ক সম্ভব নয় কেন?” 

ঊষা মাথা নত করেই বলতে থাকে, “আমার পরিবার ভীষণ সাধারণ পরিবার অনিরুদ্ধদা। তোমাদের মতো অতো জাকজমক, চাকচিক্যে ভরা জীবন নয় আমার। তোমাদের সমাজে আমি বড়ো বেমানান। তোমার বাবা একজন সফল ব্যবসায়ী। আর আমার বাবা একজন রিটায়ার্ড পোস্টমাস্টার। তোমাদের একদিনে যা হাতখরচ আমার কাছে তা গোটা বছরের মাইনে। এককথায় আমাদের সম্পর্ক যদিও হয় তাহলেও বেশিদিন টিকবে না। মাঝখান থেকে আমার জীবন কেরিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। তোমরা ডোনেশন দিয়ে এই কলেজে ভর্তি হয়েছো। কিন্তু আমাকে রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমান করে স্কলারশিপ নিতে হয়েছে। আমি এখানে তোমাদের মতো সময় কাটাতে আসিনি অনিরুদ্ধদা! তুমি ক’দিন পর তোমার বাবার ব্যবসায় বসবে। তাই তোমার কোনোচিন্তা নেই কিন্তু আমার আছে। আমি এখানে ক্যান্টিনে হইহই করতে, কলেজে বেড়াতে আসিনি। আমি এখানে পড়তে এসেছি। আমার স্বপ্ন ভালো করে পড়াশোনা করে একটা ভালো চাকরি করে আমার পরিবারকে দেখা। এখন যদি আমি তোমার সাথে জড়িয়ে যাই। লোকে নানারকম কথা বলবে। বলবে বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়িয়েছি, বড়োলোক ছেলের মাথা চিবিয়েছি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, আরো অনেক কথা যা একটা মেয়ে হয়ে আমাকে শুনতে হবে যা মুখে বলতেও আমার রুচিতে বাঁধছে। কিন্তু তুমি ছেলে বলে পার পেয়ে যাবে। তুমি বড়োলোকের স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, ড্যাশিং ছেলে। আজ আমায় ভালো লেগেছে। কাল অন্য কাউকে ভালোবাসবে। কারন এটা তোমার কাছে নর্মাল কিন্তু আমার কাছে নয়। আমি রয়ে যাবো কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে। আর রইলো আমাদের সম্পর্ক সেটা কারোপক্ষেই ভালো হবে না। আমাদের মানসিকতার বিস্তর তফাৎ। আজ নয় কাল আমাদের মধ্যে মানসিকতা নিয়ে মতান্তর লাগতে বাধ্য। কাজেই এমন একটা সম্পর্ক যার কোনো ভবিষ্যত নেই সেই সম্পর্কটা তেঁতো হবার আগে আমাদের এখানেই থেমে যাওয়া ভালো। কারন আমি চাই না এ বিষয়ে কোনোরকম স্ক্যান্ডাল হোক। তার চেয়ে আমরা বন্ধু আছি এটাই বেশ ভালো অনিরুদ্ধদা। ”

অনিরুদ্ধ একদৃষ্টে ঊষার দিকে তাকিয়ে থাকে। ঊষা চোখ মুছে বলে , “আজকের পর কোনোদিনও এভাবে আমাকে আটকানোর চেষ্টা কোরো না। না হলে আমি বাধ্য হবো ভিসিকে জানাতে।” বলে এগিয়ে যায় সামনের গেটের দিকে। অনিরুদ্ধ পেছন থেকে দেখতে থাকে ঊষার চলে যাওয়াটা।

তারপর কেটে গেছে তিনমাস। অনিরুদ্ধ আর ঊষার কাছে এগিয়ে যায়নি। ঊষাও দুরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে অনিরুদ্ধদের সাথে। এছাড়া বাকি সব একই ছন্দে চলছে। প্রতিবারের মতো কলেজ এবারও সেজে উঠেছে শুক্লাপঞ্চমী তিথির আনন্দে। ক্যাম্পাসের এককোণে বড়ো সুদৃশ্য প্যান্ডেল তৈরী করা হয়েছে। সকাল সকাল হোস্টেলের আর কলেজের স্টাফেরা সকলে বাগদেবীর আরাধনায় মগ্ন। সে বছরটাই অনিরুদ্ধদের বি.কম ব্যাচের শেষ বছর। কাজেই আর্টস, আর সায়েন্স স্ট্রীমের ফাইনাল ইয়ার ব্যাচের সাথে ওরা তাল মিলিয়ে কাজ করে চলেছে। তবে সবাই যে কাজ করছে তা নয়। বেশ কয়েকজন একটু থেকেই ফাঁকতালে নিজের নিজের প্রেমিকাকে নিয়ে কেটে পড়েছে। সরস্বতী পুজোর দিনে কোন প্রেমিকজোড়া প্রেম না করে পুজোর কাজে হাত লাগায় বলুন তো? 

আমাদের অনিরুদ্ধও কিছুক্ষণ থেকে বেরিয়ে পড়েছে। তবে তার সাথে সওয়ারী কেউ নেই। সে একাই বাইকে সওয়ার হয়ে চলেছে। কোনো গন্তব্য নেই, কোথাও থামা নেই যেদিকে দুচোখ যায় আর বাইকে যতক্ষণ পেট্রোল আছে ততক্ষণ সোজা চলতে থাকো। বাইক হাতে পাওয়ার পর থেকে এই একটা বরাবরের নেশা অনিরুদ্ধর। ছুটি থাকলে, মুড খারাপ হলে সে বেরিয়ে পরে বাইকের চাবি আর হেলমেট নিয়ে। কখনো কখনো কলকাতা ছাড়িয়ে শহরতলিতে কিছুক্ষনের জন্য নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সে। কখনো প্রকৃতির মাঝে নিরালায় বসে কাটিয়ে দেয় ঘন্টার পর ঘন্টা। কখনো শহরতলীর ভীড়ের আড়ালে চায়ের দোকানে, পার্কে বসে দেখে মানুষের নানারকম জীবনযাপনের অভিনয়। বেশ কয়েকঘন্টা কেটে যাবার পর সে যখন বাড়ি ফেরে ততক্ষনে তার মন, বোধ, মুড সম্পুর্ণ পাল্টে গেছে। এরকমই সেদিন সে বেরিয়েছে বাইক নিয়ে। গন্তব্য যথারীতি ঠিক করা নেই। যতদুর গাড়ি চলে, চলতে থাকো।

চলতে চলতে শহরতলিতে ঢোকার মুখে হঠাৎ তার খেয়াল হলো এইদিকেই কাছেই ঊষার বাড়ি। বাইকের গতি স্লথ করতে গিয়েও করল না অনিরুদ্ধ। কোনো দরকার নেই। সে যখন নিজেই চাইছে না সম্পর্কটা হোক তাহলে নির্লজ্জের মতো এগিয়ে কোনো লাভ নেই। এই ভেবে বাইকের গতি বাড়াল সে। কিন্তু রাস্তার সামনে একটা বাঁক পেরোতেই থমকে বাইকটা থামাতে বাধ্য হল সে।

বাঁকটা পেরোতেই গলি থেকে একটা মেয়ে আচমকা বেরিয়ে এসে থমকে দাঁড়াতেই চমকে গিয়ে বাইকের ব্রেক কষল অনিরুদ্ধ। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে, মেয়েটা বাইকের অনেকটা কাছে চলে এসেছে। অনিরুদ্ধ আর উপায় না দেখে বাইকের হ্যান্ডেল ঘুড়িয়ে দিল। বাইকটা মেয়েটাকে প্রায় ছুঁয়ে পেরিয়ে গিয়ে অনিরুদ্ধ সমেত কাত হয়ে পড়ে গিয়ে কিছুদুর ঘষটে চলে গেল। শব্দ শুনে রাস্তায় যারা ছিল সকলে ছুটে এল। মাথায় হেলমেট ছিল বলে অনিরুদ্ধর মাথাটা বেঁচে গেলেও ডানহাতটা বেশ ছড়ে গেছে। ডান পাটাও বেশ যন্ত্রণা করছে। 

কোনোমতে বাইক সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো অনিরুদ্ধ। তারপর বাইকটা স্থানীয়দের সাহায্যে তুলে একসাইডে দাঁড় করাতে গিয়ে বুঝলো ডানদিকের ইন্ডিকেটরটা গেছে। রংটাও ঘষে গেছে অনেকটা। মুহূর্তে মাথাটা গরম হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। বাইকটা তার বড়ো সাধের বাইক। বাইকটার ভীষণ যত্ন নেয় সে। অ্যাক্সিডেন্টটার জন্য দায়ী মেয়েটা। ওরকম হুট করে রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল নাহলে তো সে সোজা বেরিয়ে যেত। মেয়েটাকে কষে ধমক লাগানোর জন্য পেছন ফিরে তাকাল সে।

যাত্তারা! দেখেছেন! আসল লোকের কথাই বলিনি আমি! সেই তখন থেকে গৌরচন্দ্রিকা করে চলেছি। ওই যে মেয়েটা, যাকে দেখে থমকে গিয়ে এতকান্ড সে আর কেউ নয় আমাদের ঊষার বোন নিশা। দিদির সাথে পাড়ার পুজোয় অঞ্জলি দিতে বেরিয়েছিল, পেছনেই ছিল ঊষা। ঊষা দেখলো হাটতে হাটতে নিশা আচমকা গলির সামনের রাস্তায় থমকে দাঁড়িয়েছে। আর ওর খুব কাছ থেকে বাইকের হর্নের সাথে সাথে ব্রেক কষার শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে একটা হলুদ বিদ্যুৎশিখা নিশাকে ছুঁয়ে চলে গেল আর পরক্ষণে ভারী কিছু একটা রাস্তায় পড়ে গিয়ে ঘষটে যাবার শব্দ শুনতে পেল ঊষা। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে এল সে বোনের কাছে। সদ্য মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে আতঙ্কে তখন নিশার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। ঊষা এগিয়ে এসে বোনকে জড়িয়ে ধরল। তারপর তাকাল অ্যাক্সিডেন্টের জায়গাটার দিকে। আরোহী বাইক ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। আসেপাশের লোক জড়ো হয়েছে একটু। সকলে মিলে বাইকটাকে তুলে দাঁড় করাল। কেউ বাইক আরোহীর দোষ দেখছে, কেউ নিশার। বাইক আরোহী ওদের দিকে ধীরে ধীরে লেংচে লেংচে এগিয়ে এল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকটা বেশ জখম হয়েছে। লোকটা কাছে এসে হেলমেট খুলতেই পায়ের তলার মাটি টলে উঠলো ঊষার। এ কি! এ যে অনিরুদ্ধদা! এ কি হাল হয়েছে ওর? 

একই অবস্থা অনিরুদ্ধরও। মেয়েটাকে ধমক দেবে ভেবে এগিয়ে আসতেই ঊষাকে দেখে অবাক হয়ে গেছে সে। তারপর সে মেয়েটাকে চিনতে পেরেছে। কাছে এসে সে বলল, “ তুমি ঠিক আছো তো? লাগেনি তো?” নিশা মাথা নেড়ে জানায় তার লাগেনি। মুচকি হেসে অনিরুদ্ধ বলে, “রাস্তাঘাটে দেখে চলাফেরা করবে তো!? এখনই আমি গাড়ি না ঘোরালে কি হত বলো তো? অন্য কেউ হলে তো আর দেখতে হতো না। এরপর থেকে সাবধানে চলাফেরা করবে। ” ঊষা অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলে, “ ওর কথা ছেড়ে দিয়ে নিজের তাকাও অনিরুদ্ধদা। তোমার তো ভালোরকম ব্লিডিং হচ্ছে! পায়ের দিকে আর পাঞ্জাবীর হাতা রক্তে মেখে গেছে। ” নিজের দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। তারপর স্বভাবসিদ্ধভঙ্গিতে হেসে বলে, “ও কিছু হয়নি আমার। একটু ছড়ে গেছে। তবে বাইকটা একটু জখম হয়েছে বৈকি, ও ম্যানেজ দিয়ে নেব।” 

“ওসব ডাইলগবাজি কলেজে দেবে। দেখি, ইস কি ভীষনভাবে ছড়ে গেছে! এখনই ফার্স্টএইড করা দরকার।” বলে অনিরুদ্ধর পাঞ্জাবীর হাতা তুলে ক্ষতটা দেখে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে একজনকে দেখে বলে ঊষা, “মঙ্গলকাকা একটু তোমার দোকানটা খুলবে। এনাকে মনে হচ্ছে ফার্স্টএইড দিতে হবে। ” মঙ্গলকাকা মাথা নেড়ে এগিয়ে যান। কজন অনিরুদ্ধকে সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে আসে তার দোকানে। পেছন পেছন নিশাকে নিয়ে আসে ঊষা। ছোটোখাটো একটা ডিস্পেন্সারী মঙ্গলকাকার। মঙ্গলকাকা দোকানের শাটার তুলে কিছুক্ষণের মধ্যে ওষুধপত্র নিয়ে এসে প্রাথমিক চিকিৎসা করে টেট-ভ্যাক দিয়ে দেন। অনিরুদ্ধ তাকিয়ে দেখে ঊষা ততক্ষণে নিশাকে নিয়ে চলে গেছে।

মঙ্গলকাকা চিকিৎসা করে বলেন, “এমনি ভয়ের কিছু নেই। তাও একবার আপনার এলাকার ডাক্তারকে দেখিয়ে নেবেন। বাড়ি কোথায় আপনার?” এদিকওদিক তাকিয়ে হতাশ গলায় নিজের ঠিকানা বলে অনিরুদ্ধ। চমকে ওঠেন মঙ্গলকাকা, “ ওবাবা ! সে তো অনেকদূর। তা এতদুর কি মনে করে এলেন? কোথায় যাবেন?” অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকে। মঙ্গলকাকা জিজ্ঞেস করেন ঊষাকে সে কি করে চেনে? অনিরুদ্ধ বোঝে মানুষটা নির্ঘাত কিছু আন্দাজ করেছেন। এসব জায়গায় সন্দেহের কথা বাতাসের গতিতে রটে। তাই বাধ্য হয়ে সে জানায় সে আর ঊষা একই কলেজে পড়ে। সে যাচ্ছিল এই এলাকা পার করে পাশের অঞ্চলে বন্ধুর বাড়ি। এমন সময় ওদের সাথে আকস্মিক ভাবে দেখা হয়ে গেছে। বলে সে ইঞ্জেকশনের টাকাটা দিতে চায়। ভদ্রলোক জিভ কাটেন, বলেন , “ঊষা-নিশা আমার মেয়ের মতো। তুমি ওদের পরিচিত। তোমার থেকে টাকা নিতে পারি? ও টাকা লাগবে না। ” অনিরুদ্ধ তাও জোর করে টাকাটা দিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর বাইকে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

বাড়ি ফেরার পর কাঁপুনি দিয়ে ভীষণ জ্বর আসে অনিরুদ্ধর। সারাদিন শুয়ে কাটিয়ে দেয় সে। সন্ধ্যেবেলা অনিরুদ্ধর ঘরে ধুনোর ধোঁয়া দিতে গিয়ে ঠাকুমা খেয়াল করেন ব্যান্ডেজটা। তারপর চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তোলেন। পাড়ার ডাক্তারকাকা এসে ব্যান্ডেজ খুলে ক্ষতপরীক্ষা করে সবটা জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়ে ওষুধ লিখে দিলে তারপর শান্ত হন। কিন্তু টানা একসপ্তাহ অনিরুদ্ধকে বাড়ির বাইরে যেতে বারন করেন। বাধ্য হয়ে ঠাকুমার নির্দেশ মানতে বাধ্য হয় অনিরুদ্ধ।

একসপ্তাহ পর কলেজে দেখা দুজনের। ততদিনে অনিরুদ্ধ অনেকটাই সুস্থ হয়েছে ঠিকই কিন্তু ব্যান্ডেজ খোলা হয় নি। বন্ধুদের সাথে দেখা করে গোটা দিন হইহই করে কাটানোর পর বাড়ি ফেরার জন্য গেটের বাইরে এসে কিছুদুর এগোতেই সে দেখতে পেলো ঊষাকে। নীলচে রঙের একটা সাধারণ চেক চুড়িদার পড়ে তার উপর একটা লালচে হুডি চাপিয়ে নিয়েছে সে। অনিরুদ্ধ একবার তাকালো ঊষার দিকে তারপর উল্টোদিকে হাটা দিলো। ঊষা যখন চায় না তখন সে নিজে থেকে আর এগোবে না ওর দিকে। কিছুদুর গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে যায় অনিরুদ্ধ। কিছুদুর গিয়ে নেমে পড়ে ট্যাক্সি থেকে। টাকা মিটিয়ে কোনোদিকে না তাকিয়ে নীরবে হাটতে থাকে সোজা সামনে দিকে।

কিছুদূর এগোতেই একটা বাস পেয়ে সেটায় উঠে পড়ে সে। পরের স্টপেজে নেমে আবার হাটতে থাকে। ঊষাকে ইগনোর করে চলে এলেও মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না সে। বারবার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কিছুদুর এগিয়ে রাস্তার ধারে একটা চায়ের দোকানে বসে চায়ের অর্ডার করে সে। চায়ের দোকানে এখন তেমন ভীড় নেই। দু-একজন যারা আছে তারাও নিজেদের মধ্যে আলাপ আড্ডায় মগ্ন। মাটির ভাড়ে চা নিয়ে অন্যমনস্ক ভাবে খেতে গিয়ে ঠোট, জিভ পুড়িয়ে ফেলে অনিরুদ্ধ। দোকানে বসা অন্য লোকেদের চোখ এড়ায় না সেটা। তারা আড়চোখে অনিরুদ্ধর দিকে তাকায় তারপর আবার নিজেদের গল্পে বুঁদ হয়ে যায়। অনিরুদ্ধ কোনোমতে চা’টা শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। দোকানীকে চায়ের দাম দিয়ে আবার হাটতে থাকে। এভাবে সারাদিন হেঁটে সন্ধ্যের দিকে বাড়ি ফেরে সে। বাড়ির লোকে জিজ্ঞাসা করলে জানায় কলেজে এক্সট্রা ক্লাস ছিল।

এইভাবে একমাস কেটে যাবার পর একদিন কলেজ ক্যান্টিনে বসে বসে সে ডিমের পোঁচ নাড়াচাড়া করছিল এমনসময় পেছন থেকে শুনতে পেল একটা কন্ঠস্বর, “তোমার ব্যাপারস্যাপার কি বলো তো? আজকাল খুব ‘হিমু’ পড়ছো নাকি? না মানে এরকম দেবদাসমার্কা চেহারা নিয়ে গোটা কলকাতা ঘুরে বেড়াচ্ছো তাই বলছি। তা এই বেবাগী হবার রোগটা কতদিন চলবে শুনি? না মানে বাড়িতে জানে? ” অনিরুদ্ধ পেছন ফিরলো না। একমনে নিজের খাবারটা খেতে লাগলো। 

পেছনে দাঁড়ানো কন্ঠস্বরের অধিকারিনী থামলো না। সামনের চেয়ারে এসে বসে বলল, “কি হলোটা কি? কথা কানে যাচ্ছে না? নাকি মৌনব্রত নিয়েছ? না মানে তুমি কি চাও বলো তো? গোটা কলেজ দেখুক আমি তোমাকে দেবদাস বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এই যে তুমি কলেজ থেকে বেরিয়ে খোলা ষাঁড়ের মতো গোটা কলেজ চষে বেড়াও, না সে তুমি বেড়াতেই পারো তোমার যা ইচ্ছে এতে আমার কি দোষ বলো তো? বেকার বেকার আমাকে দায়ী প্রমাণ করছ কেন?”

এইবার অনিরুদ্ধ চুপ করে থাকতে পারলো না। অস্ফুটে বলল, “তুই দায়ী নোস?”

“কেন হতে যাবো বলো তো? আমি তোমাকে প্রথমদিনই বলেছি আমাদের মধ্যে বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কোনো সম্পর্ক হয় না, হতে পারে না। এর চেয়ে লজিক্যালভাবে কোন মেয়ে তোমাকে বলবে শুনি? আমি কি তোমাকে চিট করেছি? তোমাকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়েছি? না তোমাকে কোনো আকারে ইঙ্গিতে বলেছি কিছু করতে? জবাব দাও বলেছি কি?”

অনিরুদ্ধ মাথা নাড়ে। এই একটা ব্যাপারে সে ঊষাকে ক্লিনচিট দিতে পারে। প্রপোজ করার সময় থেকেই ঊষা ওর কোনোরকম সুযোগ নেয়নি। বরং বারবার ওকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। ঊষা এবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলে ওঠে, “ তাহলে কলেজে তুমি আমাকে বারবার অপমান করছো কেন? কেন তুমি এইভাবে পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছ? জানো কলেজে আমাদের নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি হয়। সকলে আমাকে কেমন যেন একটা নজরে দেখে। আর জিমিদা…’’ ঊষা মাথা নামিয়ে নেয়।

খাওয়া থামিয়ে একপলক ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। তারপর বলে, “জিমি কি?” ঊষা মাথা উচু করে তাকায় এবার অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ দেখে ঊষার চোখে একরাশ ঘৃণা উপচে পড়েছে ওর প্রতি। অনিরুদ্ধ ভ্রু কুঁচকে বলে, “ কি করেছে জিমি বল?”

“যেন তুমি জানো না! তোমার মদতেই তো সব হচ্ছে।” ব্যঙ্গ ভরা গলায় বলে ওঠে ঊষা।

“কি হচ্ছে?” অবাক গলায় বলে ওঠে অনিরুদ্ধ! ঊষার কথার কিছু বুঝতে পারে না সে।

“থাক আর সাধু সাজতে হবে না। আমার অনেক বড়ো ক্ষতি করে দিয়েছ তুমি! যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটাই সত্যি করে দিয়েছ। অনেক শিক্ষে হলো আমার। তোমাকে বিশ্বাস করে ঠকে গেলাম আমি! আজকের পর থেকে আর কাউকে বিশ্বাস করবো না! সামান্য নোটস নিতাম বলে, তোমাদের সাথে হেসে হেসে কথা বলতাম বলে তোমরা আমাকে টেকেন ফর গ্রান্টেড ভেবে নিয়েছ! আমাকে তোমরা রাস্তায় এনে নামিয়েছ! তোমার থেকে এটা আশা করিনি আমি। তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করব না। জেনে রাখো অনিরুদ্ধদা তোমার প্রতি আমার মনে যতটুকু সম্মান ছিলো সব শেষ হয়ে গেছে। শুধু একটা অনুরোধ যতদিন এই কলেজে আছি ততদিনের জন্য এইসব বন্ধ রাখো প্লিজ! আর আমার সাথে ভবিষ্যতে কোনোরকম যোগাযোগের চেষ্টা করো না।” বলে উঠে চলে যায় ঊষা। অনিরুদ্ধ হতবাক হয়ে বসে থাকে। গোটা ব্যাপারটা সাজাতে গিয়ে গোলমেলে লাগে অনিরুদ্ধর কাছে। হঠাৎ কি হলো ? ঊষা এত বড়ো অভিযোগ করে গেল কেন? কি হয়েছে? জিমি কি বলেছে ওকে? ভাবতে ভাবতে হঠাত তার খেয়াল হয় ক্যান্টিনের সবাই যেন তাকেই আড়চোখে দেখছে। যেন ওর আর ঊষার কথা সকলে মনযোগ দিয়ে শুনছিল। কিন্তু কেন? ভাবতে ভাবতে খাওয়া শেষ করে সে উঠতে যাবে এমনসময় দেখে কাজল হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে ওর দিকে।

অনিরুদ্ধর সামনে এসে কাজল থমথমে গলায় বলে, “ঊষাকে কাঁদতে কাঁদতে বেরোতে দেখে আন্দাজ করেছিলাম তুই এখানে আছিস। সত্যি করে বলতো কি শুরু করেছিস তোরা? মেয়েটাকে শান্তিতে থাকতে দিবি না নাকি?” 

“আগে কি হয়েছে সেটা বলবি তো? কথা নেই বার্তা নেই আচমকা অতগুলো কথা বলে চলে গেলো মেয়েটা। কিছু বলতে পর্যন্ত দিল না। এদিকে কলেজে সবাই আমাদের দিকে এমন দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমি কোনো শোপিস! হয়েছেটা কি বলবি? ” রাগত গলায় বলে অনিরুদ্ধ।

“কি হয়েছে? সর্বনাশ হয়ে গেছে! মেয়েটার কি দোষ বলতো? ও তোকে রিজেক্ট করেছে। কেন করেছে সেটার বাস্তবসম্মত কারনও বলেছে তাই বলে তোরা এইভাবে মেয়েটাকে মেন্টালি টর্চার করবি? তোর থেকে এটা এক্সপেক্টেড ছিলো না অনি।”

“এক সেকেন্ড! মেন্টালি টর্চার মানে? কি হয়েছে আমাকে খুলে বলবি?”

“কেন তুই জানিস না?”

“কি জানবো?”

“মানে? তুই সত্যিই জানিস না? জিমি যে বলছে…”

“সেটাই তো জানতে চাইছি তখন থেকে! জিমি কি বলেছে?” অধৈর্য গলায় বলে ওঠে অনিরুদ্ধ। 

কাজল একমুহূর্ত থামে তারপর বলে, “জিমি যে বলছে, তুই ওকে বলেছিস তুই ঊষাকে ভালবাসলেও ও কিন্তু তোকে লেজে গোবরে খেলিয়ে ধোপার কুকুরের দশা করে দিয়েছে। তোর থেকে সব আদায় করে নিয়ে এখন তোকে লেঙ্গি মেরে সতী সাজছে। ও নাকি? মানে…ওর স্বভাবচরিত্রটাই নাকি ওরকম! এখন নাকি ও জিমির দিকে ঝুঁকতে চাইছে কিন্তু জিমি ওকে পাত্তা দিচ্ছে না। এমনকি আরো অনেক নোংরা কথা রটিয়েছে। তোরা নাকি মাঝে মাঝে … মানে লংড্রাইভে যেতিস। মানে কলেজের ভেতরে ও যতই সতী সাজুক বাইরে ও একটা টাকার লোভী গোল্ডডিগার। এসব নাকি তুই ওকে বলেছিস।তাছাড়া… ”

বাকি কথাগুলো আর অনিরুদ্ধর কানে ঢুকছিল না। কানমাথা সব ঝালাপালা হয়ে আসছিল। তার মানে ঊষা এইসব বিশ্বাস করে ওকে… ছিঃ! ছিঃ! অসহায়ের মতো দুহাতে মাথা চেপে বসে থাকে অনিরুদ্ধ। তারপর আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে কাজলের দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডাগলায় জিজ্ঞেস করে, “জিমি কোথায়?”

ধুস! আবার একই ভুল হলো! আরেক পাব্লিকের সাথেও আপনাদের আলাপ করাতে ভুলে গেছি। এতক্ষণ ধরে আমাদের নায়ক নায়িকার প্রেমালাপের গল্প বলে যাচ্ছি তো বলেই যাচ্ছি। গল্পে নায়ক নায়িকার প্রেম হলেই জমে নাকি? এট্টু ভিলেনের দুষ্টুমি, এট্টু ঢিসুম ঢিসুম না হলে যেকোনো সিনেমাটাই জমবে না কাকা! তা আমাদের গল্পে ভিলেন কিন্তু একজন নয়। একাধিক আছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সাথে আপনাদের হয়তো আলাপ হয়েছে। মেন দুই ভিলেনের সাথে হয়নি। যাক গে! প্রাইমারি ভিলেনের সাথে আলাপ সেরে নিন আগে পরে সেকেন্ডারি ভিলেনের সাথে আলাপ করিয়ে দেব।

আমাদের গল্পে প্রাইমারি ভিলেন হলো, আজ্ঞে হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন! জিমি। পুরোনাম জগমোহন মোহন্ত। অনিরুদ্ধর মতোই ব্যবসায়ী বাপের সন্তান। নাম শুনে এমন কোনো নেশা নেই যা করে না। বদমাস ছেলেদের পান্ডা, স্পয়েল্ড চাইল্ড এরকমই ঠাওরে থাকলে ভুল করবেন। হ্যাঁ জিমি অনিরুদ্ধর মতো বড়োলোক বাড়ির ছেলে কিন্তু কোনরকম নেশা নেই ওর। সরি ভূল বললাম একটা নেশা আছে, বইয়ের নেশা। সামান্যশার্ট, ট্রাউজার পরিহিত, চশমা পড়া বইপোকা ছাত্র। গত দুবছর ধরে ক্লাসে টপার। ওকে যতবার দেখা যায় ততবারই কোনো না কোনো বই হাতে থাকবে। বইমেলায় প্রতিবছর প্রচুর বই কেনে, পড়ে জমায়। যেকোনো বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। চলমান লাইব্রেরি বলতে পারেন। এমন কোনো বই নেই যা ওর কালেকশনে নেই। ওর কাছে সবরকম বই পাবেন। স্বভাবখানাও ভারী মিশুকে, হাসি খুশি। নতুন কাউকে দেখলে ভাব করে চট করে বন্ধু বানিয়ে আপন করে নেয়।

কি? সব গুলিয়ে যাচ্ছে তো? ভাবছেন এমন একটা গোপালমার্কা ছেলেকে ভিলেন বলছি কেন? কারন আপাদমস্তক এই নান্তুমার্কা সুবোধ বালকটির একটা মারাত্মক অন্ধকার দিক আছে। বন্ধুরা যে ওকে জিমি ডাকে সেটা আদৌও ওর নামের আদ্যক্ষর হিসেবে নয়। ওদের জিমির মানে হলো Ge.Me, Genius Menace মানে বুদ্ধিমান দস্যি। কেন? তাই বলছি একটু সবুর করুন না! উফফ! তো হ্যাঁ কি বলছিলাম? হ্যাঁ বুদ্ধিমান দস্যি। আমাদের জিমির সব ভালো কয়েকটা জিনিস বাদে। প্রথমত, বইয়ের যত্ন নিতে সে বড্ড ভালবাসে। বইয়ের সামান্যতম অবহেলা সহ্য করতে পারেনা। দ্বিতীয়ত, জীবনে কোনোদিন সে প্রথম ছাড়া দ্বিতীয় হয়নি কাজেই সহজে হার স্বীকার করে না। তৃতীয়ত, একবার যেটা ঠিক মনে হয় সেটাই করে ছাড়ে। কেউ ওকে টলাতে পারে না। চতুর্থত, না শুনতে পারে না। পঞ্চমত, এটা গোপনীয় থাক! যথাসময় জানা যাবে। তবে এই পঞ্চম দোষের কথা কলেজে কেউ জানে না।

এইবার অনেকে বলবেন শেষেরগুলো বাদ দিয়ে বাকিগুলো গুণই তো! কি তাই তো? কচুপোড়া! দোষগুলো আরেকবার ভালো করে পড়ুন। বইয়ের সামান্য অযত্ন হলে যার দ্বারা হয়েছে তাকে দিয়েই নতুন বই কিনিয়ে ছাড়ে। সে যেই হোক না কেন? এবার বলবেন এতে কি আছে সামান্য কটা টাকাই তো। আজ্ঞে কোনোদিন কলেজস্ট্রীটে গিয়ে কোনো ব্র্যান্ড নিউ বইয়ের দাম খোঁজ করে দেখবেন কত করে পড়ে। এবার কল্পনা করুন একজন মধ্যবিত্ত স্টুডেন্টের কাছে থাকে প্রায় সর্বাধিক একশো টাকার মতো। এবার বইটার দাম ধরুন দুশো কি তিনশোর মতো। সেই স্টুডেন্টের জায়গায় আপনি হলে কি বলবেন? “ভাই আপাতত এই কটা টাকা আছে। আমার কাছে এটা রাখ পরে দিয়ে দেব।” অন্য কেউ হলে মেনে নিতো কিন্তু জিমি মানবে না। ও যেনতেন প্রকারেণ ভাবে সেদিনই নতুন বই আপনাকে দিয়ে কেনাবে। এবার আপনি উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত হলে টাকাটা তেমন ম্যাটার করবে না। বরং পকেটমানির ভার কিছুটা লাঘব হবে। কিন্তু একজন গরীব ছাত্র যার পরিবারের গোটা মাসের মাইনে ওই বইয়ের দামের সমান তার কি হবে একবার ভেবে দেখেছেন? আজ্ঞে হ্যাঁ গরীবদেরও ছাড়ে না জিমি। পারলে ওদের জিনিস বেঁচে বই কেনার দাম উশুল করে নেয়।

জিমি কোনোদিনও হারতে শেখেনি। হার ওর সহ্য হয় না। এবার ধরুন প্রতিপক্ষ যদি ওর চেয়ে বেশি প্রতিভাবান হয় তাহলে তো জয় অসম্ভব। সেক্ষেত্রে কি করবে? আজ্ঞে হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, হয় প্রতিপক্ষকে বিপদে ফেলে দেবে যাতে প্রতিযোগিতায় না আসতে পারে নাহলে এমন কিছু করবে যাতে জয়টা ওরই হয়। সে পথ যেরকমই হোক না কেন। এবার বুঝেছেন আপাদমস্তক নিরীহ এই ছেলেটাকে চটালে কতটা বিপদজনক হতে পারে? 

এবার আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই ছেলের কোন পাকা ধানে ঊষা মই দিয়েছে যে এইভাবে ছেলেটা মেয়েটার সম্মানের দফারফা করে দিচ্ছে। সেটা জানতে হলে আমাদের ফিরতে হবে আবার সিনে। তো কাজলের মুখে জিমির কীর্তি শোনার পর অনিরুদ্ধ ঠাণ্ডাগলায় জিজ্ঞেস করলো “জিমি কোথায়?” কাজল অবাক চোখে তাকিয়েছিলো অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ আরেকবার জিজ্ঞেস করলো , “জিমি কোথায়?”

জবাব দিতে হলো না কাজলকে কারন তখনই জিমি ব্যাকপ্যাক কাঁধে ক্যান্টিনে ঢুকে বলল, “ হরিদা একটা চা দিও।” বলে টেবিলে বসে ব্যাকপ্যাক থেকে বই বের করে পড়তে লাগলো। 

জিমির দিকে একবার তাকিয়ে কাজলের দিকে তাকাল অনিরুদ্ধ। তারপর এগিয়ে গিয়ে চুপ করে জিমির সামনে বসলো। ক্যান্টিনের ছেলেটা চা দিয়ে যেতেই চায়ের গ্লাসটা সরিয়ে রাখলো সে। জিমি অনিরুদ্ধকে খেয়াল করেনি। অনিরুদ্ধ চুপচাপ একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে আনমনে দেখতে লাগলো জিমিকে। জিমি বই পড়তে পড়তে টেবিলে চায়ের গ্লাসটা খুঁজতে লাগলো। খুঁজে না পেয়ে বই নামাতেই অনিরুদ্ধকে দেখে একটু চমকে উঠলো সে। অনিরুদ্ধ নির্বিকারভাবে ওর দিকে তাকিয়ে চায়ের গ্লাসটা এগিয়ে দিলো। জিমি চায়ের গ্লাসটা হাতে নিয়ে চুমুক দিয়ে খেতে গিয়ে জিভ পুড়িয়ে হ্যা হ্যা করতে লাগলো। অনিরুদ্ধ একটা ধোঁয়ার রিং উড়িয়ে বলল, “ আস্তে! আস্তে! সাবধানে খা! গরম চায়ে জিভটা পুড়িয়ে ফেললি তো!” জিমি চায়ের গ্লাসটা টেবিলে রেখে হাসি হাসি মুখ করে তাকালো। 

নির্বিকার ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ বলল, “ তোর সাথে কিছু কথা ছিলো।” কোনোমতে তুতলে বলে জিমি, “হ… হ্যাঁ, বলনা!” 

“কয়েকটা জিনিস জানার ছিলো। তাই বলছি কটা বই আমাকে ধার দিবি? সামনেই পরীক্ষা। কিছু নোটসের জন্য নিতাম আর কি।”

“হ… হ্যাঁ! শিওর! বল না কি কি বই চাই?”

“আপাতত এই বইটা হলেই চলবে।” বলে টেবিলে রাখা বইটার দিকে আঙুল দেখায় অনিরুদ্ধ। প্রথমে চমকে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে জিমি এগিয়ে দেয় বইটা। বইটা হাতে নিয়ে পাতাগুলো ওল্টাতে থাকে অনিরুদ্ধ। অনিরুদ্ধকে নির্বিকার দেখে একটু হলেও ভয়টা কমে আসে জিমির। অনিরুদ্ধ পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে “বাবা পেজগুলো দেখছি বেশ মোটা। বইটা নিশ্চয়ই খুব দামি হবে। আচ্ছা কলেজস্ট্রীটে পাওয়া যাবে? না মানে একটা আমি নিয়ে নিলে তুই কি পড়বি তাই বলছি। তেমন হলে কিনে নিতাম।” জিমি হেসে বলে, “ কেন পাওয়া যাবে না? আমার একটা চেনা দোকান আছে ওখানে। যে কোন বইয়ের নতুন এডিশনের দুটো কপি কিনে আনি আমি বাইচান্স একটা কপি কেউ নিয়ে গেলে যাতে আমার অসুবিধে না হয়।”

সিগারেট টানতে টানতে বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আচমকা অনিরুদ্ধ বলে ওঠে, “আচ্ছা, একটা প্রশ্ন ছিলো। এটা যদিও সিলেবাস সম্পর্কিত নয়। তোর যদি কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে জিজ্ঞেস করতে পারি? মানে একটু সাজেশনের দরকার ছিল।”

জিমির ভয় ততক্ষণে কেটে গেছে। হাসিমুখে সে বলে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ! বল না।”

সিগারেটটা শেষ করে ফিল্টারটা খালি কাপে গুঁজে আরাম করে বসে অনিরুদ্ধ। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব করে বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলে, “ ধর কেউ একজন, যার সাথে তোর কোনোরকম শত্রুতা নেই, তোর সাতেপাঁচেও থাকে না এমন একজন একদিন হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই আচমকা তোর নামে যা নয় তা রটাতে লাগলো। তোর অজান্তে তোর নামে এমন কিছু বলল যে তুই জানতেও পারলি না অথচ তোর ইমেজের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। তখন তুই কি করবি?”

জিমি ভয় মিশ্রিত চোখে তাকিয়ে রইল অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ চুপচাপ বইটা পড়তে লাগলো। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো, “কি হলো বল? তখন তুই কি করবি?” জিমির কপালে আবার ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। সে চারদিকে একঝলক চোখ বুলিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “বুঝলাম না! কি বলতে চাইছিস তুই?”

বই পড়তে পড়তে একটা অলস হাই তুলে অনিরুদ্ধ বলল, “বাদ দে। বইতে উত্তর পেয়ে গেছি। আমি হলে কি করতাম বলতো?”

স্খলিত গলায় জিমি বলে , “কি?”

অনিরুদ্ধ বইটা পড়তে পড়তে আচমকা একটা পাতা ছিঁড়ে নেয়। জিমি হাহা করে বইটা কেড়ে নিতে যাবে ঠিক তখনই টেবিলে রাখা জলের জগটা তুলে জিমির মুখে জগে রাখা সমস্ত জল ছুড়ে মারে অনিরুদ্ধ। তারপর বইটা কেড়ে নিয়ে লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় সেটায়। আচমকা জলের ঝাপটায় জিমির চশমা খুলে মেঝেতে পড়ে যায়। মেঝেতে বসে সেটা খুঁজে নিয়ে পরে সামনে তাকাতেই একটা আর্তচিৎকার করে অনিরুদ্ধকে বাধা দিতে যায় সে কিন্তু ততক্ষণে অনিরুদ্ধ জিমির ব্যাগপ্যাকটা হাতে তুলে নিয়েছে।

একহাতে জ্বলন্ত বই আরেকহাতে ব্যাকপ্যাক নিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আসে অনিরুদ্ধ। তারপর পোড়া বইটা ছুঁড়ে ফেলে দূরে। পেছন পেছন উদভ্রান্তের মতো বেরিয়ে আসে জিমি। দূরে বইটা দেখে ছুটে যায় সেদিকে। কিন্তু বেশিদুর যেতে পারেনা, মাঝরাস্তায় অনিরুদ্ধ ব্যাকপ্যাকটা জিমির মুখ লক্ষ্য করে মেরে ফেলে দেয় তাকে। আচমকা ব্যাগের বাড়ি খেয়ে পাথুরে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে জিমি। চোখ থেকে চশমা খুলে পড়ে যায় একদিকে। জিমি মাটিতে হাতড়ে হাতড়ে চশমা খুঁজতে থাকে। চশমাটা হাতে খুঁজে পেয়েছে ঠিক সেইসময় অনিরুদ্ধ পা দিয়ে জিমির ডানহাতের পাতা মাড়িয়ে দেয়। চশমাটা হাতের চেটোতে ভেঙে কাঁচের টুকরোগুলো গেঁথে যায় জিমির হাতে চেটোয়। অসহ্য যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে জিমি। এমনসময় একটা লাথি আছড়ে পড়ে জিমির মুখে। তারপর জামার কলার ধরে জিমিকে তুলে দাঁড় করায় অনিরুদ্ধ। কানের কাছে হিসহিসে কন্ঠে বলে, “ভালো ছেলে, ভালোবন্ধু হওয়ার জন্য কিছু বলি না বলে যা খুশি করবি? একটা মেয়ে যে তোর কোনো ক্ষতি করেনি তার নামে এরকম নোংরা কথা বলার সাহস হয় কি করে তোর? আমি তোকে বলেছি যে ঊষা আমাকে কুকুরের মতো ঘোরায়? ঊষা আমার থেকে ফেবার নেয়? আমি কবে বলেছি বল? কবে বলেছি?” 

বলে একটা ঘুষি কষিয়ে দেয় জিমির চোয়ালে। তারপর আরেকটা ঘুষি মারে নাকে। জিমির নাক বেয়ে গলগল করে রক্ত বেরোতে থাকে। অনিরুদ্ধ ওকে ক্যান্টিনের বাইরের দেয়ালে ঠেসে ধরে আরেকটা ঘুষি মেরে বলে, “কেন করলি তুই এটা? কেন? একটা মেয়ের কাছে, গোটা কলেজের কাছে তোর জন্য আমি কতটা ছোটো হয়ে গেলাম! কি ক্ষতি করেছে মেয়েটা বল? মেয়েটার এত বড়ো সর্বনাশ কেন করলি তুই? বল! নাহলে আজকে তোকে তোর ওই বইগুলোর সাথে জ্যান্ত পুড়িয়ে দেব। বল! বল!” বলে জিমিকে অনবরত ঘুষি মারতে থাকে অনিরুদ্ধ। 

ক্যান্টিনের বাইরে অবস্থিত সকলে অনিরুদ্ধর এই রূপ দেখে থমকে গিয়েছিল। সম্বিত ফিরে পেতেই সকলে মিলে ওদেরকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু অনিরুদ্ধর মাথায় ততক্ষণে আগুন চেপে গেছে সে আরো জোরে ঘুষি মারতে‌ থাকে।

অনেক কষ্টে যখন ওদেরকে আলাদা করা গেল ততক্ষণে জিমির অবস্থা বেশ সঙ্গিন। সকলে মিলে জিমিকে বারান্দায় শুইয়ে দেয় জিমিকে। মুখ চোখ ফুলে ঢোল, নাক দিয়ে, ঠোঁট দিয়ে অনবরত রক্ত বেরিয়ে বুক ভেসে গেছে। কিন্তু তাতেও কোনো হেলদোল নেই জিমির। কিছুক্ষণ খাবি খাওয়ার পর সে উঠে বসে একদলা রক্তমাখা থুতু ফেলল মাটিতে তারপর জিঘাংসা ভরা গলায় বলল, “ ক্ষতি করে নি আবার! আমার মস্ত বড়ো ক্ষতি করেছে তোর ওই বুলবুলি! এত বছর ধরে তিলতিল করে গড়ে তোলা আমার গর্ব, পরিশ্রম করে অর্জন করা আমার স্থান, সব কেড়ে নিয়েছে একটু একটু করে! আজ পর্যন্ত কোনোদিন আমি হারিনি, সেই আমাকে ওই মিডিলক্লাস ছোটোলোক মেয়েটা সবজায়গায় গোহারান হারিয়ে দিয়েছে! ইন্টার কলেজ ডিবেটে প্রতিবছর আমি কলেজের হয়ে পার্টিসিপেট করি সেখানে আমাকে টপকে ও পার্টিসিপেট করেছে। যে প্রফেসর আমাকে কলেজের হয়ে কুইজ টিম রিপ্রেজেন্ট করতে বলতো, সে আমাকে বলছে এবছর তোমার দরকার নেই! আজ পর্যন্ত জিমিকে কেউ হারাতে পারেনি সেখানে একটা মেয়ে এসে সব হিসেব উল্টে দিয়েছে। আমি হারতে পারি না! আমার হার সহ্য হয় না! আর একটা মেয়ের কাছে তো কখনোই না! একটা মেয়ে হয়ে আমাকে টপকে যাবে এ আমি হতে দেব না!” 

দাঁতে দাঁত চেপে জিমির দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। তারপর বলে, “ তুই আর তোর ব্লাডি মেল ইগো! আর সেই ইগোর চক্করে তুই মেয়েটার নামে এতবড়ো অপবাদ দিয়ে সর্বনাশ করে দিলি!”

“বেশ করেছি!” বলে আরেকদলা থুতু ফেলে রাগত গলায় বলে ঘোলাটে চোখে আন্দাজ করে তাকায় জিমি। “শালা তুই পাগলাচোদার মতো ওর পেছনে কবে থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, অথচ মহারানির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। শালা ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে বিছানায় উঠে যেত। আর শালী তোকেও ঘোরাচ্ছে। আমাকেও ঘোরাচ্ছে।”

দাঁতে দাঁত চেপে জ্বলন্ত চোখে জিমির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে অনিরুদ্ধ,“কি বলতে চাইছিস তুই? তোকেও ঘোরাচ্ছে মানেটা কি?”

ব্যঙ্গভরা গলায় বলে ওঠে জিমি, “আহা চাঁদ বোঝো না যেন! নোটস নিচ্ছে, হেসে হেসে গড়াচ্ছে গায়ের উপর, অথচ প্রেমের কথা বললে বলছে ওসব করতে আসে নি। ঢং! একটা মেয়েমানুষ হয়ে ছেলেদের সাথে ঢলে সতীপণা চোদাচ্ছে! ওরকম সতী আমার অনেক দেখা আছে! শুধু বলেছিলাম অনি পাত্তা দেয় নি তো কি হয়েছে আমি দেব। অনি যে নোটস দিতো সব আমি দেবো, যে সাজেশন দিতো তার চেয়ে বেটার সাজেশন দেব শুধু ও যেটা অনির সাথে করে সেটা আমার সাথে করুক। শুনে শালির কি দেমাক! গোটা লাইব্রেরীর সামনে আমাকে থাপ্পর মেরে দিলো? আমি শালা জগমোহন মোহন্ত! আমার গায়ে হাত? কেন? আমিই বা অনির চেয়ে কম কিসে? ওর চেয়ে অনেক বেশী পারফর্মেন্স পাওয়ার আমার! অনি যে সুখ দিয়েছে ওকে তার চেয়ে দেড় গুন বেশি সুখ দিতাম ওকে! চাইলে টাকাও দিতাম! কিন্তু মাগীর গুমোর খুব! ওর গুমোর যদি ভেঙেছি তাহলে আমি পুরুষই নই! হয় ওকে বাধ্য করবো আমার রুমে আসতে নয় ওই মেয়েকে কলেজছাড়া করবো। যদি না করতে পেরেছি তাহলে আমার নামে তোরা কুকুর পুষিস!” বলে উঠে দাঁড়িয়ে জামার হাতা দিয়ে নাকের রক্ত মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ায় জিমি।

কাজল ওর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, “ছিঃ! জিমি ছিঃ! এত নীচু মানসিকতা তোর? একটা মেয়ে কারো সাথে হেসে খেলে বেড়ালেই সহজলভ্য হয়ে যায়? একটা মেয়ের প্রতি তোর এই মনোভাব? তারমানে তো আমরাও তোর কাছে সহজলভ্য! এতদিন তোকে তাহলে ভুল চিনেছি আমরা! এতদিন ধরে তুই আমাদের সামনে ভালো সাজার অভিনয় করে এসেছিস!” 

খিকখিক করে হেসে বলে জিমি, “হ্যাঁ তোরাও তো তাই! এই যে এত অনির পেছনে কুত্তির মতো ঘুরঘুর করিস কিসের জন্যে? এই ছোটো জামা পরে পা, হাত, বুক দেখাস কিসের জন্যে? সেই তো লাগানোর জন্যেই নয় কি? আরে হাজার আধুনিক হোস না কেন? এটা তো মানবি যে তোদের জন্মই হয়েছে ঘর সামলানো আর আমাদের সেবা করে খুশি করার জন্য। যতই অফিসের কাজ করিস বলিস না কেন, বসের ঠাপন ছাড়া প্রোমোশন পাস না। শালা আধুনিকতা চোদাচ্ছে! এটা মর্ডান যুগ নাহলে দেখিয়ে দিতাম পুরুষ কাকে বলে।” 

আচমকা এই কুৎসিত আক্রমণে নির্বাক হয়ে যায় কাজল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নয়না বলে, “হোপলেস! তুই শুধু নীচ মানসিকতারই নোস, ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গির মানুষও বটে! আমার ঘেন্না করছে এই ভেবে যে তোকে একসময় আমার বন্ধু ভাবতাম।”

মুচকি হেসে জিমি বলে, “সেটাই তো দুর্ভাগ্য আমার! তুই শুধু আমাকে বন্ধু ভাবলি বলে কিছু করতে পারিনি! প্রেমিক ভাবলে এতদিনে তোকেও পরখ করা হয়ে যেত আমার!” 

অনিরুদ্ধ একমনে জিমির কথা শুনছিল আর ব্যাপারটা মেলাচ্ছিল। তারমানে এতদুর ব্যাপারটা গড়িয়ে গেছে অথচ ঊষা ওকে কিছু বলে নি? এই জন্য ঊষা ওকে যা নয় তাই বলে গেল? তারমানে জিমি ওকে একা পেয়ে…! জিমির সব কথা ওর কানে ঢুকছিল না। সে শুধু ভাবছিল ঊষা যে ভয়টা পাচ্ছিল সেটাই হল। একটা বিচ্ছিরি স্ক্যান্ডাল ঘটলো ওদের নিয়ে যেখানে ওদের কোনো ভূমিকাই নেই! অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছিল ঠিক কতটা ভুল বুঝে আর অভিমানে ঊষা এভাবে চলে গেল। ওকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পর্যন্ত দিল না। এই নরকের কীটটার জন্য ঊষা ওকে ভুল বুঝলো। দাঁতে দাঁত চেপে জিমির দিকে তাকাল অনিরুদ্ধ। বড়ো ভুল হয়ে গেছে ওকে ছেড়ে। যে করেই হোক ঊষার ভুল ভাঙাতে হবে। ওকে ফেরত আনতে হবে। নাহলে ও শান্তি পাবে না। কিন্তু তার আগে এই পশুটাকে সাজা দিতে হবে।মনে মনে স্থির করে নিল আর যাই হয়ে যাক একে ছাড়া যাবে না কিন্তু কি ভাবে? ভাবতে ভাবতে ওর নজর পড়ে জ্বলন্ত বইটার দিকে। চট করে বুদ্ধি খেলে যায় তার মাথায়। জিমির ব্যাগ থেকে বইগুলো বের করে মাটিতে ফেলে দেয় সে। পাশেই দাঁড় করানো বাইকের সিট খুলে বের করে আনে এক্সট্রা পেট্রলের বোতল।পুরো বোতলটা উপর করে দেয় বইগুলোর উপর। তারপর জ্বলন্ত বইটা তুলে এনে ফেলে দেয় বইয়ের স্তুপের উপর। ছাইচাপা আগুন ইন্ধন পেয়ে দপ করে জ্বলে ওঠে। 

আচমকা পেট্রলের গন্ধ পেয়ে চমকে ওঠে জিমি! ঘোলাটে চোখে সামনের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। আর একটা হলুদাভ আলো দেখে ভয়ে আতঙ্কে বুকটা ফাকা হয়ে যায় তার। সাধের বইগুলোর ওরকম অবস্থা দেখে আর্তচিৎকার করে ওঠে জিমি। আলো অনুসরন করে সে দৌড়ে আসে অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ জিমির বুকে লাথি মেরে ফেলে দেয় মাটিতে। বইয়ের পাতা পোড়ার শব্দ পেয়ে জিমি বুঝতে পারে ওর সাধের বইগুলো পুড়ে যাচ্ছে। সে উঠে দাঁড়িয়ে তাপ অনুভব করে এগোতে যাবে এমন সময় অনিরুদ্ধ আবার ওকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয় তারপর কোমরে কষিয়ে লাথি মেরে বলে, “ঠিক এমনটাই মনে হয় যখন কাছের মানুষ দুরে সরে যায় আর তাকে ফেরানো সম্ভব হয় না। এরকম কষ্ট হয় যখন তোমার স্বপ্ন, তোমার কষ্টে তিলে তিলে গড়ে তোলা ইচ্ছেকে কেউ পা দিয়ে মারিয়ে গুঁড়ো করে দেয়। ঠিক এরকমই মনে হয়েছে ঊষার, আমার। তুই শুধু আমাদের সম্পর্ক নষ্ট বা মেয়েটার স্বপ্ন ভাঙিস নি। মেয়েটার এতদিনের পরিশ্রমকে ধুলো করে দিয়েছিস। এই যে ছাই দেখছিস ওর জীবনটা ঠিক এরকম ছাই করে দিয়েছিস তুই। তোর অপরাধের কোনো ক্ষমা নেই। কোনো ক্ষমা নেই!” বলে জিমির শিরদাঁড়ায় কষিয়ে লাথি মারে অনিরুদ্ধ । 

কট করে একটা শব্দ হয়। চিৎকার করে ওঠে জিমি। অনিরুদ্ধ হিসহিসে কন্ঠে বলে ওঠে, “ কি হলো? লাগলো নাকি?? যাহ! তা কি করে সম্ভব? তুই তো মেরুদন্ডহীন পুরুষ! মেরুদন্ড ভাঙলে তোর আবার কিসের ব্যথা লাগবে?” বলে জিমির পিঠে আরেকবার চাপ দেয় অনিরুদ্ধ । প্রবল ব্যথায় গোঙাতে থাকে জিমি। এবার আর কেউ অনিরুদ্ধকে থামাতে আসে না। মাটিতে পড়ে গোঙাতে থাকে জিমি , খাবি খেতে থাকে বইয়ের ধোঁয়ায়, বইয়ের ছাই, ধোঁয়া জিমির চোখে ঢোকে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বলতে থাকে তার। সেই ধোঁয়া ক্রমশ কুন্ডলি পাঁকিয়ে উঠে যায় আকাশে।

*****
“ভাগ্যিস সেদিন আমি চলে যাইনি! সেঁজুতিদির কথা শুনে ঠিক সময় পৌছেছিলাম! নাহলে তো জিমিদাকে তুমি মেরেই ফেলতে! তোমার ভাগ্য ভালো জিমিদার পরিবার তোমাকে পুলিশে দেয় নি। জিমিদা তো পরে ক্ষমাও তো চেয়েছিল মনে আছে? সে কি কান্না আমার হাত ধরে হাসপাতালে।” ঊষার কথায় হুঁশ ফেরে অনিরুদ্ধর।

 আসলে ঊষার সাথে কথা বলতে বলতে পুরোনো দিনগুলোয় ফিরে গিয়েছিল সে। সেই কলেজের দিনগুলো, ঊষার সাথে তার দেখা, প্রেম, ঊষার পিছিয়ে আসা, জিমি। সব একে একে মনে পড়ছিল তার। সেদিন জিমির শিরদাঁড়া ভেঙে ওকেও পারলে আগুনে ছুঁড়ে ফেলত। ঠিক সে সময় ঊষা এসে ওকে না থামালে কি যে হতো অনিরুদ্ধ জানতো না। সেদিন যখন অনিরুদ্ধ জিমির ঘাড়ে পা তুলে দিয়ে ধীরে ধীরে ওকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে ঠিক এমন সময় ঊষা এসে অনিরুদ্ধকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। তারপর সকলের সামনে সপাটে চড় মারে। সকলে এতক্ষণ ধরে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে ছিল, এমন সময় ঊষার এই কাণ্ডে ক্যান্টিনে উপস্থিত সকলে চমকে যায়। তারপর সম্বিত ফেরায় সকলে মিলে ধরাধরি করে জিমিকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেই দিনের পরে জিমি ঊষার হাত ধরে ক্ষমা চেয়েছিল। 

আনমনে গালে হাত বুলিয়ে অনিরুদ্ধ বলে, “আমার মাথা কাজ করছিল না সেদিন। শুধু মনে হচ্ছিল যে মানুষটা তোমার এত বড়ো সর্বনাশ করেছে তার বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”

“তাই বলে মানুষটাকে মেরে ফেলবে? ইস ও মরে গেলে এই যে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেম করা ঘুচে যেত। আর অতোগুলো বই পুড়িয়ে দিলে যে! জিনিসপত্রের দাম নেই নাকি? কত দরকারি বই ছিল ওর কাছে জানো? ”

“বেশ করেছি পুড়িয়ে দিয়েছি! কত সাহস ওর! তোমার নামে উল্টোপাল্টা বলবে কেন ও?” বলে বিরক্তিসূচক শব্দ করে মাটিতে থুতু ফেলে অনিরুদ্ধ।

“তাই বলে একেবারে মানুষ খুন করবে?” অবাক হয়ে তাকায় ঊষা।

“আলবাত করবো! যে তোমার নামে বাল বকবে, তোমাকে কষ্ট দেবে তার ছাল ছাড়িয়ে দেব আমি!” বলে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরায় অনিরুদ্ধ। ঊষা নাক কুঁচকে অনিরুদ্ধর ঠোঁট থেকে সিগারেট বের করে ফেলে দিয়ে বলে,“ কতবার বলেছি! আমার সামনে সিগারেট ধরাবে না! আর এখনও এত রাগ! সত্যি এত বছর হয়ে গেল এতটুকু বদলালে না তুমি! কবে ম্যাচিওর হবে বলো তো? আর কে কি বলল তাতে কি আসে যায়? ভগবান লোককে মুখ দিয়েছেন বলার জন্য। লোকের কাজ বলা। তাই বলে লোককে ধরে পেটাবে?”

“দরকার পড়লে পেটাবো! এই অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত নিজের বাপকে ছাড়া আর কাউকে ভয় পায় না!” বলে গোঁফে তা দেয় অনিরুদ্ধ।

“সেই জন্যই বিগত দুবছর ধরে নিজের বাপকে বলতে পারছো না তুমি চাকরি করতে চাও।” বলে ফোঁড়ন কাটে ঊষা।

“এই যে! ডোন্ট আন্ডারেস্টিমেট মি! আমি চাইলে এখনই বলে দিতে পারি।” বলে ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। ঊষা এবার অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে সিরিয়াস মুখ করে বলে, “বেশ! তাহলে এখনই তোমার বাবাকে কল করে বলো। দাও ফোনটা।” বলে হাত পাতে ঊষা। তারপর মুচকি হেসে বলে, “ কি হলো? ফুস! দম বেরিয়ে গেল? ওরকম সকলেই আমাদের সামনে একটু আধটু মুখে হম্বিতম্বি করে। কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা।”

“বাজে কথা না বলে কি জন্য ডেকেছো বলো।” বলে বেঞ্চে হেলান দেয় অনিরুদ্ধ।

“এমন ভাবে বলছে যেন কত কাজ ফেলে এসেছে!” বলেই মুখটা মলিন হয়ে যায় ঊষার, তারপর থমথমে গলায় বলে, “বাড়িতে ক্রমাগত চাপ দিচ্ছে বিয়ে করার জন্য। এদিকে একের পর এক পাত্র দেখতে আসছে আমাকে দেখতে। গতপরশুও একজন এলো। ভাগ্য ভালো ওরা যে পণ চাইছে সেটা আমার বাবা দিতে অপারগ বলে সম্বন্ধ ভেস্তে যাচ্ছে। এদিকে বাড়িতে আমি বলতে পারছি না। কিন্তু এভাবে চললে বেশি দিন আর লুকোনো যাবে না।”

“জানি কিন্তু কি করবো বলো? চেষ্টা তো চালিয়ে যাচ্ছি, কিছুই তো হচ্ছে না। এই মন্দার বাজারে চাকরি পাওয়ার চেয়ে সিনেমা হলে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটা সহজ। কালকেই এক জায়গায় ইন্টারভিউ দিলাম। ওদের মুখ দেখে মনে হলো না যে চাকরিটা পাচ্ছি। আর সরকারি চাকরি তো একেবারে হীরের আংটির মতো। হয় পরীক্ষায় র‍্যাঙ্ক করে নেতাদের পা ধরো, নাহয় টাকা দিয়ে পোষ্ট কিনে ফেলো। এই দুটো পথের প্রথমটা আমার দ্বারা হবে না। আর পরেরটা তোমার পছন্দ হবে না। তাহলে কি করা যায়?” অসহায়ের মতো ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। 

ঊষা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “কিছু একটা উপায় তো বের করতেই হবে! বাড়িতে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে জানাজানি হলে অশান্তির শেষ থাকবে না। এভাবে রোজ রোজ তো আর পাত্র আমায় রিজেক্ট করবে না। আর একবার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে…”

“বিয়ের মন্ডপ থেকে তুলে আনবো তোমাকে! দেখি শালা কে আমাকে আটকায়? আমাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবে তুমি? সাহস হয় কি করে?” বলে চিৎকার করে ওঠে অনিরুদ্ধ।

“আস্তে!” ত্রস্ত চোখে চারদিকে তাকায় ঊষা। তারপর ধীর গলায় বলে, “তুমি কি পাগল? এইভাবে চিৎকার করছো কেন?”

“আলবাত করবো! আরো বেশি করে করবো! আমাকে ছেড়ে তুমি অন্য কারো সাথে বিয়ের মন্ডপে বসবে কেন? এই কথা বলার সাহস হয় কি করে তোমার!” বলে বেঞ্চ চেড়ে উঠে দাঁড়ায় অনিরুদ্ধ।

ঊষা একপলক তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “জানতাম!”

“কি জানতে?” বলে ভ্রু কুঁচকে ঊষার দিকে তাকায় অনিরুদ্ধ। ঊষা বেঞ্চে হেলান দিয়ে বলে, “আমাদের এই সম্পর্ক, আর তোমার চাকরি পাওয়া দুটোই এখন বিশ বাঁও জলে। এই কারনে আমি আগেই বলেছিলাম এই সম্পর্ক হবার নয়, কিন্তু তুমি বোঝার পাত্র নও।”

দাঁতে দাঁত চেপে অনিরুদ্ধ বলে, “ এইটা এতবছর আমার সাথে প্রেম করার সময় মনে ছিল না? নাকি অন্যকোনো পয়সাওয়ালা চাকরিরত নাগর পেয়ে মোহ কেটে গেছে?”

ঊষা হেসে বলে, “যদি বলি হ্যাঁ তাহলে কি করবে? মেরে ফেলবে? তাছাড়া আর কি পারবে? এই অ্যাটিটিউডের জন্য আজও তুমি বেকার। রগচটা, মেজাজি, অহংকারী, নবাবী অ্যাটিটিউড নিয়ে আর যাই হোক চাকরি হয় না। কিন্তু এই স্বভাবগুলো তোমার মজ্জাগত। দুনিয়াটা তোমার কলেজ ক্যাম্পাস নয় যে নিজের জোর খাটিয়ে সব আদায় করবে। মতের মিল হবে না বলে জিমিদার মতো সকলকে পেটাবে, বা রুমে ডেপুটেশনের নামে হল্লা করবে। এটা বাস্তব! এই পৃথিবীটা তোমার ওই বাইকে চলা সুগম রাজপথ নয়। পাথুড়ে, খানাখন্দে ভরা ভাঙাচোরা কাঁচারাস্তা। এখানে পায়ে হেঁটে চলতে হয়,পদে পদে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়তে হয়, আবার উঠে দাঁড়িয়ে চলতে হয়। তোমার দ্বারা ওসব সম্ভব নয়। প্রথম ইন্টারভিউতে জিন্স-টিশার্ট পরে গিয়ে ওদের সামনে মুখে সিগারেট নিয়ে দেশলাই চেয়ে বসলে। দ্বিতীয় ইন্টারভিউতে ফ্যাকাল্টির প্রশ্নের জবাব দিতে না পেরে ওকে মেরে বেরিয়ে এলে। তৃতীয় ইন্টারভিউতে সব ঠিক চলা সত্ত্বেও অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা বন্ধুদের সাথে পার্টি করতে গিয়ে পুড়িয়ে দিলে। এত ক্যালাস তুমি যে চাকরির পরীক্ষার দিন মদ খেয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলে। তারপরও বলছো তুমি চাকরি পাবে? এত দম আসে কোথা থেকে তোমার?”

অনিরুদ্ধর মনে হয় কেউ যেন তার গালে সপাটে চড় কষিয়ে দিয়েছে। কান-মাথা জ্বালা করছে তার। একটা মিডিলক্লাস মেয়ে তাকে এইভাবে যা নয় তা বলছে! ইচ্ছে করছে কষিয়ে একটা চড় মেরে দিতে। কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে রাগ সহ্য করে সে। ঊষা সরাসরি অনিরুদ্ধর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, “জানি তুমি পারবে না। তোমার দ্বারা ওসব হবে না। যাও, ফিরে যাও তুমি। নিজের বাবার ব্যবসায় গদি আলো করে বসো।” তারপর ধরা গলায় বলে, “ আমাকে আমার হালে ছেড়ে দাও। এভাবে আমাদের সম্পর্ক জিইয়ে রাখা অসম্ভব। আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো। এতে দুজনেই খুশি থাকবো। আর আমাকে ভুলে যেও। মনে করবে আমাদের এই সম্পর্কটা একটা স্বপ্ন ছিল।”

বলে উঠে দাঁড়ায় ঊষা। অনিরুদ্ধ আর সহ্য করতে পারে না। পেছন থেকে শক্ত করে ধরে ঊষার হাত, পেছনদিকে মুচড়ে ধরে হাতটা। ককিয়ে ওঠে ঊষা। কানের কাছে মুখ এনে হিসহিসে কন্ঠস্বরে বলে ওঠে অনিরুদ্ধ, “কোথায় যাওয়া হচ্ছে? আমাকে ছেড়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? শালী! এতদিন আমার সাথে প্রেমের ভান করে, নাটক করে, এখন নতুন নাগর পেয়ে আমাকে কলা দেখানো হচ্ছে! বলা হচ্ছে আমাদের সম্পর্কটা স্বপ্ন মনে করে ভুলে যেতে! শালী তোকে মেরেই ফেলব আমি! জিমি ঠিকই বলতো! তোদের মতো মেয়েরা টাকা বোঝে আর সম্পত্তি বোঝে। সরকারি চাকরি টাকরি সব ভান! আসলে নতুন নাগর জুটেছে তাই আমাকে কাটানোর প্ল্যান! অনেকদিন ধরে দেখে যাচ্ছি তোর নাটক দেখছি। আর নয়! আজকেই তোকে আমি…!”

ব্যথার মধ্যেও গর্জে ওঠে ঊষা, “ কি করবে? রেপ করবে? মুখে অ্যাসিড ঢেলে দেবে নাকি আমাকে মেরে ফেলবে? অবশ্য তা তুমি করতেই পারো! বড়োলোক বাপের ছেলে কিনা! যে ছেলে মতের মিল না হওয়ায় লোকজনকে মেরে ফেলতে পারে সেই ছেলে আমার মতো একটা মিডিলক্লাসের মেয়েকে অনায়সে পৃথিবী থেকে লুপ্ত করে দিতে পারে। আসল কথা কি জানো? বাইরে থেকে তোমরা যতটা সুদর্শন ভেতর থেকে ততটাই কুৎসিত! বাইরে যতই ভালো সাজো না কেন? ভেতর ভেতর প্রত্যেকে নোংরা মনের মানুষ! তোমার আর জিমিদার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই! দুজনেই একই মানসিকতার মানুষ! আমারই ভুল তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসা। তোমার সাথে মেশা। তারই মাসুল দিতে হবে! রেপ করবে তো? চলো ওইদিকের ঝোপে চলো! তারপর মনের সুখে আমাকে রেপ করে পাথর দিয়ে আমার মাথাটা থেতলে দেবে। ভয় নেই! যতই যন্ত্রণা দাও না কেন আমি চ্যাচাবো না।”  

কথাটা শোনা মাত্র ঊষাকে কষে থাপ্পর মারে অনিরুদ্ধ! থাপ্পরের চোটে মাটিতে আছড়ে পড়ে ঊষা। দাঁতে দাঁত চেপে পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের গুড়িতে ঘুষি মেরে নিজের রাগটা ঝেড়ে ফেলে অনিরুদ্ধ। তারপর ঝুঁকে ঊষাকে তুলে বেঞ্চে বসিয়ে দেয়। মাটিতে পড়ে গিয়ে ঊষার কপালের একপাশে আঘাত লেগে রক্ত জমাট বেধে গেছে, জায়গাটা হাল্কা নীলচে দেখাচ্ছে। গালেও হাতের পাঁচ আঙুলের দাগ পড়ে গেছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে পার্কের ট্যাপকলের জলে ভিজিয়ে এনে ঊষার মুখের লেগে থাকা ধুলোবালি পরিস্কার করে ব্যথার জায়গাটায় চেপে ধরে রক্তটা সচল করার জন্য একটু ঘষে দেয় অনিরুদ্ধ। এত কিছুর পরেও ঊষা নীরব হয়ে বসে থাকে, যেন কিছুই হয় নি। অনিরুদ্ধ ঊষার মুখটা মুছে নতজানু হয়ে ঊষার সামনে বসে পড়ে। তারপর হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে ঊষার কোলে মুখ গোঁজে। ঊষা নির্বিকার হয়ে বসে থাকে।

অনিরুদ্ধ গোঙাতে গোঙাতে বলে, “একটা সুযোগ!... একটা সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছি।… সুযোগটা পেলে আর আমাদের চিন্তা করতে হবে না।… কত চেষ্টা করছি আমি! কিন্তু সেই সুযোগ আসছেই না।… দিনের পর দিন এভাবে চাপে পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি!... একমাত্র তোর মুখ দেখে, তোর সাথে গোটা জীবনটা কাটাবো এই আশায় রোজ একেকটা ইন্টারভিউতে যাচ্ছি।এখন তুইও যদি এভাবে আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিস তাহলে আমি কোথায় যাবো বল? আমার যত সংঘর্ষ আমাদের কথা ভেবেই। এখন যদি তুইও আমাকে এভাবে ছেড়ে চলে যাস তাহলে আমার এতদিনের সব যুদ্ধ মাটি হয়ে যাবে।”

ঊষা আনমনে অনিরুদ্ধর মাথায় বিলি কাটতে থাকে। ছেলেটা যে চাকরির জন্য কতটা খাটছে তা সে বিলক্ষণ জানে। এবং কেন একটা চাকরির জন্য এতটা আকুল সেটাও অজানা নয় ঊষার। বড়োলোক ব্যবসায়ী বাবার আদুরে ছেলে, চাইলে আরামে বাবার সাথে ব্যবসায় নেমে জীবন কাটাতে পারতো। কিন্তু ওর একটা শর্তে সব কিছু ছাড়তেও প্রস্তুত হয়ে গেছে ছেলেটা। এমন ছেলেকে কি না ভালোবেসে পারা যায়? 

******
“দাঁড়া! তখন থেকে শুধু পালিয়ে বেড়াচ্ছে! আমি কি বাঘ , ভাল্লুক, না পুলিশ ? যে এভাবে আমাকে দেখলেই ভয়ে পালাচ্ছিস?” বলে দৌড়ে ঊষার পথ আগলে দাঁড়ায় অনিরুদ্ধ। 

“তোমাকে ভয় পেতে আমার বয়েই গেছে! পথ ছাড়ো ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। ” বলে অনিরুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যায় ঊষা। ঊষার পেছন পেছন পেছন অনিরুদ্ধ হাটতে হাটতে বলে, “উফ! একটু দাঁড়া না! এত কিসের তাড়া তোর? পিকে স্যারের ক্লাস তো? ও আমি নোট এনে দেব। চাপ নেই।”

“না চাপ আছে!” বলে হাটার গতি বাড়ায় ঊষা। পেছন পেছন প্রায় দৌড়তে দৌড়তে অনিরুদ্ধ বলে, “কীসের চাপ?” ঊষা প্রায় ক্লাসে পৌঁছে গেছে। ক্লাসে ঢোকার আগে সে বলে, “পরে বলবো।”

প্রায় দুঘন্টা পরে কলেজের মাঠে দুজনে দুদিকে বসে আছে। একজন বইয়ের পাতায় মগ্ন, অপরজন সিগারেটের ধোঁয়ার রিং ওড়ানোয়। তবে একজনের গোমড়ামুখ দেখে মনে হয় সে অপরজনের কোনো কাজে আহত হয়ে অভিমান করে বসে আছে। অপ্রজনের অবসশ্য তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বইয়ের পাতাতে মগ্ন। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সিগারেটটা শেষ করে মাঠের উপর শুয়ে পড়ল অনিরুদ্ধ। ভেবেছিল ঊষা হাই হাই করে উঠবে এই নোংরা মাটিতে শুতে দেখলে। কিন্তু ঊষা তখনও একমনে বই পড়ে চলেছে দেখে বাধ্য হয়ে সব অভিমান জলাঞ্জলী দিয়ে অনিরুদ্ধ বলে উঠলো, “ধুস! এত কি পড়িস তুই বলতো? সারাদিন দেখছি কোনো না কোনো একটা বই সবসময় মুখের সামনে ধরা। শেষমেশ জিমির ভুত তোর উপরও চাপলো নাকি?”

বই পড়তে পড়তে ঊষা বলল, “এর উত্তর আমার চেয়ে বেশি তুমি জানবে। সামনেই ফাইনাল সেমেস্টারের পরীক্ষা। এখন যদি না পড়ি তাহলে কখন পড়বো?”

“রাখ তো? এত পড়ে কি হবে? আচ্ছা পরীক্ষা নিয়ে এত চিন্তা তো? ও আমি কোশ্চেন পেপা…” অনিরুদ্ধর কথা মুখেই থেকে গেল। ঊষা ঝট করে তাকিয়েছে অনিরুদ্ধর দিকে। ঊষার চোখের দিকে তাকিয়ে লজ্জায় পড়ে গেল অনিরুদ্ধ। ঊষা ভ্রু কুঁচকে ভৎসর্নার চোখে তাকিয়ে বলল, “লজ্জা করে না এই কথাটা বলতে? এই তুমি কলেজের এফিশিয়েন্ট ছাত্র? ছিঃ! ছিঃ! অনি, শেষমেশ তুমি কিনা কোশ্চেন পেপার চুরি করতে চাইছো!”

“এই দেখো! চুরি করতে চাইছি কবে বললাম? আরে আমি বলছি যে তেমন হলে চুরি করা যাবে।” আমতা আমতা করে বলে অনিরুদ্ধ।

“না করবে না!” গর্জে ওঠে ঊষা! “আমি করতে দেবো না। পরীক্ষায় ফেল করলে ফেল করবো কিন্তু কোনোরকম চিটিং করবো না।”

“আরে আমি কথার কথা বলছি। সত্যি সত্যি করবো নাকি? তুইও যেমন!” বলে হাসার চেষ্টা করে অনিরুদ্ধ। ঊষা গম্ভীর মুখে বই পড়তে পড়তে বলে, “কথাটাও বলবে না। আমি চাই না আমার কেরিয়ারে আর কোনো দাগ লাগুক। মনে রেখো অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত, তোমার জন্য যদি আমার কেরিয়ারে কখনো দাগ লাগে তোমাকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না।”

বলে আবার বইতে মুখ গোঁজে ঊষা। অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আলতো করে বলে , “ঊষা, তুই আমার উপর শুধু শুধু রাগ করছিস। আমি তো জাস্ট কথার কথা বলেছিলাম। আমি জানি যদি আমি কোনোদিন পেপার চুরি করেও আনি তুই কোনোদিনই সেই পেপার ফলো করবি না। বরং এমন ব্যবস্থা করবি যাতে সেই পেপারে কেউ পরীক্ষা না দিতে পারে।”

“তা জানোই যখন তাহলে এরকম কথা বলে আমাকে রাগিয়ে দাও কেন?”

“সত্যি বলবো? না কারনটা অনেকটা সেই নাইন্টিজের বাংলা সিনেমার ডাইলগের মতো শোনাবে।”

“বাঃ বাঃ তুমি আবার বাংলা সিনেমাও দেখো নাকি?” ঠোঁট ওল্টায় ঊষা।

“একসময়ে দেখতাম। এখন মনে পড়লে মনে হয় কেন দেখতাম?” বলে হতাশ গলায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনিরুদ্ধ।

“তা এই সত্যিটা কি শুনি?”

“রাগলে তোকে ভীষণ কিউট লাগে।”

কথাটা শোনার পর কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকে ঊষা তারপর হো হো করে হেসে ফেলে। অনিরুদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ঊষার দিকে। কিছুক্ষণ হাসার পর ঊষা নিজেকে সামলে বলে, “ইস! এর চেয়ে না বললেই পারতে! কি বাজে লাগলো শুনতে! আমি তোমার সানলাইট মার্কা অ্যাডের লাইন এটা।”

হতাশ গলায় অনিরুদ্ধ বলে , “জানতাম! আমি জানতাম এই নিয়ে খিল্লি হবে। আরে ওসব ফ্লার্টিং টার্টিং আমার দ্বারা হয় না।”

হাসতে হাসতে ঊষা বলে, “তাই বলে এই বস্তাপঁচা ডাইলগ ঝাড়বে? ও মাগো! পেট ব্যথা করছে আমার হাসতে হাসতে!”

কাঁদো কাঁদো মুখ করে অনিরুদ্ধ বলে, “সবই আমার কপাল! নাহলে এরম প্রেমিকা জোটে? কতদিন পর প্রেমিকাকে প্রেম নিবেদন করলাম। কোথায় লজ্জা পাবি তা না উল্টে হেসে গড়িয়ে পড়ছিস।”

ঊষা হাসি থামিয়ে বলে, “ তা হাসবো না তো কি করবো? তুমি যেমন ফ্লার্টিং পারো না তেমনই নেকুপুষু প্রেম আমারও পোষায় না। কাজেই ওসব ডাইলগ দিয়ে আমাকে পটাতে পারবে না।” 

“তাহলে কি করিলে আপনার হৃদয় পাবো দেবী?”

“অতো বার খাওয়াতে হবে না।” বলে আবার বইতে মুখ গোঁজে ঊষা। 

“ইস! কি ভাষা হয়েছে রে তোর!” নাক কুঁচকে বলে অনিরুদ্ধ।

“কি করবো? মোর প্রেমিকের সঙ্গদোষের জোর।” বই পড়তে পড়তে আলগোছে বলে ঊষা।

অনিরুদ্ধ প্রথমে চমকে গিয়ে তারপর হেসে বলে “আমি নিরপরাধ ধর্মাবতার! আমার দোষ নাই।”

ঊষা উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “ওই ক্লাসের টাইম হলো আমি পালাই।”

******

বাইকটা গ্যারাজে পার্ক করে বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথে বাবার গলা শুনতে পেল অনিরুদ্ধ। ঘরে ঢুকে দেখলো বাবা আজকে সকাল সকালই দোকান থেকে ফিরে এসেছেন। ড্রইং রুমে সোফায় বসে তার দিকে অপলকে তাকিয়ে আছেন। পাশে দাদা বিব্রত মুখ করে বসে। ঠাকুমার সোফার আরেকপাশে থমথমে মুখ করে বসে আছেন। অনিরুদ্ধ ওর বাবাকে পাত্তা না দিয়ে চুপচাপ দেওয়ালের হুকে বাইকের চাবি ঝুলিয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোতেই শুনতে পেল বাবার গম্ভীর কন্ঠস্বর। 

“দাঁড়াও অনি! তোমার সাথে কয়েকটা কথা ছিল।”

অনিরুদ্ধ থমকে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে ব্যাপারখানা আঁচ করতে করতে এগিয়ে এলো ড্রইং রুমে। বাবা তখনও তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে। সে কাছে এগোতেই তিনি বললেন, “বসো!”

অনিরুদ্ধ সোফায় বসার পর কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, “কাল থেকে তুমি আমার সাথে দোকানে বসবে। অনেক ঘোরাঘুরি, পড়াশুনোর নামে রংবাজি হয়েছে আর নয়! এবার থেকে সব বন্ধ।”

অনিরুদ্ধর মনে হল কেউ যেন তাকে অনেক উচু থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলে দিয়েছে। ব্যাপারটা হৃদয়ঙ্গম করতে বেশ কিছুক্ষণ লাগলো তার। কোনোমতে সে জিজ্ঞেস করলো , “কেন?”

“আমি বলেছি বলে! আমি চাই না তোমার স্বেচ্ছাচারিতার জন্য আমাকে আর কোনো ঝামেলার মুখোমুখি হতে। বাপের হোটেলে থেকে বাপের পয়সায় খেয়ে আর ঘোরাঘুরি করতে হবে না।”

“কিন্তু আমার চার্টাড অ্যাকাউন্টেন্সি…”

“থামো! আর গুলগপ্পো দিতে হবে না! তোমার মিথ্যে ধরা পড়ে গেছে!”

পরিস্থিতি সামলাতে ঠাকুমা বলে উঠলেন, “আহা ও বাইরে থেকে এসেছে! স্নান করে ফ্রেশ হয়ে আসুক। তারপর নাহয় খেতে বসে ধীরে সুস্থে…”

“তুমি চুপ করো মা!” গর্জে উঠলেন অনিরুদ্ধর বাবা।

“বাপ-ছেলের মাঝে একটাও কথা বলবে না তুমি! তোমার আশকারাতেই ও এতবড়ো স্পর্ধা দেখিয়েছে! কিছু বলতে গেলেই সবসময় তুমি আড়াল করে গেছো ওকে! তোমার আশকারা না হলে এত সাহস পায় কোথা থেকে?”

অনিরুদ্ধ নিজেকে সামলে বলে ওঠে, “এক সেকেন্ড! ঠাম্মির সাথে ওভাবে কথা বলছো কেন? কি হয়েছেটা কি? আমি এমন কি করেছি যেটায় তোমার মুখ দেখানো দায় হয়ে গেছে! কি করেছি আমি?”

“কি করেছো? আবার বড়ো মুখ করে জিজ্ঞেস করছো আমাকে? আমার মান সম্মান একেবারে ডুবিয়ে দিয়েছ তুমি!”

“আহা কি করেছি সেটা তো বলবে? ফাঁসির আসামীকেও সাজা দেওয়ার আগে তার অপরাধ সম্পর্কে জানানো হয়। সেখানে আমার জীবন নিয়ে এতবড়ো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমি জানবো না যে কি কারনে এই সিদ্ধান্ত নিতে হলো তোমাকে?”

“বেয়াদপ ছেলে! বাপের নাম ডুবিয়ে চাকরি করতে যাবে তুমি? লোকের ফাইফরমাস খাটবে? বড্ড লায়েক হয়ে উঠেছ না তুমি?”

এতক্ষণে সবটা পরিস্কার হয় অনিরুদ্ধর কাছে। সে চট করে খামটা খুলে ফেলে। ভেতর থেকে বের করে আনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা। পড়তে পড়তে মনের ভেতর একটা আনন্দের ঢেউ খেলে যায় তার। অবশেষে সে পেরেছে! একটা চাকরি! যে কোনো একটা হোক তাও একটা সরকারি চাকরি! মুহূর্তের মধ্যে ড্রইংরুম, ঠাকুমা, দাদা, বাবা চোখের সামনে থেকে উবে গেল। সে নিজেকে আবিস্কার করলো কফিহাউজে। তার সামনে চেয়ারে বসে আছে ঊষা। একদৃষ্টে চেয়ে আছে কফির কাপের দিকে।

******
“কিরে হা করে বসে আছিস কেন? খা! বুঝেছি, কফিটা ভালো হয়নি না? সত্যি কফিহাউজের কফির মানটা দিন দিন কেমন হয়ে যাচ্ছে।”

সম্বিত ফিরে পেয়ে হাল্কা বিব্রত হয় ঊষা। হাল্কা হেসে বলে, “এমা! না না! কফি ঠিকই আছে।”

“তাহলে খাচ্ছিস না কেন?”

“খাচ্ছি তো।” বলে কফির কাপে চুমুক দেয় ঊষা। 

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে ঊষার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলে, “ব্যাপার কী বল তো? কয়েকদিন ধরে দেখছি তুই একটু ডিস্টার্বড। কী এত চিন্তা করছিস তুই? ”

ঊষা চমকে বলে, “কই কিছু না তো! সব ঠিক আছে। ”

অনিরুদ্ধ মাথা নেড়ে বলে ,“না কিছু ঠিক নেই। থাকলে তোর মুখটা এরকম দেখাতো না। কী হয়েছে আমাকে বল?”

ঊষা বিরক্ত হয়ে বলে,“বললাম তো কিছু হয় নি! তোমার কফি খাওয়া হয়েছে? তাহলে চলো আমাকে বাসস্টপে পৌঁছে দেবে”

“সেকি? এত তাড়াতাড়ি? কিছুই তো খেলি না!”

“আমার ভালো লাগছে না। তোমার হলে চলো। নাহলে আমিই চললাম।” বলে উঠে দাঁড়ায় ঊষা। 
শশব্যস্ত হয়ে অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ায়। কফির দাম মিটিয়ে কফিহাউজের বাইরে এসে দাঁড়ায় ওরা।

অনিরুদ্ধ বাইক বের করার সাথে সাথে পেছনে ঊষা বসতেই অনিরুদ্ধ বাইক স্টার্ট করে দেয়। কিছুদুর যাবার পর বাসস্টপে না গিয়ে উল্টোদিকের পথ ধরে সে। ঊষা অবাক হয়ে বলে, “আরে করছো টা কী? বাসস্টপ তো পার হয়ে গেল!” 

অনিরুদ্ধ বলে, “জানি, চুপ করে বসে থাক। আমি তোকে ঠিক সময় পৌঁছে দেব। এখন বিরক্ত করিস না।” 

ঊষা বুঝতে পারে অনিরুদ্ধ আজ ওকে সহজে ছাড়বে না। পেটের কথা বলিয়ে ছুটি দেবে। ঊষা শান্ত গলায় বলে, “বাইক থামাও। আমি নেমে যাচ্ছি অনিরুদ্ধ ।” অনিরুদ্ধ বাইকের গতি বাড়িয়ে দেয়। ঊষা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অনিরুদ্ধকে। 

“অনিরুদ্ধ আমার ভয় করছে। বাইক থামাও বলছি।” ঊষা কাঁপা অথচ শান্ত গলায় বলে। অনিরুদ্ধ জবাবে বাইকের গতি আরো বাড়িয়ে দেয়। ঊষা আরো ভয়ে চেপে ধরে অনিরুদ্ধর জামাটাকে। কিন্তু অনিরুদ্ধর কোনো বিকার নেই। সে প্রবল গতিতে বাইক চালিয়ে যাচ্ছে। বেগতিক দেখে অবশেষে ঊষা বলে, “আচ্ছা বেশ বলছি কী হয়েছে। আগে বাইকটা থামাও।” অনিরুদ্ধ বাইকের গতি কমিয়ে এগোতে থাকে।

বেশ কিছুদুর যাবার পর একটা পার্কের সামনে বাইকটা দাঁড় করায় অনিরুদ্ধ । ঊষা চট করে নেমে দাঁড়ায়। অনিরুদ্ধ বাইকটাকে পার্কিংয়ে রেখে ঊষার দিকে তাকিয়ে বলে, “ভেতরে কথা বলার অনেক জায়গা আছে। সেখানে আমাদের ডিস্টার্ব করবে না।” বলে ঊষার সাথে সাথে পার্কের ভেতরে ঢোকে। 

পার্কের ভেতরটা বেশ ছিমছাম, নিরিবিলি। চারদিকে সবুজ জানা-অজানা গাছে ঘেরা পার্কটা। একপাশে বাচ্চাদের খেলার জন্য নানারকম দোলনা, স্লিপার রয়েছে। তেমনই জগারদের জন্য মোরামের রাস্তা আছে। রাস্তার ধারে কয়েকটা স্টিলের বেঞ্চ পাতা। তার মধ্যে একটায় বসে অনিরুদ্ধরা। 

এখন দুপুরবেলা বলে পার্কে তেমন ভীড় নেই। দু-একজন যারা আছে তারাও নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে ব্যস্ত। অনিরুদ্ধ সেদিকে আলগোছে একবার তাকিয়ে সিগারেট ধরায়, তারপর একটা টান মেরে বলে, “এবার বল কী হয়েছে।”

ঊষা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। অনিরুদ্ধ বোঝে কোথা থেকে শুরু করবে বুঝতে পারছে না মেয়েটা। ঊষাকে সবটা গুছিয়ে বলার সময় দেয় সে। কিছুক্ষণ পর ঊষা সোজা তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে। অনিরুদ্ধ দেখে ঊষার চোখের কোণটা চিকচিক করছে জলে। যেন প্রাণপণে কান্না চেপে রেখেছে মেয়েটা। যেকোনো মুহূর্তে কেঁদে ফেলবে। হতবাক অনিরুদ্ধ ঊষার হাত নিজের মুঠোতে এনে বলে, “কী হয়েছে? এনিথিং সিরিয়াস? বাড়ির সবাই ভালো আছে? কাকু মানে তোর বাবার শরীর ভালো তো?”

মাথা নেড়ে ইতিবাচক উত্তর দেয় ঊষা। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনিরুদ্ধ ।

“ যাক বাবা! আমি তো টেনশনে পড়ে গিয়েছিলাম! তাহলে কী হয়েছে?”

“আমার বোধহয় আর বেশিদিন পড়া সম্ভব হবে না।” 

“মানে?” কথাটা শুনে ভ্রু কুঁচকে যায় অনিরুদ্ধর। 

ঊষা ধরাগলায় বলে, “বাবার শরীর রীতিমতো ভাঙছে। এককালে আমাদের জন্য অনেক খেটেছে। আর কত খাটবে? তার উপর বয়স হয়েছে। সংসারটা বাবার পেনসন আর আমার এবং নিশার টিউশনির টাকায় চলে। গত সেমেস্টারে দুটো টিউশনি ছেড়েছিলাম পরীক্ষার চাপে। তারপর আর পাইনি। কেউ আর নতুন টিউশন টিচার চাইছে না। বাকি টিউশনগুলোও প্রায় না হবারই সমান। বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে তাদের অভিজ্ঞ গৃহশিক্ষক প্রয়োজন। অতএব মানে মানে কেটে পড়ো। কিন্তু যেহেতু অনেকদিন ধরে পড়াচ্ছি তাই মুখ ফুটে বলতে পারছেন না। এবার ওটা ছেড়ে দিলে কার্যত হাত ফাঁকা হয়ে যাবে আমার । বাড়িতে আমি ছাড়াও নিশা রয়েছে। ওরও পড়াশুনো আছে। সামনের বছর জয়েন্ট দেবে। এরমাঝে যদি আমি…”

“বুঝেছি। কিন্তু তাই বলে এভাবে হুট করে মাঝপথে পড়া ছেড়ে দিবি?”

“না। লাস্ট সেমেস্টারটা দিলেই আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হবে। গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেই ইতি দেব।”

ঊষা মাথা নাড়ে। অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করে, “আর তোর চাকরির স্বপ্ন, চাকরি করে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটা? সেটার কি হবে?”

ম্লান হাসে ঊষা, “কতরকম স্বপ্নই তো দেখে মানুষ । সব স্বপ্ন কি সত্যি হয়? মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখাটাই সার। বাস্তবে পূর্ণ করা অসম্ভব । এটাও তেমনই থেকে যাবে।”

“তারপর কি করবি?”

“যা যুগে যুগে মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েরা করে আসছে। কন্যাদায়গ্রস্ত বাপ-মাকে মুক্তি দেব।”

“মানে? তুই বিয়ে করবি? কাকে?”

“যার সাথে বাবা মা ঠিক করবে!”

“হোয়াট দ্য ফ…! আর আমাদের সম্পর্কটা?”

“ভালো স্বপ্ন মনে করে ভুলে যেতে হবে দুজনকেই। এই কারনেই আমি কোনোরকম সম্পর্ক চাইনি তোমার সাথে। তুমিই কাছে এসেছিলে।”

অনিরুদ্ধর মনে হয় তার মাথায় যেন বাজ পড়লো। তার মনে হয় কেউ তাকে মাটিতে আছড়ে ফেলেছে। এতদিন সে মুর্খের স্বর্গে বাস করেছে। এখন বাস্তবের মুখোমুখি হতে সব যেন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। ভালোবাসা জিনিসটা ততদিনই সুন্দর থাকে যতদিন পর্যন্ত মানুষ বাস্তবের সম্মুখীন না হচ্ছে।

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। তারপর হঠাৎ বলে, “বাড়িতে জানে আমাদের সম্পর্কে? ”

“নিশা বাদে কেউ জানে না। সেদিন নিশা আমাদের দেখে কিছু আন্দাজ করেছিল বোধহয়। তারপর সবটা জানতে পারে। কিন্তু বাড়িতে জানায় নি।” 

“হুম। বেশ আজ বাড়ি ফিরে কাকিমাকে জানিয়ে দিবি।”

ঊষা ত্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করে, “মানে? কী বলতে চাইছো তুমি?”

“মানে কাল আমি ঠাম্মিকে নিয়ে তোদের বাড়ি আসছি। তোকে বউ করে নিয়ে যেতে।”

“পাগল হয়ে গেছ তুমি? কী বলছো কোনো খেয়াল আছে তোমার?”

“কেন? ভুল কী আছে এতে?”

“বাড়িতে জানাজানি হলে কী হবে ভেবেছ? আমার কলেজে পড়া আগেই বন্ধ হয়ে যাবে! পড়াশোনা করতে গিয়ে কলেজে প্রেম করছি জানলে… পাড়া-প্রতিবেশীরা এমনিতেই বাঁকা কথা শোনায়। তারপর জানাজানি হলে… না না! তা হয় না। তার উপর বাবা আমাদের সম্পর্ক মানবে না।”

“সেকি? কেন?”

“যারা ব্যবসা করে, কিংবা দোকান বা কারখানা আছে তাদের বাবা সহ্য করতে পারে না।”

“তোর বাবা সিপিএম নাকি? শ্রেণীশত্রু, বুর্জোয়া মানে?”

“অনিরুদ্ধ!” ঊষা বিরক্ত হয়।

“যাহ বাঁ…! তুই তো বলছিস তোর বাবা ব্যবসায়ীদের সহ্য করতে পারে না। তা সিপিএমের পাবলিকরাই তো এসব মানে।”

“বাবার মত হলো, ব্যবসায় স্থায়ী আয় নেই। পুরোটাই লাভের উপর নির্ভরশীল । এমনকি ব্যবসা করে সকলে লাভের মুখ যেমন দেখে রাজা হয় তেমনই ক্ষতি হলে পথের ভিখিরি হয়ে যায়। তাই বেশীরভাগ ব্যবসায়ী কালোটাকা রাখে। ট্যাক্সে ফাঁকি দেয়। তাই বাবার চোখে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ক্রিমিনাল। বাবার সখ সরকারি চাকরী করা ছেলের সাথে আমাদের দুই বোনের বিয়ে দেবে। ”

“বুঝলাম।” বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনিরুদ্ধ ।

“কী বুঝলে?” ঊষা জিজ্ঞেস করে।

“প্রথমত, তোর বাবা ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে গেলে ভালো নাম করতেন, ডাকঘরের পোষ্টমাষ্টার হয়ে জীবন ব্যর্থ করেছেন। দ্বিতীয়ত, তোর বাবা পাক্কা সিপিএম এবং তোকেও মিনি সিপিএম করে তুলেছেন। এবং শেষ পয়েন্ট তোর বাবা ছিটগ্রস্ত। সরি ছিটগ্রস্ত বলছি। কথাটা হবে টিপিক্যাল ছিটগ্রস্ত।”

ঊষা উঠে দাঁড়ায়। রাগে ওর গোটা মুখ থমথমে হয়ে গেছে। সে হাটা শুরু করলে পেছন থেকে অনিরুদ্ধ ঊষার হাত ধরে বলে, “আরে রাগ করলি নাকি? আরে আমি মজা করছিলাম! আচ্ছা বাবা শ্বশুরমশাইকে আর সিপিএম বলবো না হয়েছে? এবার বোস, একটা আইডিয়া এসেছে।”

“কী?”

“তোর বাবার চাকরিওয়ালা ছেলে পছন্দ তো? বেশ আমারও বাবার ব্যবসায় জয়েন করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। কিন্তু বাবা নাছোড়বান্দার মতো আমাকে ব্যবসায় নামাবেই। একটা রিজন খুঁজছিলাম বাবাকে থামানোর। মনে হয় এতে দুজনের বাপই থামবে। আচ্ছা আমি যদি চাকরী পেয়ে তোর বাবার সামনে হাজির হই তাহলে তো ওনার কোনো আপত্তি নেই।”

“মানে? কী বলতে চাইছো তুমি? তুমি চাকরি করবে?”

“ইয়েস মাই লাভ। চাকরি করবো।”

ঊষা এতক্ষণে ফিক করে হাসে, “তুমি আর চাকরি? ব্যাপারটা কেমন শোনাচ্ছে না? মানে শচিনকে সিজন বল দিয়ে ফুটবল মাঠে বাস্কেট বল খেলতে বলা হচ্ছে এমন ব্যাপার হয়ে গেল না?‌ এ প্ল্যান চলবে না।”

“আলবাৎ চলবে! বাজি লাগাতে পারিস।”

“চাকরি মুখের কথা নয়। আর জীবনটা কলেজ‌ নয় যে গায়ের জোরে সব পেয়ে গেলে। ”

“বেশ দেখা যাবে! আমি চাকরি পেয়ে দেখাবো। কি বাজি রাখবি বল।”

“অনিরুদ্ধ…!”

“আমি বাজি লাগাচ্ছি। যদি পাঁচবছরের মধ্যে আমি চাকরি না পাই তাহলে বাবার ব্যবসায় যোগ দেব। আর তোর বিয়েতে সবচেয়ে বড়ো বোকে টা আমিই পাঠাবো। কিন্তু চাকরি পেলে তুই কি‌ করবি?”

ঊষা থমকে তাকায় অনিরুদ্ধর দিকে। ছেলেটা অন্যদিন এতটা কনফিডেন্স নিয়ে কথা বলে না। আজ এতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ কেন? অবশ্য একটা চমৎকার হোক সেও চায়। কিন্তু … দেখাই যাক‌ না কি হয় কিছুক্ষণ ভেবে বলে, “তুমি যা চাইবে তাই পাবে।”

“কথা দিচ্ছিস?”

“দিলাম!”

“পরে পিছিয়ে যাবি না তো?”

“প্রশ্নই ওঠে না!"

“পাঁচবছর পর না পারলে আমাদের সম্পর্কটার কী হবে?”

“যা হয়, ব্রেকাপ। চিরকালের মতো। আমরা একে অপরের অচেনা হয়ে যাবো চিরকালের মতো। এই বাজিটা শুধু আমাকে পাবার বাজিই নয় আমাদের সম্পর্কটাকে পণ করে বাজি। জিতলে ঠিক আছে। হারলে আমি তোমাকে চিনবো না।”

“বেশ! মনে থাকবে তো?”

“থাকবে! তোমার মনে থাকবে?”

প্রশ্নটা ক্রমাগত তাকে ধাক্কা দিতে দিতে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে। অনিরুদ্ধ দেখে সে ড্রইংরুমে বসে আছে। তার বাবা ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করছেন, “মনে আছে ওদের মাকে কী কথা দিয়েছিলে? ছেলেদের মানুষ করবে। এই তোমার মানুষ করার নমুনা?”

চিঠিটা আরেকবার পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। তাহলে দিনটা এসেই গেল অবশেষে! সোজাসুজি সে তাকালো তার ঠাকুমার দিকে। অপমানে,আত্মগ্লানিতে, কষ্টে মানুষটা এতটুকু হয়ে গেছে। হঠাৎ মাথায় আগুন চেপে গেল তার। ঊষাকে সে কথা দিয়েছিল আর সে কোনোদিন ঝগড়া করবে না। কিন্তু কতক্ষণ ঠাকুমাকে এভাবে অপদস্ত হতে দেখা যায়? সে ঠিক করল আর নয়। আজই এসপার নয় ওসপার করে ছাড়বে। ভাবতে ভাবতে সে উঠে দাঁড়ালো সোফা ছেঁড়ে।

“একমিনিট! ব্যাপারটা কী? ঠাকুমাকে খামোখা কথা শোনাচ্ছ কেন?"

অনিরুদ্ধর বাবা অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বললেন,“একটাও কথা বলবে না তুমি! চুপচাপ ঘরে যাও!"

“না যাব না! ঘরের সদস্য হিসেবে আমারও কিছু মতামত আছে। তাছাড়া আমি তোমার কচি খোকা নই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক হবার দরুণ আমার জীবন নিয়ে আমার নিজস্ব মত আছে। তুমি এভাবে নিজের মত আমার উপর আমার ইচ্ছে ছাড়া চাপিয়ে দিতে পারো না। আমি দাদা নই যাকে ম্যানুপুলেট করে, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে ব্যবসায় নামাতে পারবে। ”

“এত বড়ো বড়ো কথা? চাকরি পেয়ে লায়েক হয়ে গেছ না? আমি তোমাকে...” বলে অনিরুদ্ধকে সপাটে চড় মারেন তার বাবা।

চড়টা খেয়ে স্বাভাবিক গলায় বলে অনিরুদ্ধ, “আমাকে যতখুশি মারতে পারো, কিন্তু মেরে তো সত্যিটা মিথ্যে হবে না। দাদা স্কুলে টপার ছিল। আমাদের স্কুলে সবচেয়ে হায়েস্ট মার্কস দাদার। এমনকি কলেজে পর পর তিনবছর টপারের সিট দাদার দখলে ছিল। সেই মেধাবী ছেলেটা হঠাৎ ফাইনাল পরীক্ষায় সাপ্লি পেল এটা বিশ্বাসযোগ্য?তুমিই বলো এটা সম্ভব?"

অনিরুদ্ধর দাদা উঠে দাঁড়ায়, “চুপ কর অনি। বাবার মুখে মুখে কথা বলিস না।”

“তুই চুপ কর! এতদিন একটা মিথ্যে ভয় নিয়ে বেঁচে আছিস। তোর কি মনে হয় মানুষটা সত্যিই বিষ খাবে?" বলে অনিরুদ্ধ ওর বাবার দিকে ফিরে বলে, “বলো সেদিন তুমি দাদার ঘরে ঢোকোনি? দাদাকে ভয় দেখাও নি? ভুল বুঝিয়ে ম্যানুপুলেট করো নি? সেদিন তুমি ভেবেছিলে আমি ঘুমিয়ে আছি। কিন্তু সেদিন আমি সবটা শুনেছিলাম বাবা! সেদিনই বাবা হিসেবে তোমার প্রতি সব শ্রদ্ধা শেষ হয়ে গেছে আমার! বাবা‌-মায়েরা সন্তানের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করে থাকেন, তারা যা করেন সন্তানের মঙ্গলের জন্য এটা আমি মানি। কিন্তু কোনো বাবা নিজের দায়িত্বের বোঝা জোর করে নিজের সন্তানের কাছে চাপিয়ে দেন না। নিজেকে শেষ করে দেবেন এমন ভয় সন্তানকে দেখান না। কিন্তু তুমি? তুমি নিজের ব্যবসার জন্য এসব করেছ।”

“তাতে ভুল কোথায়? তোর দাদা পাশ করলে বিদেশে যেত। সেখানকার পড়াশোনা আমাদের ব্যবসার কোন কাজে লাগতো শুনি? আমি ইনভেস্ট বুঝি। বেকার কটা সস্তার রদ্দির কাগজের জন্য টাকা খরচ করা আমার ধাঁতে নেই! তোর দাদাকে বলেছিলাম বলে আজ ব্যবসাটা বেড়েছে। তুইও আয় তাহলে তিন বাপ ব্যাটায় ছহাতে রোজগার করবো ।"

“আর দাদার মতো স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে দেব তাই তো?"

“ধুস! তোরা একদম তোদের মায়ের মতো হয়েছিস! ইমোশনাল ফুল! ব্যবসায় ইমোশন চলে না, রক্তের সম্পর্ক, মনের ইচ্ছে-অনিচ্ছে চলে না। চলে শুধু প্রফিট আর কাস্টোমারকে ম্যানুপুলেট করে রাইভালদের টেক্কা দেওয়ার স্কিল। এই যে এতদিন কলেজে নষ্ট করলি এ সময়টা ব্যবসায়‌ লাগালে কত টাকা আসতো জানিস?”

“সারাদিন শুধু প্রফিট, টাকা আর প্রফিট! তোমার জীবনের আর কোনো লক্ষ্য‌ নেই না? বেশ একটা প্রশ্নের উত্তর দাও তাহলেই আমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে তোমার সাথে দোকানে বসবো।‌ এই অফিস, ব্যবসা, আমাদের পরিচিতি বাদ দিলে তুমি কী ? তোমার অস্তিত্ব কী?তোমার পরিচয় কী?সেনগুপ্ত ইন্ডাস্ট্রি বাদ দিলে আমরা কারা? আমাদের পরিচয় কী? লোকে আমাদের চিনবে কি করে?আমাদের ড্রাইভারের পরিচয় আছে সে একজন ড্রাইভার। সিকিউরিটি গার্ডেরও পরিচয় আছে একটা। তোমার কী পরিচয়? কে তুমি? তোমাকে মিডিয়ায় বলা হয় সেনগুপ্ত ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান কর্ণধার। ব্যস ঐটুকুই তোমার পরিচয়? আর কিছু না? এই যে দাদা ওর কি পরিচয়? ঠাকুমা আর মায়ের পরিচয় তারা সেনগুপ্ত পরিবারের পুত্রবধু, এছাড়া তাদেরকে লোকে আর কী নামে চেনে? পার্টিতে গেলে লোকে এতদিন বলতো ,‘The Sengupta's are coming' এছাড়া কি আর কোনো পরিচয় নেই?ধরে নাও না সেই পরিচিতি কেই খোঁজার জন্য এই চাকরিটা করছি। যাতে লোকে সেনগুপ্তরা না বলে একটা স্পেসিফিক নামে ডাকে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে এই পদক্ষেপ।”

“কোনো সিনেমা দেখে এসেছ নাকি কলেজে কোনো নাটক-ফাটক চলছে?এত বড়ো বড়ো ডাইলগ বেরোচ্ছে! নাহ পরিচালককে আর অভিনেতাকে একসাথে পুরস্কার দিতাম।"

“আমি তো কোনো সিনেমার কথা বলছি না। অবশ্য তোমার মনে হলে আলাদা ব্যাপার । আমি শুধু আমাদের বংশের ঐতিহ্য ফলো করছি।”

“মানে?”

“মনে আছে তুমিই তো গল্প বলেছিলে তোমার ঠাকুর্দার বাবা জমিদার বংশের সন্তান। সেন রাজাদের রক্তের একটা ধারা নাকি আজও আমাদের ধমনিতে বহমান। তোমার ঠাকুর্দার বাবা জমিদারি ছেড়ে ব্যবসা করতে চাওয়ায় জমিদার বংশে অশান্তি লেগেছিল। শেষমেষ তিনি সফল হন।”

“হ্যাঁ কিন্তু কোন মুল্যে মনে আছে তো?তা সেটা চোকাতে পারবে?এত বড়ো বড়ো বাতেলা বাড়ির বাইরে গিয়ে টিকবে তো?”

স্থির হয়ে যায় অনিরুদ্ধ । মানেটা পরিস্কার তার কাছে। বাবা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন। ত্যাজ্যপুত্র করবেন তাকে। চোখ বুঁজে কিছুক্ষণ নিজেকে সময় দেয়। তারপর ধীরপায়ে চলে যায় নিজের ঘরে। অনিরুদ্ধর বাবা বিজয়ের হাসি হেসে বলেন, “জানতাম পারবে না! আরে মুখে ন্যায়ের কথা, বড়ো বড়ো দার্শনিক ভাষন ঝাড়া সহজ। কাজের বেলা সকলের ফেটে চার হয়ে যায়। বাপের টাকায় অবলম্বন করে, বাইকে টোটো করে ঘোরে যে ছেলে তার মুখে মধ্যবিত্তের বস্তাপঁচা ডাইলগ মানায় না! ওসব সিনেমাতে হয়। যে নিজেই আত্মনির্ভর নয় সে নাকি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছে! আমাকে কনভিন্স করতে যা করেছ এই এফর্টটা ব্যবসায় লাগিয়ে দেখাও। আমিও দেখবো কত টাকা প্রফিট হয়। আমাকে জ্ঞান দিতে‌ এসেছে। দুদিনের ছেলে...”

অনিরুদ্ধর বাবার মুখের কথা মুখেই থেকে গেল কারন অনিরুদ্ধ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। কাঁধে ট্রাভেলিং এর রুকস্যাক। পরনে একটা মলিন শার্ট আর ফেডেড জিন্স। পায়ে একটা সাদামাটা পুরোনো স্পোর্টস শু। ড্রইংরুমে এসে পকেট থেকে বাইকের চাবিটা বের করে টেবিলে রাখে অনিরুদ্ধ। 
“বাইকটা রাখলে রেখে দিয়ো নাহলে বিক্রি করে দিও। রুমটা চাইলে পিজি রাখতে পারো আমার আপত্তি নেই। ল্যাপটপটা আর ফোনটা নিচ্ছি কারন ওদুুটো লাগবেই। বাকি ম্যাকবুকটা ফরম্যাট করে দিয়েছি। রুমটা পিজি ইউজ করতে পারে। এমনকি আসবাবগুলোও। জামাকাপড় নিয়েছি কয়েকটা। বাকি জিনিস হোস্টেলে আছে, ওখান থেকে নিয়ে নেবো।”বলে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরে অনিরুদ্ধ । 

“চললাম ঠাম্মি।”

“কোথায় যাচ্ছো দাদুভাই এই বুড়িটাকে ফেলে?”

“নিজেকে খুঁজতে। আর বংশের নিয়ম অনুযায়ী বাঁধাছক ভেঙে নতুন ভাবে নতুনধারা তৈরি করতে। আমার শরীরেও তো সেনগুপ্তদের রক্ত বইছে! সেটা প্রমাণ করতে হবে। এবং তার জন্য সব রকম কষ্ট সহ্য করতে আমি প্রস্তুত। আমাকে আটকে রেখো না ঠাম্মি। এতে আমরা দুজনেই কষ্ট পাবো। তার চেয়ে এটাই ভালো হবে। তবে কথা দিচ্ছি তোমার কাছে ফিরবো আমি। হয় নিজেকে প্রমাণিত করে বিজয়বিক্রমে নাহয় পথভোলা ঘরের ছেলে হিসেবে। ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারবে তো?" শেষ কথাটুকু বলতে গিয়ে গলা কেঁপে ওঠে অনিরুদ্ধর। এই পরিবারে দাদা ছাড়া একমাত্র ঠাকুমাই ওকে ভালোবাসতো। ঠাকুমার কোলেই মানুষ সে। ঠাকুমার শরীরটা ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। ঠাকুমার কিছু হলে দাদা আর ও একা হয়ে যাবে।

“পারবো!” ধরা অথচ দৃঢ় গলায় বলে উঠলেন বৃদ্ধা । 

“যাও। নিজের মতো বাঁচো জীবনটাকে। প্রমাণ করে দাও তুমি সেনগুপ্তবাড়ির ছেলে। আমি আশীর্বাদ করছি সফল হবে তুমি। তারপর এই বুড়িটার কথা মনে পড়লে ফিরে এসো!" বলে অনিরুদ্ধর কপালে একটা চুমু খেলেন তিনি।
অনিরুদ্ধ তাঁকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল। দাদাকে জড়িয়ে বলল, “চললাম রে।"

ধরা গলায় অনিরুদ্ধর দাদা বলল, “আয়! যেটা আমি পারিনি তুই করে দেখা ভাই। জানবো তোর হয়ে আমিই সেসব করছি। ঠাম্মি আর বাবাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। ওদের জন্য আমি রইলাম। জীবনে কখনো দরকার পড়লে ফোন করিস আমি চলে আসবো। বাবা যতই বলুক, এবাড়ির দরজা তোর জন্য সবসময় খোলা আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে।”

অনিরুদ্ধ ওর দাদাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরে সদর দরজার দিকে এগোয়। পেছন থেকে শুনতে পায় ও বাবার কন্ঠস্বর, “যাচ্ছো যাও। আমিও দেখবো এই অ্যাডভেঞ্চার কতদিন টেকে। তিন মাসের মধ্যে তুমি ফিরে আসবে এই আমি বলে রাখলাম।”

অনিরুদ্ধ হেসে পেছন ফিরে বলে, “তা ঠিক! তিন মাস পরেই ফিরবো আমি। তবে এভাবে নয়,পুলিশের পোশাকে।”

“মানে?” ভ্রু কুঁচকে যায় অনিরুদ্ধর বাবার।

হেসে অনিরুদ্ধ বলে, “অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা দেখলে অথচ খামে ছাপটা দেখনি তুমি। তোমার রগচটা ছেলে রগচটা চাকরিই পেয়েছে। বাকিটা তিন মাস পর ফিরে এলে জানতে পারবে।” বলে হাসতে হাসতে মেন গেট থেকে কানে ফোন দিয়ে বেরিয়ে যায় অনিরুদ্ধ ।

******

বাইকটা নিয়ে ঊষাদের বাড়ির প্রায় পৌঁছে গেছে এমন সময় বাইকটা গোঁ গোঁ শব্দ করে থেমে গেল। অনিরুদ্ধ অনেক চেষ্টা করলো কিন্তু নাহ! বার বার কিক মেরেও স্টার্ট হচ্ছে না বাইকটা। নিজের বাইক হলে চাপ হতো না কিন্তু সেটা ছেড়ে এসেছে সে। এটা এক বন্ধুর বাইক। মনে হচ্ছে পেট্রোল শেষ। কিন্তু এখনও যে ঊষার বাড়ি অনেকটা দূর! “দুচ্ছাই!” বলে বাইকটা রাস্তার ধারে দাঁড় করাল অনিরুদ্ধ। যে করেই হোক পাত্রপক্ষের আগে পৌঁছতে হবে। অবশেষে সে জিতে গেছে খবরটা দিয়ে বিবাহ প্রস্তাবটা দিতে হবে। ফোনে অনেকবার ট্রাই করেছে কিন্তু জবাব পায় নি। হয়তো ছেলে দেখতে আসবে তাই ব্যস্ত। মেসেজ করে বলতে পারতো কিন্তু খবরটা শোনার পর ওর ঊষার রিঅ্যাকশন মিস করতে চায় না অনিরুদ্ধ। উফ! প্রায় একমাস পর দেখা হবে দুজনের! কতদিন ঊষাকে দেখেনি সে! না আর দেরী করা যাবে না। বলে বাইকটা লক করে অনিরুদ্ধ দৌড়তে লাগল ঊষাদের বাড়ি লক্ষ্য করে। 

ঊষা সেজে বসে ছিল নিজের ঘরে। আর কিছুক্ষণ পর পাত্রপক্ষ এসে পৌঁছবে। সে ঠিক করল আর সে এদের ফেরাবে না। অনেক হয়েছে আর নয়। অনিরুদ্ধকে একমাসের সময় দিয়েছিল সে। সেই একমাস শেষ হতে আর মাত্র মিনিট পাঁচেক। এখনও অনিরুদ্ধ একটা চাকরি জোগাড় করতে পারে নি। বাড়িতে সবার সাথে যুদ্ধ করতে করতে সে ক্লান্ত। দুঘন্টা আগে মেসেজটা করার পর অনিরুদ্ধ অনেকবার ফোন করেছে। সে পাত্তা দেয় নি। এবার বোধ হয় ওদের আলাদা হওয়াই উচিত। এতেই দুজনের ভালো হবে। এই ভেবে চোখের জল মুছে ফোনটা হাতে নেয় ঊষা। ঘষা স্ক্রিনে দেখাচ্ছে অনিরুদ্ধর নাম, পাশে পঁচিশটা মিসড কলের চিহ্ন। নাম্বারটায় মেসেজ করে সে, “আর একসাথে আমাদের পথ চলা হলো না। এ জন্মের বাকি পথ না হয় পরের জন্মে হেঁটে নেব। বাই। ভালো থেকো।” 

মেসেজটা পাঠিয়ে নাম্বারটা শেষবারের মতো দেখে স্ক্রিনে চুমু দিয়ে ডিলিট করতে যাবে এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢোকে নিশা। ঊষা নিশার দিকে অবাক চোখে তাকায়। দেখে নিশার মুখ আনন্দে ভরে উঠেছে। মুহূর্তে ব্যাপারটা আন্দাজ করে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে ঊষা। তারপর নিশার সাথে ঘরের বাইরে বেরিয়ে দরজার সামনে দাঁড়ায়।

আর এখানেই আমাদের গল্পের ইতি ঘটে। জানি পাঠক ভাবছেন ইস! এরকম একটা চরম জায়গায় গল্পটা শেষ হয়ে গেল! কিন্তু কি করব বলুন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দেখা- শোনা এরকম হাজারো গল্প থাকে যাদের শুরুটা জানা থাকলেও শেষটা জানতে পারি না। এই যে আপনি- আমি যারা নিত্য বাসযাত্রী। রোজ কতজনের সাথে না আমাদের সাক্ষাৎ হয়। এদের মধ্যে কেউ কলেজ পড়ুয়া, কেউ অফিস যাত্রী, কেউ বা ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছে। সকলের জীবনের গল্প কি আমরা পুরোটা জানতে পারি? মাঝে মাঝে কিছু জিনিস অজানা থাকাই ভালো। বরং চলুন না একসাথে কল্পনা করা যাক ঊষার সাথে অনিরুদ্ধর শেষ পর্যন্ত মিল কিভাবে হলো। এতক্ষণ তো আপনারা আমার মুখে থুড়ি লেখায় শুনলেন ওদের গল্প। শেষটা আপনারাই কল্পনা করুন দেখি।  

 

সাদা অর্কিডের দেশে অন্তিম পর্ব

হোটেলে ফেরার পর লাগেজ গুছিয়ে নিতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না মধুজার। শুধুমাত্র কালকের বাড়ি ফেরার সময়ের পোশাকগুলো বাইরে রেখে চটপট অতীন আর ওর জামাকা...